জঙ্গিবাদ, ধর্মবিশ্বাসের অপব্যবহার ও সরকারের তেল থেরাপি

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ হবার জন্য সরকার দুইবেলা বিনামূল্যে উপদেশ বিলি করে বেড়াচ্ছে। হয়ত প্রধানমন্ত্রীর ঘুম হারাম হয়ে গেছে এতদিনে। ওদিকে পশ্চিমারা এই প্রথম বাংলাদেশকে কব্জা করতে পেরে মহাখুশি। সহযোগিতার ঝাপি খুলে বসেছে তারা। সরকারও চাচ্ছে না তাদেরকে বেজার করতে।

অর্থাৎ সূত্রে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যে হারে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে সেই হারে সাম্রাজ্যবাদীদের আনাগোনা বাড়ছে। পাকিস্তানের সাথে অনেকে মিল খুঁজে পাবেন হয়ত।

প্রথম যখন ব্লগার খুন হওয়া শুরু হল, তখনই আশঙ্কা করেছিলাম দেশ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ঠিকই দিন দিন সেটা স্পষ্ট হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কে আছে, কার স্বার্থ আছে তা যতটা পরিষ্কার ততটাই অপরিষ্কার। তাই পেছনের শত্রুকে পেছনে রেখে যেটা সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে, অর্থাৎ জঙ্গিবাদ সেটা নিয়েই ভাবতে হবে আমাদের। আপাতত ধরে নেয়া যাক বাংলাদেশের প্রধান শত্রু জঙ্গিবাদ।

বাংলাদেশকে জিততে হলে জঙ্গিবাদকে হারাতে হবে। আর জঙ্গিবাদকে হারাতে হলে? এখানে এসে নানামুনির নানা মত হয়ে যায়। এই পয়েন্টে এসে আমরা ভুলে যাই জঙ্গিবাদের শেকড় প্রোথিত আছে ধর্মবিশ্বাসে। ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক খাতে প্রবাহিত না করলে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না হবে না হবে না।

আমরা রাজনীতিতে ধর্মবিশ্বাসের অপব্যবহার দেখেছি, অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ধর্মের অপব্যবহার দেখেছি। দেখেছি ধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করে হুজুগ সৃষ্টি করতে, রাস্তাঘাট, দোকানপাটে ভাঙচুর করতে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হয় মালাউনের বাড়িতে হামলা চালাও, শত শত মানুষ দৌড় লাগায়। ঘোষণা করা হয় খ্রিষ্টান মার, গীর্জা ভাঙ্গো- হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় কথিত জিহাদ করতে। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার আইএস তৈরি হয়ে যায়। দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে, টিভি-ক্যামেরার সামনে ধর্মের নামে দেশকে অচল করার হুমকি কতবার দেওয়া হয়েছে ভুলে গেছি আমরা? ওগুলোও উগ্রবাদ। জঙ্গিবাদ তারই পরের ধাপ মাত্র। ধর্মবিশ্বাসের কোনো প্রকার অপব্যবহারের পথ খোলা রেখে জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়।

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে জঙ্গি বের হচ্ছে মানে এই নয় যে, মাদ্রাসা থেকে হচ্ছে না। ধর্মের অপব্যবহার সবখানেই চলছে, ধর্মবিশ্বাস সবার মধ্যেই আছে, সুতরাং প্রাইভেট-পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে যেমন জঙ্গি বের হবে, গ্রাম-গঞ্জের ভাঙ্গাচোরা স্কুল-কলেজ থেকেও বের হবে, বড় বড় মাদ্রাসা থেকেও বের হবে। ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ না করলে আপনার পাশের চেয়ারের শান্ত-শিষ্ট লোকটিকেই দেখবেন কালো পতাকা নিয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে।

যে লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে ধর্মের নামে উন্মাদনা সৃষ্টি করে ঢাকায় আনা হয়েছিল, মাইকে ঘোষণা করা হয়েছিল- বঙ্গোপসাগর পরিমাণ রক্ত যদি দিতে হয় তবু দিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু নাস্তিকদের বিচার না করে এখান থেকে যাব না, ওদের ধর্মানুভূতি কি নিঃশেষ হয়ে গেছে? পাঁচ লাখ লোকের মধ্য থেকে পাঁচশ’টা জঙ্গি বের হওয়া খুব অসম্ভব?

আপনারা ভোটের রাজনীতি অনেক করেছেন। ওরা যদি ধর্মানুভূতি নিয়ে ব্যবসা করে আপনারা ওদের নিয়ে ব্যবসা করেছেন। কে কয়টা ইসলামী দল পুষতে পারেন, কে নিজেকে কতটা ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপন করে ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ভোট কাড়তে পারেন তার প্রতিযোগিতা করেছেন। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে কুক্ষিগত করে রাখা ভণ্ডদের গায়ে-মাথায়-হাতে-পায়ে-পিঠে তেল মেখে বেড়িয়েছেন। ন্যায়কে ন্যায় আর অন্যায়কে অন্যায় বলতে ভয় পেয়েছেন। পাছে ভোট নষ্ট হয়। এভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব নয়। আমরা বস্তু ছেড়ে ছায়ার সাথে লড়াই করছি।

সরকারকে বলব- ধর্মবিশ্বাসের সকল প্রকার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। ধর্মের ঠিকাদারী গোষ্ঠীর মুখোশ খুলে দিন। জনগণকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। দেখবেন ধর্মবিশ্বাস কতবড় সম্পদে পরিণত হয়। তবে সব কথা বৃথা যাবে যদি আপনারা নিজেরা ন্যায় ও সত্যের উপর দণ্ডায়মান না হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *