খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ২

বাংলাদেশে জঙ্গী উত্থানের উৎস প্রধানত রাজনৈতিক। নীতিহীন ক্ষমতাদখলের সমীকরণ এই বিপদজনক দৈত্যকে জন্মদিয়ে হৃষ্টপুষ্ট করে অতিকায় করে তোলা হয়েছে। সে এখন তাঁর অবস্থানের জানান দিচ্ছে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রকে। যা করছে তা বড় কোন আঘাত শুরুর মহড়া মাত্র। যার শুরু হয়েছে অনেক আগেই। কোন সরকার কখনোই স্বীকার করতে চাই নি। বর্তমান সরকারও নয়। জনগনকে বানিয়েছে বোকা, দিয়েছে ধোকা। এটা বাংলাদেশে মৌলবাদ-জঙ্গীবাদী রাজনীতির শেষের শুরু। তবু যে আঘাত এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে তা অনেক বড়। শেষ যুদ্ধের আগে তাই বলি, কাঁদো বাঙালি কাঁদো।

অসুস্থ রাজনীতির সুবিধাভোগী একটি শ্রেণী লুটপাটে এত ব্যস্ত যে, সমাজ ও সন্তানের দিকেও তাঁদের তাকানোর সময় হয় নি! প্রকৃতি কখনো কখনো বড় নির্মম ও প্র্রতিশোধ পরায়ন হয়। গরীবের সন্তানরা হয়ে আসছে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার। রাজনীতির কাঁচামাল। হরতাল আর আন্দোলনে মাঠ উত্তপ্ত রাখার জ্বালানি ও লাক্রি। আর আজ, নিজের সন্তানরা ঝাকে ধরে নিঁখোজ হচ্ছে আত্মঘাতি জঙ্গী আক্রমনের রসদ-গোলাবারুদ হিসেবে!

শুনেছি শুকর যখন তার সন্তান জন্ম দেয়, সে জন্মেই তাঁর জন্মদাতা জননীর পশ্চাতেই প্রথম কামরটা বসায়। আজ জঙ্গীদের আক্রমন ও আক্রান্তের উভয়েরই স্বীকার এই উচ্চবিত্তরা! পত্রিকার নানা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে আমলা-এমপি-মন্ত্রী-রাজনীতিকদের স্বজন-সন্তানদের ভয়ঙ্কর জঙ্গী কানেকশনের খবর। যাদের পৃষ্টপোষকতা ও উদাসীনতা এই মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের উত্থান। আজ তারাই আতংকিত ও আক্রান্ত। ঘরে-বাইরে সন্দেহ, অস্বস্তি, অশান্তি।

জঙ্গী সংগঠনগুলো ব্যবহার করছে শহুরে উচ্চবিত্ত্বের সন্তানদের। যাদের চিন্তা-ভাবনা, পোষাক-পরিচ্ছদ, তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান উন্নত। আধুনিক জীবন-যাপন ও চলাফেরায় কেতা দস্তুর। যে স্থান, ধরণ ও মাত্রার আক্রমন করতে হবে-, তারজন্য উপযুক্ত ছেলেমেয়েই ওদের টার্গেট। বাংলাদেশের মাদ্রাসার অনগ্রসর বিদ্যাবুদ্ধি ও অপুষ্টিতে ভোগা গ্রাম্য কিশোর-তরুণদের দিয়ে এই কাজ করা অনেক কঠিন। তাই দেখা যায়, জুলাইয়ের ১ তারিখে গুলশানের হোটেলে আত্বঘাতি জঙ্গী হামালায় নিহত জঙ্গী ও আক্রান্তরা স্কলাস্টিকা, মানারাত, স্যার জন উইলসন, সানি ডেল ও নর্থ সাউথে লেখাপড়া করা উচ্চবিত্তের সন্তান।

উপমহাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শুরু অনেক আগে হলেও ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করেন। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর ধর্মভিত্তিক গুলো দ্রুত নানা কৌশলে তাদের সংগঠনিক অবস্থা জোড়দার করতে থাকে। সেই সুযোগেই তৈরী হতে থাকে জঙ্গী তৎপরতার উপযুক্ত ক্ষেত্র! বাংলাদেশে জঙ্গীপাঠের উৎস ও স্বরুপ সন্ধানে এখানে কয়েকটি প্রধান প্রধান দিক্ পয়েন্ট আকারে উত্থাপন করছি। পরবর্তি পর্বে থাকবে এর বিস্তৃত পর্যালোচনা জঙ্গীপাঠের অন্যান্য বিষয়।

১. বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষ করে কওমী ও এই ধারার মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় যে শিক্ষা ও তালিম দেয়া হয় তার একটি বড় অংশ জুরে থাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন ও আধুনিকতা বিষয়ে নেতিবাচক ধারনা।

২. যুগযুগ ধরে বাংলাদেশের গ্রাম-মফস্বল-শহর সরকার স্বীকৃতিহীন মাদ্রাসা শিক্ষায় অর্ধশিক্ষিত হাফেজ-আলেম-মৌলভীরা নিয়ন্ত্রনহীভাবে সাধারন মানুষদের ‘ইসলামের জলসার’ নামে বিভিন্ন বিভ্রান্তকর বক্তব্য।

৩. মৌলবাদী-জঙ্গী সংগঠনের জিহাদী বই-পুস্তক-পত্রিকা প্রকাশনা ধর্মভীরু অশিক্ষিত, কমশিক্ষিত মানুষদের বিপদগামী করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত-সূত্র ও মানহীন বই-পুস্তক-পত্রিকা-প্রকাশনা তরুণপ্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করছে।

৪. তরুনদের মাঝে হিরোইজম ও বেহেসতের অনন্ত সুখের বাসনা কাজ করছে। প্রকৃত জ্ঞান ও বোধের অভাবে ইহোকাল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা।

৫. নিম্নমানের বক্তব্য সম্বলিত বিভিন্ন সিডি, ভিডিও, বিভিন্ন চ্যানেলে ইসলামিক বক্তব্য প্রচার

৬. টিভিতে দেশ-বিদেশের পরিচিত ইসলামিক স্কলারদের বয়ান-বক্তব্য্-ফতুয়া তরুনদের উদ্বুদ্ধ করছে। সম্প্রতি জাকির নায়েক পরিচালিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পিস টিভি’র বিরুদ্ধে জঙ্গীবাদে উষ্কানী দেয়ার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।

৭. ধর্ম ও রাজনৈতিকে একাকার করে ফেলা ও নেতৃবৃন্দের অসংলগ্ন বক্তব্যে ধর্মীয় উন্মাদনার স্বীকৃতির ক্ষেত্র তৈরী করেছে।

৮. মসজিদ-মাদ্রাসায় নামাজের আগে ও খুতবায় ইসলামী আলোচনার নামে রাজনৈতিক বক্তব্য, পশ্চত্যের সভ্যতা ও সমাজ সম্পর্কে অবিরত নেতিবাচক আলোচনা একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হওয়া।

৯. কোরআন-হাদিস-ইসলামের জ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা ইত্যাদি।

১০. অধিকাংশ মানুষ অর্থ না জেনে যুগ যুগ ধরে কোরআন শরীফ পরে যাচ্ছে। এর সঠিক অর্থ না জানার কারনে (তাদের শেখানো হচ্ছে বাংলা কোরআন পড়লে নেকি হয় না) অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

১১. উচ্চবিত্ত ও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের জঙ্গী সংগঠন এবং সন্ত্রাসী তৎপরতায় ঝুঁকে পরার প্রধান কারন পারিবারিক সংকট-শিথিলতা ও সামাজিক বিচ্ছিনতা।

১২. সাহিত্য-সংস্কৃতি-খেলাধূলা-ইতিহাস-ঐতিহ্য জ্ঞান ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব।

১৩. একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের সংকট ও দূর্বলতা একটি বড় কারণ। রাষ্ট্র তার গণতান্ত্রিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠনগুলোকে শক্তিশালী না করে তা কৃত্তিমভাবে টিকিয়ে রাখতে অগণতান্ত্রিক আচরণ করে তখন উগ্রবাদীতার ক্ষেত্র তৈরী হয়।

১৪. বিশ্ববাণিজ্য, দেশিও ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা সমীকরণ ও তার ধারাবহিকতা এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ

১৫. আমেরিকা ইরাক আক্রোমন ও সাদ্দাম হোসেনকে হত্যার পর নিজেদের ক্ষমতাকে নিষ্কন্টক করার জন্য সাদ্দামের গঠিত প্রায় ৪ লাখ সেনা সদস্যকে চাকুরিচুত্য করা হয়েছিল। জানা যায় সেই চাকুরিচুত্য সেনারাই আইএসের মূল শক্তি। বাংলাদেশে মর্মান্তিক বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার সদস্যের বিচার হয়েছে-চলছে। অনেকে পালিয়েছে, অনেককে চাকুরিচুত্য করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেই বিডিআর সদস্যরা কে কোথায়? কি করছে? জঙ্গি প্রশিক্ষণের সঙ্গে এদের একটি অংশের সম্পৃক্ততা সন্দেহের কথা শোনা যায়।

ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক, লেখক-গবেষক, সাবেক ছাত্রনেতা।

২ thoughts on “খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *