এই দুর্যোগে বলি হবে আর কত প্রাণ?

সকালে ঘুম ভাঙ্গল সময় টিভি চ্যানেলের সাভার প্রতিনিধির কন্ঠস্বরে। চোখ কচলে টিভির দিকে তাকিয়ে দেখি ইট আর সিমেন্টের প্লাইয়ের স্তুপ স্ক্রিনজুড়ে। আজ সকাল ১০ টায় ৯ তলা এই ভবনটির প্রায় পুরোটা ধ্বসে পড়ে একতলা ভবনে পরিণত হয়ে গেছে। টিভিসূত্র মতে, ভিতরে চাপা পড়েছে হাজার দেড়েক মানুষ। এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে অর্ধশতাধিক মৃতদেহ আর শতাধিক গুরুতর আহত দেহ।

আশংকা করছি, ঘটনাস্থলেই মারা পড়েছে যত না লোক, তার চাইতে অনেক বেশী মারা পড়বে আফটার ম্যাথে। রিপোর্ট যদি সঠিক হয়, ভেতরে এখনো হাজার খানেক লোক আটকা পড়ে আছে। ইতিমধ্যেই সাড়ে তিনঘন্টা পার হয়ে গেছে। আমি মুটামুটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, আগামী কয়েক ঘন্টার ভেতর এদেরকে উদ্ধার করা না গেলে, এদের একটা বিরাট অংশ ভেতরেই মারা পড়বে অক্সিজেনের অভাবে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে, গরমে হিটস্ট্রকে অথবা অনাহার ও প্যানিক এটাকে।

আমাদের উদ্ধারকাজের যে অবস্থা দেখলাম, তাতে করে আমরা হয়তো আজ রাতে বা কাল সকালে এমন একটা চিত্র দেখবো যে, যারাও বা আজ সকাল থেকে ভেতরে চাপা পড়ে কোনমতে বেচেঁ ছিলো, তাদের গলিত ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে।

উদ্ধারকাজ পুরোদমে শুরু করতে কমপক্ষে দুইঘন্টা দেরী হয়েছে। গত দেড়ঘন্টা ধরে মূল উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় মানুষজন যতটা না সাহায্য করছে, রাস্তায় ভীড় করে উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তার চাইতে অনেক বেশী। সেনাবাহিনীর লোকজন তাদের লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু পরমূহুর্তেই আবার এসে ভীড় জমাচ্ছে একই স্থানে। জাতিসংঘের একটি ক্রেইন আর সেনাবাহিনীর একটা বুলডোজার সেখানে গিয়ে ঘন্টাখানেক ধরে ঠায় দাড়িয়ে আছে, যেন কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছে না।

দু:খের ব্যাপার হলো, উদ্ধার কাজে কাপড়ে কাপড়ে গিঠঁ দিয়ে সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফায়ার বিগ্রেডের একটামাত্র মই, বাকী দুটা কাপড়ের ট্রেইল, সেখান দিয়ে আহত গার্মেটন্স কর্মীদের স্লিপ করে নামানো হচ্ছে। তারপর কোলে করে এ্যামুলেন্স। একজন মহিলাকে দেখলাম, তার পায়ের হাড় ভেঙ্গে হাটুঁর নীচ থেকে ঝুলছে। আরেকজন নারীকে দেখলাম তার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। রক্তের কারনে তার চেহারাও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।

বাইরের দেশে দেখেছি, ভূমিকম্পে দালান ধ্বসে সেনাবাহিনীর অতিকায় হক সিরিজের কার্গো হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করা হয়। সাথে লিটারেলি আকাশচুম্বি ক্রেইন। এত উচুঁ আর লম্বা ক্রেইন হতে পারে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তো সেই হেলিকপটার আর ক্রেইনগুলো দিয়ে লোহার আংটা আটকিয়ে ধ্বসে পড়া সিমেন্টের ব্লকগুলো একটা একটা করে উপরে দিকে টেনে তুলে ফেলে। যতটা পারা যায় আস্ত। তারপর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চাপা পড়া মানুষ। এটা হচ্ছে দালানের নীচে চাপা মরা মানুষকে উদ্ধার করার সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ পদ্ধতি। অথচ আমার মনে হয় না বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পযর্ন্ত এভাবে কোনদিন উদ্ধারকাজ চালানো হয়েছে। কবে হবে কে জানে?

আমাদের সেনাবাহিনীর সেই কার্গো হেলিকপ্টার হয়তো আছে, কিন্তু সেগুলোকে এ কাজে লাগানো হয় না, সম্ভবত তারা জানেই না যে মালামাল বহন করা ছাড়াও এসব সামরিক যান দিয়ে অনায়াসে উদ্ধারকাজও করা যায়। সামরিক যানবাহনগুলোকে এভাবেই ডিজাইন করা হয় যাতে করে বিপদের সময় এগুলো দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কঠিন কাজ করানো যায়। তাছাড়া আমাদের সেই আকাশচুম্বি ক্রেইনও নেই। যেগুলো আছে সেগুলো বেসরকারী, রিয়েল এস্টেট কোম্পানির।

কিছুদিন আগে সেনাবাহিনীর জন্য কয়েকহাজার কোটি টাকা দিয়ে বাহুল্য, অথচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিছু সামরিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। অথচ তার ১০ ভাগের একভাগ অর্থ খরচ করে এই দেশে প্রথম বিশ্বের মতো সর্বাধুনিক উন্নত প্রযুক্তি ক্রয় করা সম্ভব ছিলো। যা দিয়ে ধ্বংসস্তুপ, দুর্ঘটনাস্থল ও পানির নীচ থেকে উদ্ধার করা যেতো অসংখ্য দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে, ঠেকানো যেতে অংসখ্য মৃত্যুকে। বি:দ্র: কিছুদিন আগে লঞ্চডুবিতে শ খানেক লোক মারা গেছেন, তাদের লাশ উদ্ধার করেছে সেই অন্ধের ষষ্ঠি, মান্ধাতা আমলের জং ধরা উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’।

এই মূহুর্তে আহতদের চিকিৎসা করা হচ্ছে সাভারের এনাম মেডিকেল ও জেলাস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। শুনলাম ছাগু হাসপাতাল কল্যানপুরের ইবনে সিনা বিনামূল্যে সাভারের আহতদের চিকিৎসা করার ঘোষানা দিয়েছে।

সাভার-আরিচা এদেশের একটা অভিশপ্ত জায়গা। বাংলাদেশের মধ্যে স্মরনকালের সবচেয়ে বেশী দুর্ঘটনা হয়েছে এই এলাকায়। প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনা, কিছুদিন আগের গার্মেন্সে আগুন আর আজকের দালান ধ্বসে এ পর্যন্ত নিহত ও আহত হয়েছে অসংখ্য প্রাণ। তবু কোন সরকারেরই টনক নড়ে না। কোন সরকারই এর প্রতিকার করে না।

প্রতিকার দূরে থাক, আগুনে পুড়ে যাওয়া বা ভবনের নীচে চাপা মরা মানুষজনকে উদ্ধার করার মতো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও জনবলও আমাদের নাই। একটা ভবন ধ্বসেই যদি আমাদের এই করুণ অবস্থা হয়, তবে যদি একটা ভূমিকম্প হয়, বেশী না মাত্র ৬ মাত্রার ভূমিকম্প, তাহলে সেই ক্ষতি পুষানো বা আহত মানুষজনকে বাচানোঁ তো আমাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হবে।

কিন্তু এর প্রতিকারটি তো খুব কঠিন কিছু নয়। রানা প্লাজার কনট্রাকটরসহ ভবনের নির্মানকাজে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো তাদের নামে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করে, মৃত্যুদন্ডের বিধান করে আইন সংশোধন করে, সেই আইনের আওতায় খুব দ্রুত তদন্ত ও বিচার করে দুয়েকটাকে ঝুলিয়ে দিলেই হয়। বাকীটা এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।

২ thoughts on “এই দুর্যোগে বলি হবে আর কত প্রাণ?

  1. সাভারে ”রানা প্লাজা” ধ্বসে
    সাভারে ”রানা প্লাজা” ধ্বসে পড়ার কারনে অনেক লোক আহত হয়ে মুমূর্ষ অবস্থায় এখন হসপিটালে আছে। তাদের জন্যে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন। যারা রক্ত দিতে আগ্রহি দয়াকরে হসপিটালে যোগাযোগ করুন। …স্থান- এনাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, সাভার, ঢাকা। ….যোগাযোগ- 01681212777 (রন্তু)

    যারা রক্ত দিতে পারবেন তারা উক্ত নাম্বারে ফোন করুন, রক্ত না দিতে পারলে পোস্টটি লাইক করুন অথবা শেয়ার করুন নিজের স্ট্যাটাসে, বিভিন্ন বাংলা পেইজে ও গ্রুপে, যেন অন্য কেউ এটি দেখে রক্ত দিতে এগিয়ে আসে। ফোন নাম্বার –
    তুহিন 01923337010 (জাহাঙ্গীরনগর)
    রন্তু 01681212777 (এনাম ম্যাডিক্যাল)
    027743779-82, 01716358146

    শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন। তাসলিমা :০১৭১১৫৪৪৫৪৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *