আমেরিকার ‘ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ ও জঙ্গিবাদের ভূত … !!!

Mississippi Burning মুভিটা একবার সময় করে দেখে নেবেন। ‘ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ সম্পর্কে একটা ভালো আইডিয়া পাওয়া যায়। কুখ্যাত এই ক্রিশ্চান জঙ্গীগোষ্ঠীটিকে কঠোর হস্তে দমন করার জন্য আমেরিকা সরকারকে তাদের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক বল প্রয়োগ করেছিলো এবং তারা সফলও হয়েছিলো, যার ফলশ্রুতিতে বারাক ওবামার মতো একজন কৃষ্ণবর্ণও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছে। কিন্তু এর পিছনের ইতিহাসটি কিন্তু ব্যাপক নোংরা ও বীভৎস। ‘ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ বা ‘দ্য ক্ল্যান’ সম্পর্কে যাদের আইডিয়া নাই, তাদেরকে সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

দ্য ক্ল্যান হচ্ছে সাদাবর্ণের ক্রিশ্চানদের সৃষ্ট সবচেয়ে কুখ্যাত, নৃশংস ও বর্বর জঙ্গীগোষ্ঠী, যাদের মূল লক্ষ্য ছিলো white supremacy, white nationalism, anti-immigration। আইসিস ঠিক যে মৌলবাদী লক্ষ্যে বীভৎস বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে, এটি অনেকটা সেরকমই। পার্থক্যটা হচ্ছে, দ্য ক্ল্যানের সীমা ছিলো শুধুমাত্র আমেরিকান টেরিটরিতে। বিপরীতে আইসিসের প্রভাব ছড়িয়ে গেছে প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বে। এই দুই জঙ্গীগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হচ্ছে, এদের প্রত্যেকের উগ্রতা ও বর্বরতার থিউরী রেফারেন্স হলো তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ, অর্থাৎ কোরআন ও বাইবেল। দ্য ক্ল্যানের নির্যাতনের একক সাফাফার ছিলো আমেরিকান নিগ্রোরা। একইভাবে আইসিসের নির্যাতনের শুরুটা শুধুমাত্র ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের উপর হলেও বর্তমানে তা সমগ্র অমুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদি দ্য ক্ল্যান সম্পর্কে কিছুটা আইডিয়া থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই জানবেন, এদের নৃশংসতা, বর্বরতা ও উগ্রতায় এরা প্রায় আইসিসের কাছাকাছিই ছিলো। তবে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা হচ্ছে, আইসিস একটি সামরিক শক্তি বিশিষ্ট উন্মোচিত সংগঠন, বিপরীতে দ্য ক্ল্যান ছিলো সমাজের ভিতর লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে নিয়ে সংগঠিত একটি টপসিক্রেট এন্ড হাইলি ডিসিপ্লিনড ফ্যানাটিক সংগঠন, যেকারণে এদেরকে সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে আলাদা করাটা ছিলো ব্যাপক দুরুহ ব্যাপার।

যা হোক, সিনেমার কথা, দ্য ক্ল্যানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং এর সাথে আইসিসের প্রসঙ্গটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে শুধুমাত্র একটি বিষয়ে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। আর তা হলো, আইসিস-আলকায়েদাই পৃথিবীর প্রথম জঙ্গী নয়, এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এরা শেষ জঙ্গীও নয়। এদের পরেও আরো বহু জঙ্গী আসবে ভবিষ্যতে।

একটু খেয়াল করে দেখলেই বুঝতে পারবেন, যে কোন ইজম বা মতবাদের বাইডিফল্ট ত্রুটি হচ্ছে এইরকম উগ্রতা বা জঙ্গীবাদ। শুধুমাত্র ধর্মীয় অর্থাৎ ইসলাম, হিন্দুইজম কিংবা ক্রিশ্চিয়ানিজমের মাধ্যমেই যে জঙ্গিবাদ ছড়ায় বিষয়টি মোটেও তা নয়। এটি যে কোন প্রকার মতবাদ থেকেও সৃষ্টি হতে পারে। এই বাংলায় (পূর্ব ও পশ্চিম) এক সময় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নকশাল আন্দোলনের নামে বহু মানুষের গলা কাটা হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি খন্ডে খন্ডে উপবিভাগ হয়ে যে পরিমাণ আতঙ্ক ছড়িয়েছে, সেই তুলনায় বর্তমানের জঙ্গীরা এখনো দুগ্ধ পোষ্য শিশু। ইসলামিস্ট জঙ্গিরা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য যেইসব মডেল উপস্থাপন করছে, তা মূল উগ্রপন্থী কমিউনিস্টদেরই সৃষ্টি। আর যদি জিজ্ঞেস করেন, জাতীয়তাবাদে উগ্রপন্থা বা জঙ্গীবাদের উদাহরণ কোথায় ? তাহলে হিটলারের নাম উঠে আসবে সবার আগে। তার আগে ছিলো জাপানীরা, তার আগে ছিলো নেপোলিয়নের নেতৃত্বে ফ্রান্স !

এমন অসংখ্যবার হুমকির মুখে পরলেও, এই পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত ফ্যানাটিকদের হাতে পুরোপুরি দখল হতে পারেনি। প্রতিবারই এদেরকে প্রতিরোধ করা হয়েছে সাফল্যের সাথে, দমন করা হয়েছে শক্ত হাতে নির্দয়ভাবে। ইরাক সিরিয়াতে আইসিস এখন শক্ত প্রতিরোধের মুখে। স্রেফ কুর্দি নারীরাই এদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে এক প্রান্তে। এদিকে আলকায়েদা অনেকটাই স্তিমিত। রাশিয়াতে চেচেন জঙ্গীদের দমন করা হয়েছিলো নির্দয়ভাবে। বাংলায় কমিউনিস্ট জঙ্গি দমনের ক্ষেত্রেও সেই সময়কার রাষ্ট্রনায়কদের চূড়ান্ত নির্মম হতে হয়েছিলো। মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ বইটি পড়লে জানতে পারবেন কিভাবে রাস্তাঘাটে রেললাইনে এমন শত শত কিউট ধনীর দুলাল জঙ্গির লাশ অবহেলায় পরে ছিলো। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই সময়কার জঙ্গীদেরও অধিকাংশ ছিলো এমন সুদর্শন উচ্চবিত্ত সুবিধাভোগী পরিবারের সন্তান। কিন্তু মোদ্দা কথা হচ্ছে, ঠেলার নাম বাবাজি। যত বড় জঙ্গি ফঙ্গিই হোক, দৌড়ের উপর রাখলে এরাও এক সময় জঙ্গীবাদ ছেড়ে দিয়ে তাত্ত্বিক হয়ে টিভিতে এসে টকশো জমায়। উদাহরণ হিসেবে আপনারা ফরহাদ মাজহারকে ঘেটে দেখতে পারেন।

জার্মান ফ্যানাটিকদের ঠেকানোর জন্য সমগ্র ইউরোপ আমেরিকা রাশিয়া যেমন এক হয়ে গিয়েছিলো, ঠিক তেমনি ইসলামিস্ট জঙ্গীদের ঠেকানোর জন্য সমগ্র পৃথিবী যদি এক হয়ে এদেরকে ঠেঙিয়ে তাড়িয়েও দেয়, তাতেও আমি নিশ্চিত যে, আগামী দুইচারপাচ দশকের মধ্যে নতুন কোন জঙ্গীবাদ নতুন কোন মোড়কে নতুন কোন তত্ত্বের ঘাড়ে চেপে মানুষকে উৎপাত করবে। তারপরে আবার তারা দমন হবে, তারপর আসবে অন্য কেউ। এটি হচ্ছে একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস, অন্তত যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বাভাবিক মানুষের মেজরিটি আছে, যাদের মননে তত্ত্বভিত্তিক উগ্রতার চেয়ে বউ- সংসার-নিজস্ব সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রকে নিয়ে সুখে থাকার আন্তরিক ইচ্ছা আছে।

এই স্ট্যাটাসটি হয়তোবা বাংলাদেশের সরকারের কাছে একজন আমফেসবুকারের খোলা চিঠি হতে পারে। আপনারা যারা গেইম অব থ্রোনস সিজন সিক্স দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, একটি রাষ্ট্র কি অবলীলায় ফ্যানাটিকদের হাতে চলে যেতে পারে, যদি সামান্যতম সুযোগও আপনি তাদের দেন। বাস্তবতাও তাই ! জঙ্গী ফ্যানাটিকদের ক্ষুধা পূরণ করার সামর্থ্য কারো নাই। খাটি বাংলায় যাকে বলে ‘ খাইতে দিলে শুইতে চায়, শুইতে দিলে আর কথা নাই ‘। সুতরাং, এদেরকে স্রেফ শক্ত হাতে দমন করার পরিবর্তে যদি সামান্যতম তোষণও করা হয়, তাহলে ঘাড়ে চাপতে দুই দিনও সময় নিবে না। জঙ্গিবাদ হচ্ছে ঘড়ে পোষা অজগর সাপের মতো, যে কিনা আপনারটাই খাবে, আপনার ঘরেই ঘুমাবে, কিন্তু প্রতিদিন একবার করে হলেও আপনার শরীরের মাপ নিয়ে নিবে, এই স্বপ্নের ঘোরে যে, কবে আপনাকে আরাম করে পুরোপুরি গিলতে পারবে।

দেশের কথা যখনই ভাবি, মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। আজকে এক ইতালীয়ান আমার পাকিস্তানী কলিগকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করছিলো, পাকিস্তানে এতো টেররিস্ট কেনো ? উত্তরে পাকিস্তানী হাসতে হাসতে বললো, আসলে সব দেশেই টেররিস্ট আছে, পাকিস্তান বাংলাদেশ সব মিলায়েই। কথাটা শুনেও চুপচাপ হজম করতে হলো। প্রতিবাদ করার মুখ নেই।

আমি জানি না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাথায় জঙ্গীবাদ দমনের সুদুরপ্রসারী কোন মাস্টার প্ল্যান আছে কিনা। কিন্তু যেই গতিতে আগাচ্ছে তাতে লক্ষণ মোটেও সুবিধার ঠেকে না। মনের কোণে একটি ধারণা দিন দিন বদ্ধমূল হচ্ছে। এই বাংলাও অদূর ভবিষ্যতে জঙ্গীবাদের দখলে চলে যাবে। তারপর শুরু হবে চিরাচরিত বাংলার প্রতিরোধ। হয়তো কুর্দিদের মতো আমাদের নারীরাও অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসবে, যেমনটা তারা করেছিলো একাত্তরে। মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বাংলার ক্ষ্যাপা তরুণেরা বুকে মাইন বেধে ঝাপিয়ে পরবে শত্রুর ট্যাংকে। আমি নিশ্চিত জানি, বাংলা একদিন এইসব অভিশাপ থেকে মুক্ত হবেই। বাংলাকে কেউ কোনদিন দাবায়ে রাখতে পারে নাই, পারবেও না। ভয় শুধু সেই অন্ধকার সময়টির জন্য। প্রচন্ড খারাপ লাগে, এই দেশের গরীব সরল সহজ মানুষগুলোর জন্য, যারা একবেলা পান্তা খেয়েও হাসিমুখে বলে দিতে পারে খু্ব ভালো আছি ! এই মানুষগুলো সত্যিই দুর্ভাগা … !

৯ thoughts on “আমেরিকার ‘ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ ও জঙ্গিবাদের ভূত … !!!

  1. যুগে যুগে ফ্যানাটিকরা আসে যায়
    যুগে যুগে ফ্যানাটিকরা আসে যায়, তাদের দমনের উপর নির্ভর করে ফ্যানাটিকরা মানব সভ্যতার কি পরিমাণ ক্ষতি করতে পারে। মজার বিষয় হচ্ছে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ একক ক্ষমতায় বিস্তার লাভ করতে পারেনা। সে অন্যের উপর নির্ভর করে বিস্তার করে। ক্ষমতাসীনদের সহযোগীতা ছাড়া জঙ্গিবাদ সক্রিয় ভুমিকা রাখতে পারেনা, সেটা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন।

    1. যে কোন প্রকার জঙ্গীবাদের জন্য
      যে কোন প্রকার জঙ্গীবাদের জন্য ক্ষমতাসীনদের নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শীতাই দায়ী .. !

  2. আপনার পর্যবেক্ষনে একটু ভুল
    আপনার পর্যবেক্ষনে একটু ভুল আছে। কু ক্লাক্স ক্লানকে কিন্তু তাত্ত্বিকভাবেই পরাজিত করা যায় খৃষ্টান ধর্মকে স্পর্শ না করেই। সেটা হলো খৃষ্টানরা মূলত: যীশু খৃষ্টকে অনুসরন করে , আর যীশু কখনই কোন রকম হিংসাত্মক ঘটনা ঘটায় নি। তাই কু ক্লাক্স ক্লান কিভাবে যীশুর শিক্ষাকে ব্যবহার করত তা আমার জানা নেই তবে তারা যে স্বেতাঙ্গ শ্রেষ্টত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলত সেটা বহুল প্রচারিত। অর্থাৎ তাদের সহিংসতা সেই আদর্শের দ্বারা চালিত হতে পারে।

    পক্ষান্তরে ইসলামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিংসা , বিদ্বেষ, হত্যা , ডাকাতি , ধর্ষন ইত্যাদিতে পূর্ন। খোদ মুহাম্মদ নিজেই ছিল হিংস্র , ডাকাত , ধর্ষক , খুনি। দুনিয়ার সকল মুসলমান এই ধরনের একজন বর্বর অসভ্য মানুষকে তাদের আদর্শ মানে। সুতরাং মুসলিম সমাজ থেকে জঙ্গিবাদ দুর করা সেটা কিভাবে ইসলামকে স্পর্শ না করে সম্ভব , সেটা আমার মাথায় ঢুকছে না।

    আপনার উচিত খৃষ্টান ধর্ম সম্পর্কে একটু স্টাডি করা , তারপর ব্লগে লেখা।

    1. যুদ্ধ বিগ্রহ হত্যা খুন
      যুদ্ধ বিগ্রহ হত্যা খুন বর্বরতা – এইসব টার্ম হিসেব করলে, কোন ধর্ম কার চেয়ে কার চেয়ে কম করেছে ? হা হা হা …. আপনি একটি মন্তব্যে যেভাবে ক্রিশ্চান ধর্মের প্রায় দুই হাজার বছরের ইতিহাসের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন, তাতে মনে হচ্ছে ক্রিশ্চান ধর্মের ইতিহাস আমার সাথে সাথে আপনারও একটু ঘেটে দেখলে উপকার হয়। তারপর না হয় ব্লগে এসে এই ইস্যু নিয়ে তর্ক করা যাবে। কোন সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে আপনার পার্সোনাল এঙ্গার ঠান্ডা করার জন্য তর্কে যাওয়াটা অযথাই সময়ের অপব্যয়। অতোটা ধৈর্য্য নাই বাহে। এনিওয়ে, কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ !

      1. খ্রীস্টান ধর্মের মধ্যসময়ে
        খ্রীস্টান ধর্মের মধ্যসময়ে প্রতিটি খ্রিস্টান অধ্যুসিত দেশে গীর্জাগুলো রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। ইউরোপে সেই সময়ে খ্রীস্টান শাসকগণ রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *