দায় কার?

কিছু বিষয় আমার মাথায় এসেছে, সেগুলো একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তা।
১. যে ছেলেগুলো আইএস এ যোগ দিয়েছে বা অপারেশন এ অংশগ্রহণ করেছিল, নিঃসন্দেহে তারা মগজ ধোলাই এর কারনে মানুষ থেকে জানোয়ার এ রূপ নিয়েছিল। কিন্তু তারা এই দেশের নাগরিক ছিল, হয়তো তাদের কেউ কেউ মেধাবী ছিল, যা হতে পারতো দেশের সম্পদ; হত্যাকারী ধ্বংসকারী না হয়ে। তাদের বিপদে যাবার পিছে হয়তো পরোক্ষভাবে তাদের পরিবার দায়ী। কিন্তু সাধারণত কোন পরিবার চায় না তাদের সন্তান আত্মঘাতী হোক! তাদের জঙ্গি হবার পিছনে পরিবারের ধর্মান্ধতা সাথে রাষ্ট্রেও দায় আছে!
সরাসরি তাদের পরিবারে ছবি প্রকাশ করা, বিশেষ করে মেয়ে সদস্যদের ছবি প্রকাশ করে বাজে মন্তব্য করার মাঝে আরেক ধরনের উগ্রতা কি প্রকাশ পায় না?
২. বরাবরের মত সরকার জঙ্গিবাদ নিয়ে গা ছাড়া মন্তব্য করে এসেছে। এখনো নাকি বলতেছে এটা আইএস এর কাজ না (যদিও পুলিশের আগে আইএস পতাকা সহ পাঁচ জঙ্গির ছবি প্রকাশ করে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের উপস্থিতি)। বেশিদিন আগে না, বাংলাদেশে সরকার প্রধান সরসরি বলে দিয়েছিলেন এই দেশে কোন জঙ্গি নেই, বিশেষকরে আইএস নেই! কিন্তু কত কাল তুষ দিয়ে আগুন চাপা দিবেন? তাতে আগুন মাত্রা বেড়ে যাবে, যে আগুন নিবানোর ক্ষমতা কারোর থাকবে না।
জঙ্গিদের অপারেশন হবার ১২ ঘন্টা আগে টুইটারে আক্রমণ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তাহলে আমাদের বিভিন্ন ধরনের সরকারী গোয়েন্দারা কি করেছিল? বিশেষ করে সাইবার বিভাগ? তাদের কাজ কি, নাস্তিক, মুক্তচিন্তার মানুষ কি লেখছে, তা যাচাই করা?
অনলাইন জগতে, বিশেষ করে ফেসবুক টুইটার ব্লগে বাংলাদেশের জঙ্গিদের অবাধ বিচারণ দেখা যায়। তারা শুধু তাদের চিন্তার প্রকাশ করতেছে না, একই সাথে বিভিন্ন ভাবে, মুক্তিচিন্তার মানুষদের হুমকি দিয়ে আসতেছে। অন্ততপক্ষে আমি প্রতি সপ্তাহে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টে বেশ কয়েকবার হুমকি পাই। এভাবে সবাইকে হুমকি যারা দিচ্ছে, তারা এই দেশেই বসবাস করে হুমকি দিচ্ছি। ফেসবুক আইডি লিংক সুত্র ধরে তাদের ধরা সম্ভব, কিন্তু কেন জানি এখানে নিরবতা প্রকাশ করতেছে সবাই! (সরকারে কাউকে হুমকি দিলে ১২ ঘন্টাও লাগে না, তাদের ধরতে। মানে পুলিশ চাইলে সেটা খুব সহজে পারে।)
৩. আমি বিশ্বাস করি, একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার জন্য কিছু যোগ্যতা লাগে, বিশেষ করে গোয়েন্দা বিভাগে। বাংলাদেশ সরকারের বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা বিভাগ আছে। কিন্তু লোক দেখানোর চিরুনি অভিযান ছাড়া, আসলে তারা কি করতেছে?
যেহেতু উগ্রবাদীদের ধরতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তারমানে পুলিশের কিছু লোক ওদের কাছে তথ্য সরবরাহ করতেছে অথবা পুলিশের মাঝেই কিছু জঙ্গি ঢুকে গেছে। আমাদের বুদ্ধিমান পুলিশ অফিসার কেন, সরষের মাঝে ভুত বের করতেছে না?

আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, হামলা আগে নিজেদের নাম সহ হুমকি দিয়েছে। আর আইএস সবার আগে ছবি প্রকাশ করে নিজেদের সতত্যার জানান দিয়েছে। তার মানে, যাই আনসারউল্লাহ, তাই আইএস। একই সংগঠনের দুটি নাম, একটি বাংলাদেশের জন্য, অন্যটি আন্তর্জাতিক।

পরিশেষে একটি বাস্তব গল্প বলি, নাম ভিন্ন হলেও সত্য কাহিনী।

আমি তখন একটি মফস্বলের সরকারী কোয়াটারে থাকি। আমাদের একঝাঁক বন্ধু একসাথে নিয়মিত নামাজে যাই। প্রতিদিন ভোরে আমি সবার আগে উঠে, সবাইকে ডাকতাম। আমাদের মাঝে একটি ডানপিটে ছেলে ছিল, নাম “গোলাপ”। আমরা পাঁচওয়াক্ত নামজ পড়লেও সে চার ওয়াক্ত পড়তো। কারন সে ফজরে ঘুম থেকে উঠতো না। বই এর নেশা আমাকে ধর্মান্ধ হবার আগেই ধর্ম থেকে বের করে এনেছিল। তাও সেভেন এইটে থাকতে। যাই হোক, গোলাপ এর কথা বলি। সে আমাকে বলেছিল, পড়ায় ফাঁকি দেবার জন্য সে নাকি নামাজ পড়ে! খুব মেধাবী না হলেও, মোটামুটি মেধাবী ছিল ছেলেটি। তবে অনেক ডানপিটে ছিল সে। আমার ধারণা, জগতের এমন কোন কাজ নাই সে করে নাই। এসএসসি পর তার সাথে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তার বাবার অন্য জেলায় বদলি হবার কারনে। হঠাৎ করে, বছর দুই তিন আগে ফেসবুকে তাকে পেয়ে যাই। নক করে জানতে পারলাম, বেসরকারি ইউনিভার্সিটি পাশ করে এখন সে ইংল্যান্ড এ থাকে। বুঝতে পারলাম, তা ঘুসখোর বাবা ছেলেকে লন্ডন পাঠিয়েছেন (তার বাবা ছোট চাকরি করলেও ঘুসের চাকরি করতেন এবং এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন)। সেদিন তার ফেসবুক বন্ধু হবার পর, তার একাউন্ট দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম! প্রোফাইলে তার ছবি নেই, সম্পূর্ণ নাম জানলে আমি তাকে চিনতাম না! ভিতরে যেয়ে একটা ছবি পেয়েছিলাম, সমূদ্রের পাশে। তার বেশিরভাগ পোস্ট ছিল ধর্ম নিয়ে বা ধর্ম প্রচার নিয়ে। প্রোফাইলে আরবি লেখা কাল একটি ছবি, ব্যানারেও সেই রকম! তখনও বুঝি নাই, সেগুলো আইএস পতাকা ছিল! আমার প্রোফাইল দেখে, সে সম্ভবত আমার বর্তমান অবস্থা বুঝতে পারে। দুই দিন পর সে আমাকে আনফ্রেন্ড করে। যদিও মেসেঞ্জারে সেই প্রশ্ন আমি করি নাই তাকে। আনফ্রেন্দ করার দুই তিন পর মেসেঞ্জার চেক করে বুঝি, সে আমাকে ব্লক করেছে। এরপর আর তাকে খুঁকে পাই নি। জানি না, ‘গোলাপ এখন কোথায়? কি করে? সে কি সত্যিই আইএস এর সক্রিয় সদস্য?’
কোন দিন পত্রিকায় তার নিহতের খবর পেলে, হয়তো অবাক হব কিন্তু বিস্ময় প্রকাশ করবো না।
গোলাপ! হুম গোলাপ! চমৎকার সেই ছেলেটি আমার বন্ধু ছিল, সে কারোর ভাই বা কারোর ছেলে! এদের মগজ বিকৃতি করার পিছনে কারা? ওর পরিবার উগ্র ধার্মিক না হলেও, যথেষ্ট ধার্মিক ছিল! পরিবার কি প্রথম বপণ করে অজান্তে জঙ্গিবাদ? সমাজর কি দায় নেই এক্ষেত্রে?
প্রশ্নটা সবার কাছে…..

২ thoughts on “দায় কার?

  1. জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার
    জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র সবকিছুই দায়ী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *