টার্গেট কিলিং, ক্রসফায়ার ও রাষ্ট্র (পর্ব ১)

এই সময়কালে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার প্রধান ধরন হলো ‘টার্গেট কিলিং’। গত দেড় বছরে এরকম প্রায় অর্ধশত হামলায় প্রায় অর্ধশত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। লেখক-প্রকাশক-বিদেশি অতিথি-শিক্ষক-বাউল-ইমাম-নামাজরত মুসল্লি-পুরোহিত-সেবায়েত-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ, একেক সময়ে টার্গেট কিলিং এর শিকার হচ্ছেন একেকজন। এই হত্যাকা-গুলোর দায় স্বীকার করতে আমরা দেখছি কথিত ‘আল কায়েদা’ কিংবা ‘আইএস’ কে। সরকার আল কায়দা কিংবা আইএস এর উপস্থিতি নাকচ করে দিয়ে দায় চাপাচ্ছে, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’, ‘জেএমবি’, কিংবা ‘হিজবুত তাহরীর’ এর উপর। অর্ধশত জঙ্গি হামলার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে হাতে গোনা দুএকটির। তাদের সাথে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগ থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিকভাবে পলিটিকাল ইসলামের এক ধরনের উত্থান এবং মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদের প্রসার এইসকল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করেছে সন্দেহ নেই। এখন পর্যন্ত এই সব টার্গেট কিলিং এর হোতা ও এদের অর্থযোগানদাতাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় না নিয়ে আসার কারনে, এদের প্রকৃত মদদদাতা কে বা কারা, এদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কোন মাত্রায় কিংবা এদের শক্তির উৎস কতটুকু গভীরে প্রোথিত সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না।

টার্গেট কিলিং প্রসঙ্গে

এই সময়কালে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার প্রধান ধরন হলো ‘টার্গেট কিলিং’। গত দেড় বছরে এরকম প্রায় অর্ধশত হামলায় প্রায় অর্ধশত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। লেখক-প্রকাশক-বিদেশি অতিথি-শিক্ষক-বাউল-ইমাম-নামাজরত মুসল্লি-পুরোহিত-সেবায়েত-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ, একেক সময়ে টার্গেট কিলিং এর শিকার হচ্ছেন একেকজন। এই হত্যাকা-গুলোর দায় স্বীকার করতে আমরা দেখছি কথিত ‘আল কায়েদা’ কিংবা ‘আইএস’ কে। সরকার আল কায়দা কিংবা আইএস এর উপস্থিতি নাকচ করে দিয়ে দায় চাপাচ্ছে, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’, ‘জেএমবি’, কিংবা ‘হিজবুত তাহরীর’ এর উপর। অর্ধশত জঙ্গি হামলার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে হাতে গোনা দুএকটির। তাদের সাথে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগ থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিকভাবে পলিটিকাল ইসলামের এক ধরনের উত্থান এবং মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদের প্রসার এইসকল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করেছে সন্দেহ নেই। এখন পর্যন্ত এই সব টার্গেট কিলিং এর হোতা ও এদের অর্থযোগানদাতাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় না নিয়ে আসার কারনে, এদের প্রকৃত মদদদাতা কে বা কারা, এদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কোন মাত্রায় কিংবা এদের শক্তির উৎস কতটুকু গভীরে প্রোথিত সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। সরকারের দায়িত্বশীল লোকজন একেকবার একেক তথ্য দিচ্ছেন, কখনো সংকটের গভীরতাকে আড়াল করতে চাইছেন, কখনো খুনিদের সুরে সুর মিলিয়ে আক্রান্তদেরই দোষারোপ করছেন, কখনো উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একপেশেভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করছেন।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার এই ধরনটি বর্তমান বিশ্বের অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলার ধরনের থেকে একটু ভিন্নতর। পাকিস্তানে এরকম দু’একটি টার্গেট কিলিং হলেও তা সন্ত্রাসী হামলার মূল প্রবণতা নয়। এমনকী গত শতাব্দীর শেষ দিকে আওয়ামী লীগের আমলে যখন বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার সূচনা হয়, তখনকার হামলার ধরন এবং এখনকার হামলার ধরনের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। যশোরে উদীচীর সম্মেলন, ছায়ানটের বর্ষবরণ. সিপিবির সমাবেশে হামলার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিএনপি-জামাতের আমলে জেএমবির নেতৃত্বে বেশকিছু সন্ত্রাসী হামলা পরিচালিত হয়, যার অধিকাংশ হামলাই ছিলো আত্মঘাতী বোমা হামলা, এবং টার্গেট ছিলো রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সিনেমা হল, বিচার বিভাগ ইত্যাদি। সেইসময়ে এই ধরনের হামলা মানুষের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও তা জনগণ সেই সময় জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় বিরোধিতা করে। ছায়ানটে বর্ষবরণে বোমা হামলার পরেও দেখা যায়, পরবর্তী বছর পহেলা বৈশাখে জনতার ঢল। বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে এই সন্ত্রাসবাদীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, এবং এই জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়, বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সেই আন্দোলনে মাঠে থাকে এবং আক্রান্তও হয়। অভ্যন্তরস্থ জনমতের চাপে, এবং নাইন ইলেভেন পরবর্তী পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামাত জোট সরকার জেএমবির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

জামাতের সাথে জোট এবং জঙ্গিবাদের উত্থানে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিএনপি একতরফা নির্বাচনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, ক্ষমতা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে আসে, সেসময় জেএমবি নেতাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ হওয়ার পর, জাতীয় নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গি দমন, বিচারবহির্ভুত হত্যা বন্ধ, বাহাত্তরের সংবিধান পুন:প্রতিষ্ঠার মত জনপ্রিয় দাবি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। নিরংকুশ ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন অজুহাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে, জামাতকে প্রথম সুযোগেই কোনঠাসা করার সুযোগ না নিয়ে, ক্ষমতার প্রতিপক্ষ বিএনপি’কে কোনঠাসা করার নীতি নেয় সরকার। জনমতের চাপে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও তা ঢিমেতালে চলতে থাকে। সংগঠিত হওয়ার ও শক্তি সঞ্চয়ের যথেষ্ট সুযোগ পেয়ে জামাত একদিকে মাঠে নেমে পুলিশের উপর আক্রমণ করে ও গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়, অপরদিকে সরকারের সাথে নানারকমভাবে যোগাযোগ রাখতে শুরু করে। বিদেশী রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে জামাতের সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের বৈঠক হওয়ার খবর পত্রিকায় আসে। এদিকে ৭২ এর সংবিধান হাইকোর্টের রায়ে পুনর্বহাল হলেও, আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় আসে ‘পলাতক’ বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। বাচ্চু রাজাকারের দেশত্যাগ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়, সন্দেহ দেখা দেয় হঠাৎ করে মতিঝিলের সমাবেশ থেকে জামাত কর্মীরা পুলিশকে রজনীগন্ধার স্টিক উপহার দেওয়াতেও। এর পরপরই কাদের মোল্লার রায় যাবজ্জীবন ঘোষণা হওয়ায়, আপোস সন্দেহে মানুষ ফুঁসে উঠে, সৃষ্টি হয় গণজাগরণ। শাহবাগের বিস্ফোরণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, রাজনীতিবিমুখ বলে পরিচিত শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন জনমনে নতুন আশার তৈরি করে। এই আন্দোলন যাতে কোনোভাবেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ না নিতে পারে, সে লক্ষ্যে স্ট্রাটেজি বদলে, আন্দোলনকে নিজেদের পকেটস্থ করার স্বার্থে নানা কৌশল নেয় সরকার। জামাতের সাথে আপোসের সমস্ত সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায়। শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণনির্ভর এই স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলনের কোনো সুগঠিত নেতৃত্ব না থাকায়, শ্রমিকশ্রেনিকে প্রত্যক্ষভাবে এই আন্দোলনে আরো সম্পৃক্ত না করতে পারার ব্যর্থতায়, বামপন্থীদের ভেতওে ঐক্যমতের ঘাটতি থাকায় এই আন্দোলনের নিয়ন্ত্রন অনেকটা সরকারের হাতে চলে যেতে থাকে। সেই সময় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি শাহবাগের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার শুরু করে, ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দেয়। শুরু হয় নতুন ধরণের সন্ত্রাসী আক্রমণ, টার্গেট কিলিং। প্রথম শিকার রাজীব হায়দার।

রাজীব হায়দারের মৃত্যু ছিলো অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি ঘটনা। এই টার্গেট কিলিংকে কাজে লাগিয়ে, ‘আমার দেশ’ সহ কয়েকটি পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে রাজীব হায়দারসহ ব্লগারদের নামে লাগাতার অপপ্রচার করা হয়। রাজীব হায়দার হত্যা ছাপিয়ে নাস্তিকতার ইস্যুতে শাহবাগের কাউন্টার ডিসকোর্স আধিপত্য স্থাপন করার চেষ্টা করে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিকদের মঞ্চ বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রী রাজীব হায়দারের বাসায় গিয়ে বিচারের আশ্বাস দিলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার আবার ভোল পাল্টায়। হেফাজতে ইসলাম মাঠে নামে ১৩ দফা দাবি নিয়ে, কতক বুদ্ধিজীবী তাদের পক্ষে প্রচারণা চালায়, বিএনপি-জামাত-জাতীয় পার্টি এমনকী আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের বিভিন্ন স্থানে তাদের সমর্থন দেয়। সরকার শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ গুড়িয়ে দেয়, চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ করতে বাধা দেয়, হেফাজতের সাথে যোগাযোগ করতে থাকে। প্রতিক্রিয়াশীল ১৩ দফা দাবি নিয়ে বিনা বাধায়, সরকারী সহযোগিতায় হেফাজত কর্মসূচি পালন করতে থাকে। রানা প্লাজা ধ্বসের দশ দিনের মাথায়, যখন অনেক শ্রমিক কংক্রিটের নিচে চাপা, তখন হেফাজত ঢাকা শহরে অভূতপূর্ব তা-ব চালায়, কমিউনিস্ট পার্টির অফিস আক্রান্ত হয়। এর আগের দিন খালেদা জিয়া এক জনসমাবেশে সরকার পতনের আল্টিমেটাম দেন এবং হেফাজতকে সমর্থন দেন। ঢাকায় প্রবেশ করতে দিয়ে, দিনভর তা-ব চালাতে দিয়ে, রাতের বেলা সরকার শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতকে উঠিয়ে দেয়। এর পরেও ঢাকার বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষ চলতে থাকে। হেফাজতের মূল নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পরবর্তীকালে সরকার এই তা-বকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে একতরফা নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। নির্বাচনের আগ দিয়ে, কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করেও জনগণের সমর্থন আদায় করতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ। সেসময় বিএনপি জামাতের সহিংস আন্দোলনের মুখে সরকার একতরফা নির্বাচন করে,এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চূড়ান্ত মাত্রায় পরাস্ত করে পুনর্বার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের বছরখানেক পর, বিএনপি আবারো সহিংস আন্দোলনের ডাক দেয়। লাগাতার অবরোধে পেট্রোলবোমা সন্ত্রাসে প্রাণ যায় বহু নিরীহ মানুষের, পুলিশও গুলি করে হত্যা করে অনেককে। রাষ্ট্রক্ষমতার এই লড়াইয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকে। পেট্রোলবোমা ও নাশকতার মামলায় খালেদা জিয়াসহ বিএনপি-জামাতের বহু নেতার নামে মামলা হলেও মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করা হয়নি। বিএনপির এই সর্বাত্মক কর্মসূচিতে সরকার শেষপর্যন্ত লাভবান হয়, এবং বিএনপি একেবারেই কোনঠাসা হয়ে পড়ে, সরকার নিরংকুশ ক্ষমতা অর্জন করে।

এই নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে টার্গেট কিলিং। রাজীব হায়দার হত্যার আপাত সাফল্যে ও বিচারহীনতায় ফের টার্গেট কিলিংকেই বেছে নেয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী। তারা বেছে বেছে ব্লগার হত্যা শুরু করে, এবং একই সাথে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে সেই হত্যাকা-কে জায়েজ করার চেষ্টা করে এবং হত্যাকান্ডের সপক্ষে এক ধরনের সামাজিক সম্মতি আদায় করার চেষ্টা করে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতির কথা সরকার বললেও, সত্যিকার অর্থে সেই সুফল প্রান্তস্থিত জনগণের কাছে না পৌঁছানোতে, জনগনের বস্তুগত জীবনমানের কাক্সিক্ষত উন্নতি না হওয়াতে, জনগণের ভেতরে পশ্চাদপদ চিন্তার উর্বর ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েই আছে। এর পাশাপাশি সৌদি ওয়াহাবী শাসকগোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত মাদ্রাসা, জামাতের সাংগঠনিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ইসলামের মৌলবাদী লিটারেল ব্যাখ্যাকে প্রচার করার বস্তুগত অবস্থা তৈরি করে রেখেছে। এর উপর ক্ষমতাসীনদের লুটপাট, দুর্নীতি, ক্ষমতায় টিকে থাকার অদম্য লোভে আদর্শিক আপোস, বামপন্থ’ী প্রগতিশীল আন্দোলনের দূরবস্থা, গণতন্ত্রহীনতা ইত্যাদি কট্টরপন্থী ইসলামকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও ‘ওয়ার অন টেরর’ এর নামে ‘ক্রুসেড’ ঘোষণা করে সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, প্যালেস্টাইনে মার্কিন মদদে ইজরাইলী গণহত্যা, হান্টিংটনের ‘কø্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ এর মত উদ্ভট তত্ত্ব, ইসলামোফোবিয়া ইত্যাদি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চমধ্যবিত্ত তরুণকেও তথাকথিত ‘জিহাদ’-এর পথে টানছে।

এইরকম পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে কট্টর মৌলবাদীরা পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্থানের মত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে নি, কেননা বাংলাদেশের জনগণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক বিশাল ঐতিহ্য আছে। পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সুফিবাদী-বাউল মতাদর্শের প্রভাব, শহুরে মধ্যবিত্ত সেক্যুলার তরুণদের বিকাশ, ক্রমবর্ধনশীল শহুরে প্রলেতারিয়েত (যাদের একটা বিশাল অংশ নারী), ভৌগলিক অবস্থান ইত্যাদি এই দেশে রাতারাতি কট্টর ইসলামপন্থী বিপ্লবের সম্ভাবনাকে অনেকটাই নিউট্রালাইজ করে। এই অবস্থা সম্পর্কে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও সচেতন, জনগণের সক্রিয় সমর্থন তারা পাবে না ধরে নিয়েই তারা টার্গেট কিলিং এর পথে এগুচ্ছে। আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলার পথ থেকে তারা সরে এসেছে, আপাতত, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ করার পরিকল্পনা কিংবা সক্ষমতা তাদের নেই। টার্গেট কিলিংগুলো অনেকটা তাদের মতাদর্শ প্রচার ও উপস্থিতি জানান দেওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আইএস ও আল কায়েদা যেসব হামলার দায় স্বীকার করছে, দেখা যাচ্ছে যে তাদের টার্গেটের ভিন্নতা রয়েছে। আল কায়েদা বা আনসার আর ইসলাম টার্গেট করছে তথাকথিত নাস্তিক ব্লগারদের, আইএসের মতাদর্শে বিশ্বাসী জেএমবি হত্যা করছে শিয়া সম্প্রদায়, সুফি-বাউল, বিদেশি নাগরিক ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের। সম্প্রতি হিজবুত তাহরীর এরও জঙ্গি হামলায় সম্পৃক্ততার কথা শোনা গেছে, ক্রসফায়ারে নিহত ফাহিমের বক্তব্য অনুযায়ী (যদি সত্য হয়ে থাকে) ভারতকে সরকারের উপর অসন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে তাদের টার্গেট হিন্দু জনগোষ্ঠী। এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মতাদর্শিক বিরোধ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বাংলাদেশে সমন্বয় করে কাজ করছে কিনা দেখা দরকার। রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা জামাত এইসকল গোষ্ঠীর সাথে কীভাবে জড়িত, এদের অর্থায়নের উৎস কি এইসব দ্রুত বের করা দরকার। জামাতের মউদুদীবাদ দ্বারা দীক্ষিত কোন কর্মী সহজেই এসব কট্টর সন্ত্রাসীগোষ্ঠীতে ভিড়ে যেতে পারে কিংবা সক্রিয় সহযোগিতা করতে পারে এই বিষয়টিও নজরে রাখার দরকার।

টার্গেট কিলিং এর বর্তমান টার্গেট রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী নয় কিংবা নিকট ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নয়, তা এখন অনেকটা স্পষ্ট। রাষ্ট্রক্ষমতার বড়সড় কোনো পরিবর্তন করার মত কোনো শক্তি এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এখনো অর্জন করতে পারেনি, এই ভেবে সরকার যদি তাদের সমূলে উৎপাটন না করতে চায় তাহলে বাংলাদেশের সামনে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে। আমরা দেখেছি ব্লগার হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক ধরনের ঔদাসীন্য। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, লেখালেখির জন্য কেউ খুন হলে সে দায় সরকার নেবে না। অর্ধশত জঙ্গি হামলার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে হাতে গোনা দুএকটির। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভুতভাবে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হত্যা করা হচ্ছে, এতে মূল অপরাধীরা আড়াল হয়ে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সরকার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকার বৈধতা নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসবাদ পুরোটা না দমন করে ‘নিয়ন্ত্রিত আকারে’ জিইয়ে রেখে দিতে পারে এমন সন্দেহও দানা বাঁধছে অনেকের মনে।

জেএমবি’র প্রথম দিককার হামলার পর মানুষ সক্রিয় প্রতিবাদ করেছিলো। আওয়ামী লীগ ছিলো বিরোধী দলে, তারাও জনগণকে সংগঠিত করেছিলো। বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি মানুষকেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনিচ্ছুক করে তুলেছে। সরকার বা ১৪ দল লোকদেখানো দুএকটি কর্মসূচি পালন করলেও মানুষকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক লড়াই চালাবার নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে। জামাত-হেফাজতকে সমর্থন দিয়ে বিএনপির নিজের অস্তিত্বই হুমকিতে। ক্ষমতার বাইরের বামপন্থীরা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা খুব একটা কার্যকর হয়ে ওঠে নি। এমতাবস্থায় সন্ত্রাসী শক্তিকে নিয়ে খেলা কিংবা শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তাদের দমন করতে চেষ্টা করা বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ইতিহাসে কট্টর রিভ্যাইভালিজম কিংবা ফ্যাসিস্ট চিন্তা সমাজমানসে ছড়িয়ে পড়েছে ও প্রভাব ফেলেছে তখনই, যখন সমাজে বিদ্যমান বস্তুগত সংকটের বিপরীতে প্রগতিশীল আন্দোলন পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে মূর্ত করে তুলতে পারে নি। আবার কেবলমাত্র বিশুদ্ধ মতাদর্শ কিংবা বিমূর্ত সেক্যুলারিজম প্রচারের মাধ্যমে টার্গেট কিলিং বা সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে লেনিনের এই উক্তিটিই যথার্থ,

‘ধর্মীয় প্রশ্নকে বিমূর্ত, আদর্শবাদী কায়দায়, শ্রেণি সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কহীন বুদ্ধিবাদী প্রসঙ্গরূপে উপস্থাপিত করার বিভ্রান্তিতে আমরা কখনোই পা দেব না বুর্জোয়াদের র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্রাটগণ প্রায়ই যা উপস্থাপিত করে থাকে। শ্রামক জনগণের অন্তহীন শোষণ ও কার্কশ্য যে সমাজের ভিত্তি, সেখানে বিশুদ্ধ প্রচার মাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরনের প্রত্যাশা বুদ্ধিহীনতার নামান্তর। মানুষের উপর চেপে থাকা ধর্মের জোয়াল যে সমাজমধ্যস্থ অর্থনৈতিক জোয়ালেরই প্রতিফলন ও ফল, এটা বিস্মৃত হওয়া বুর্জোয়া সংকীর্ণতারই শামিল। পুঁজিবাদের তামস শক্তির বিরুদ্ধে স্বীয় সংগ্রামের মাধ্যমে চেতনালাভ ব্যতীত যেকোন সংখ্যক কেতাব, কোনো প্রচারে প্রলেতারিয়েতকে আলোকপ্রাপ্ত করা সম্ভব নয়।’

– লেনিন, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে শাসকশ্রেনি ক্ষমতায় যাবার জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘাতে মৌলবাদীদের বারবার ব্যবহার করেছে কিংবা আপোস করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। আদর্শিক প্রশ্নের চাইতে লুটপাটের স্বাধীনতা, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থরক্ষা ও যেনতেনপ্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন সমাজের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে নি। এই বস্তুগত বাস্তবতায়, মেহনতি মানুষের শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রসর না করে শাসকশ্রেণির ‘কম মৌলবাদঘেঁষা’ অংশকে সমর্থন যোগানোর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ রুখে দেওয়ার ভাবনা ক্যানসারের চিকিৎসায় কুইনাইন দেয়ার মতই ব্যাপার। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষদের নিজস্ব দাবি নিয়ে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে তৃণমূলে কার্যকর সংগঠন ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল টার্গেট কিলিং কিংবা সন্ত্রাসবাদের কার্যকর মোকাবেলা করা সম্ভব।

৩ thoughts on “টার্গেট কিলিং, ক্রসফায়ার ও রাষ্ট্র (পর্ব ১)

  1. টার্গেট কিলিং ও ক্রশফায়ার সবই
    টার্গেট কিলিং ও ক্রশফায়ার সবই আওয়ামী পৃষ্টপোষকতায় হচ্ছে। দেশে যেহেতু কোন জঙ্গি নাই, সরকার হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করছে না। স্বাভাবিকভাবেই সকল হত্যাকাণ্ডের দায় আওয়ামীলীগের ও শেখ হাসিনার।

  2. সবই ভারতের ষড়যন্ত্র, ভারত
    সবই ভারতের ষড়যন্ত্র, ভারত এদেশটা দখল করতে উঠে পরে লেগেছে যেমন করেই হোক হাসিনা বেঁচে থাকতে থাকতে দেশটা দখল করে নিবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *