নর নারীর এক অস্তিত্ব

‘অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’।
বিদ্রোহী কবি সাম্যের গান গাইতেন।বিশ্ব গড়তে নর নারির সমান ভুমিকা বলে মানতেন।আদতে আমাদের সমাজ এই নারীর অর্ধেক বললে কি বোঝে তা সহজে অনুমান করা যায়।আমার ছেলে বেলার কথাই বলি।ক্লাসে শিক্ষক মাঝে মাঝেই এই নারীর সমাজে অর্ধেক ভুমিকার কথা বলতেন প্রায়ই।বুঝাতেন সবাইকে।খুব একটা অভিনয় করেই বুঝাতেন।

ছেলেরা মাঠে ঘাটে অফিসে কাজ করে।অর্থনৈতির চাকা সচল রাখে।তাহলে বল তো নারী কি ভাবে অর্ধেক বিশ্ব গড়ে দিল।স্বাভাবিক ভাবেই সবাই একটু অবাক হতাম।চিন্তা করতাম কি ভাবে।বেশ একটা জ্ঞানী ভাব নিয়ে বলতেন।তোমাদের রান্না করে দেয় কে?তোমাদের দেখা শোনা করে কে?তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা থাকে না শিক্ষক মশাই কি বলতে চাচ্ছে।রান্না ঘরের রান্না,আর ঘর গুছিয়েই এই নারী আমাদের সমাজের অর্ধেকটা গড়ে দিয়েছে।কথাটা বুঝেই বেশ আনন্দ পেতাম আর ভাবতাম নারী কি ভাবে অর্ধেক সমাজ গড়েছে।আর শিক্ষকের জ্ঞানের প্রশংসা করতাম।মোটের উপড় আমার প্রিয় শিক্ষকও ছিলেন বটে!

আমাদের সমাজে নারী বলতেই ঘরের কাজ করা কিছু রক্ত মাংশের রোবট হিসাবেই বলা যায়।পতি সন্তান আর নিজের ঘর নিয়ে যার ব্যাস্ততা।সমাজ নারীকে দেবি,ঘরকন্যা,লক্ষী বলে বিষেশ উপাধিতে ভূষিত করেছে।আদতে এরা সবাই পুরুষের দাসি মাত্র।সমাজে ভিন্ন নামে ভিন্ন ভাবে এদের রুপায়ন করে উচ্চমর্যাদা দিয়েছে।তবে সেটা দাসি থেকে বেশি নয়।এ সমাজে মানুষ নারী পাওয়া যাবে না।সবাই একেকটা দাসি নারী।

পুরুষের স্বপ্ন থাকে আর্থিক নির্ভরশীল হওয়া,তারপর নারী নামের এক দাসি বিয়ে করা।যাকে কয়েকটা শাড়ী,দু পয়সার আলতা কিংবা লিপস্টিক দিলেই খুশি।বিনিময়ে তার কাছ থেকে পাওয়া যায় ঘরের সকল কাজ আর সাথে যৌন সেবা।এটাকে যৌন সেবাই বলা যুক্তিযুক্ত।পুরুষতন্ত্র এই যৌন সেবাকে ‘ভালবাসা’ নাম দিয়েছে।ঘটা করে এক মেয়েকে কসাইয়ের গরু দেখার মত দেখে বিয়ে করে নেয়।তারপর চলে ভালবসা নামের অন্তঃপুরের কাহিনী।যাতে ঐ নারীর সেচ্ছায় আত্মঃসমর্পণ ছাড়া অন্য উপায় নেই।আর সেটাই আমাদের ভালবাসা।এটা গ্রহণ করলে তুমি নারী লক্ষী,দেবি।ঠিক উল্টো নারীর স্বপ্ন থাকে শুধু একটা দাসি হওয়া।আর যেটা আমাদের এই পুরুষতন্ত্র বলে দিয়েছে লক্ষী পয়মন্ত।

‘সংসার সুখে হয় রমণীর গুনে……’

সমাজ শিখিয়েছে,রমনী সংসার সুখের করে তোলে।পুরুষ তাহলে ঢেঁড়স!পুরুষতন্ত্র প্রতিনিয়ত নারীকে ঘরে বন্দি রাখার যে সব কাজ চালায় তাদের মাঝে এই সব সুমিষ্টি কথা থাকে।দেবি লক্ষী এইগুলোই তার রুপ।নারী পুরুষ যে প্রকৃতির অভিন্ন সৃষ্টি তা এই পুরুষতন্ত্র মেনে নিতে পারে নাই,আর এখনও পারছে না।

সমাজের মূলেই ধর্ম।পুরুরষতন্ত্র এই ধর্মকে সৃষ্টি করেছে আর নারীকে দাসি হিসাবে নিজের কাজে লাগিয়েছে।সকল ধর্মেই নারী নিকৃষ্ট,নিচ,হীন।ধর্ম মানুষ বলতে পুরুষ বোঝে।নারী তার দাসি।ইসলামে তাই নারীকে অন্তঃপুরে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।হিন্দু ধর্মের মনুসংহিতায় বলা আছে,নারী খেতস্বরূপ,পুরুষবীজস্বরূপ।আবার দ্রুপদির বস্রহনন।প্রায় সব গ্রন্থেই নারী নিগৃহীত।ধর্ম ও সমাজ নারীকে কখনও মানুষ রুপে ভাবে নাই।

নারী পুরুষ এক অভিন্ন অস্তিত্ব।এই সত্য যত দিন আমাদের সমাজে মানুষ না বুঝবে ঠিক তত দিন আমাদের সমাজর উন্নতি হবে না।আমাদের চিন্তা করে যেতে হবে নারী কি ভাবে অর্ধেক পৃথিবী গড়েছে।সে দিন হয় তো শিক্ষক ঘরের কাজকেই নারীর সভ্যতা গড়ার অর্ধেক হিসাবে বুঝিয়েছে আমাদের।যত দিন পর্যন্ত আমরা আমাদের মানুষিকতা উন্নত না করব ঠিক তত দিন এই ভাবে সমাজে নারীর অবদান খুজতে হবে!দাসী হিসাবে না মানুষ হিসাবে বাঁচার অধিকার নিতে হবে।বুঝতে হবে নারী পুরুষে ভিন্নতা নয় এরা এক অভিন্ন অস্তিত্ব।

২ thoughts on “নর নারীর এক অস্তিত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *