ছেলেরা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি নয়!

সংসার সুখে রাখার একতরফা দায়িত্ব কি শুধু ঘরের বৌয়ের? আমাদের ঘর পরিবারে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা এই রকমই ইঙ্গিত করে। আমার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে দেখি ঘরে কোন অশান্তি হলে তার দায় গিয়ে পড়ে ঘরের বৌয়ের উপর। এক আত্মীয়ের বাড়িতে এক পাল মেহমান আসল, সবাইকে উপহার দেওয়া হল, ভুল ক্রমে এক জন বা দুজন বাদ গেলো, বা কারও উপহার মন মতো হয় নি। সবাই কানাঘুষা করতে লাগলো বউ কেন দিলো না?

শ্বশুর শাশুড়ির সেবায় কোথাও কোন ভুল হলে সবারই একই কটু কথা “বউ দেখে নি, যত্ন নেয় নি”। এক খালাত ভাই কোন উৎসব উপলক্ষে কিপটের মত কম বাজার করলে খালাত ভায়ের বউকে সবাই কথা শুনায় , কেন সে তার স্বামীকে বলে নি, বুঝায় নি। কেউ বলে না , ছেলে ইচ্ছে করে আনে নি, খেয়াল করে নি। মাঝে মাঝে বলে ফেলি “তোমারা সবাই ভাবিকেই কেন দোষারোপ করো, ভাইয়া তো নিজ থেকে করতে পারে, তাকেও কিছু বলো” । তখন সবার এক উত্তর , “ছেলেদের এসব মাথায় থাকে না, বউদের মনে করিয়ে দিতে হয়”

হায়, বউদের উপর “মনে করিয়ে দেওয়ার” দায়িত্বও ঢেলে দেওয়া হয়। বউ মানেই হল শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ননদ জা ভাসুর পাড়া প্রতিবেশী হতে শুরু করে সবার সব ধরণের আবদার পূরণ করা এবং তাদের মন মতো চলা। তাদের ইচ্ছে-চাহিদা তাদের ছেলের কাছে সঠিক ভাবে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও বৌয়ের। সেই চাহিদা ছেলে যেন সঠিক ভাবে পূরণ করে তার তদারকি করার দায়িত্বও বৌয়ের। যদি হেরফের হয় তবে এ অবধারিত যে বউ মনে করিয়ে দেয় নি বা বলে নি। ছেলেদেরও যে দায়িত্ব আছে নিজ থেকে সবার যত্ন নেওয়ার এই বোধ বেমালুম সবাই ভুলে যায়। এমনকি ছেলে যদি স্বেচ্ছায় নিজ থেকে কোনো দায়িত্ব পালন না করে তবে এর দায়ও কিন্তু ছেলের স্ত্রীর উপর বর্তায়।

অনুরূপ অভিযোগ যদি কেউ আলাদা সংসার করতে চায়। যৌথ পরিবার থেকে স্বামী স্ত্রী আলাদা থাকার শখ মানেই বউ ছেলের মাথা খেয়েছে। কেউ এই তথ্যটি মনে রাখে না যে একটি মেয়েও কিন্তু তার বাবা মা ভাই বোন, তার চিরচেনা পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে এসে নিজেকে সপে দেয়। তার এই সবাইকে ছেড়ে আসাকে কেউ গুরুত্বের চোখে দেখে না। দেখে না কারণ এটাই যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। বাতাসের মত স্বাভাবিক বলে এই ছেড়ে আসার কোন গুরুত্ব সমাজে কেউ তাঁকে দেয় না। কিন্তু একই কাজ যদি ছেলে করতে চায়, অর্থাৎ আলাদা সংসার করতে চায়, বাবা মা ভাই বোন চিরচেনা পরিবেশ থেকে বের হয়ে নতুন পরিবেশে নিজ স্ত্রী নিয়ে থাকতে চায় তবে পরিবারে, আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে হাহাকার জেগে উঠে।যেন ছেলের পরিবার ছাড়া থাকা কষ্টের , কিন্তু মেয়ের পরিবার ছাড়া থাকা স্বাভাবিক বা অকষ্টের।

তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই বউ সত্যি সত্যি ছেলেকে তার পরিবারের থেকে আলাদা করতে চাচ্ছে, বিভিন্ন কটু কথা বলে ছেলের কান ভারী করছে, সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করছে, তবে সেখানে ছেলে কেন কোন পদক্ষেপ নেয় না? যদি আলাদা হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় না থাকে তবে আলাদা হওয়া মানে এই না যে ছেলে তার পরিবারের প্রতি কোন দায়িত্ব পালন করবে না। ছেলের পরিবার সম্পর্কে নিন্দনীয় কথা ছেলেকে বলা অবশ্যই একজন বৌয়ের অন্যায় কাজ। তবে আলাদা হয়ে ছেলে যদি পরিবারের দায়িত্ব পালন না করে তবে সেটা আরও অন্যায়। সেখানে তার স্ত্রী তাঁকে যতই কানপড়া দিক না কেন তার নির্বোধের মত আচরণ করে দায়িত্বে অবহেলা করা তার স্ত্রীর কানপড়া দেওয়ার চেয়ে বেশি অন্যায়। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক কর্মক্ষম ছেলে যথেষ্ট বুদ্ধি এবং বিবেক সম্পন্ন মানুষ। অন্যের কথায় নিজের বোধ হারিয়ে বাবা-মা’কে অবহেলা করা নিজেকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রমাণ করে।

সংসার সুন্দর পরিপাটি সুখের করার জন্য যেমন স্ত্রীর ভূমিকা আছে তেমনি স্বামীরও ভূমিকা আছে। একতরফা একজনের চেষ্টায় সংসার যেমন সুখের হয় না তেমনি দুঃখেরও হয় না। অশান্তি হওয়ার পিছনে কেউ যদি ইন্ধন যোগায় তবে সেই ইন্ধনকে পাত্তা দেওয়াও অন্যায়। সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে নয়, স্বামী স্ত্রী উভয়ের গুন এবং চেষ্টায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *