গঙ্গা- যমুনা- ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা সেই ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের খপ্পরে পড়েছে

বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের মধ্যে আবারো আলোচনায় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। ভারতের ১৯৬৩-৬৪ সালে কেন্দ্রীয় সেচ ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ড কানুরি লক্ষন রাও প্রথম নদীগুলোকে সংযুক্ত করার এক ধারণা ভারতের জনগনের সামনে আনেন। তারই ধারনাপ্রসূত এক আসন্ন প্রকল্প ভারতের আন্তঃন্দী সংযোগ প্রকল্প। তবে ভারত সরকার এই বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে তাঁর খাদ্য, সেচ ব্যাবস্থাপনাসহ বন্যা নিয়ন্ত্রন, মরুকরন নিরসন ভাবনা থেকে। এই বিলাসি ও ব্যায়বহুল প্রকল্প নিয়ে ভারত প্রথম কাজ শুরু করে ১৯৮০ সালে তাঁদের পানিসম্পদ নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহনের মধ্য দিয়ে। ভারতজুড়ে বিভিন্ন নদীগুলোকে সংযুক্ত করার এই পরিকল্পনা ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নেয়ার ২ বছরের মাথায়ই ভারত সরকার national water development agency – NWDA প্রতিষ্ঠা করে।
ভারত এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত যা করতে চাচ্ছে তা হলো –
১) রাজস্থান , গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ , তামিলনাডু প্রভৃতি করাপ্রবন রাজ্যের কৃষি সেচ ব্যাবস্থা এগিয়ে নেয়া।
২) দেশের ৩৫ হাজার হেক্টর জমিকে কৃষি জমিকে সেচের আওতায় আনা
৩) ৩৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

ভারত সরকার এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে বেশিমাত্রায় তোরজোড় শুরু করে বিগত বিজেপি শাসনাধীন আমল থেকে। সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে দ্রুত তাগাদা দেন। তবে তাঁর সরকারের মেয়াদ শেষ হলে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসলে এই প্রকল্পকে ঘিরে আগ্রাসীভাব দেখা যায় নি। তারা ধীরে চলো নীতিতে অগ্রসর হচ্ছিল। এর মধ্যে পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে এই প্রকল্প ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গড়ালে ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এস কুমার, এস এইচ কাপাডিয়া এবং এস কে পাটনায়েকের বেঞ্চ এই প্রল্পের সপক্ষে রায় দিয়ে একে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয় । সেই রায় পেয়ে কংগ্রেস কাজ শুরু করতে না করতেই বিজেপি ক্ষমতায় এসে এই বিতর্কিত প্রকল্পে হাত দেয় ।
এখন প্রশ্ন হলো , কেন এই প্রকল্প বিতর্কিত এবং অন্যায্য?

প্রথমত, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত যে সকল নদীতে ভারত সংযোগকারী বাঁধ দেবে বলছে এর সবকটি নদী দক্ষিন এশিয়া, চীন, মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে যৌথভাবে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদী। অর্থাৎ এসকল নদীর উপর অধিকার সকল দেশেরই রয়েছে। যেসকল নদী ভারতে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে তাঁর ভাটিতেই বাংলাদেশ। কাজেই ভারত সরকার তাঁর যে নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে তাতে অন্যান্য বিশেষত বাংলাদেশের মতামত অবশ্যকীয়ভাবে শোনার মতো। বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডে মূলত বৃহত্তম নদী প্রবাহ বলতে পদ্মা/গঙ্গা-যমুনা/ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা এই ধারায় বুঝানো হয়। আর ভারত সরকারের প্রকল্প গুলোর বৃহদাংশই এই তিন নদীর মোহনাকে ঘিরে। এই তিন নদীর মিলিত অবববাহিকা বাংলাদেশ সীমান্তে ৭ ভাগ, নেপাল ভাগে ৯ ভাগ, ভুটানে ২ভাগ , চীনে ২০ ভাগ, ভারতে ৫৮ ভাগ । স্বভাবতই এই নদীধারার মধ্যকার যেকোন ব্যাবস্থাপনায় এর অন্তর্গত অববাহিকার সকলের মতামত, অংশীদারিত্ব থাকতেই হবে। কিন্তু ভারত এক্ষত্রে তাঁর তোয়াক্কা করে নি , করছেও না। বলাবাহুল্য চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

দ্বিতীয়ত, উপনিবেশবাদের বিলুপ্তির মাধ্যমে বিশ্বের অনেক একিভূত অঞ্চল যেমন পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে আবার অনেক অঞ্চলের মধ্যকার সংযোগ ঘটেছে। তবে এর মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে প্রাকৃতিক বিভিন্ন হেরিটেজ নিয়ন্ত্রন, ব্যাবহার বিবিধ বিষয়ে মতদ্বৈততার আবির্ভাব ঘটেছে। সীমান্ত, পানি, জলপথ ইত্যাদি নিয়ে দেশগুলোর মধ্যকার বিরোধে তাই আন্তর্জাতিক আইন কানুন জরুরি হয়ে পড়েছিলো। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্ববধানে ১৯৭০ সালে হেলসিংকি রুলসকে পরিপূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। সত্যিকার অর্থেই এই আন্তর্জাতিক বিধিমালাটি যেকোন আন্তর্জাতিক এরূপ বিরোধ নিষ্পত্ত্বির জন্য অনন্য। আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনের এই আইনের ৫,৬ ধারায় ভাটির দেশের স্বার্থ রক্ষ্য আলোচনা, ক্ষতিপূরণের কথা জোর দিয়ে বলা আছে। এছাড়াও আইনের ২০ -২৬ ধারায় পানি দূষণ, প্রবাহের বিষয়ে যৌথ প্রচেষ্টার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য , এর ২৩ নম্বর ধারায় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষনে পারষ্পারিক যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগ এবং ক্ষোভের হলো এই যে, ভারত এসকল আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ক্ষেত্রে উক্ত কনভেনশনের কোনরূপ ধার ধারে নি। বরং এই কনভেনশনের আওতায় যেকোন সংকট এর মিমাংসা করতে গেলেই ভারত তা দ্বিপাক্ষিক বিষয় বলে এড়িয়ে যায়। ভারত সরকার এসকল নদীর প্রবাহকে একচ্ছত্রভাবে নিজস্ব রাজনীতির গুটি হিসাবে ব্যাবহার করছে। খরাপ্রবন রাজস্থান, তামিলনাডু প্রভৃতি রাজ্যে শুধুমাত্র নির্বাচনী গন্তন্ত্রের জন্য সম্পূর্ণ প্রকৃতিবিরোধী এইসব প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। সেই অঞ্চলের ভোট পেতে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করার উন্নাসিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে নি বিজেপি ।

তৃতীয়ত, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের উপর এমন আধিপত্যবাদী নীতি নতুন নয়। সেই ফারাক্কা বাঁধ, গঙ্গা পানিচুক্তি, তিস্তা পানি চুক্তি, গজলডোবা বাঁধ এবং টিপাইমুখ বাঁধ ভারত কর্তৃক আমাদের পানিশোষণের নীল নকশা। এর প্রত্যেকটিতেই ভারত বাংলাদেশকে বঞ্চিত করেছে অথবা প্রতারিত করেছে।
সংযোগ প্রকল্পে ভারত কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ-
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের রায় দেয় সে রায়ে স্পষ্টত উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ফুটে উঠেছে। সে রায়ে প্রতিবেশি দেশ এবং আন্তর্জাতিক নদী হিসাবে যে ট্রিটমেন্ট উপস্থাপনযোগ্য ছিলো তা আসে নি। বরং সেখানে এ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করা হয় নি। ভারত সরকার এই প্রকল্পে যা করছে তা ভয়াবহ। সোজা কথায় ভাটির বাংলাদেশের জন্য তা ভয়ংকর। এই প্রকল্পে সরকার সারা ভারতের যেসকল নদীতে উদ্বৃত্ত পানি প্রবাহ রয়েছে সেখান থেকে পানি কম প্রবাহের অঞ্চলে নেয়া হবে। এর জন্য বিভিন্ন নদীকে সংযোগ করে ৩০ টি খাল নির্মাণ করা হবে। আর সমগ্র প্রকল্প কে ঘিরে এরূপ খাল নির্মাণ হলে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১০ হাজার মিটার। এরই মধ্য ভারত সরকার ২০১৪ সালে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়েছে এই প্রকল্পে । এই প্রকল্পে ভারতের মধ্যকার গোদাগাড়ি- কৃষ্ণা , কালিন্দি – চম্পল, ক্যেন –বেতিয়া , নর্মদা-তাপি, পিঙ্গল- দামগঙ্গা প্রকল্পের কাজ আসন্ন । পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী আগামী ১০ বছরে এই বৃহৎ প্রকল্প শেষের কথা বলেছেন।

বাংলাদেশের যা ক্ষতি –
১) নদী সংযোগের মাধ্যমে ভারতে যত শাখা প্রশাখা বাড়বে বাংলাদেশের জন্য ততই সেটা বিপজ্জনক। কারন নদীতে পানিপ্রবাহের পথ বেড়ে গেলে স্বভাবতই ভাটিতে বাংলাদেশে এসে যে পানি পাওয়ার কথা তা কমে যাবে। ৩০ সংযোগ খাল দেয়া হবে এদেশের বৃহত্তর তিন নদীর উজানে যার ফলাফলে পানি কমে গেল এই শতাব্দীর মধ্যেই দেশের নদীর ভবিষ্যৎ কি হবে তা ভেবেই আতকে উঠতে হয়। উঠতি জলবায়ু সংকট আবার এদিকে ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনায় পানিশূন্যতা ঠিক কোন পরিণতিতে আমাদের নিয়ে যাবে তা ভাবাও কষ্টসাধ্য।
২) এই প্রাকৃতিক নদীপ্রবাহে যে জীববৈচিত্র্য আছে সেটিও যে ভেঙ্গে পড়বে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভারত সরকার এই সংযোগ প্রকল্প আরোপ করলে এদেশের স্বাদুপানির মৎস্য বৈচিত্র্য ব্যপকভাবে নষ্ট হবে । এমনিতেই দেশে স্বাদুপানির হাওড় –বাওড় , খাল, বিলের বিশাল মৎস্য বৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে সেখানে এহেন প্রকল্প দেশের এই প্রাকৃতিক অভয়ারবন্যকে ধ্বংস করবে – এ কথা অস্বীকার করার বিন্দুমাত্র উপায় নেই।
৩) জলবায়ু পরিবর্তনের আসন্ন ঝুকিতে বাংলাদেশ অনন্য । দেশের জলাধারগুলোতে লবনাক্ততা বাড়ছে। এখন কৃষিজ উৎপাদন করে যাওয়ার এক ভয়ানক কারন এই লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া। আর সমুদ্রের পানির লবনাকক্ততা নদীতে না আসার জন্য প্রয়োজন ব্যপক ও অবাধ পানির পলিযুক্ত প্রবাহ । কিন্তু যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই এই পানিপ্রবাহ কমে যাবে এবং নদীগুলোর মধ্যে অবশিষ্ট পানিতেও লবনাক্ততা গ্রাস করবে। যার ফলে কৃষিজ ক্ষতি এবং স্বাদুপানির মাছের ব্যাপক বিলুপ্তি আসন্ন।
৪) এই প্রকল্প একইসাথে নদী ভরাট প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। সাধারণত নদীপথের ৬০ ভাগ পলি গঙ্গা দিয়ে আসে আর বাকি ৪০ ভাগ অন্য নদীগুলো দিয়ে আসে। কিন্তু নদীতে পানি প্রবাহ কমে গেলে নদীপথে আসা পলির যে ৮০ ভাগ সাগরে পরার কথা তাঁর ব্যাঘাত ঘটবে। এতে নদী ভরাট হয়ে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।
৫) দেশে নদীপথে বাণিজ্য, দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ এই পানি প্রবাহের সাথে জড়িত। পানি প্রবাহ কমে গেলে ক্রমান্বয়ে কমতে থাকা নদীপথ ৫৯৯৫ কিলোমিটার থেকে ধারাবাহিকভাবে আরো কমবে।

পানি নিয়ে ভারতীয় প্রহসন-
ফারাক্কা বাঁধ এবং গঙ্গার পানি চুক্তিঃ ১৯৬০ সাল হতে হাতে নেয়া ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্প ১৯৭৫ এ এসে বাংলাদেশ হওয়ার পর শেষ হয়। গঙ্গা থেকে হুগলিতে পানি সরিয়ে নেয়া এবং কলকাতা বন্দরকে সচল রাখতে একতরফাভাবে গঙ্গা অববাহিকায় ১২১ গেটের বাঁধ দেয়। পরিতাপের হলো এই যে, বন্যা আসলে আবার এই পানি প্রত্যাহারকারী ভারতই পানির প্রবাহ খুলে দেয় নিজেদের বন্যার পানি হতে রক্ষা করতে। যার ফলে কয়েকবার বাংলাদেশকে মারাত্নক বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৯৮ সালের বন্য সেই কর্মকাণ্ডের নিদর্শন। আমাদের দেশের জন্য চরমতম বিব্রতকর হলেও সত্য যে ১৯৭৫ সালে ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধ চালুর কথা বলে আজ অবধি তা বন্ধ করে নি ভারত সরকার। যা কিনা এক চরমতম বিশ্বাসঘাতকতা। আশ্চর্যের হলো , এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪০ বছরে সামান্যতম কূটনৈতিক তৎপরতাও চোখে পরে নি আমাদের সরকার মরারাজদের সেটা বিএনপি হোক আর আওয়ামি লীগই হোক। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত গঙ্গায় ৪০-৪৫ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে আর বাংলাদেশ তাঁর ভাগে ১০-১৫ কিউসেক পেলে পায় , না পেলে নাই। যা হোক জিয়াউর রহমান এসে জাতিসংঘে বিষয়টা তুললে ১৯৭৭ সালে গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালে সে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ভারত আর তা নবায়নে আগ্রহী হয় নি। এ সময় কয়েকবার বাংলাদেশ সংকট নিরসনে হেলসিংকি কনভেনশনের আওতায় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্ততা নিতে বললে ভারত বরাবরই তা দ্বিপাক্ষিক বলে এড়িয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। পাকিস্থানের সাথে সিন্ধু নদের হিস্যা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্ততায় ভারত বসে সমাধানে গেলেও বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত সে পথে যাচ্ছে না।

তিস্তা পানিচুক্তিঃ
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য যে চুক্তি হয়ার কথা ছিলো সেটিও ভারত সরকার এবং মমতা ব্যানারজীর যৌথ তৎপরতায় আটকে আছে। চুক্তি হবে হবে করেও সেটি হয় নি একদম শেষ মুহূর্তে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে অভ্যন্তরীন রাজনীতির হিসাব মেলাতে এদেশের তিস্তাপারের মানুষদের জিম্মি করে রেখেছেন। তিস্তায় এখন চরাচর চোখে পড়ে , পানি নেই। দুই দেশের নদী ও পানি নিয়ে যৌথ কাজের জন্য যে জে আর সি নামে জয়েন্ট কমিশন আছে তাকে তিস্তার পানি প্রশ্নে গত ৪ বছরে একটি বৈঠকেও বসাতে পারে নি বাংলাদেশ। পানিচুক্তি ও সমঝোতার আওতায় ভারত তিস্তায় পানি প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও ২০০১৪ সালে সর্বনিম্ন ৫৫০ কিউসেক পানি তিস্তায় প্রবাহিত হয়। অথচ ভারত কোন কিছুতেই সারা দিচ্ছে না। এদেশের নেতা-মন্ত্রিরাও আছে সেই একই ধাঁচে।

১৯৯৬ সালের পানিচুক্তিঃ
এই চুক্তি ভারতকে একটি চুক্তির টেবিলে আনলেও তা ছিল পূর্বের ১৯৭৭ সালের পানিচুক্তির থেকে আরো পিছু হটা। তৎকালীন আওয়ামি লীগ সরকার শুষ্ক মৌসুমকে ঘিরেই মূলত এই চুক্তিতে ভারতের সাথে আবদ্ধ হয়। এতে ভারতকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যারান্টি সহকারে পানি দেয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে ধারা সংকুচিত। এই চুক্তি মতে প্রতিটি মওসুম কে ১৫ পর্যায়ে বিভক্ত করে পানি দেয়ার কথা রয়েছিলো ভারতের কিন্তু দেখা গেছে উক্ত চুক্তি মতে পানির যে হিস্যা পাওয়ার কথা ছিলো তাও পাওয়া যায় নি। একদিকে চুক্তির নতজানু শর্তে পানি আটকে রাখছে ভারত অপরদিকে প্রতিশ্রুত যে পানি দেওয়ার কথা সেটিও দিচ্ছে না বাংলাদেশকে। এক্ষেত্রে চুক্তির মধ্যে শুভঙ্করের ফাকিও রয়েছে-
যেমন এই চুক্তিমতে পানির বণ্টন সমীকরন নিরধারিত হয়েছিলো ১৯৪৯- ১৯৮৮ সালের গঙ্গায় পানিপ্রবাহের ধারা অনুযায়ী। কিন্তু ফারাক্কা সেই প্রবাহকে একদিকে রুখে দিচ্ছে আর ভারত কম প্রবাহের অজুহাত তুলে পানি নিয়ে লজ্জাজনক জোচ্চুরির আশ্রয় নিচ্ছে ।

টিপাইমুখ বাধঃ
সিলেট সীমান্তে ভারতের বরাক নদীর মুখে ভারত সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। এই প্রকল্পটি এখন নির্মাণের পথে। ১৭০ মিটার উচ্চতার এবং ৩৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ বাঁধ আদতে এক বিশাল পানি আটকে রাখার মাধ্যম যেটি কিনা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাবহার করা হবে। উদ্বেগের হলো ঐ অঞ্চলটি সাংঘাতিকভাবে ভূমিকম্পপ্রবণ । যদি কোন কারনে ভূমিকম্পে বাঁধ ভেঙ্গে যায় তবে সিলেট হবে আমাদের সেই ভবিষ্যৎ দুর্গত অঞ্চল। আর এ নদীর সাথেই যুক্ত যে সরমা কুশিয়ারা মিলিত স্রোত টিপাইমুখ হবে সেটির সবচাইতে বড় ক্ষত। অথচ, এদেশের মন্ত্রী- আমলা- উপদেষ্টা ভারতের চেয়ে আগবাড়িয়ে বলে বেরায়, টিপাইমুখে কোন ক্ষতি নাকি আমাদের হবে না। পরিহাস আর নিয়তির কাছে অসহায় এদেশের জনগন। মন্ত্রী- আমলারা ভারিততোষণে ব্যাস্ত কিন্তু বাস্তবতা হলো জনগন তিস্তা- ফারাক্কা ভুলে নি। কাজেই টিপাইমুখ কি হবে বাংলাদেশের জন্য সেটি বুঝতে বিজ্ঞ হতে হবে না।

দশকের পর দশক ধরে এই হলো নদী ও পানি নিয়ে ভারতের সাম্রাজ্যাবাদী ও আগ্রাসী নীতির খতিয়ান। ধারাবাহিকভাবে ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগনকে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ করে নজীরবিহীন অন্যায় করে আসছে। উল্লেখ্য যে পানি নিয়ে ভারত সরকারের নীতির দ্বিমুখীতাও মাঝে মঝেই দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্র নদীতে চীন যখন বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন এই চীনা নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দরবারে নালিশ করেছিলো ২০০৯ সালে । কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে খোদ ভারত চীনের পথে হাঁটে। এ সমস্ত সকল বিষয়ে আশ্চর্য হতে হয় এদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির আওয়ামি- বিএনপির দিকে তাকালে। মুখে ভারতবিরোধী বলে বিএনপির বাগাড়ম্বর আর আওয়ামি লীগের ভারততোষণ উভয়ই ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থে চালিত। এ যাবত ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক যত ইস্যু এসেছে সেগুলোতে নতজানু নীতি শাসকগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শন করে এসেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারায় আচ্ছন্ন ও সাম্প্রদায়িক ভাবাপন্ন বিজেপি যেন এই উন্নাসিক ও হঠকারি উন্নয়নভাবনায় জোয়াড় ঠেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক সনাতনী উন্নয়নতত্ত্ব সারা ভারত জুড়ে গ্রাস করেছে। আধিপত্য বিস্তারের উগ্র মানস যখন তীব্র হয়, ভোটের রাজনীতির নির্মম হিসাব যখন মাদকতায় শাসকদের ভরিয়ে ফেলে তখন প্রাণ , প্রকৃতি , সভ্যতা, বন , নদী কিছুই বাকি থাকে না। প্রতিটি দেশ , ভূখণ্ডে তা স্পষ্ট। এর চাইতে নিগূঢ় সত্য হলো, জাতীয়তাবাদে বিভক্ত আর রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভক্ত মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা এবং বিশ্বনাগরিকতাবাদের চাইতে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতিরাষ্ট্রের অর্থনীতির তথাকথিত বিকাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *