জাপানের ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসঃ আমরা কোথায়?

জাপানে একটা সাধারন বিষয় প্রচলিত আছে, “জাপানি লোকেরা জন্মগ্রহনের অনুষ্ঠান পালন করে শিন্তো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, বিয়ে করে খৃস্টীয় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এবং শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পালন করে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী”। এই যে একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ইভেন্টে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের রীতিগুলো (ritual) পালন করে, একে তারা কখনো সাংঘর্ষিক বিষয় মনে করে না; বরং সানন্দেই সবাই তা গ্রহন করে। উপরের জরিপের অদ্ভূত ফলাফলের মূল হেতুও এটা। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে একই ব্যক্তি নিজেকে একাধিক ধর্মের অনুসারী হিসেবে মত দিয়েছে, কেননা বাস্তবেও সে একাধিক ধর্মের রীতিই পালন করে। যার প্রেক্ষিতেই ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে জনগনের সমষ্টি দ্বিগুন হয়ে গেছে।

ঘটনার শেষ এখানেই নয়; আরো অদ্ভূত বিষয় আছে। একই সময়ে আবার যখন আরেকটি জরিপ করা হলো ‘নাস্তিকতা’ বিষয়ে, সেখানেও দেখা গেল ৩১% জাপানি নিজেকে ‘নাস্তিক’ হিসেবে মতামত দিয়েছেন। আবার নাস্তিকতার পরিবর্তে ‘ধর্মের সাথে যুক্ত না’ এমন বিষয়ে জরিপ করা হলে সেখানেও ৫৭% লোক এই পক্ষে নিজের মত প্রদান করে।

“আমরা জানি ঈশ্বর নেই। কিন্তু জনগনের ঈশ্বরের প্রয়োজন আছে”। -ভলতেয়ার।

১.
জাপানে সম্প্রতি সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থার মাধ্যমে জাপানি অধিবাসীরা ‘কে কোন ধর্মে বিশ্বাসী’ তার উপর একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপের ফলাফল দেখা যায় যে, প্রায় ২০৯ মিলিয়ন লোক বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী; যা জাপানের মোট জনগনের প্রায় দ্বিগুন। বিষয়টা একইসাথে যেমন অদ্ভূত তেমনি অবিশ্বাস্য; অথচ মিথ্যা নয় মোটেও। সমস্যা আসলে কী?
অনুসন্ধিতসু ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, জাপানের আদি ধর্ম শিন্তো এবং পরবর্তিতে সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যপক বিস্তার হয়। খ্রীস্টান ধর্মসহ আরো অসংখ্য ধর্মের অনুসারীও সেখানে আছে, এমনকি ইহুদী –হিন্দু –মুসলমান ধর্মের অনুসারীও আছে; অনেকগুলো নতুন ধর্ম আছে এবং তাদেরও অনুসারী আছে। সেইক্ষেত্রে, এই অদ্ভুত ফলাফলের একটা অর্থ দাঁড়ায় এমন যে, জাপানি অধিবাসীরা নিশ্চয়ই খুবই ধার্মিক প্রকৃতির।
অথচ বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়। জাপানে একটা সাধারন বিষয় প্রচলিত আছে, “জাপানি লোকেরা জন্মগ্রহনের অনুষ্ঠান পালন করে শিন্তো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, বিয়ে করে খৃস্টীয় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এবং শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পালন করে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী”। এই যে একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ইভেন্টে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের রীতিগুলো (ritual) পালন করে, একে তারা কখনো সাংঘর্ষিক বিষয় মনে করে না; বরং সানন্দেই সবাই তা গ্রহন করে। উপরের জরিপের অদ্ভূত ফলাফলের মূল হেতুও এটা। কেননা গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে একই ব্যক্তি নিজেকে একাধিক ধর্মের অনুসারী হিসেবে মত দিয়েছে, কেননা বাস্তবেও সে একাধিক ধর্মের রীতিই পালন করে। যার প্রেক্ষিতেই ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে জনগনের সমষ্টি দ্বিগুন হয়ে গেছে।
ঘটনার শেষ এখানেই নয়; আরো অদ্ভূত বিষয় আছে। একই সময়ে আবার যখন আরেকটি জরিপ করা হলো ‘নাস্তিকতা’ বিষয়ে, সেখানেও দেখা গেল ৩১% জাপানি নিজেকে ‘নাস্তিক’ হিসেবে মতামত দিয়েছেন। আবার নাস্তিকতার পরিবর্তে ‘ধর্মের সাথে যুক্ত না’ এমন বিষয়ে জরিপ করা হলে সেখানেও ৫৭% লোক এই পক্ষে নিজের মত প্রদান করে।
জাপানের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টা আমাদের কাছে যতই অদ্ভূত ঠেকুক না কেন, তাদের কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক। জাপানের শিক্ষা, জাতীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের যে কাঠামো রয়েছে সেটাই আমাদের দৃষ্টিতে অদ্ভূত –কিম্ভূতকিমাকার বিষয়টিকে তারা বাস্তব ও স্বাভাবিক করে তুলেছে। জাপানে ধর্মের বিষয়টি নিছক বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের বিষয় নয়। এটা এমন একটা বিষয় যা তাদের জীবনে আবহমান কাল ধরে চলে আসা একটা সমন্বিত ঐতিহ্য ও প্রথার বিষয়। জাপানের সমাজ –সংস্কৃতি –জীবন যাপনের সাথে ধর্মগুলো এমনভাবে মিশে গেছে যে কেউ চাইলেই তাদের আলাদা করে দেখতে পারবে না।
একইসাথে পুঁজির সুষম বিকাশ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জন –নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়াদি সহ মৌলিক বিষয়গুলোর পর্যাপ্ততা ও সহজলভ্যতা তাদের এই সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতিকে বাস্তব করে তুলেছে বলেই তাদের পারলৌকিক বাস্তবতার প্রয়োজন পড়ে না।

২.
উপরে জাপানের যে চিত্র আমরা দেখলাম, সেটার সাথে আমাদের এখানকার অবস্থার যোজন –যোজন পার্থক্য। আমাদের এখানে মুসলিম –হিন্দু –বৌদ্ধ –খ্রীস্টান ইত্যকার ধর্মের মানুষের মধ্যে কোন ধরনের সর্বজনীন সামাজিক সম্পর্ক কখনো তৈরি হয় নি। এখানে ধর্মে বিশ্বাসী –অবিশ্বাসী এই রকম বিভাজনগুলো সমাজে এত বৈরী সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে খুন –হত্যা –ধর্ষন ইত্যাদি বিষয়গুলোও বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। সম্প্রদায়ে –সপ্রদায়ে যেমন দূরত্ব ও ঘৃণা বাড়ছে, তেমনি ধর্মকে কেন্দ্র করে পক্ষে –বিপক্ষে উগ্রতাও চরম আকার ধারন করছে। তারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে নানা শ্রেনী –পেশার মানুষ দিনে –রাতে, ঘরে –বাইরে সর্বত্র লাশে পরিনত হচ্ছে। আমাদের সর্বজনীন সংস্কৃতি ‘পহেলা বৈশাখ’ এর মত ইভেন্টগুলোকে সংকীর্ণ ধর্মীয় লেবাসে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। আর এই সুযোগে রাষ্ট্র তার স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি নীতির বাস্তবায়ন করে চলেছে।
আমাদের এখানে জাপানের মত যেমন কোন জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি তেমনি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের যে কাঠামো সেখানেও সম্প্রদায়ে –সম্প্রদায়ে, শ্রেনীতে –শ্রেনীতে ভিন্নতা আছে, বিদ্বেষ আছে, ঘৃণাবোধ আছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্র পরিচালক বেবী ইসলামের অভিজ্ঞতা থেকে এর একটা চিত্র পাওয়া যাবে।
তিনি স্মৃতিচারন করে বলেছিলেন, “১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দে কোলকাতা শহরে আমার মা ছিলেন কোলকাতা কর্পোরেশনের ফ্রি –প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষয়িত্রী। ভাড়াটে বাসায় আমি এবং মা বসবাস করতাম। বাসা বদলের জন্য নতুন বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা পাকাপাকি করে পরদিন গেলাম অগ্রিম টাকা নিয়ে এগ্রিমেন্ট করার জন্য, বাড়িওয়ালা যেই মাত্র শুনলেন আমার মার নাম মোতাহারুন নেসা, সেইমাত্র দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন, বললেন, “মাফ করবেন, আমি হিন্দু ছাড়া কাউকে ঘর ভাড়া দেব না”।
১৯৯৫ খ্রীস্টাব্দ। ঢাকা শহর। আমার সামনের বাড়ি খালি হলো। বাড়ির মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক –বৈজ্ঞানিক। আমার পরিচিত ভদ্রলোক ভাড়া নাবার জন্য আমার কাছে এলেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। কথা হলো, বাড়িওলা যখনই জানলেন ভদ্রলোক হিন্দু, কোন রকম দ্বিধা না করে বললেন, “আমি বুড়ো মানুষ নামাজ –রোজা করি, মাথার উপর হিন্দুকে ভাড়া দেব না।”
এরপর তিনিই বলছেন, “অর্থাৎ ১৯৩৫ –এ যা ছিলো, ১৯৯৫ –তেও তাই। সময় বদলেছে, স্থান বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি সম্প্রদায়ের প্রতি সম্প্রদায়ের ঘৃণা –বিদ্বেষ”।
এই অবস্থা এখনো পালটায় নি বরং বেড়েছে। আমরা যতই ডিগ্রিধারী হই না কেন, সাম্প্রদায়িকতার ঐ গণ্ডি থেকে এখনো বের হতে পারি নি। যেকারনে আমরা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখি সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে আবাসিক হল দিব্যি বহাল থাকে।
জাপানের মত পশ্চিমা দেশগুলোতেও ধর্মের ব্যাপারে এত উচ্চ –বাচ্চ দেখি না। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর ইতিহাস ও পদ্ধতি আলাদাভাবে এগিয়েছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ধর্ম যে বাস্তবতার কারনে গুরুত্বপূর্ণ ও মূখ্য হয়ে ওঠে, সেই বাস্তব শর্তগুলো অনেকটাই পূরন করেছে বলেই সেখানে জাতীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ নিজেদের মত করে তারা গড়ে তুলতে পেরেছে।

৩.
জাপানে শিন্তো –বৌদ্ধ –খ্রীস্টান ছাড়াও যেমন অন্যান্য ধর্মের লোক সম্মিলিতভাবে তাদের জাতীয় সংস্কৃতি পালন করে আমরা পারি না কেন? সেখানে একই লোক একাধিক ধর্মের রীতি পালন করে দিব্যি নিজেকে নাস্তিক বলতে পারে, আমরা পারি না কেন? আমরা জানি এইসব প্রশ্নের উত্তর জাপানে না খুঁজে বাংলাদেশেই খুঁজতে হবে। সেই কাজটাই সময়ের দাবি।
আমাদের কী করণীয় কিংবা কী করিলে কী হইবে সেই আলোচনায় আমরা যাচ্ছি না। জাপানের ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এই খতিয়ান কেন এতক্ষন দিলাম সেই ক্ষেত্রে কৈফিয়ত মোল্লা নাসিরুদ্দিনের মাধ্যমেই পেশ করলাম –
নাসিরুদ্দিন তার বাড়ির বাইরে বাগানে কী যেন খুঁজছে। তাই দেখে এক পড়শি জিজ্ঞেস করলে, ‘ও মোল্লাসাহেব, কী হারালে গো’?”
‘আমার চাবিটা’, বললে নাসিরুদ্দিন।
তাই শুনে লোকটিও বাগানে এসে চাবি খুঁজতে লাগলো। কিছুক্ষন খোঁজার পর সে জিজ্ঞেস করলে, ‘ঠিক কোনখানটায় ফেলেছিলে চাবিটা, মনে পড়ছে?
‘আমার ঘরে’।
‘সে কী! তাহলে এখানে খুঁজছো কেন’?
‘ঘরটা অন্ধকার’, বললে নাসিরুদ্দিন। ‘যেখানে খোঁজার সুবিধা সেইখানেই তো খুঁজবো’।

২ thoughts on “জাপানের ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসঃ আমরা কোথায়?

  1. জাপানের মত নেপালেও
    জাপানের মত নেপালেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও বৌদ্ধরা মিলে একই সাথে দুই ধর্মের রীতি পালন করে বলে জানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *