বাকৃবির একটি বাস্তব নির্মম চিত্র

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিশিক্ষার পীঠস্থান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) এক সময় সত্যিই শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যতম একটি কৃষি বিষয়ক জ্ঞান সম্বলিত বিশাল এক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছিলো। যে আকর্ষণের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা পড়ার জন্য পাড়ি জমাতো এই বাকৃবিতে। কিন্তু বর্তমানে সে গৌরব ধসে পড়তে পড়তে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। কী কারণ এর পেছনে? কারণ খুঁজতে গেলে পর্দার সামনের কিংবা পর্দার পেছনের অসংখ্য কারণ খুজে পাওয়া যায়।
তবে সব কারণ ছাপিয়ে এখন যে কারণটি সুস্পষ্টভাবে চোখে ধরা পড়ে তা হলো আবাসিক হলগুলোর অবস্থা। অবশ্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো মন্দ গুণ পরিমাপের অন্যতম একটি মাপকাঠি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল। কিন্তু বাকৃবির হলগুলো খুঁজে পাওয়া গেলো এক মধ্য যুগীয় বর্বরতার ছবি। মেয়েদের হলগুলোতে ঐ মাত্রার সমস্যা না থাকলেও ছেলেদের হলগুলো প্রতিনিয়ত ভাসতে থাকে সীমাহীন নির্যাতন আর নিপীড়নের মধ্য দিয়ে। আবাসিক হলের ছাত্রদের পুরো প্রথম বর্ষ বাধ্যতামূলক ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের মিটিং মিছিল এ থাকতে হয়। কেউ যদি বিন্দুমাত্র অনীহা প্রকাশ করলে তাকে হলের টর্চার সেলে ( গেস্ট রুম) নিয়ে নানাবিদ শাস্তি প্রদান করা হয়। এরকম শাস্তির স্বীকার হয়ে অনেক ছেলে বিকল্প রাস্তা দেখা শুরু করে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার রাস্তা খুজে। অনেকে আবার চলেও যায়। অনেকে মানসিক বিকৃতি নিয়ে পড়ে থাকে ক্যাম্পাসে। এরকম টর্চার সেলের অত্যাচারে মৃত্যর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে ক্যাম্পাসে। ২০১৪ সালে সাদ ইবনে মমতাজ নামে মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের এক ছাত্র মৃত্যুবরণ করে। শুধু যে এরকম র্যানডম নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ছাত্র লীগ টর্চার সেল ব্যবহার করে তা নয়, অনার্স প্রথম বর্ষের প্রতিটি দিন এই টর্চার সেলে মিটিং বসে। যেখানে ভয় ভীতি দেখিয়ে ছাত্র লীগ তাদের নিয়ন্ত্রণ মানতে বাধ্য করে।
প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, এরকম পরিস্থিতিতে হল প্রশাসন, অর্থাত হলের প্রভোস্ট, হাউজ টিউটরদের ভূমিকা কী? এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো আরো ভয়ংকর অবস্থা। হল প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই ঘটে এসব ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলো। হল প্রশাসন ব্যাপারটি নিয়ে বেশ সচেতনভাবে উদাসীন। অনেক প্রভোস্ট আবার বিষয়টি রাজনৈতিক বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবে হল প্রশাসনের মেরুদন্ডহীন ভূমিকায় ক্রমাগত বাড়ছে ছাত্র লীগের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। ব্যাহত হচ্ছে ছাত্রদের অ্যাকাডেমিক পড়াশুনা, ঘটছে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়।
হলগুলোর প্রতি ছাত্র লীগের এরকম লাগামহীন নিয়ন্ত্রণে হলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ একেবারেই অনুপস্থিত। অনেক আগেই আরেক ছাত্র সংগঠন ছাত্র দল ক্যাম্পাস ছাড়া। তবে প্রগতিশীল দুটি সংগঠন (ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন) হলেই অবস্থান করছিলো। কি অবস্থা এই সংগঠনদুটির?
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বাকৃবি শাখার এক নেতার ভাষ্যমতে ,“ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো একদল ফ্যাসিস্ট দস্যুর হাতে আত্মসমর্পন করেছে। এক কথায়, খুবই ভয়াবহ অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাম সংগঠনগুলো সব সময়ই এর প্রতিবাদ আসছিলো। ফলে হলগুলোতে এখন বাম রাজনীতি এক প্রকার নিষিদ্ধ বলা যায়। ছাত্রদের বাম সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা না বলার জন্য খুব রূঢ়ভাবে সচেতন করে দেয়া হয়।
সিটের রাজনীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দেখুন, আমরা সব সময়ই বেশ আন্তরিকভাবেই চাই সিট যেনো মেধা অনুযায়ী বণ্টিত হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা হয় না। এজন্য ২-৪ টা সিট আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বলতে হয় এটা ছাত্র ফ্রন্টের সিট। মাঝে মাঝে আমাদের এই সিট গুলো নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।”
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। মুক্তি আসবে কী??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *