প্রথা ভাঙ্গা মানেই সমাজ পরিবর্তন নয়

সংস্কৃতি কথাটি বার বার এসেছে,
সংঙ্গত প্রশ্ন -সংস্কৃতি বলতে কী
বোঝানো হচ্ছে?এর সংজ্ঞার্থই বা
কী?প্রাণিকুলের মধ্যে মানুষকেই
সবচেয়ে বেশি শিখতে হয়েছে।
প্রাচীন মানুষ অসহায় ছিলো,কারণ
পশুপাখি প্রকৃতি প্রদত্ত জৈবিক
শিক্ষা এমনিতেই পেয়ে থাকে।
কিন্তু মানুষ বেচেঁ থাকতে কিছু ভুল
করে শিখতে হয়েছে। এমনকি মানুষ
কিছু জিনিস নতুন করে শিখতে হয়।
যেমন-শৈশবে মানুষ খাবার গিলে
ফেলে,কিন্তু তাকে চিবিয়ে
খাবার খেতে শিখানো হয়।এছাড়া
আরো অনেক প্রকৃতি প্রদত্ত
আচরণকে কারো সাহায্য
পরিশীলিত করতে হয়েছে।
সংস্কৃতির সংজ্ঞার্থ দিতে গিয়ে
hutchinson encyclopedia(1989)তে এ
ধরনের বক্তব্য তুলে
ধরেছেন”সংস্কৃতি হচ্ছে এমন একটি
জীবনব্যবস্থা যা একদল লোকের
চিন্তা,বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার
প্রথা,পোশাক-পরিচ্ছেদ,
ভাষা,সংগীত ও সাহিত্য সাথে
অঙ্গীভূত “।
সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ও আমাদের
উল্টা পথে যাত্রা—————-
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো
আশেপাশের জগতকে জানতে
চেষ্টা করা।এ কারনে যে কোন
জনগোষ্ঠী নিজেদের বিচ্ছিন্ন
রাখতে পারে না।বিশেষকরে
আজকের দিনের যোগাযোগের এত
বৈচিত্র্যময় মাধ্যমে আছে
যে,বাস্তবে কোন জনগোষ্ঠী
বিচ্ছিন্ন নয়।পরস্পরের ধ্যান ধারনা
হাত-বধল হওয়াটা খুবই নৈমিত্তিক
ব্যাপার। এই হাত বধল প্রক্রিয়া
সংস্কৃতি নতুন প্রলক্ষণ সংযুক্ত
(acculturation)হয়,তেমনি পুরাতন
প্রলক্ষণ অবলুপ্তি ঘটে।বিষয়টি
বুঝার জন্য চীন থেকে
বাংলাদেশে আমদানিকৃত হ্যান্ড
ট্রাক্টর এর উদাররণ খুব প্রাসঙ্গিক।
এই ট্রাক্টর কৃষিক্ষেত্র জন্য আনা
হলেও বাংলাদেশের প্রায় অদক্ষ
কারিগর অল্প দিনে এই যন্ত্রটির
ভিন্ন চেহারায় ভিন্নক্ষেত্রে
ব্যবহার শুরু করে।সামান্য পরির্বতন
করে এই যন্ত্র কে নৌকা চালানোর
মেশিন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে,
গম,ধান ভাঙ্গানোর কল হিসাবে
ব্যবহৃত হচ্ছে।ইটভাঙ্গার কল
হিসাবে এর কার্যকারিতা
অসাধারণ। প্রকৃত যন্ত্রটির
পরিশীলিত ব্যবহারই হল আত্নীকরণ।
সংস্কৃতির প্রলক্ষণ হাত বধল হয়ে
থাকে একদল দেয়,আরেকদল নেয়।এই
আদান-প্রদানে একদল দেয়,যাকে
বলা হয় ‘দাতা সংস্কৃতি’।অন্যদিকে
যারা নেয় তাদের ‘গ্রহীতা
সংস্কৃতি’ বলে।
কিন্তু সংস্কৃতির এই আদান-প্রদান
আর অন্ধ অনুসরণ কোন ভাবেই এক
কাতারে ফেলা যায় না।আমাদের
দেশের কিছু ভন্ড প্রগতিশীল আছে
যারা এই আদান-প্রদান নামে
হলিউড থেকে নানা ধরনের অর্পিত
সংস্কৃতি আমদানি চেষ্টা করছে
যা কোন ভাবেই আমাদের দেশের
জনগোষ্ঠী সাথে যায় না।
সংস্কৃতির কোন খাবার কিংবা
ঔষধ নয় যে তাকে যেমন ইচ্ছা
তেমনিভাবে গিলানো যাবে।
সংস্কৃতির গ্রহন করার বিষয়। দীর্ঘ
দিনের শিক্ষা আচার-ব্যবহার
মাধ্যমে সংস্কৃতি গড়ে উঠে।আমার
শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন?আমার
সমাজ বাস্তবতা কেমন?তার দিকে
নজর না দিয়ে।কিছু প্রথা ভেঙ্গে
অর্ধশিক্ষিত মানুষ কে ক্ষিপ্ত করা
খুব সহজ কাজ।কিন্তু সমাজ
পরিবর্তন করা অনেক কঠিন কাজ।
দার্শনিক গ্রামসি বলেছেন
‘আমাদের লক্ষ সংস্কৃতি রাজনীতি
লক্ষ উপায়ের মাধ্যম মাত্র’।
আমাদের দেশে কেন মৌলবাদী
শক্তির উত্তান ঘটছে?তাদের
উত্তানের পেছনে কী প্রেক্ষাপট
তার আলোচনা না করে।খুব সহজে
বিপ্লবী বলে নিজেকে জাহির
করার উপায় হচ্ছে কিছু প্রথা
ভেঙ্গে নিজেকে আলোচনায় নিয়ে
আসা।এই লোকদের কে বুঝাবে কিছু
প্রথা ভাঙ্গা আর সংস্কৃতির
পরির্বতনের লড়াই এক জিনিস নয়।
আমরা যদি মূল বিষয়ে ফোকাস না
করে কিছু প্রথার পিছনে লেগে
থাকি তবে এই জনম তো দূরের কথা
আগামী সাত জনমেও সমাজ
পরির্বতন করা সম্ভব নয়।

৩ thoughts on “প্রথা ভাঙ্গা মানেই সমাজ পরিবর্তন নয়

  1. প্রথা ভাঙ্গাটা জরুরী,সবসময়ই
    প্রথা ভাঙ্গাটা জরুরী,সবসময়ই জরুরী।একসময়কার সতীদাহ প্রথা আরো দীর্ঘ সময় ধরে হয়তো চলতে থাকত যদি না মানুষ ক্ষিপ্ত হবে এই ভয়ে এই প্রথার বিরোধীতা না করা হত।প্রথা ভাঙ্গাকে সংষ্কৃতির বিপক্ষে দাড় করাবার কোন সুযোগ নেই। প্রথা যেমন সংষ্কৃতির অংশ, প্রথা ভাঙ্গাটাও সংষ্কৃতিরই অংশ।এই ভারতবর্ষে বহু আগে থেকেই প্রথাবিরোধীতা চলে আসছে।চার্বাক দর্শন,বিভিন্ন সময়ে প্রথাবিরোধী অবস্থান এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত;তাই এ অঞ্চলের প্রথাবিরোধীতা হলিউড বা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে আমদানীকৃতও না।আর বিদ্যমান সমাজব্যাবস্থার সাথে আপোষ করে কিংবা সমাজ ব্যাবস্থাকে হালকা বকে দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করার কাজকে বিপ্লব বলেনা। বিপ্লবকে আপোষমুখী করার আলাপ যারাই দেবে তখনই আসলে বোঝা জরুরী এরা বিপ্লবের নামে সুবিধাবাদীতার চর্চা করে এবং এদের উদ্দেশ্যটাও সেরকমই।

  2. প্রথা কে কখন সংস্কৃতির
    আপনার কথা অনুযায়ী রানি স্বামী মারা গেল, রানি পালিয়ে চলে গেল অমনি সতিদাহ প্রথা
    এ দেশ থেকে বিলুপ্তি হয়ে গেল!সতিদাহ বিলুপ্তি পেছনে ইতিহাস নিশ্চয় এমন নয়।
    সতিদাহ প্রথা দীর্ঘ দীনের সামাজিক আন্দোলনের ফলে ই এ দেশ থেকে
    বিলুপ্তি হয়েছে।
    হলিউড থেকে সংস্কৃতি আমদানি চেষ্টা হয়নি???
    জার্মানি বসে প্রকাশ্যে ঢাকায় চুমু দেওয়ার ইভেন্ট কারা খুলেছিল???
    বাদ বাকি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপার

    1. মানুষ ক্ষেপে যাবে – এটা ভেবে
      মানুষ ক্ষেপে যাবে – এটা ভেবে সতীদাহের ক্ষেত্রে প্রথাবিরোধীতা থেমে থাকেনি এবং যারা এই প্রথাবিরোধী ছিল তারা সমাজের প্রতিকূলে দাড়িয়েই প্রথাবিরোধীতা করে গেছেন;দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলনটাও সমাজের সাথে আপোষ করে হয়নি কখনো। কে জার্মান বসে একটা ইভেন্ট খুলে বসল আর আমাদের এতদিনের প্রথাবিরোধীতার সংষ্কৃতি পশ্চিমাদের নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে গেল এবং আমরা প্রথাবিরোধীতার সংষ্কৃতির আমদানীকারক হয়ে গেলাম?মূলত আমাদের সংকটের জায়গাটাই এটা, আমরা আমাদের নিজস্বতা নিয়ে ভাবি না; নিজস্বতাটাকে মনে মনে কোনভাবে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিজেদের আমদানীকারক ভেবে সেটার পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলে সুখ লাভ করি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *