সালাফি সংগঠন আইএসআইএস ও তার আদর্শিক অবস্থান

বর্তমান আইএস সৃষ্টি ও শক্তি বৃদ্ধির পেছনে ৯/১১ কে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ, সিরিয়ায় আসাদ এর স্বৈরাচারী নীতি ও আসাদ বিরোধী বিদ্রোহসহ অনেকগুলো বিষয় কাজ করেছে। পশ্চিমা মদদ, মধ্যপাশ্চ্যের অস্থিরতায় এসব জঙ্গি-গোষ্ঠী তৈরিতে সহায়ক হলেও তাদের যে রাজনৈতিক দর্শন আছে সেটি ভুলে গেলে চলবে নাহ। জঙ্গিবাদ ইস্যুতে পৃথিবীর মুসলিম সমাজ সাধারণ যে কথাগুলো শেখানো বুলির মতন উচ্চারণ করে তৃপ্তি লাভ করেন তার মধ্যে অন্যতম; জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই এবং মুসলিমদের দুর্নাম করার মানসে জঙ্গিবাদ পশ্চিমাদের সৃষ্টি। প্রতিটি জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন রাষ্ট্র মদদ ও ব্যবসায়ীদের অনুদান থাকে। অর্থ নৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোন আদর্শও প্রচার পায় না। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে ধনী জঙ্গি সংগঠনটির নাম-আইএসআইএস (ISIS or ISIL)।

নোয়াম চমস্কি কিছুদিন আগের একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাষায় বলেছেন-সৌদি আরব সারা পৃথিবীতে উগ্রবাদ রপ্তানি করছে। সৌদি আরব একটি ওহাবী রাষ্ট্র। ওহাবীপন্থী কিংবা সালাফিপন্থীরা নিজেদের বাহিরে অন্যদের মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করে না। বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে রক্তাক্ত ইতিহাস আছে। আমরা সবাই জানি, নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর আত্মীয়তার চাদরে মূলত আরবের গোত্র দ্বন্দ্বই মাথা চাঙ্গা দিয়ে উঠে। আলী ছিলেন প্রথম পুরুষ মুসলিম, নবী-খাদিজার ঘনিষ্ঠ ও হাশেমি বংশের প্রতিনিধি। তৎকালীন সময়ে হাশেমি বংশ অন্যদের সাথে পেরে উঠে নাই। নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর ২৫ বছর পর আলী যখন ক্ষমতায় আরোহণ করেন সেই আরোহণ তাঁর সুখের ছিল না। যাই হোক, মুহাম্মদের হাশেমি বংশধররা আবারো পরাজিত হলো সৌদ পরিবারের কাছে। হাশেমি বংশধরদের পরাজিত করেই সৃষ্টি হয় বর্তমান সৌদি আরব। তেল আবিষ্কারের পূর্বে মুসলিম বিশ্বের সৌদি আরবের তেমন কোন ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু তেল আবিষ্কারের সাথে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। হজ্জ ব্যবসা ও তেল বিক্রির পয়সা তারা মুসলিম বিশ্বের মোড়ল হয়ে বসে। প্রচার করতে থাকে তাদের ওহাবি/সালাফি মতবাদ।

আইএস যেভাবে হাজির হয়:

ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রধান হলেন আবু বকর আল-বাগদাদী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী ইতিহাসে থেকে পাশ করা উচ্চ ডিগ্রিধারী আবু বকরের সাথে আল-কায়দার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০০৫-২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়ার সময় তিনি বিচারকদের নিউইয়র্কে আবার দেখা হবে বলে হুমকি দেন। ২০১০ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবু বকরকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং তার সন্ধান কিংবা তথ্যদাতার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। বাংলাদেশের জঙ্গিদের মতাদর্শ প্রচার কিংবা কর্মী সংগ্রহের ভাল একটি জায়গা যেমন জেল খানা তেমনি বাদদাদী জেল খানা বন্দি অবস্থায় কর্মী সংগ্রহ করেন।

অনেকদিন আত্মগোপনে থাকার পর. ২০১৪ সালে সশরীরে ইরাকের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র আইএস এর দখলকৃত ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের আল-নুরি মসজিদে রমজানের প্রথম দিন (শুক্রবার) হাজির হয়ে আবু বকর বললেন- ‘দীর্ঘদিনের ধর্মযুদ্ধ এবং প্রতীক্ষার পর আল্লাহ মুজাহিদিনদের জয়ী করেছেন… যোদ্ধারা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে এবং খলিফার হাতে রাষ্ট্রকে সমর্পণ করেছে’। আইএসআইএস কর্তৃক রমজানের প্রথমদিন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণার ঠিক পাঁচ দিন পর বাগদাদী নিজেকে আইএস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের খলিফা দাবী করে বিশ্বব্যাপী জিহাদের আহবান জানিয়ে বলেন– “এই মহান রমজান মাসের ডাক শোনো, হে আল্লাহর বান্দারা! যুদ্ধ শুধু করো। এই সেই মাস যে মাসে রসুল (স:) তার সেনাবাহিনীকে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে বলেছিলেন, যে মাসে তিনি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন বহুশ্বেরবাদীদের বিরুদ্ধে। আল্লাহকে ভয় করো, হে আল্লাহর বান্দারা!” তিনি নিজেকে নবীর ইসলামের স্বঘোষিত খলিফা ও ইসলাম ধর্মের শেষ নবী মুহাম্মদের বংশধর বলে নিজেকে দাবী করেন এবং সকল মুসলমানকে তাকে অনুসরণ করার আহবান জানান।

আইএস-এ যোগ দিচ্ছে যারা:

আইএস-এ কারা যোগ নিচ্ছে তার জন্যে আমরা আইএস-এর সদস্যে আবু আহমেদ (ছদ্ম নাম) এর বক্তব্য তুলে ধরতে পারি। তার জবানবন্দিতে জানা যায় কীভাবে আইএস সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে অস্ত্রভাণ্ডার (রাসায়নিক অস্ত্রসহ) দখল করেছে, জিহাদি কর্মীরা কীভাবে আইএস-যোগ দিয়েছে। আবু আহমেদ বলছেন; কিছু বিদেশী যোদ্ধা আসলে ধর্মোন্মাদ। বেশিরভাগই মরক্কো বংশোদ্ভূত বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডের উ-শৃঙ্খল যুবক। ইসলাম সম্পর্কে তাদের কাছে কোন ধারনাই নাই। না পারে ঠিকমত পড়তে কোরআন, না পারে নামাজ। এরা ইউরোপে বেশিরভাগই ছিল কর্মহীন, পারিবারিক বন্ধনহীন। ইউরোপের মূলধারার শিক্ষা এদের মাঝে নেই। বাস করত শহরের অনুন্নত বস্তি এলাকায়, হয়ত বেঁচে ছিল কোনক্রমে সোশ্যাল বেনিফিটের টাকায় আর এদের প্রায় সবাই ছোটখাটো ক্রাইমে আগে থেকেই যুক্ত ছিল। এইসব ধর্মোন্মাদদের মধ্যে কোন ধর্মেরই জ্ঞান নেই। জীবনে কোরআনের একটা আয়াত পড়েছে কিনা সন্দেহ। ইউরোপের সালাফি মসজিদে ওয়াহাবি ইমামের বয়ান শুনে হঠাৎ করে তাদের মনে জ্বলে উঠেছে দোজখের আগুন। ইউরোপের শুঁড়িখানায় আর ডিসকোতে কাটানো উচ্ছন্নে যাওয়া এইসব যুবকদের জন্য সিরিয়ার যুদ্ধ হল রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনী অথবা পাপে ডুবে যাওয়া জীবনে অনুশোচনা করার সহজ মাধ্যম। কিন্তু কিছু কিছু বিদেশী যোদ্ধা আছে যারা ইউরোপে প্রকৃত অর্থেই ধর্মীয় আদর্শে জীবনযাপন করত এবং তারা সত্যিকার জিহাদের ডাকে সাড়া দিতেই সিরিয়াতে পাড়ি জমিয়েছে।

আইএসআইএস যে কারণে কালো পতাকা ব্যবহার করে:

নবী মুহাম্মদ বিশেষভাবে কোন রঙ্গের পতাকা ব্যবহার করে নাই। কয়েক রঙ্গের পতাকা তিনি তার সময় ব্যবহার করেছিলেন। তাহলে প্রশ্ন আসে বর্তমানে জিহাদিরা কেন কালো পতাকা ব্যবহার করছে। কালো রঙটি বিশেষ করে শিয়াদের রঙ হিসেবে অনেকে বুঝে থাকেন। তাহলে কেন এই সুন্নি সালাফি জঙ্গি গোষ্ঠীরা এই রঙ বেঁছে নিয়েছে, এর জন্যে আমাদের ফিরে যেতে হবে আব্বাসিয় সময়টিতে। কারণ এই ইতিহাস লুকিয়ে আছে আব্বাসিয় সময়ে সৃষ্টি হওয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় ভবিষ্যতবাণী ও বিশ্বাসে।

উমাইয়াদের সময়ে মুসলমানদের একাংশের মধ্যে ইমাম মাহাদী-সংক্রান্ত বিশ্বাস প্রথম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠে। মুহাম্মদ আল হানাফিয়ার অনুসারী অর্থাৎ কায়সানিয়া শিয়াদের মধ্যে। উমাইয়াদের হাতে নবী পরিবারের ৭২ জন সদস্য খুন হওয়ার পর, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল নারী ও শিশু; উমাইয়া খলিফাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও বারবার বিদ্রোহের ব্যর্থতা পর, ইমাম মাহাদী সংক্রান্ত বিশ্বাস তাদের মনোবল ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা বাঁচিয়ে রেখেছিল। তাদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় যে, মুহাম্মদের পরিবার থেকেই মুহাম্মদ নামেই একজনের আর্বিভাব ঘটবে, যিনি মুহাম্মদের পরিবার, ইসলাম ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে এই ধরণের হাদিস স্থান পেয়েছে। শেষ জমানার বিশ্বাস ও মাহাদীবাদ-ই ছিল আব্বাসিয়া বিপ্লবের অন্যতম অনুষঙ্গ। আব্বাসিয়াদের কালো পতাকার আগম ঘটে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ রমজান। নবী পরিবারভুক্ত ইমামদের স্মরণে শোকের প্রতীক হিসেবে আব্বাসিয়ারা কালো পতাকা উত্তোলন করেন।

খোরাসানের কালো পতাকা ও মাহাদী সংক্রান্ত ধারণাগুলো আব্বাসীয় সময়ে সৃষ্ট। আব্বাসিয়দের বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল খোরাসানে আবু মুসলিম খোরাসানির নেতৃত্বে কালো পতাকা উড়িয়ে। উমাইয়াদের হাতে নিহত ইমামদের প্রতি শোক প্রকাশের জন্যে তারা কালো পতাকার ব্যবহার করে। সুন্নিদের বিভিন্ন হাদিসে এমন কিছু হাদিস পাওয়া যায় যেখানে বলা হয়েছে, খোরাসান থেকে যারা কালো পতাকা উড়িয়ে আসবে, তোমরা তাদের কাছে যাবে, কারণ তাদের মধ্যেই আছে আল্লাহর খলিফা, তখন হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাদের কাছে যাবে (বায়াত দেওয়ার জন্যে)।যদিও এসব হাদিসকে আব্বাসীয় প্রোপাগান্ডা বলে অনেকেই দাবী করে আসছেন। বর্তমানে খোরাসানের কালো পতাকা ও ইমাম মাহাদির ধারণা নতুন করে জনপ্রিয়তা পায় সালাফি জিহাদিদের মাঝে।আব্বাসিয়া আমলে খোরাসান ছিল বর্তমান আফগানিস্তান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অংশ জুড়ে একটি প্রদেশ। এই যুগের সালাফি জিহাদিরা আফগানিস্তানের তালেবানের কালো পতাকাকেই সেই সব হাদিসের ভবিষ্যতবাণী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। তালেবানদের সরকারী পতাকা ছিল সাদা এবং সামরিক পতাকা কালো। আল-কায়দা, বোকা হারাম, আইএসসহ অন্যরা যে কালো পতাকা ব্যবহার করে তার শিকড় লুকিয়ে আছে আব্বাসিয়দের এই কালো পতাকা ও ইমাম মাহাদি সংক্রান্ত হাদিসের মধ্যে।

কেন ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করা হচ্ছে?

সিরিয়ার ঐতিহাসিক পালমিরা নগরী আইএসের দখল করে তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমরা আফগানিস্তানের আল-কায়দার বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংসের কথা স্মরণ রাখতে পারি। তাদের আদর্শ হল; বিধর্মীদের এমন কোন কিছু রাখা যাবে না যা মুসলমানের মনে শিরকের জন্ম দেয় ফলে এসব ওহাবী সালাফিদের হাতে কোন ঐতিহাসিক স্থাপনাও নিরাপদ নয়। ওহাবী/সালাফি মতবাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে সৌদি আরব। এই রাজবংশের হাতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের যেসব স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়েছে তার মধ্যে নবী মুহাম্মদের চাচা হামজার কবর, কন্যা ফাতিমার মসজিদ, মুহাম্মদের স্ত্রী খাদিজার বসতভিটা, মুহাম্মদের মদিনার বসতভিটা, মুহাম্মদের তৈরি করা প্রথম বিদ্যালয়, তার মা আমিনার কবর, আলীর বসতভিটা, সাহাবি সালমান আল ফারসির মসজিদ অন্যতম। শিরকের জন্ম দিতে পারে এই ফতোয়া দিয়ে এসব ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্ন ধ্বংস করা হয়েছে। শিরকের নামে এগুলো ধ্বংস শুরু হলেও বর্তমানে এরকম আরো স্থাপনা ধ্বংস করা হচ্ছে শুধু হজ্জ ব্যবসাকে মাথায় রেখে। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করে নির্মাণ করা হচ্ছে হাজীদের জন্যে হোটেল। নবী মুহাম্মদের করব রাখার পক্ষেও ওহাবীরা নয়। তারা বলে-ইসলাম বলেছে কবরের কোন চিহ্ন থাকবে না। আর এই কারণে ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে ওহাবী সেনাবাহিনী মদিনায় হামলা চালিয়ে নবীর পরিবার সদস্যদের ও অনেক সাহাবীর কবর গুড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তারা যখন নবীর কবর ভাঙ্গার উদ্যোগ নেয় তখন বিশ্বের মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখে এই কবর ভাঙা তারা ক্ষান্ত দেয়। ওহাবী/সালাফিরা বলে-ইসলাম অনুসারে কবরের কোন চিহ্ন থাকবে না। সুতরাং সকল কবরের চিহ্ন গুড়িয়ে দিতে হবে।

আইএসআইএস কিংবা সালাফিদের আদর্শিকগুরু কারা?

আইএসআইএস কিংবা সালাফি, ওহাবরা চিরকুমার থাকা ইবনে তাইমিয়াকে প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে গণ্য করেন। তবে সালাফি কিংবা ওহাবী মতবাদের জনক কিংবা স্রষ্টা ইবনে তাইমিয়া নন। তারপরও তিনি তাদের কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগুরু হিসেবে বিবেচিত। কারণ তারা তাদের কাজের বৈধতার ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়ার বয়ান তুলে ধরে। জামাতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ‘শিবির’ ইবনে তাইমিয়াকেও বিশেষ সম্মান করে থাকেন। তাদের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে শিবিরের কর্মীদের জন্যে তায়মিয়ার জীবনী দেওয়া আছে। আইএস অন্ধভাবে ইবনে তায়মিয়ার চিন্তাভাবনাকে ফলো করে।

ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে ইসলামে অনেক বিতর্ক আছে। এমনকি তাকে তার সময়ে অন্য ইসলামিকরা নাস্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতবাদ ও বিভিন্ন ফতোয়ার জন্যে তৎকালীন মুসলিমরা তার ফতোয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এবং শাসকরা তাকে গ্রেফতার করে। যেমন- ইবনে তাইমিয়া দামেস্কে বসে একটি ফতোয়ার মাধ্যমে ঘোষণা দেন যে, কেউ যদি নবী মুহাম্মদের রওজা শরীফ জিয়ারত করার উপলক্ষে সফর সূচী গ্রহণ করল সে যেন একটি বড় পাপে লিপ্ত হল। পাপ কাজের সফরে নামাজ কসর করতে হবে না। ইবনে তায়মিয়া তার ফতোয়া খানাতে এই কথাও উল্লেখ করে যে, যারা বলে মহান প্রিয় নবীর রওজা শরীফে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন লক্ষ্য লক্ষ্য ফেরেশতা রওজা শরীফ জিয়ারত করছেন, তারা মিথ্যা বলে । আর যদি উহা সত্য হয় তবে ফেরেশতাগণও পাপ কার্যে লিপ্ত হচ্ছে।

তেরো শতকে মুসলিম দুনিয়ায় জন্ম নেওয়া সুন্নি হাম্মলি মাজহাবন্থী ইবনে তাইমিয়া ছিলে কট্টরপন্থী একজন ধার্মিক। ব্লসফেমি অথাৎ নবী অপমানে সুন্নি চার মাজহারের মধ্যেও তফাৎ আছে। লঘু শাস্তি থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিভিন্ন রকম শান্তির কথা বলা আছে। আবার ইসলাম গ্রহণ করলে শাস্তি মওকুফের সুযোগও আছে। কিন্তু তাইমিয়া মতামত দেন, নবী অবমাননা করলে ইসলাম গ্রহণ করলেও সাজা মওকুফের কোন সুযোগ নাই, মৃত্যুই একমাত্র শাস্তি। যেমনটা আমাদের হেফাজতে ইসলাম থেকে শুরু করে জিহাদি জঙ্গি সংস্থাগুলো বলে থাকে। ইবনে তাইমিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর জেল খানায় বসে লেখেন- মহানবীর অবমানকারীদের বিরুদ্ধে উত্থিল তলোয়ার। কথাটা ভুল হবে না, বাংলাদেশে নবী অবমাননার শাস্তি কী এই বিষয়ে যে বইগুলো দেখতে পাওয়া যায় বেশির ভাগ বইতে তাইমিয়ার স্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়।

তাইমিয়া কোরান-হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা দান করেন। সালাফিরাও আক্ষরিক ব্যাখ্যাকেই অনুসরণ করে। সালাফ শব্দের অর্থ পূর্বপুরুষ। সালাফি ইসলাম মানে পূর্ব-পুরুষের ইসলাম। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম যে ধরনের জীবন যাপন করেছে যে ধরনের আইনে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে সেই যুগে ফিরে যাওয়াই সালাফিবাদ। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম যা করে নাই তা করাকে বিদআত হিসেবে ঘোষণা করেন তায়মিয়া। যেমন-বাংলাদেশে নবী মুহাম্মদের জন্মদিন ঈদে মিলাদুননবী সৌদিসহ ওহাবী সালাফিরা উদযাপন করে না। বরং সৌদি গ্যান্ড মুফতি এটিকে হারাম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তেমনি সালাফি, ওহাবরা সুফি ইসলামকে বিকৃত ও অনৈসলাম হিসেবে গণ্য করে। তাইমিয়া জীবিত অবস্থায় তার বিতর্কের অন্যতম টার্গেট ছিল সুফিবাদরা। ইবনে তায়মিয়া শুধু এগুলো বলেই থেমে থাকেননি, যারা তার মতো শরীয়তি ইসলাম ফলো করে না তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ফতোয়া দেন। জিহাদ সম্পর্কে তিনি লেখেন-একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই একজন মানুষ ইহকাল ও পরকালে সুখী হতে পারে। জিহাদ ত্যাগ করা মানে ইহকাল পরকাল দুটাই ত্যাগ করা। শিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সুফিবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে শুরু করে অশরিয়াপন্থীদের বিরুদ্ধে যারা আজ যুদ্ধ করছে তারা সবাই তাইমিয়ার ফতোয়ায় প্রভাবিত।

তবে সালাফিবাদীরা ইবনে তাইমিয়ার পাশাপাশি ইমাম হাম্বলকেও নিজেদের অন্যতম গুরু মানেন। ইমাম হাম্বলের লিখিত হাদিস সংকলনের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার। তিনি কোরানের বাহিরে একমাত্র হাদিসকেই আইনের উৎস হিসেবে গণ্য করতেন। সুন্নি চার মাজহারের মধ্যে হাম্বলিবাদীরাই সবচেয়ে কট্টরপন্থী।

ইবনে তাইমিয়া ও ইমাম হাম্বল সালাফিদের প্রধানগুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে সালাফিবাদের জনক হলেন ইবনে আবদুল ওয়াহাব। ওয়াহাব এর মতবাদ সৌদির রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ প্রচারে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ওয়াহাব তাইমিয়ার মতবাদে প্রভাবিত হয়েই সালাফি ধারণার জন্ম দেন। ওয়াহাব-এর অনুসারীরা সালাফি ও ওয়াহাবী নামে পরিচিত। সালাফিবাদ/ওয়াহাবীবাদ একটি আধুনিক ধারণা। ১৯৬০ এর দশক পরবর্তী আন্দোলনের সমন্বয় বলে উল্লেখ করা হয়। সালাফিবাদে ইসলামের আক্ষরিক, কঠোর ও বিশুদ্ধ চর্চা এবং বিশেষত সালাফ তথা ইসলামের প্রথম যুগের চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। সালাফিবাদ অন্যতম প্রভাবশালী ও দ্রুত বর্ধনশীল ইসলামি মতাদর্শ। এর মূল কারণ সৌদির পৃষ্ঠপোষকতা।২০১৫ সালে জার্মানির বন শহরে ইসলামি উগ্রপন্থীরা প্রায় ৩০ জন পুলিশ কর্মীকে আহত করেছে৷ তারা সালাফি গোষ্ঠীর সদস্য বলেই সন্দেহ করা হচ্ছে৷ শুধু জার্মানিতে নয় সারা পৃথিবীতেই সালাফিরা শক্তিশালী হচ্ছে সৌদি ও তার সহযোগীদের সহায়তায়।সুতরাং বিষয়টি স্পষ্টত বর্তমান বিশ্বে যে ইসলামিক উগ্রবাদের প্রসার তার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরবের মতন রাষ্ট্রগুলো, যে রাষ্ট্রগুলো আদর্শিকভাবে সালাফিবাদের জনক ইবনে আবদুল ওয়াহাব এর অনুসারী।

ইয়াজিদ নারীদের উপর কেন এতো নৃশংসতা করছে আইএসআইএস:

সিরিয়ায় যে জাতিটি আইএআ্‌এস এর গণহত্যার শিকার ও যে সম্প্রদায়ের নারীরা জিহাদিদের যৌন দাসীতে পরিণত হয়েছে সেই সম্প্রদায়টির নাম-ইয়াজিদ। সিরিয়ায় খ্রিস্টান, শিয়া থেকে শুরু করে অনেক ধরণের সম্প্রদায় থাকার পরও শুধু কেন ইয়াজিদ সম্প্রদায় জিহাদিদের বিশেষ টার্গেটে পরিণত হল সেই প্রশ্ন এসেই যায়।

ইয়াজিদ শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ইজিদিস থেকে। যার অর্থ ঈশ্বরের পূজারি। ইয়াজিদির ধর্ম পৃথিবীতে অ-আব্রাহামিক ধর্ম বলে পরিচিত। ইয়াজিদি সম্প্রদায় একই সঙ্গে আলো ও অন্ধকারের পূজা করে। তবে বিশেষভাবে সূর্যের উপাসনা করা তাদের ধর্মের অন্যতম অনুষঙ্গ। তাদের মধ্যে পশু কুরবানি ও লিঙ্গ খৎনা করার প্রথাও প্রচলিত। জন্মগ্রহণ ছাড়া এই ধর্মের মানুষ হওয়া যায় না। অন্য ধর্ম গ্রহণ করাও নিষেধ। ইয়াজিদিরা ইয়াজদানকে তাদের প্রভু বলে বিশ্বাস করে। তবে সরাসরি সেই প্রভুর প্রার্থনা করা যায় না। ইয়াজদানের সাতজন দেবতা। এদের মধ্যে সবচেয়ে মহান হচ্ছেন ময়ূর-দেবতা। ময়ূর-দেবতা ইয়াজিদিদের কাছে মালেক তাউস নামে পরিচিত। সারা পৃথিবীতে ইয়াজিদি ধর্মবিশ্বাসের প্রায় সাত লাখ মানুষ রয়েছে। তবে এদের সিংহভাগের বসবাস উত্তর ইরাকে। ঐতিহাসিকভাবে জরস্ত্রিয়ান, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের কাছে অগ্রহণযোগ্য ইয়াজিদিরা নৃতাত্ত্বিক-ভাবে ইরাকের কুর্দিশ সম্প্রদায়ভুক্ত। বহুবছর ধরে চাপ, নিপীড়ন ও হুমকির মধ্যে তারা সিনজার পর্বতের আশপাশে বাস করে আসছেন। ১৮ ও ১৯ শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীনে ইয়াজিদিরা অন্তত ৭২ বার হামলা ও গণহত্যার শিকার হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় ইরাকের আত্মঘাতী হামলার মূল টার্গেট ছিল ইয়াজিদিরা। ইয়াজিদিরা আইএসের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কারণ তাদের ধর্মবিশ্বাস।

মুসলিম খলিফার অধীনে অমুসলিমদের বসবাস করার কয়েকটা স্ট্যাটাস আছে তার মধ্যে একটি ধিম্মি ক্যাটাগরি। এছাড়া অমুসলিমরা জিজিয়া কর প্রদান করে নিজেদের ধর্ম পালন করার সুযোগ আছে। তবে মুসলিম সাম্রাজ্যের অধীনে অমুসলিমদের বসবাস কিংবা ধর্ম পালনের অধিকারটি যতোটা না ধর্মীয় তার থেকে বড় ছিল রাজনৈতিক। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খলিফার অধীনে বিভিন্নভাবে অমুসলিমরা বসবাস করে আসছে। যেমন ধিম্মি ক্যাটাগরিতে খ্রিস্টান, ইহুদিরা পড়ে। আইএস তার পত্রিকা দাবিক-এ বলেছে ইয়াজিদদের মুশরিক (পৌত্তলিক) ক্যাটাগরিতে পড়ে। মুশরিক যেহেতু ধিম্মি ক্যাটাগরিতে পড়ে না সুতরাং তাদের পুরুষদের হত্যা ও নারীদের যৌন দাসীতে পরিণত করা ইসলাম সম্মত হিসেবে মত দেয় আইএস পণ্ডিতরা। আইএস যদি ইয়াজিদদের মুরতাদ ক্যাটাগরিতেও ফেলত, তাহলেও সম্ভবত তারা যৌন দাসী হওয়া থেকে মুক্তি পেত না। কারণ আইএস স্বীকার করেছে যে, মুরতাদ নারীদের দাস বানানো যায় না তবে ইবনে তায়মিয়ার মতামত উল্লেখ করে বলেছে-সাহাবিরা মুরতাদ নারীদের যৌন দাসী বানিয়েছে এমন প্রমাণ আছে। আর যেসব ইয়াজিদ নারী জিহাদিদের যৌন দাসীতে সম্মত হয়নি তাদের হত্যা কিংবা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে আইএস এর জিহাদিরা।

সালাফিদের ইদের জামাত নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে:

২০১৫ সালে ইরাকের মসুল শহরের মুসলমানরা ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন না মুসল্লিরা। ইসলামিক স্টেট (আইএস) ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর মূল কারণ পূর্বেই উল্লেখ করেছি- সালাফি সংগঠনটি ইসলামের তিন প্রজন্মের ইসলামের যুগে ফিরে যেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ইসলামের তিন প্রজন্ম যা করে নাই মুসলমানদের তা করা উচিত নয়। তাই তারা স্পষ্টভাষায় বলেছে-নবী মুহাম্মদের সময় ঈদের জামাত বলে কোন কিছুই হতো না। মূল ইসলাম ধর্মে ‘ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম নেই’ এবং ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদের নামাজ পড়তেন না’ তাই কেউ ঈদের জামাত পড়লে তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। তবে মুহাম্মদ ইদের নামাজ পড়েছেন এমন হাদিস আছে। তবে ব্যাপার হল, জিহাদ অবস্থায়, অথবা যখন কোন খিলাফত থাকেনা সেই অবস্থায়, দেশে ইসলামি শাসনহীন অবস্থায় ইদের নামাজ পড়া হয়না। যেমন ফারাজি আন্দোলন ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনে ইদের নামাজ পড়া যাবে না। আর আইসিস খুব সম্ভবত যুদ্ধাবস্থার কারণে ইদের নামাজের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেমনটি ফারাজিরা ব্রিটিশ আমলে ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনে ইদের নামাজ পড়া যাবে না।

আইএসআইএস-এর কাবা ভাঙা প্রসঙ্গ:

কিছু গণমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশ করে যে, আইএস কাবা ভাঙতে চাচ্ছে। যদিও তারা সূত্র হিসেবে বলছে আইএস সদস্য আবু তুরাব আল মুগাদ্দাসি বলেন যে, তাঁরা মক্কার কাবা ধ্বংস করবে: “আল্লা চাহে তো, আমরা মক্কার সেইসব পাথর (আসওয়াদ) পুজারীকে হত্যা করব এবং কাবা ধ্বংস করব। লোকেরা মক্কায় যায় পাথরগুলো স্পর্শ করতে, আল্লাহ্‌র জন্য নয়।” তবে কোন অথেনটিক সোর্স তারা উল্লেখ করেনি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ কা’বা ভাঙতে যাবে এমনটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে ওহাবী সেনাবাহিনী মদিনায় হামলা চালিয়ে নবীর পরিবার সদস্যদের ও অনেক সাহাবীর কবর গুড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তারা যখন নবীর কবর ভাঙ্গার উদ্যোগ নেয় তখন বিশ্বের মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখে এই কবর ভাঙা তারা ক্ষান্ত দেয়। আইএস এর মুখপত্র দাবিক পত্রিকায় আইএস কাবা ভাঙার কোন ইচ্ছার কথা তারা উল্লেখ করে নাই। তবে এমন কিছু নিউজ মাঝে মধ্যে দেখা যায় আইএস কা’বা ভাঙতে চাচ্ছে তবে বিশ্বাসযোগ্য কোন সূত্র এখনো এমনটি দাবী করেনি। তবে হ্যাঁ, সালাফিরা কট্টর মাজার ও পূজা বিরোধী। পূর্বেই উল্লেখ করেছি তারা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মে ফিরে যেতে চাচ্ছে তাই প্রথম তিন প্রজন্ম যা করেনি সেসব কর্মকে তারা বিদআত বলে গণ্য করে। যেমন সালাফিরা ফলো করে- “কেউ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ দেখলে নিজের শক্তি প্রয়োগ করে তা বদলে দিতে হবে। যে এভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না, বাকশক্তি প্রয়োগ করে তাকে এর বিরোধিতা ও সংস্কার সাধন করতে হবে। আর যে তাও পারবে না সে নিজের মনের মধ্যে এর প্রতি বিরোধিতা ও ঘৃণা পুষে রাখবে। আর এটা হচ্ছে দুর্বলতম ঈমান।” অনেক সময় বলা হয়, কা’বায় মানুষ আল্লাহকে নয় বরং পাথরে চুমু খেতে যায়। এই ক্ষেত্রে সালাফিরা এই চুমু খাওয়াতে কিছু সংস্কার করলেও করতে পারে তবে বর্তমান কা’বা ভাঙা একটা ভ্রান্ত ধারণা কারণ। বর্তমানে হজ্জ সৌদির সবচেয়ে বড় ব্যবসা। এই বছর সৌদি সরকার তেল থেকে হজ্ব ব্যবসার নীতিতে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। তাই যে কেউ কা’বা দখল করলে কাবা ধ্বংসের কোন সুযোগ নেই। হয়তো সংস্কারের একটা রীতি-নীতি তৈরি হবে। যেমন-সৌদি পুলিশ নবী মুহাম্মদের কবরের সামনে কেউ হাত তুলে কিছু চাওয়া মাত্র নাকি বেত দিয়ে হাত উপরে তোলার নির্দেশ দেয়। কারণ চাইতে হবে আল্লাহ কাছে, নবীর কাছে কিংবা নবীর কবরে কাছে নয়। সুতরাং কাবা ভাঙ্গার প্রসঙ্গটি অযৌক্তিক, বরং হজ্জ পালনের সময় কিছু রীতি-নীতির কিছুটা সংস্কারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

পরিশেষে বলা যায় আইএস আসলে এক প্রকাশ ধর্মযুদ্ধেই লিপ্ত হয়েছে। যেখানে তারা নিজেদের ছাড়া বাকি দুয়াকে কাফের, মুরতাদ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং নিজেদের মতকেই একমাত্র সত্য মত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আইএস পশ্চিমা মদদে সৃষ্টি কিংবা পশ্চিমাদের ফান্ডে তৈরি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, এসব কথাবার্তা বলেও মুসলিম তরুণদের আইএস গমন থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ এর একটি আদর্শ আছে আর সেই আদর্শ তারা অনলাইন থেকে শুরু করে অফলাইনেও প্রচার করে যাচ্ছে আর তাতে উদ্ভুগ্ধ হচ্ছে সাধারণ মুসলিম তরুণরা। ইউরোপের তরুণরাও দলে দলে তুরস্কের বর্ডার পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় যাচ্ছে কারণ তাদের চোখেও ইসলামের তিন প্রজন্মের যুগে ফিরে যাওয়ার বাসনা। সৌদির সালাফি কিংবা ওয়াবী মতবাদ কতোটা ভয়ংকর তার একটা উদাহরণ হাজির করছি।

গল্পটা কসোভোর, জাতিগত-ধর্মীয় সহিংসতা এবং রক্তপাতের ভেতরে জন্ম নেওয়া নতুন একটি রাষ্ট্র।কসোভো নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশটির ৯৫% মুসলিম। ধর্মীয় গোঁড়ামি দেশটির কোন বড় সমস্যা হিসেবে কখনো হাজির হয়নি। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী সময়ে সৌদি অর্থায়নে সেই দেশে কিছু মসজিদ তৈরি হয়। সেখানে সৌদিদের ধর্মীয় মতবাদ অর্থাৎ ওহাবী সালাফি মতবাদ প্রচার শুরু হয়। অল্পতেই সেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি বড় একটি সমস্যা হিসেবে হাজির হয়। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা গেছে নয়া দিল্লীতে এমন ১৪০ জন ঈমাম মূলত সৌদি দূতাবাসের বেতনভুক্ত কর্মচারী, যারা এই অনুদানের অর্থে জঙ্গিবাদ প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব পালন করছে। কসোভোর যুদ্ধের ক্ষত এখনও মেরামত হয় নি, তবে ওয়াহাবী মতাদর্শ প্রচার প্রসারের এক যুগে দেশটি ইসলামী উগ্রবাদী জঙ্গি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সিরিয়া- তুরস্ক- বলকান অঞ্চলে ধর্মীয় সহিংসতা এবং ধর্মের নামে হত্যা করছে কসোভোর নাগরিকেরা, যারা যুদ্ধ শুরুর আগে কখনও ধর্মকে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করতো না। অথচ আজকে সেই দেশের তরুণরাই আইএসএসএস যোগ দিয়ে ইসলামের নামে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্যে মানুষের গলা কাটছে। বাংলাদেশে অনেক উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা আইএস এ যোগ দিয়েছে এবং যোগ দিতে চাচ্ছে। যাতের বড় একটি অংশ সমাজের উচ্চ মধ্য বিত্ত, সাবেক সেনা অফিসার, সাবেক বিচারপতিদের সন্তান। যে বাংলাদেশে ধর্ম ছিল মানুষের সংস্কৃতি কিংবা বাপ-দাদার ধর্ম ধর্ম হিসেবে পাওয়া জীবনের একটি সাধারণ অংশ। সেই সমাজের এক অংশের ছেলেরা এখন ওহাবী, সালাফিবাদে দীক্ষিত হয়ে নাস্তিক জবাই কিংবা নবী অপমানের শোধ নেওয়ার জন্যে বেড রুম থেকে চাপাতি হাতে বের হচ্ছে, অন্য অংশ প্রথম তিন প্রজন্মের ইসলামের যুগে ফিরে পাওয়ার জন্যে তুরস্কের সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে!

সহায়তায়:
মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতার সম্পর্কের ইতিহাস: জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা-পারভেজ আলম
আইএসআইএস: মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নী ওয়াহাবি জঙ্গি গোষ্ঠীর ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ
গল্পটা কসোভোর
আইএস যেভাবে সৃষ্টি হল-বিকাশ মজুমদার (অনুবাদ প্রবন্ধ)

১৪ thoughts on “সালাফি সংগঠন আইএসআইএস ও তার আদর্শিক অবস্থান

  1. দারুণ লিখছেন। সালাফিদের
    দারুণ লিখছেন। সালাফিদের সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিপ্রায়ে আজ সমগ্র বিশ্ব অস্থিতিশীল করে রেখেছে ওহাবিবাদী মুসলিমরা। ইসলামের ক্ষতি অমুসলিমরা করার প্রয়োজন নাই, মুসলমানরাই যথেষ্ঠ। সালাফিদের এই আস্ফালন মুসলমানদের মানব সভ্যতা থেকে ছিটকে ফেলে দেবে।

    1. প্রধানমন্ত্রী সৌদি টাকায় দেশে
      প্রধানমন্ত্রী সৌদি টাকায় দেশে ৫ হাজার মসজিদ করবেন। আর সেই মসজিদ থেকে সালাফিবাদ শেখানো হবে। হাতে খুব বেশি আর সময় নেই, অতি দ্রুত আমরা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের যুগে প্রবেশ করার জন্যে লড়াইয়ে লিপ্ত হবো।

      1. প্রধানমন্ত্রীর ভাবসাব দেখে
        প্রধানমন্ত্রীর ভাবসাব দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুসলিম শাসকদের মধ্যে প্রথম মহিলা আমীর হিসাবে অফিসিয়ালী স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে।

    1. দুই সপ্তাহ আগে সৌদি ঘোষণা
      দুই সপ্তাহ আগে সৌদি ঘোষণা দিয়েছে। তারা তেল ব্যবসা কমিয়ে দিয়ে হজ্ব ব্যবসায় ঝুঁকবে। হজ্ব সৌদিদের কাছে ব্যবসা এটা ওপেন সিক্রেট বিষয়।..। এই কারণে মক্কা কখনো ভ্যাটিকানের মতন আলাদা করবে না তারা। বরং মক্কা দখল করে সেটার আবেগ পুঁজি করে রাজনীতি ও ব্যবসা করবে।

  2. বাংলাদেশের মুসলিমরা এতটা
    বাংলাদেশের মুসলিমরা এতটা সালাফি না। তবে দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এখনি ব্যবস্থা না নিলে এদেশ জঙ্গীবাদের একটা ব্রিডিং পয়েন্ট হয়ে যাবে।।

    1. অন্যধর্মের মানুষকে গালি দিতে
      অন্যধর্মের মানুষকে গালি দিতে গেলে মালাউন বিধর্মীসহ বিভিন্ন শব্দ বলতে হয়। আপনারা তো নিজের পরিচয় দিতেই এখন লজ্জা পান *biggrin*

  3. ISIS is not salafi
    ISIS is not salafi oraganization..apnar post porei bojha jay kono anti saudi or kobor-majar niye business kore emon keu likhse…:p Because saudis are dead against grave worshippers..plus saudi and isis er majhe da kumra shomporko..

    However let’s see what Saudi Salafi Scholars say on ISIS.
    .

    Salafi Scholars who Warn Against ISIS and Said these people Are *khawarij & Un Islamic & Party of Satan & Dogs of the Hellfire*

    1. Shaykh. Saleh Al Fawzaan Said these ISIS is party of Shaitan

    Link : https://youtu.be/5331IXpoVwE

    2. Shaykh.Abdul Mushin Al Abbad said :

    ISIS are deviant kharijites & it is not islamic country

    Link : https://youtu.be/7MY1JaD5rIs

    3. Shaykh. Ramzan Al hajri said ISIS are blood Thirsty Murderers

    Link : https://youtu.be/ifUCXbbEAKo

    4. Shayhk. Muhammed ibne haadi Al Madkhali on ISIS

    Reality of ISIS( Daesh)

    Link : https://youtu.be/fQWG6_vpLiA

    5. Shaykh.Muhammad ibne Haadi Al Madkhali said : ISIS is Terrorist organisation

    Link : https://youtu.be/kNL9cwB-plY

    6. Shaykh.Saleh As Suhaymee on ISIS the correct position concerning Them

    Link : https://youtu.be/vEZ274flcwQ

    7. Shaykh.Saleh As Suhaymee on ISIS & Alleged Khilafat.

    Link : https://youtu.be/mBXed2-3YZc

    And in another lecture Shaykh.Suhaymee on ISIS

    Link : https://youtu.be/SPeZ365JaPo

    8. Shaykh.Ubyadal Jabiri Said ISIS is not A Salafi Group

    Link : https://youtu.be/2ToPeT-F-7c

    9. Shaykh Ubydal AlJabiri On ISIS

    Link : https://youtu.be/Rvh5Nik1fD0

    10. Shaykh.Sulayman Ar Ruhaylee On ISIS

    Link : https://youtu.be/f2DvyvLH-Q0

    11. Grand Mufti of Saudi Arabia Shaykh.Abdul Azeez Al us Shaykh on ISIS

    Link : https://youtu.be/rVDKOD_38GA

    12. Shaykh.Ali Ar Ramly on ISIS

    Link : https://youtu.be/3aJLQXfZ4f0

    13. Shaykh.khalid Usthman Al misree on ISIS

    Link : https://youtu.be/VSDJs69MDyQ

    14. Shaykh.Ramzan Al hajri on ISIS

    Shaykh. Aproched the issue from A Unique angle bringing the Misguidence of this Group in to historical perspective

    Link : https://youtu.be/ipmbWLSbFT8

    15. Shaykh.Abdul Muhsin Al Abbad said ISIS is from Khawarij

    Link : https://youtu.be/oE-fx3oSVK4

    ————————

    May Allah destroy This ISIS. They have nothing to do with Islam and they are the worst of enemies of Islam. And they are Dogs of the Hell fire.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *