সাভার ট্রাজেডি ও কিছু কথা

গত বুধবার ২৪.০৪.২০১৩ বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে গেল এক ভয়াবহ ট্রাজেডি। বাংলার ইতিহাসে এটা একটি শোক দিবস হিসাবে চিন্হিত হয়ে থাকবে। আজ আমরা যারা শোকের মাতম করছি, হয়ত আগামীতে আমরা অনেকেই ভুলে যাব, কিন্তু নিহতের পরিবার এবং যারা তাদের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে মানবেতর জীবনের অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমাবেন তারা কি কোনদিন ভুলতে পারবেন ? অবশ্যই না।

২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল সাভারের স্পেকট্রাম গার্মেন্ট ভবন ধসে প্রায় ৮০ জন মারা যায়। সেদিন এ নিয়ে আদালতে রীট হয়েছিল । কিন্তু আজ অবধী ঐ রীটের কোন জবাব সরকার পক্ষ দেয় নাই। সেদিন যদি ঐ বিচার হত হয়ত আজকে এ বিপর্যয় ঘটত না।

আমরা যদি একটু পিছনে চলে যাই তাহলে দেখব আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে দুর্ঘটনার কারনে লাশের বোঝা কত ভারী !

গত ২৫-১১-২০১২ইং তারিখে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে ১১১ জন শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ‘তানজীন ফ্যাশন লিমিটেড’-নামক এই পোশাক প্রতিষ্ঠানে এই হতভাগ্য শ্রমিকরা কাজ করতেন দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে।

সেই ২৫শে নভেম্বর’২০০০ইং-এ নরসিংদীর “সাগর চৌধুরী গার্মেন্টস”-এ মারা যায় ৪৫ জন শ্রমিক যার মধ্যে ১০ জনই ছিল শিশু শ্রমিক।

০৮ই আগষ্ট’২০০১ইং-এ ঢাকা মিরপুরের “মাইক্রো সোয়েটার লিমিটিড”-এ মারা যায় ২৪ জন।

০৩রা মে’২০০৪ইং-এ “মাইক্রো সুপার মার্কেট কমপ্লেক্স”-ঢাকাতে মারা যায় আরও ৯ জন, আহত হয় ৫০ জনেরও বেশী।

১১ই এপ্রিল’২০০৫ইং “স্পেকট্রাম শাহরিয়ার ফেক্টরী”-সাভারে ভবন ধসে জীবন্ত চাপা পড়ে মারা যায় ৬৪ জন, আহত হয় ৭৪ জন আর চাকুরীর অক্ষম হয় শতাধিক।

ট্রাজেডির এখানেই শেষ নয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারী’২০১০ইং-এ গাজীপুরের “গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরী”-তে মারা যায় ২১ জন হতভাগ্য গার্মেন্টস শ্রমিক।

১৫ই ডিসেম্বর’২০১০ইং তারিখে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ৩০ জন, আহত হয় ৫ শতাধিক। যাদের অধিকাংশই মারা যায় ১০ তলা থেকে লাফিয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। তারা ছিল “হা মীম গ্রুপ”-এর শ্রমিক। এ যেন নর শিকারী সিংহের শিকার। [সূত্র: প্রথম আলো ২৭.১১.২০১২]

যারা মারা যাচ্ছে তারা বেশীর ভাগই শ্রমিক। নিম্ন বেতন ভোগী। বাবা-মা, ভাই-বোন বা সন্তানদের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দেবার জন্যে প্রতিদিনের হাড়-ভাঙ্গা খাটুনিই এদের নিত্যদিতের রুটিন। তারপরও এরা বাঁচতে পারেনা, আমাদের সভ্য সমাজের কিছু নরকীট ও অসভ্য জানোয়রেরা বিভিন্ন অসৎ উদ্দ্যেশ্য হাছিলের জন্যে এদেরকে সময়-অসময়ে বিনা ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার সাথে করে চলছে। লুফে নিচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা।

উপড়ে দেয়া হত্যা কান্ডের বেশীর ভাগেরই বিচার হয়নি। আর কোন দিন হবে কিনা ঐ বিধাতাই ভালো জানেন। কারন গরীব-অসহায়দের বিচারের বাণী নিবৃতে কাঁদে। দেখার কেউ নেই। যারা আসেন, তারা বেশীর ভাগ সময় একটা ব্যবসা বা স্বার্থ নিয়ে আসেন। ব্যবসার মেয়াদ শেষ হলে কেটে পরেন। ১১০০০ ভোল্টের টর্স দিয়েও তাদের আর খুজে পাওয়া যায় না।

২৪ এপ্রিল, ২০১৩ । সাভার ট্রাজেডি। এক করুন ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। আমার এ লেখার সময় কাল পর্যন্ত ৩০৪ জন মৃত ও ২৩৪৮ জন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এত লাশ যেন বাংলাদেশ এক সঙ্গে স্বাধীনতার হত্যাযজ্ঞের পর আর দেখেনি। বিভিন্ন প্রাকৃতি দুর্যোগে প্রাণ হানী হয়েছে। সেটা ছিল প্রাকৃতিক। কিন্তু ২৪ তারিখের ঘটনাটা দুর্যোগ নয়, একটা হত্যা কান্ড। এতে কোন সন্দেহ নাই।
ভবন ধ্বসের আগের দিন শিল্প পুলিশ ও পোশা শিল্পের মালিক সংগঠন ভবনটি পরিত্যাক্ত ঘোষনা করে ছিলেন এবং ভবনটি খালি করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু জল্লাদ ভবন মালিক সোহেল রানা ও ৪ টি গার্মেন্টসের মালিক সীমার মালিকগণ তা সম্পূর্ন অগ্রায্য করে শ্রমিকদের বিভিন্ন হুমকি-ধামকি দেখিয়ে কাজে যেতে বাধ্য করে। এ যেন ডেকে এক হত্যা করা।

ইতিমধ্যে এ নিয়ে শুরু হয়ে গেছে রাজনীতি। যা অত্যন্ত ঘৃন্য ও জঘন্য একটা কাজ। জাতীর যদি নুন্যতম আত্ম সচেতনতা বোধ থাকে তাহলে আমি মনে করি তারা ঐ সকল রাজনীতিবিদদের রাজপথেই দিগম্বর করে ছেড়ে দিবেন। আর এটা দেখে যেন ভবিষৎতে কেউ আর এরকম একটা হৃদয়বিদারক বিষয়কে নিয়ে রাজনীতির মত নোংরা-আবর্জনার সাথে গুলিয়ে না ফেলে।

স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর কথা নিয়ে আমি শুধু এটুকই বলব, তার আর এ পদে থাকার কোন নৈতিক অধিকার নাই। কিন্তু আমরা এটাও যেন ভুলে না যাই যে, আরোও কিছু বক্তব্য আমাদের কানে এসেছে যা অবশ্যই যাচাই বাছাই করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে জরুরী হয়ে পড়েছে।

বি. চোধুরী । তিনি একাধারে সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি গতকাল ২৫.০৪.২০১৩ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ” তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল না করলে, সাভারের ট্রাজেডি হতোনা।”

তিনি কিভাবে বুঝলেন ? তার মানে কি দাড়ালো ? তাহলে ঐ খানে কেউ কি নাশকতা ঘটিয়েছে ? বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সরকার্ ও সরকারের খাস গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান করার জন্যে অনুরোধ করছি। প্রয়োজনে বি. চৌধুরীকে গ্রেফতার করে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।

হেফাজতীরা কোন রাজনীতি করেন না ! কিন্তু এটাকে আল্লাহর গজব বলে মত দিয়েছেন। হায়রে ধর্মান্ধ জানোয়ারের দল। তোরা কি মুসলিম ? এটাই এখন আমার প্রশ্ন, এর বেশী আমি বলতে পারছি না।

মওদুদ বলেছেন, এটা গণহত্যা। কে করেছে ? গার্মেন্টস ৫টির তিনটির মালিকই হলো বিএনপির নেতা। আর ভবন মালিক আওয়ামীলিগের। তাহলে কে করল এ গণ-হত্যা ?

ওনারা কথায় কথায় গণ-হত্যার গন্ধ পান। তারা উদ্ধার কাজে সহায়তা না করে এ ট্রাজেডি নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছেন। আমাদেরকে ওদের গণ-হারে বয়কট করতে হবে। যাতে ভবিষৎ-এ এ জাতীয় জঘন্য মন্তব্য আর না করতে পারে।

আশার কথা প্রধানমন্ত্রী নিজেই আজকে ভবন মালিক সোহেল রানাক ও ৫টি গার্মেন্টেসের মালিকদের গ্রেফতার করার জন্যে নির্ধেষ দিয়েছেন। অনেক দেরী হয়ে গেছে মাননীয় মন্ত্রী। তবুও ধন্যবাদ। আমরা আশা করব পুলিশ দ্রুত ওদের ধরে প্রমাণ করবে, পুলিশ কতটা আন্তরিক।

এ ট্রাজেডি নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনীতি ও ভাংচুর শুরু হয়ে গেছে। যা আমাদের কারো্রই কাম্য হতে পারে না। একদিকে লাশ, অন্যদিকে রাস্তা অবরোধ করে গাড়ী ভাংচুর, দোকান-পাট ভাংচুর, অন্যন্য পোশাক কারখানায় হামলা – এগুলো কার স্বার্থে এবং কেন ?

আমি যতটুক জানতে পেরেছি ঐ আ্ন্দোলন কারীরা বেশীর ভাগই রাজনীতিক কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নেমেছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সরকারকে অনুরোধ করব কঠোর হস্তে ওদের দমন করা সহ এদের নির্দেশ দাতা শয়তান-জানোয়ারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন।

খবরে প্রকাশ হয়েছে, সাভারে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের লোকজন, পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহীনিদের উপড় অতর্কিত ভাবে হামলা করা হয়েছে। কারন তারা কেন ক্রেন দিয়ে দেয়া সরিয়ে উদ্ধার করতে গেল ! তার মানে কি, ওখানে কি লাশের মিছিল দীর্ঘ করার কোন ষড়যন্ত্র হচ্ছে ? সরকারের গোয়েন্দাদের কাছে অনুরোধ, ঐ সকল কাল-পিটদের ধরে ওদের কাছ হতে এর রহস্য উদঘাটন করুন। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয়।

লাশ নিয়ে রাজনীতি, লাশের রাজনীতি তথা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে রাজনীতিবিদদের নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার মত ঘৃন্য কাজকে আমাদের সকলকে না বলার সময় এসেছে। আসুন সবাই ওদেরকে না বলি।

[আমি এখানে কোন বিভৎস ছবি ব্যবহার করিনি, কারন এটা অনেকের জন্যেই ক্ষতিকর।]
আমার ভুবন

১ thought on “সাভার ট্রাজেডি ও কিছু কথা

  1. বি. চোধুরী । তিনি একাধারে

    বি. চোধুরী । তিনি একাধারে সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি গতকাল ২৫.০৪.২০১৩ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ” তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল না করলে, সাভারের ট্রাজেডি হতোনা।”

    হেফাজতের কথার কোন মুল্য নাই। ধর্মান্ধদের কাছ থেকে আমি এই ধরনের কথাই আশা করি। কিন্তু বি-চৌধুরী যদি এই কথা বলে থাকে, তবে অবশ্যই কিন্তু আছে। এদের মত রাজনীতিবিদদের মুখ থেকে এই ধরনের কথা শুনলে অবশ্যই আশংকার বিষয়। সাইনবোর্ডসর্বস্ব রাজনীতির এই কীটগুলোকে সর্মূলে ধ্বংস করার সময় হয়েছে। এদের হাত ধরেই বাংলাদেশে ধর্মান্ধতার পথ তৈরী হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এই ধরনের ছাগলামী মার্কা কথাবার্তাকে আমি কোনভাবেই সমর্থন করতে পারিনা। কারণ ভবনটি আগে থেকেই ঝুকিপূর্ণ ছিল। এর সকল দায়-দায়িত্ব ভবনের মালিক ও গার্মেন্টসগুলোর মালিকদের। এদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক। মানুষ মারার বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দরকার নাই।

    সরকারের উচিত এখন সব দিক থেকেই সর্তক দৃষ্টি রাখা। সবাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, এখন সরকারের মন্ত্রীদের কথা-বার্তা চিন্তা-ভাবনা করে বলা উচিত। ছাগল মার্কা কথাবার্তা যারা বলেন, তাদের মুখের চোয়াল বেঁধে দিতে হবে। না হলে মন্ত্রীসভা থেকে বের করে দেওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব জ্ঞানহীন বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। আর না হলে পদত্যাগ বা বহিষ্কার। এই ধরনের শাস্তি বিধান করা হলে ভবিষ্যতে অন্যরা সর্তক হয়ে যাবে।

    ভাল লিখেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *