শিক্ষাখাতে বাজেটে বরাদ্দ প্রসঙ্গে

একটা গনতান্ত্রিক দেশে বাজেট প্রণয়ণের আগে সম্ভাব্য
বাজেট কি রকম হবে তা নিয়ে বিভিন্ন স্তরের, শ্রেণীর
মানুষের সাথে আলোচনা করা,পরামর্শ নেয়া একটি সাধারণ
বৈশিষ্ট্য। আমরা প্রতি বছর দেখছি আমাদের দেশে বাজেট
প্রণয়নের সময় আমলা-ব্যবসায়ী ছাড়া আর কারো মতামত
নেয়া হয় না। বাজেটের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয় সরকারের
দৃষ্টিভঙ্গি ও জনগনের প্রতি দায়িত্ববোধ।সরকার শুধু
ট্যাক্সের হার বাড়াতে ব্যস্ত। শিক্ষা-স্বাস্থ্যের জন্য
বরাদ্দ বাড়াতে নয়।
প্রত্যেক বছর বাজেটে আয়তন বড় হয়। কিন্তু শিক্ষার খাত
বরাবরই অবহেলিত থাকে গত বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বাজেটের
১১.৬০%। প্রতি বছর শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমছে, বাড়ছে
শিক্ষার ব্যয়।
আমরা বলি শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড কিন্তু শিক্ষাকে যদি
মুখে মেরুদন্ড বলে কাজে ঠিক উল্টো অবস্থায় রাখি তাহলে
কি হবে.? আমরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ না করে সামরিক
খাতে বিনিয়োগ করি বেশি বেশি মনে হচ্ছে দুই দিন পরে
বিশাল এক সেনা অভিযানে যাবো আমরা। শিক্ষা
জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করে।আমাদের দেশ
পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।এখানে মাথাপিছু জমির
পরিমাণ কম। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত।মানব সম্পদ ছাড়া
দেশের উন্নতির পথ আর কি আছে.? মানব সম্পদ সৃষ্টির
একমাত্র উপায় হচ্ছে মানসম্মত ও সবার জন্য শিক্ষা।
অনেকে আবার এ কথা শুনলে নাক শিটকাবে সবার জন্য
শিক্ষা কেমনে বলে। এত্তো টাকা পাবো কোথায় বলে।
একটু চিন্তা করে দেখেন যে হারে প্রতি বছর অর্থকেলেঙ্কারি
হয় কালো টাকা ধরা হয় আর সামরিক খাত সহ অন্যান্য
খাতে যে হারে টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। তাতে কি মনে
হয় না শিক্ষা খাতে বাজেটে বৃদ্ধি করা সম্ভব.?সোভিয়েত
ইউনিয়নের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত
শ্রমিকের তুলনায় শিক্ষিত শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা ১২৭
গুন বেশি। আফ্রিকার অনেক গরীব দেশেও শিক্ষাখাতে
আমাদের থেকে বেশি বরাদ্দ থাকে।বিশ্বের অন্যতম
দরিদ্রওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাজেটে সেলেগাল ৪০
শতাংশ,কেনিয়া ৩১ শতাংশ,তাঞ্জানিয়া ২৬ শতাংশ অর্থ
বরাদ্দ রাখে শিক্ষাখাতে।অথচ এসব দেশের তুলনায়
বাংলাদেশের জিডিপির আকার অনেক বড়।আমাদের
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বরাদ্দ
মিলে শিক্ষার বরাদ্দ রাখে ২২ শতাংশ,পাকিস্তানে ২৫
শতাংশ,নেপালে ২০ শতাংশ ও ভূটানে ২১ শতাংশ।
দেশের ১৬১৪২ টি গ্রামে এখনও কোন সরকারি স্কুল নেই।
প্রায় ৬০% স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই। স্বাধীনতার পর
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৪৮ টি আর ৪৪
বছর পর মাত্র ৩৩২! প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রতি
সরকারের ব্যয় মাত্র ১৫০৪ টাকা আর ক্যাডেট কলেজের
ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় ৭৩৬৭৩ টাকা। সরকারি
কলেজের সংখ্যা মাত্র ২৮৯টি আর বেসরকারি কলেজ ৩০২৫
টি! আস্তে আস্তে বেসরকারি খাতকেই শিক্ষার প্রধান
ধারায় পরিণত করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট, অনিয়ম আর নতুন নতুন
পদ্ধতির কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের
অবস্থা শোচনীয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপর
ক্রমাগত চাপানো হচ্ছে ফি’র বোঝা। বানিজ্যিক
সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়কে
সান্ধ্যকালীন বিপনী বিতানে পরিণত করা হচ্ছে। আবাসন-
পরিবহন সংকটে জর্জরিত হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
গুলো চলছে বিশাল পরিমাণ বাজেট ঘাটতি নিয়ে। ইউজিসি
দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গত বছর
বরাদ্দ করেছে ২ হাজার ১৭৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। গবেষকরা
বলছেন, এই বরাদ্দের ৮৫-৯০ ভাগই খরচ হবে শিক্ষক-
কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা পেনশন ও অন্যান্য
রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। বাকি যা থাকে তা শিক্ষার কাজে
ব্যয় হবে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি তথা বাজেটের ২৫শতাংশ
বরাদ্দের দাবি দীর্ঘ দিন যাবৎ দেশের বামপন্থি ছাত্র
সংগঠন গুলো আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু আমাদের
শাসকগোষ্ঠী বরাবরই এসব দাবির যোক্তিকতা মেনে নেয়
নি উল্টো পুলিশ ও তাদের গুন্ডা বাহিনী দিয়ে নির্যাতন,
হামলা ইত্যাদি চালিয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের
উপর। শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রসঙ্গ আসলেই
শাসকদের পক্ষ থেকে সমস্বরে বলা হয় রাজকোষ শূন্য।
অথচ শাসকদের লুটপাট আর অপচয় কিন্ত থেমে নেই। দেশের
ঋণখেলাপীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ১৬২ জন। খেলাপী
ঋণের পরিমাণ ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। ১৫ লক্ষ কোটি
টাকার উপরে কালো টাকা। ১০ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে
৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে
পাচার হয়েছে ১০ কোটি ডলার। এত টাকা হারিয়ে যায় কিন্তু
শিক্ষার জন্য টাকা নেই! “পরিকল্পনা কমিশনের” তথ্যমতে
গত ২ অর্থ বছরে সংশোধিত ১৩২টি প্রকল্পের ব্যয়
বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
দোহাজারী-কক্সবাজার ১২৮ কিমি রেলপথে খরচ ৬ বছরে
১০১৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৮০৫৮ কোটি টাকা হয়েছে!
ভারতে ৪ লেন রাস্তা নির্মাণে প্রতি কিমি খরচ পড়ে ১০
কোটি টাকা আর বাংলাদেশে হাইওয়ের নামে ৪ লেন রাস্তার
খরচ ধরা হয়েছে প্রতি কিমি ৫৯ কোটি টাকা! মেট্রোরেল
নির্মাণে খরচ ১৮ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাড়িয়েছে
২২ হাজার কোটি টাকায়। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের মাশুল
গুনতে হবে আবার জনগনকেই। তাই মেট্রোরেলের প্রতি
কিমি ভাড়া নির্ধারন করা হয়েছে ২২.৫০ টাকা। চলতি বছরের
বাজেটে শিক্ষা খাতে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তার চেয়ে
ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যয় বেশি।এই হচ্ছে শিক্ষাকে কেন্দ্র
করে শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি।
২ লক্ষ ৮ হাজার কোটি টাকা পরোক্ষ কর তো দেয়
এদেশের সাধারণ জনগনই। মানুষ তো কর দেয়
নিরাপত্তা,শিক্ষা,চিকিৎসা বিধানের জন্য কিন্তু শাসকরা
তার বিধান তো করছেই না বরং জনগণের সেই অর্থকে
লুটকরার আয়োজনে নেমেছে। স্বাধীনতার পর কোটিপতি
ছিল মাত্র ২ জন আজ তা দাড়িয়েছে ১ লক্ষ ২৪ জন।
অন্যদিকে দিনে মাত্র ১০০ টাকার নীচে আয় করে এরকম হত
দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির ও বেশি। দেশের মাত্র ১০
শতাংশ মানুষের এখন দেশের ৪২ শতাংশ সম্পদ পুঞ্জিভূত
হয়ে গেছে। এরা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে, কোটি
টাকায় নমিনেশন নেয়,৩৬ হাজার পরিবার বিদেশে সেকেন্ড
বানায় ফলে দেশের শিক্ষা নিয়ে এদের উদ্বিগ্ন না হলেও
চলবে, কিন্তু দেশের শ্রমিক-কৃষক সাধারণ মানুষের শিক্ষার
অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে।

সূত্র : বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে বাজেটে বরাদ্দ প্রসঙ্গে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *