রুপকথার ইশ্বর

ছোটবেলায় রাজকুমার আর রাক্ষসের গল্প দাদা দাদির কাছ থেকে শোনে নাই এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর।রাক্ষস নির্দয় নিষ্ঠুর ভালবাসাহীন ভয়ঙ্কর মানুষ খেক প্রাণী।রাক্ষস রাজকুমারীকে বন্দি করে পাতাল পুরীতে রাখে।আর সেই রাজকুমার পক্ষীরাজের ঘোরায় চড়ে ইশ্বর,দেব,দেবিদের শক্তিতে তাকে উদ্ধার করে আনে।পরে ধুমধাম করে রাজকুমারী আর রাজকুমারের বিয়ে হয়।রাক্ষসের গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়ে তাদের সুখের সংসার চলে।

আমাদের ধর্মগ্রন্থ গুলো পড়লে ইশ্বরের মহানুভবতা দয়াশীল উদারতাই প্রকাশ পায়।ইশ্বর সর্ব ক্ষমতা সম্পন্ন যার বলে রাজকুমার ভয়ঙ্কর সব যন্তুজানোয়ারের হাত থেকে উদ্ধার করে রাজকুমারীকে।ধর্মগ্রন্থে ইশ্বরের মহানুভবতার সাথে সাথে তার সর্ক্ষমতার বর্ণনাও পাওয়া যায়।ইশ্বর কি না করতে পারেন!মহা বিশ্ব থেকে তৈরি শুরু করে পৃথিবীর ক্ষুদ্র জীব সব কিছুই।সপ্তম আসমান কিংবা জলের উপর পৃথিবীকে স্থির করেও রাখতে পারেন।ইশ্বরের ক্ষমতার যে শেষ নেই তা বিশাল বিশাল ঐশী গ্রন্থ পড়ে জানা যায়।দয়াশীলতার বর্ণনা পাওয়া যায়।ক্ষুদ্র প্রাণী খাবার দেয়া,বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো,তার অনুসারীকে স্বর্গের সুবিধা দেয়া আরো কত কি।যদিও তার পরিবর্তে ক্ষুদ্র প্রাণীকে নিজে খারাব সংগ্রহ করে নিতে হয়,বিপদে পরলে নিজেই বিপদ মোকাবেলার চেষ্টা করতে হয় কিংবা স্বর্গের জন্য তার উপাসনা করতে হয়।বিনিময় প্রথাটা ইশ্বর মানুষের মস্তিষ্কে জন্ম নেয়ার পর থেকেই চালু রেখেছে।বিনিময়ের মাধ্যমে দয়াশীল হয়ে উঠেছে এই ইশ্বর।পৃথিবী ঘুর্ণয়মান ও গোলাকৃতি হলে ইশ্বর সেটা স্থির জলের উপড়ে কিংবা চ্যাপাকৃতি করে রেখেছেন।গ্রন্থগুলোর নির্দেশ মতে ইশ্বর মহা শক্তিশালী।ঘুর্ণায়মান পৃথিবী স্থির করে রাখাটা কি কম শক্তির ব্যাপার,কিংবা গোলাকৃতি কে চ্যাপাটায় রুপান্তর করা কি কম কথা!বর্তমান বিজ্ঞানের যুগেও যে এই ইশ্বর বেঁচে আচ্ছে তাও কি কম কথা!ইশ্বর যেহেতু দয়াশীল সর্বক্ষমতার অধিকারী এবং ন্যায়বান তাহলে ইশ্বরের বিচারই হবে এক মাত্র সঠিক বিচার!

প্রত্যেক দিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে পরে ইশ্বরের তান্ডব।ইশ্বরের তান্ডব বলাই ভালো।কেননা ইশ্বরের দৃষ্টির অগোচরে বিন্দু পরিমান ঘটনাও ঘটে না।ন্যায়পরায়ন হলে তার বিচার তৎক্ষনাত হওয়া উচিৎ।এটা যেহেতু হয় না তাহলে সেটা বিচারের নামে প্রসহন বলা যায়।ন্যায়পরায়নতা থাকে না।ইশ্বরের তান্ডবের মাঝে ধর্ষন একটা।প্রত্যেক দিন একটা না একটা এ তান্ডব চলছেই পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে।ইশ্বর কি করে তখন?তার বিচারে দোষীকে ধর্ষক না ধর্ষিতা।ধর্ষক হলে তাদের বিচারের জন্য পরকালের অপেক্ষায় কেন?সে কি অক্ষম দুনিয়ায় বিচার কাজে।কিংবা সে কি চায় কেউ ধর্ষন হোক?জেল তৈরি হয় আপরাধিকে আটকে সাজা এবং তাকে আরেকবার সুজোগ দেয়া ভাল হয়ে যাওয়ার জন্য।জেলের উদ্দেশ্য হচ্ছে খারাপ কে আটকে রাখা।অন্যায়কারী কে জেলে যেতে হবে।কেউ যদি অন্যায় না করে জেলে যেতে হবে কাকে?কাউকে না।মানুষ ভবিষ্যৎ বক্তা নয়।ধর্মগ্রন্থ মতে ইশ্বর ভবিষ্যৎ জানে এবং তা সেই নির্ধারন করে দিয়েছে।তাহলে নরকের দরকারটা কি?ইশ্বর কি তাহলে নিজেই চায় ধর্ষক ধর্ষন করে অপরাধ করুক?কিংবা কেউ অন্যায় করুক যাতে তার তৈরি নরকে ঠাই হয়।না হলে তো নরক তৈরি কাজটাই বৃথা যাবে।কিংবা ইশ্বর কি নির্ধারন করেই দিয়েছে ধর্ষক কে আর ধর্ষিতা কে হবে?সে তো সব কিছু নির্ধারন পুর্বেই করে রেখেছে।তাহলে ধর্ষিতার কাছে ইশ্বর কি দয়াশীল?কিংবা ধর্ষক আর ধর্ষিতার মাঝে ন্যায় বিচারক?ইশ্বরের ঐশী গ্রন্থে জবাব হয় তো পাওয়া যাবে না।

ইশ্বর পরমদয়াশীল।তাহলে-

‘এক জাহাজ মাঝ সুমুদ্রে ডুবে গেছে।প্রায় সবাই মারা গেলেও এক জাহাজের যাত্রী বেঁচে যায় ভাগ্যক্রমে।বেঁচেই সে ইশ্বর কে ধন্যবাদ দেয় তাকে বাঁচানো জন্য’।

এখানে ঐ বেঁচে যাওয়া জাহাজের যাত্রীর কাছে ইশ্বর পরমদয়ালু।কিন্তু মৃত বাকি জাহাজের যাত্রীর কাছে ইশ্বর কি?নির্দয় রাক্ষস কিংবা ড্রাকুলা।একজনের কাছে দয়াশীল হলেও বাকিদের কাছে নির্দয়।

পৃথিবীতে প্রায় ১১ ভাগ মানুষ না খেয়ে রাত্রিযাপন করে।ঐ ১১ ভাগ মানুষের কাছে ইশ্বর কি দয়াশীল।যে ইশ্বর দু মুঠো ভাত দিতে পারে না সে ইশ্বর কি আদৌ কিছু করতে পারবে।সর্বক্ষমতাবান ইশ্বর ক্ষুদার্থ কে অন্ন দান করতে পারে না তাকে কি বলা যায় সর্বক্ষমতাবান।এই ইশ্বর আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে।সাধারন মানুষকে ভাইরাসের মত আক্রান্ত করে আছে।আমাদের রাজকুমার নেই যে ইশ্বরের হাত থেকে উদ্ধার করে মহাসুখে সমাজ চালাবে।

দয়াশীল,ন্যায়পরায়ন,সর্বক্ষমতার অধিকারী শব্দ গুলোর ব্যাবহারে ইশ্বর নামের গল্পের রাক্ষস আমাদের সমাজে প্রকট ভাবে বিদ্যময়ান আছে।গল্পের পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চেয়ে আসা রাজকুমার শুধু গল্পেই হয় বাস্তবে এদের ভিত্তি নেই।কিন্তু গল্পের সর্বক্ষমতার ইশ্বর মানব মস্তিষ্কে ভাইরাস হিসাবে আছে।মহামারীর মত আক্রান্ত করেছে আমাদের সমাজকে।ইশ্বর মানব মস্তিষ্কের ফল তা বুঝতে সমাজ থেকে হারাচ্ছি অনেকে।শুধু মাত্র ধর্ম ভাইরাসের কারনে।

কামনা বাসনা এক মাত্র মানুষের মাঝেই বিদ্যমান।লোভ কিংবা ক্ষমতা দাপট সেটাও মানুষের ব্রেনের আয়ত্তে।ইশ্বরের মাঝেও এই বৈশিষ্ট বিদ্যমান।বিজ্ঞান হল প্রমাণ নির্ভর জ্ঞান।ধর্ম অন্ধবিশ্বাস।বিজ্ঞান প্রমাণ করে পৃথিবী গোলাকৃতি,গতিশীল সেখানে ধর্মের অন্ধবিশ্বাস বলে চ্যাপটা,স্থির।ধর্মের সাথে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বিস্তর ফারাক।ঐশী গ্রন্থগুলো হল ইশ্বর প্রণীত গ্রন্থ আর সেটা প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক।এই সাংঘর্ষিকতাই কি ইশ্বরের অস্তিত্য হুমকিতে ফেলে দেয় না?এতেই কি বোঝা যায় না ইশ্বর মানুষের স্বল্প জ্ঞানের আবিষ্কার?যেখানে প্রত্যক্ষ জ্ঞান কিংবা প্রমাণ ছিল না।শুধুই ছিল অন্ধ বিশ্বাস।

ক্ষুদার্থকে অন্ন দান করতে পারে না।উল্টো ক্ষুদার্থের পার্থনা চাওয়া ইশ্বর কি দয়াশীল।কিংবা ধর্ষিতার কাছে ইশ্বরের ন্যায় বিচারক?মোটেই না।ইশ্বর না পারে ন্যায়বিচার করতে না পারে কাউকে দয়া দেখাতে।ইশ্বর শ্রেফ মানুষের মস্তিষ্কের কল্পনা।যেমনটা রাজকুমারীর বন্দী করে নিয়ে যাওয়া পাতালপুরী আর রাক্ষস।তবে শুধু ভিন্নতা ইশ্বরের নামের পুর্বে দয়াশীল,ক্ষমতাবান ন্যায়পরায়ন লাগিয়ে মহান করে তোলা আর রাক্ষস উল্টো।আদতে গল্পে দুই চত্রিতই একই কাজের।একটা বাস্তবে সমাজকে গ্রাস করে নিচ্ছে।বর্ণবাদ জাতভেদ কিংবা দাঙ্গার মত ভয়ঙ্কর পরিস্থিত তৈরি করছে।গল্পে রাজকুমার একটা বাস্তবে ইশ্বরের বিরুদ্ধে লড়ে সমাজকে বাচাতে রাজকুমার অনেক।কেউ হারিয়ে গেছে লড়াইয়ের মাঝে কেউ এখনও লড়ে যাচ্ছে।

২ thoughts on “রুপকথার ইশ্বর

    1. ভীতু আর লোভি মানুষের মস্তিষ্ক
      ভীতু আর লোভি মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তৈরি ইশ্বর ঐ মানুষের আচারনের মতই হবে স্বাভাবিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *