আজানের পরিবর্তে মসজিদ থেকে যখন ধ্বনিত হয় সাম্প্রদায়িকতার সুর

জনাব শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৭১ সালেই কোন এক জায়গাতে লিখেছিলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলার মানুষের মুক্তি হবে আবার এই জয় বাংলা স্লোগানেই বাংলার মানুষ কে একদিন প্যাঁদানি দেয়া হবে’।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ৭১এর স্বাধীনতার স্বপ্ন, জয় বাংলা এই শব্দগুলো আজ দলীয় ব্র্যান্ড, এই শব্দগুলো দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজের পেশী শক্তির রাজনীতিবিদরা দেশ শাসনের ভার নিয়েছেন। আমার খামাখাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই, যে দেশে প্রশাসন অপরাধীদের দিয়ে বিশেষ তদন্ত কমিটি সাজাতে পারে সেই দেশের স্বাধীনতা যে কোন মুহূর্তেই অন্যের হাতে চলে যেতে সময় লাগবে না। সময় থাকতে জয় বাংলা স্লোগানকে শক্ত হাতে ধরে রাখতে না পারলে এটাও ধর্মান্ধদের হাতে চলে যাবে তখন খোলা আকাশের নীচে বসে জীবন ভর কাঁদতে হবে, বিলাপের সুর বলতে হবে একদিন আমরাও স্বাধীন ছিলাম।

পৃথিবীতে কিছু কিছু শুরু আছে যেটার শেষ হলে আর শুরু হয় না, যেমন জন্ম যার মৃত্যুতেই শেষ তাই যতদিন এই শুরুটা চলতে থাকে সেটাকে যত্ন করে লালন করতে না জানলে মৃত্যুর পর সেটার সার্থকতার স্বাক্ষর থাকে না। একটি জাতির শুরুটাই হচ্ছে তার স্বাধীনতা যেটা আমরা পেয়েছিলাম ১৯৭১ সালে আর এই জাতির মূল চার নীতিকে সযত্নে লালন করতে না জানলে এটারও মৃত্যু ঘটে যেতে পারে যে কোন সময়, তখন আর নতুন করে শুরু করা যাবে না। এই চার মূল নীতির একটি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তথা ধর্ম নিরপেক্ষতা।

একজন গুণী ব্যক্তি তথা শিক্ষক, সাংবাদিক, কীর্তিমান মানুষদের সম্মান চলে গেলে জাতি তা কোনদিনই ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিছুদিন আগেই ঠিক একি ভাবে আমরা সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে মিথ্যা মামলায় হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় কোর্টের দরজায় দাড়িয়ে থাকতে দেখেছি আর আজ দেখছি জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে নারায়ণগঞ্জে স্কুল শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে অমানবিক নির্যাতন ও অপমান করতে। এইসব গুণী ব্যক্তিদের মিথ্যা মামলা দিয়ে জাতির সামনে অপমানের যে অপচেষ্টা সেটা কি জাতি অনন্ত কাল নীরব দর্শকের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে ?

এ দেশের মানুষের বিবেক বলতে কি কিছু নেই? ‘লেখাপড়া করে যেই গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই’ প্রবাদের যুগ হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু কেউ কি কোনদিন এইসব গুণী মানুষদের কাছে একবারও জানতে চেয়েছি, তাদের জীবন কি ভাবে চলছে, সংসার কি ভাবে চলছে, ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ কি ভাবে চলছে? আসলে আমরা এ সব প্রশ্নের উত্তর কোনই দিনই খুঁজে বেড়াই না। আজ আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে গুণী ব্যক্তিরা পায়ে হেটে কাজে জান, গাড়িতো দূরের কথা ঘোড়ার ঘাস কাটাই যেন তাদের জীবনের শেষ কাজ, ধনতন্ত্রের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সমাজতন্ত্রের বাংলাদেশের স্বপ্ন। পুঁজিবাদী আর পেশীবাজীর দাপটে চলছে আমাদের দশের শাসন ব্যবস্থা।

ধর্মের বাণী নিয়ে ধ্বনিত হবে আজানের সুর আজ সেই আজানের সুরের পরিবর্তে মাইকে সুর করে ধর্মান্ধরা সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। ধর্মের অপপ্রচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে যখন লাঞ্ছিত করা হয় তখন একটি জাতির শুরু থেকে শেষের দিকে ধাবিত হতে থাকে, যেটা আর নতুন করে শুরু করা যাবে না। জয় বাংলা কি আজ একটি আতঙ্কের স্লোগান? বাংলাদেশ জেগে উঠবেই, এ জাতি ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। ভাল থেকো বাংলাদেশ।
—–মাহবুব আরিফ কিন্তু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *