বাঁশখালীর গণ্ডামারাতে রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারাতে গ্রামে গত এক সপ্তাহ ধরে গ্রামবাসীর চলাচল পুলিশ বন্ধ করে রেখেছে। এর পেছনের ইতিহাস শুরু হয় এক মাস আগে যখন এস.আলম গ্রুপ এর প্রকল্পিত কয়লা-বিদ্যুত কেন্দ্রর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নামে গণ্ডামারার গ্রামবাসীরা। তাদের অভিযোগ ছিল যে এস.আলম তাদেরকে মিথ্যা বলে জমি কিনে নিয়েছে তাদের কাছ থেকে- ওখানে যে কয়লা-বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মান করা হবে এটা তারা জমি বিক্রি করার সময় জানত না। এর মধ্যে আপনারা সবাই নিশ্চই দেখেছেন যে ৪ ই এপ্রিল গণ্ডামারায় সংঘাত সংঘর্ষে ৪ জন মারা যায়। মিডিয়া এই খবরই ছড়ায় যে সেখানে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়- এস.আলম কর্মী, পুলিশ এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যে। এই কথা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। এই কথা ঠিক যে, ওখানে এস.আলম কর্মী, পুলিশ এবং গ্রামবাসীরা ছিল, কিন্তু সংঘর্ষের সময় পুলিশ ও এস.আলম কর্মীরা মিলে গ্রামবাসীদের উপর আক্রমন চালায়। তখন বাড়ির ভেতর ঢুকে মহিলা ও শিশুদের ওপর ও গুলি চালানো হয়, যার প্রমান আমার নিজের চোখে দেখা। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে গুলির ছাপ। এই কান্ডের পর পুলিশ মামলা করে প্রায় ৪০০০ অসনাক্ত গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে। এস.আলম কর্মী একজনও আমার জানা মতে মামলার স্বীকার হয় নাই।

সেই দিন এর আরো কিছু কথা- বিদ্যুত প্রকল্পের প্রস্তাবে এস.আলম সরকারকে ৫০,০০০-এর জনসংখ্যার জায়গায়ে কেবল মাত্র ১৫০ পরিবার এর সংখ্যা দেখিয়ে প্রোজেক্ট এর অনুমুতি নেয়। ৪ এপ্রিল, ২০১৬ এর সংঘাতের সময়ে পুলিশের সঙ্গে গণ্ডামারার গ্রামবাসীদের উপর আক্রমণ করে এস আলম গ্রুপের কেনা সন্ত্রাস-দালাল। গ্রামবাসীরা যখন বৈঠক বসান প্রকল্পিত কয়লা-বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ কিঃমিঃ দূরে, তখন পুলিশ হঠাৎ এসে ১৪৪ ধারা জারি করে। এটা নিয়ে তাদের আগে থেকে কোনো খবর দেওয়া হয়নি। তারপরেই শুরু হয় অনবরত গুলি আর টিয়ার গ্যাসের আক্রমণ।

এটা ছিল ৪ই এপ্রিল এর কথা। এখন বলি সম্প্রতিকালের পরিস্থিতি। গত তিন দিন ধরে প্রতিদিন পুলিশ গণ্ডামারা গ্রামে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে যে এখানে অবৈধ অস্ত্র আছে। এই যুক্তিতেই তারা দুইদিন আগে লিয়াকত আলী’র ঘর ঘেরাও করে, এবং সেখান থেকে লিয়াকত এর ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবাকে গ্রেপ্তার করে। আমাদের সংগ্রহ করা ভিডিওতে দেখতে পাবেন যে এখানে গ্রামবাসীরা কেবল দাঁড়িয়ে থাকায় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে মারে। এর পরে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) হাবীবুর রহমান দাবি করেছে যে, সেখান থেকে দুটি দেশীয় তৈরি এলজি, চার রাউন্ড গুলি ও একটি হ্যান্ড মাইক উদ্ধার করা হয়েছে। তারা আরও মনে করে যে লিয়াকত গ্রামবাসীদের উস্কানি দিচ্ছে এস.আলম এর বিরুদ্ধে, কারণ সে বিএনপি এর মানুষ। লিয়াকত এর খোজ এ এখনো পুলিশ রেড দিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রামবাসীরা আতঙ্কিত। তারা বাজার থেকে খাবার নিয়ে আসতে পারছে না, কারণ গেলেই পুলিশ নির্যাতন করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, সেখানে র্যা ব এর ও গাড়ি আছে। দুই দিন আগে পুলিশ এর আক্রমনে আহত হয়েছেন প্রায় ২৬ জন, তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ প্রায় ১৫ জন, তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক। সাথে মারা গেছে ৮ টি পালিত গরু।

লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর কারণ হচ্ছে যে উনি ‘গণ্ডামারা বসত ভিটা ও গোরস্থান রক্ষা কমিটির’ আহ্বায়ক ও বিএনপি নেতা। কর্তৃপক্ষের দাবি যে নির্বাচন এর সময় সেই অরাজকতা সৃষ্টি করছে। কিন্তু এভাবে পুলিশ সন্ত্রাসবাদ করলে সেটা অরাজকতা নয়? পত্রিকা ও মিডিয়ায় বলা হয় যে যারা কয়লা-বিদ্যুত কেন্দ্র চায় না তারা নাকি দেশের উন্নয়ন চায় না, তারা নাকি দেশদ্রোহী। যেই উন্নয়নে গোটা ৫০,০০০ মানুষের বাসস্থান নষ্ট হয়ে যাবে সেই উন্নয়ন এর কি লাভ? আর উন্নয়ন আসলে কার হবে, দেশের জনগনের নাকি এস.আলম ও তাদের সঙ্গে লিপ্ত সরকারী কর্মীদের? এই বিষয়ে সব প্রধান মিডিয়া চ্যানেল ও পত্রিকাগুলো নিরব কেন? সরকার এর এই উন্নয়ন প্রকল্প ইতিমধ্যে নানান জায়গার মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। তারা কি এই দেশের জনগণ না? তাদের উন্নয়নের প্রয়োজন নাই? যেই উন্নয়ন এর কারণে আজ গন্ডামারার গ্রামবাসীরা ঘর থেকে বের হতে পারছে না আতঙ্কে, যার কারণে সেখানকার নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে এবং পুরুষদের হত্যা করা হচ্ছে, সেই উন্নয়নের প্রয়োজন নাই আমাদের। তীব্র ধিক্কার জানাই এস.আলম’কে, সরকারকে এবং সন্ত্রাসী পুলিশকে।

ভিডিও ক্লিপস: বাঁশখালির গণ্ডামারায় পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

১ thought on “বাঁশখালীর গণ্ডামারাতে রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *