বাংলার শিক্ষক: শুধুই প্রাপ্তি আর প্রাপ্তি

কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটা পড়ে সেই শৈশব থেকেই শিক্ষক হওয়ার এক দুঃস্বপ্ন পোষে এসেছি। ‘দরিদ্র শিক্ষক’, বহুল ব্যবহৃত এই বিশেষণটি আজও দমাতে পারেনি আমার দুঃসাহসিক স্বপ্নের অভিযানকে। তাই ধীরে-ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করতে-করতে প্রস্তুতি পর্বের শেষ পর্যায়ে এসে হিসেবের পাল্লাটাকে ভারী করার আরো কিছু উপকরণ মনে হয় পেয়ে গেলাম।

কি পাবো শিক্ষক হয়ে দেখিতো একটু-
-পড়াতে গিয়ে নিখাদ বিনোদন। যদি না শিক্ষার্থী চাকু নিয়ে ক্লাসে ঢুকে।
-শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা (সবসময় না। মনে হচ্ছে কালে-ভদ্রে)।
-শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কৃতজ্ঞতায় ভরা দু’টা চোঁখ (কখনো কখনো সেই চোঁখের রং লালা হয়ে যাবে)।
-শিক্ষার্থীর বিদায়ের দিনে দু’চোঁখে দু’ফোঁটা জল।
-আমার মতো রাগী শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর কয়েকটা ছবি থাকবে স্মৃতি হয়ে।
-ভালো ফলাফল শেষে শিক্ষার্থীর মিষ্টিতে ফোলা-ফোলা দু’টা গাল। আর মিষ্টির রসে ভেজা থুতনি। চওড়া একটা হাঁসি। মিষ্টি খেয়ে মন খুলে প্রার্থনা।

আরো পাবো- মোটা চালের ভাত, মোটা সুতার কাপড়। এইতো, আর কী চাই?
বেশ সুখেরই মনে হচ্ছিলো এই স্বল্প প্রাপ্তি। কিন্তু, শিক্ষককে এতো স্বল্প পুরস্কারে মান ছোট হয়ে যায় আমাদের পুলিশের, ছাত্রনেতাদের, রাজনীতিবিদের, ধর্মজীবীদের। তাই তারা আরো উপঢৌকন নিয়ে হাজির শিক্ষকের কুঁড়ের ঘরে। তারও একটা সুবিশাল তালিকা ছাড়া কী ব্যাপারটা সুন্দর হয়? মোটেই না-

– জাবির ইতিহাসের অধ্যাপক মোজাহিদুল ইসলাম স্যার বহিরাগত এক ছাত্রীকে নিপীড়ন থেকে বাঁচাতে গিয়ে জাবির ছাত্রলীগ দ্বারা লাঞ্ছিত হন। এর ফলে স্যার রাতারাতি ছেলেরবেটি হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যান।

-সুনামগঞ্জের ধর্মাপাশা উপজেলার নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষিকাকে মারধর করেন বিদ্যালয় সভাপতি সর্বানন্দ তালুদার। এতে শিক্ষিকাগণ অতিরিক্ত কিছুদিন স্কুল বন্ধ করার সুযোগ পেয়ে যান।

-জাবির নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম মাঈনুদ্দিনকে লাঞ্ছিত করেন লীগ কর্মী মামুন। মামুনের যোগ্যতা না থাকায় পরীক্ষায় বসার অনুমতি না দেয়ায় এই ঘটনা ঘটে। আসলে মামুন শিক্ষকের দায় কমাতে উদ্যোগী ছিলেন, শধু শিক্ষকই যা বুঝলেন না!

– ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোনতাজ উদ্দিনকে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সহকারী কমিশনার আশরাফুল ইসলামের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হয় আশরাফুলের পরিচয় জিজ্ঞেস করায়। আরে বেটা তুই দেড় টাকার শিক্ষক, আর তিনি ম্যাজিষ্ট্রেট।

-শাহবাগে প্রাইমারির শিক্ষকদেরকে পুলিশ কর্তৃক গরম পানি নিক্ষেপ, লাঠি পেটা ছিলো শিক্ষকদের অলস শরীরের জন্য খুব উপাদেয় বডি ম্যাসাজ।

-শাবির শিক্ষক লাঞ্ছনা হলো একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

– শ্যামল কান্তি ভক্ত? এই বেটা আল্লাহর জমিনে বসে আল্লাহর ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। শাস্তি সে পাবেই। এ নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নাই।

আরো কী লিখতে হবে? হুমায়ূন আজাদ, রেজাউল করিম সিদ্দিকীদের কথাও কী লিখতে হবে? তিন মাস বেতন না পেয়ে অনাহারে থাকা শিক্ষকদের কথাও? বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া সিরাজ স্যারদের কথাও কী লিখতে হবে?
আর কত লিখবো, কলম দিয়েতো কালি বের হচ্ছে না, এবার রক্ত বের হচ্ছে। রক্ত দিয়ে এখনই অতো বেশি লেখা ঠিক হবে না। আরো কতো প্রাপ্তির কথা যে লিখতে হবে…….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *