গল্পঃ এন্ড দেন আই ডিসাইডেড টু কিক মাইসেলফ আউট অফ হেভেন – পর্ব – ৫

পর্ব-৩ পর্ব-৪


এই বেহেস্তের সব সম্ভবের জীবনে “সম্ভব না” শুনতে হবে এইটা ভাবিনাই, আমি আকাশ থাইকা পড়লাম!! এর মধ্যে আজাইরা যন্ত্রনার মত হুট কইরা মাথায় কবিতার লাইন মনে পড়তে লাগলো। সেই কবে যে লিখছিলাম?! আমি মনে করতে চেস্টা করলাম লাইনগুলা,

“তাদের ঠোঁট ছোয়া একান্ত বিকেলে
হুট করে নেমে এসেছিলো সন্ধ্যা;
খুব তাড়াহুড়োয় বলেছিলো-
“সম্ভব না”।

বালক বালিকার সব সম্ভবের দিনে তখন ভরা পূর্ণিমা;
কার্তিকের চাঁদের একখন্ড বালিকার, বালকের বাকীটা!
হাতে হাত, ঘোরলাগা চোখ;
ওরা একসাথে বলেছিলো-
“সম্ভব না??”

এরপর-
মুহুর্তে ধু ধু মরুভুমি,
দপ করে নিভে গ্যাছে-রুপোলি চাঁদ!
কেউ নিশ্চয়ই ভেবেছিলো-
“সম্ভব না!!”

তারপর-
অজস্র বাইশে শ্রাবণ,
বালকের কিছু মনমরা বিকেল;বা
লিকার ভাঙ্গা কাঁচের চূড়ি!!

এই শহর কারো গল্পই লিখে রাখেনি… “

এই বেহেস্তে বইসাও আমি ভাবতে থাকলাম, জীবন যেইদিকেই যাক, যেইখানেই থাকিনা ক্যান, সবকিছু হওয়া সম্ভব না। বেহেস্তে যদি গল্প উপন্যাসের পাঠক পাঠিকা থাকতো, বছর বছর বইমেলা হইতো, তাহলে সেইগুলা টার্গেট কইরা হাহাকারপূর্ন গল্প উপন্যাস লিখে ফেলা যাইতো। ঠিক এই মুহুর্তে আমার বুক ভর্তি হাহাকার। এই বেহেস্ত… এই নাদান বেহেস্ত আমার এই হাহাকারের গল্প লিখে রাখবে না। আমারেও লেখার তাগিদ দিবে না। এক অদ্ভুত জায়গা এই বেহেস্ত, ঠিক এই মুহুর্তে এত প্রাচুর্য্য, এত আরাম, এত কামনা বাসনা লালসা পুরনের জিনিস থাকার পরেও এমন হাহাকার কেবল মাত্র বেহেস্তেই সম্ভব!!

যাইহোক, এইসব ভাবতে ভাবতে দিন পার করছি নাকি বছর এইসব গুনিনাই। কোটি কোটি বছর পার করার পরেও এই হিসাবগুলা ধরতে পারিনাই। এক দিনে নাকি হাজার বছর হয় দুনিয়ার, ঘন্টা সেকেন্ডের হিসাবও মনে হয় আলাদা হবে। ঘড়িটড়ির কথা মনে পরেনাই এতদিনেও। ঘড়ি হাতে লাগাইলে কাহিনী বুঝা যাইতো। আমার বেহেস্তি ঘড়ি দেখার খায়েশ হইলো, চীফরে বললাম,

–   “একটা বেহেস্তি ঘড়ি আইনা দাও!“

সেই মুহুর্তেই আমি আমার হাতে একটা ঘড়ি দেখতে পাইলাম। কী যে সুন্দর বইলা বোঝানো যাবেনা। সোনার বেল্ট, নীল হীরার ডায়াল, পান্নার কাঁটা! কিন্তু ঘড়িটা কি নষ্ট??!! নড়াচড়া বিহীন ঘড়ি দেখতেছি!!?

আমি চীফরে জিগাইলাম,

–    “কি ঘড়ি দিলিরে গেলমান, কাটাকুটা তো কিচ্ছু নড়েনা?”

চীফ জবাব দিলো,

–   “স্যার, ঘড়ি বেহেস্তি টাইম ফলো করতেছে। সময় হইলেই নড়তে দেখবেন। দুনিয়ার হিসেবে ১০০০ বছরে এইখানের একদিন। সেই হিসেবে দুনিয়ার সময়ের ৪.২২৫ দিন পর পর সেকেন্ডের কাঁটা জায়গা বদল করবে। একটু ধৈর্য্য ধইরা তাকাইয়া থাকেন, পরিবর্তন চোখে পরবে!”

আমি কইলাম,

–   “কস কি গেলমান?! একটু এডজাস্ট কইরা ঘড়িটা দিতে পারিলিনা? সময়ের পরিবর্তন বুঝতে যদি এতো টাইম লাগে তাইলে এই ঘড়ি দিয়া আমি করুম কি? এইটা তো হাতে ঝুলানোর অলংকার হইয়া গ্যালো!”

চীফ জবাব দিলো,

–   “স্যার, বেহেস্ত অনন্তকাল বর্তমান থাকবে। এইখানে সময়ের টানাটানি নাই, সময় নিয়া টেনশনের কিছুও নাই। তাই আসলে ঘড়িরও দরকার নাই। তবু আপনার শখ হইলে পড়তে পারেন। আর নাড়াচাড়া বুঝতে পারতেছেননা, কারন আপনার ব্রেইন চলতেছে দুনিয়ার ডিজাইন অনুসারেই। ঈশ্বর আপনাদের এমনভাবেই ডিজাইন করছিলেন যে সেকেন্ডে আপনাদের চোখ দশটা ছবির ফ্রেম দেখতে পারবে। সময়ের হিসাবের যেই নিম্ন মান ধইরা নিছেন, আপনার সেন্স সেই নিম্নমানেই আছে। মৌলিক ডিজাইনের কোন পরিবর্তন হয়নাই। তাই আপনার কাছে এই বেহেস্তি সেকেন্ডও অনেক দীর্ঘ্য মনে হইতেছে। আপনি যদি চান তাইলে পরিবর্তন কইরা দেয়া যায়। আপনার এইখানের এক সেকেন্ড তাইলে হবে দুনিয়ার ৪.২২৫ দিনে। কিন্তু পরিবর্তনের পর আপনি দুনিয়ার কোন স্মৃতি ঠিক মনে রাখতে পারবেননা। ০.৪২২৫ দিন পর পর একটা কইরা ফ্রেমের মতো সামনে উদয় হবে, বাকী ভগ্নাংশগুলা আপনার ব্রেন ধরতে পারবেনা। স্যামপ্লিং রেট ব্রেনের বেশি থাকাই ইহকালীয় আর পরকালীয় স্মৃতি ধইরা রাখার জন্য শ্রেয়!”

দীর্ঘ্য বক্তব্যের কিছু বুঝলাম নাকি বুঝলামনা তাই বুঝতে বুঝতে বুইঝা গেলাম যে বেশি বুইঝা ব্রেইনের মৌলিক ডিজাইনের পরিবর্তন করতে গেলে আমার দুনিয়ার সবকিছু হাওয়া হইয়া যাবে। বেহেস্তি এই জীবনে আমার ওই স্মৃতিগুলাই একমাত্র সম্বল, বাইচা থাকার প্রেরনা। আমি ওইগুলা হারাইতে চাইলামনা। প্রসঙ্গ এড়াইতে চিফরে কইলাম,

–   “তাইলে এই সোনা হীরার ঘড়ি বাদ দিয়া দুনিয়ার টাইমে চলা একটা ট্যাগ হিউয়ার ঘড়ি আইনা দাও। দুনিয়ায় থাকতে খুব শখ আছিলো!“

চীফ বললো,

–   “হাতের দিকে তাকান বস। ট্যাগ হিউয়ারের মোস্ট এক্সক্লুসিভ মালটা এখন আপনার হাতে। ওয়ান পিস মেড হওয়ার পরেই কারিগর ডেড হইয়া আজন্ম সুইস ব্যাঙ্কের ভল্টে শোপিস হইয়া পইরা ছিলো। কেয়ামত দিবসে ধ্বংস প্রাপ্ত হইছিলো। এখন আবার অনু পরমানু জোড়া লাগাইয়া সেম টু সেম আপনারে দেয়া হইলো।“

আমি তাকাইয়া দেখি সত্যি তো তাই। তবে অন্য প্রজন্মের ঘড়ি বইলা মনে হইলো, মনে হয় আমি মরার আরো দুই একশ বছর পরেও কোম্পানী টিইকা ছিলো, তখন বানানো। জিনিস মন্দ না। আমি চিল্লান দিতে চাইলাম, “ট্যাগ হিউয়ার রে!!” বইলা। এরপর ভাবলাম, আরে, এত্ত জোস একটা জিনিস হাতে দিছি, এইটা যদি আমার তারে না দেখাই, তাইলে ক্যামনে হয়? এতো কিছু ভাবতে গিয়া তারে দেখার কথাই ভুইলা গেছিলাম!!আমি চীফরে বললাম,

–    “আমারে নিয়া যাও তার কাছে, এখনি!”

চীফ আবার জবাব দিলো,

–   “আপাতত সম্ভব না স্যার!!“

এই প্রথম বেহেস্তে চান্দি হট হইলো। খুন করার মতো রাগ উঠলো। চীফরে বললাম,

–   “ক্যান সম্ভব না?!”

চীফ জবাব দিলো,

–    “স্যার, বেহেস্তীদের সঙ্গী নির্বাচনের নীতিমালার মৌলিক সুত্র লঙ্গিত হবে। এই জন্য আপনিও বেহেস্তে সঙ্গীহীন আছেন। উনিও তাই আছেন। স্মৃতিতে ঘাই মাইরা দেখেন।“

আমি বললাম,

–   “আবার ফ্ল্যাশব্যাকে যাইতে পারুমনা। একবার গেলেই কোটিখানেক বছর হ্যাং খাই। মুখে কও নাইলে ব্রেইনে ডাইরেক্ট ঢুকাইয়া দাও।“

চীফ ব্রেইনেই ডাইরেক্ট ঢুকাইয়া দিলো গুরুত্ব বুইঝা। বেহেস্তিদের ক্ষেত্রে সঙ্গী নির্বাচনের কিছু শর্ত ছিলো নিম্নরুপ কিংবা এরই মতনঃ

১।   বেহেস্তী পুরুষদের স্ত্রী কিংবা স্ত্রীগনও যদি বেহেস্তী হন তাইলে তারা তাদের স্বামীর সঙ্গী হবেন এবং তাদের রুপ হুরদের চেয়ে অনেকগুন উত্তম হওয়া ছাড়াও তারা সেইসব হুরদেরও সর্দারনী হইবেন।

২।   বেহেস্তি পুরুষ যদি অবিবাহিত হন তবে তারা বেহেস্তে হুরদের সঙ্গী হিসেবে পাইবেন।

৩।  বেহেস্তী নারী যদি অবিবাহিত হন, তাহলে তারা তাদের পছন্দমত সঙ্গী পাইতে পারবেন।

৪।  বেহেস্তী নারী যদি বিবাহিত হন, তাইলে তাদের স্বামীও যদি বেহেস্তি হন, তবে তারা একত্রে থাকিবেন।

৫।  বেহেস্তী নারীর যদি দুনিয়াতে বেশ কয়জন স্বামী থাইকা থাকে, তাইলে তাদের সর্বশেষ বৈধ স্বামীকে সঙ্গী হিসেবে পাইবেন।কিন্তু বেহেস্তে স্বাধীন ইচ্ছা এইসব শর্তের সাথে কনফ্লিক্ট কইরা আমারে আর তারে, দুইজনরেই সঙ্গী লাভ হইতে দুরে রাখছে।

ফ্ল্যাশব্যাকে যা পাইলাম, তা হইলোঃ

১। আমি কোন কারনে অকালে মৃত্যুবরন করি অবিবাহিত অবস্থায় এবং তেমন কোন কারন থাকা না সত্ত্বেও পরম করুনাময় ঈশ্বরের অশেষ দয়ায় আমি বেহেস্তে স্থান লাভ করি। সেই হিসেবে আমার প্রাপ হুর আমাকে দেয়া যায় এবং দেয়া হইছেও। কিন্তু স্ত্রী হিসেবে দুনিয়ার কাউকে দাবী কইরা তারে পাওয়ার অধিকার নাই।

২। আমার অকাল মৃত্যুর পর পিতাপাতার চাপে পইরা আমার সেই প্রিয় মানুষটা আরেকজনরে বিয়ে করে। সেইটাও ঘাপলা বিয়া ছিলো। আমার সেই প্রিয় মানুষের এক নিঃস্বার্থ প্রমিক ছিলো, যে তার খুশীর জন্য যা খুশী করতে রাজী ছিলো। সে ওই ছেলেরে বিয়েতে রাজী করায় এই শর্তে যে পিতামাতারে মানসিকভাবে সুখী রাখতে সে বিয়ে করবে, কিন্তু বিয়ের পরের কোন সম্পর্ক থাকবেনা এবং তারা আলাদা থাকে বিয়ের পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

৩।  যে আমার প্রিয় মানুষরে বিয়ে করছিলো সেও বেহেস্তী হয় এবং বেহেস্তে সে স্ত্রী হিসেবে আমার প্রিয় মানুষরেই চায়, ওইটাও একেবারে অকৃত্তিম প্রেমের নিখাঁদ চাওয়া।

৪।  আমার প্রিয় মানুষের কাছে বেহেস্তে আসার পরেও আমি প্রিয় মানুষ থাকি এবং সেও এই বেহেস্তী জীবনে ওই ঘাপলা স্বামীরে গ্রহন না কইরা আমারেই গ্রহন করতে চায়।

৫। কিন্তু বেহেস্তী জীবনেও প্রকৃত সত্ত্বার ভাগাভাগি সম্ভব না এবং বেহেস্তী মানুষরের মনের বিরুদ্ধে গিয়া কিছু করা সম্ভব না বইলা তারা আলাদাই আছে এবং এই সঙ্গী লাভের ব্যাপারটা ঝুইলা আছে।

শেষ পর্যন্ত যা বুঝলাম তা হইলো, আমি তারে চাই, সেও আমারে চায় কিন্তু আবার দুনিয়ার জীবনের বৈধ অধিকার এবং মৌলিক শর্তাবলী অনুযায়ী সেই মানুষটাও যেহেতু দাবী ছাড়তেছেনা, তাই সকলেই ঝুইলা আছি।

আমি চীফরে বললাম,

–   “ ওই ব্যাটারে একটা ক্লোন বানাইয়া দাওনা কেন?”

চীফ জবাব দিলো,

–   “স্যার, উনি ক্লোন নিবেন না। বেহেস্তে নকল বানাইয়া কারচুপির সুযোগ নাই। যে যা চায়, তাকে প্রকৃতরুপেই সেইটা দেয়ার নিয়ম।“

আমি বললাম,

–   “এইভাবে তাইলে কতদিন? সমাধান কি? আমার তারে চাইই চাই।“

চীফ জবাব দিলো,

–   “স্যার, আপনাদের যে কোন একজনের মন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব না।“

আমি বললাম,

–   “কি সেই শর্ত বুঝাও আমারে!”

চীফ বললো,

–   “স্যার হয়, আপনার প্রিয় মানুষটারে আপনার দিক থাইকা মন ফিরাইতে হবে। অথবা আপনার প্রিয় মানুষটার দুনিয়ার বৈধ স্বামীরে তার দাবী ছাড়তে হবে। আপনার দিক থাইকা মন ফিরাইলে উনি উনার বৈধ স্বামীর সাথে থাকবেন আবার উনার বৈধ স্বামী দাবী ছাড়লে উনি আপনার কাছে আসতে পারবেন যেহেতু আপনিও বেহেস্তি এবং বেহেস্তিদের একসাথে থাকার এই ইচ্ছার মধ্যে অনৈতিক কিছু নাই। সমস্যা হইতো যদি আপনারা দুইজন দুই ক্যাটাগরির বেহেস্তে থাকতেন। তখন একজনরে বেহেস্তের ক্যাটাগরি ডাউনগ্রেড করা লাগতো। সেইটা আপনারা নিজেরা বুইঝা ঠিক করতে পারতেন।  আবার ঈশ্বর চাইলে দয়া কইরা কোন একজনরে আপগ্রেডও কইরা দিতে পারতেন। কিন্তু আপনাদের এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হইলো দুইজনের একজনের মন পরিবর্তন।“

আমি বুঝতে পারলাম, এই শর্ত পুরন জীবনেও সম্ভব না। আর তারে ছাড়া এই বেহেস্তি জীবনের আমার কাছে কোন মানে নাই। ভীষন শুন্যতা অনুভব করলাম। আরো শুন্যতা আর হাহাকার আসলো এই ভাইবা যে আমার প্রিয় মানুষটা দুনিয়ার সেই অল্প সময় সহ এই বেহেস্তের প্রায় অনন্ত সময় আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে। আমার ভালোও লাগলো, আবার ভীষন হতাশায় নিমজ্জিত হইলাম এই ভাইবা যে কী ভীষন একাকীত্বে সে আছে!! কী ভীষন আশাহীনতা আর শুন্যতার মধ্যে দিয়া সেও সময় কাটাইতেছে। অনন্ত শুন্যতার নিদারুন যন্রনার সময়, এই বেহেস্তেও….আমি আর সহ্য করুতে পারলামনা। আমি চীফরে বললাম,

–   “আমি ঈশ্বরের সাথে সরাসরি কথা বলতে চাই!!”

চীফ নির্লিপ্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

–   “স্যার, সম্ভব না!!“(চলবে…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *