সাক্ষাৎকারঃ আমার পরিচয়- আমি একজন “নাস্তিক ব্লগার”

২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে বুদ্ধিজীবী এবং লেখক হত্যা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এপ্রিল মাসে খুব অল্প সময়ের ব্যাবধানে চারটা ঘটনা ঘটলো। সব কিছু মিলে আজকের এই বিশেষ পরিস্থিতিকে কিভাবে দেখছেন?
আমি আজকের এই হত্যা-খুনের মহোৎসবকে আগের ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় দেখি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই হত্যা-খুন আগের চেয়ে আরো তীব্র রূপ ধারণ করার কারণ বলে মনে করি। ২০১৩ সালে পরপর দুই মাসে আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যা প্রচেস্টা এবং আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে রক্তাক্ত অধ্যায়ে প্রবেশ করে, সেই সময়েই যদি সরকার খুনী জঙ্গীদের ধরে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসতো, জঙ্গীদের আস্তানা- তাদের পরিকল্পনাকারী- মদদদাতাদের খুজে বের করতো- এদেরকে অঙ্কুরেই নির্মূলের চেস্টা করতো, তাহলে ২০১৫ সালে এই ধারাবাহিক ব্লগার, লেখক, প্রকাশক খুনের উৎসব শুরু হতো না বলে মনে করি। উল্টো আমরা দেখেছি, ২০১৩ সালে যাকে খুন করার চেস্টা হলো, সেই আসিফ মহিউদ্দিনকেই গ্রেফতার করা হলো, যাদেরকে খুন করার হুমকি দেয়া হচ্ছিল- যাদের ফাসীর দাবীতে ইসলামপন্থী শক্তি দেশজুড়ে তান্ডব করলো, তাদেরকেই গ্রেফতার করলো, তাদের নানারকম তালিকা বানিয়ে মিডিয়ায় প্রচার করে- তাদের জীবনকে আরো বিপদসংকুল করলো! এসবই খুনীদের, জঙ্গীদের উৎসাহিত করেছে, তারা শক্তি অর্জন করেছে এবং ২০১৫ থেকে সিরিয়াল কিলিং এর কায়দায় ধারাবাহিক ‘অপারেশন’ শুরু করে। প্রতি ঘটনার পরে সরকার খুনী জঙ্গীদের ধরার পরিবর্তে ‘দেশে কোন আইএস বা আল কায়দা জঙ্গী কিছু নেই’ বলে জঙ্গীদের আড়াল করা এবং মুক্তমনা, নাস্তিক লেখক, ব্লগারদেরকেই তাদের লেখার বিষয়বস্তুর জন্যে দোষারোপ করা, সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া লেখার ‘অপরাধে’ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া- এসবই জঙ্গীদেরকে পরবর্তি আক্রমণের ব্যাপারে অধিক উৎসাহিত করেছে। ২০১৫ সালের শেষ আক্রমণের পরে কিছুদিন বিরতির পরে এ বছর এপ্রিল মাসে নাজিমুদ্দিন সামাদকে দিয়ে আবার শুরু হয়েছে- সেই মহোৎসব। অবশ্য তার আগে হিন্দু পুরোহিত ও ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান মুক্তিযোদ্ধাকে একই কায়দায় চাপাতির আঘাতে হত্যা করা হয়। ২৮ মার্চ আদালত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের রিট কোনরকম শুনানি ছাড়াই খারিজ করে দেয়। এই রিটের শুনানিকে কেন্দ্র করে তার আগে থেকেই শুরু হয় দেশ জুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণ- নির্যাতন, যা বর্তমানেও চলমান। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ১৯৮৮ সাল থেকে থাকলেও এবারে অষ্টম সংশোধনী বাতিলের রিট খারিজ হওয়ায় ইসলামপন্থীদের মাঝে যেন ইসলামী জোশ আরো বেড়ে যায়! সেই জোশে সারাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রবল সমারোহে চলতে থাকে। ৬ এপ্রিল নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যা করে। নববর্ষ পালনের বিরুদ্ধে সরাসরি হুংকার ছুড়তে থাকে আওয়ামী ওলামা লীগ সহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল। আর বাংলা নববর্ষের দিনটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নাস্তিক’ ‘মুক্তমনা’ বিরোধী অংশকে সন্তুষ্ট করতে- মুক্তমনাদের নোংরা, বিকৃত ও পর্ণ ধরণের লেখার লেখক অভিহিত করে সরাসরি জানিয়ে দেন যে, তাদের এরকম নোংরা লেখার জন্যে কোন রকম অঘটন ঘটে গেলে তার দায় সরকার নিতে পারবে না। এরকম বক্তব্য জঙ্গী- খুনীদের প্রতি একরকম গ্রীন সিগনাল হিসাবেই আমি দেখি! তারই ফলাফল আমরা হাতেনাতে পেলাম, ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিমকে চাপাতি দিয়ে মারা হলো এবং তার দুদিন পরেই ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশে সমকামী ও হিজড়াদের আন্দোলনের অগ্রণী পথিক জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে সেই চাপাতি দিয়ে মেরে ফেললো সেই জঙ্গীরা। আজ দেশের অবস্থা, আমাদের রাজনীতি, আমাদের সরকার এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছে- এখান থেকে সহজে মুক্তির কোন পথ আছে বলে মনে হয় না। চরম অসহনশীল, চরম ঘৃণার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই ২৫ এপ্রিলেই আরো কয়েক জায়গায় চাপাতির কোপে কয়েকজনকে খুন করা হয়েছে, গুলিতে মারা হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারের সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টরকে গুলি করে হত্যা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যুবককে গলা কেটে হত্যা, কুষ্টিয়ায় স্কুলশিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা, রাঙ্গুনিয়ায় ২ যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তার আগে গোপালগঞ্জে সাধুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে! কোথায় নিরাপত্তা বলেন? অথচ, আজকেও পুলিশের আইজিপি বলছেন- জনগণকেই নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে, পুলিশের পক্ষে প্রতিটি ঘর পাহাড়া দেয়া সম্ভব হবে না। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বেডরুম পাহাড়া দিতে পারবেন না। খুনের সংস্কৃতি পাহাড়া দিয়ে দূর হয় না, খুনীদের ধরা ও তাদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দূর করা যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি তথা খুনীদের চিহ্নিত করা, ধরা ও দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে সরকারের আশ্চর্যরকম নীরবতা, নিস্পৃহতা ও নিস্ক্রিয়তার পাশাপাশি সরকার ও সরকারী বাহিনীর এ রকম দায়িত্বহীন কথাবার্তাই তো খুনীদের, জঙ্গীদের এরকম বেপরোয়া করে তুলছে।

এবারই সম্ভবত প্রথমবারের মত LGBT আন্দোলনের দুজন কর্মী খুন হলেন! এই কমিউনিটির অনেকেই ভীষণভাবেই হতবিহবল- কেননা আগে এরকম খুনের ঘটনা ঘটেনি। আপনি কি করেন যে, জুলহাস মান্নানের হত্যা বর্তমানের চলমান জঙ্গী আক্রমণকে আরো ভীতিকর পর্যায়ে নিয়ে গেল?
পরিকল্পিত হত্যার জায়গা থেকে এটাকে প্রথম বলা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে সমকামীরা, হিজড়ারা সবসময়ই নিগৃহীত হয়েছে। পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হয়েছে, পাবলিক বা ‘মব’ এর হাতে নিগৃহীত হয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের হাতে হয়েছে। জুলহাস মান্নানও তার এক লেখায় বলেছেন, “আমরা এমন সমাজে বাস করি যে সমাজে ধর্মের চোখে আমরা পাপী, আইনের চোখে অপরাধী এবং সামাজিক নৈতিকতায় আমরা বিকৃত”। সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্যে এ দেশে সেরকম আন্দোলনই তো আসলে নেই, কিছু এনজিও’র কিছু বিচ্ছিন্ন ভূমিকা ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না। সে জায়গায় জুলহাস মান্নানের একটি বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। সে সমকামীদের প্রথম ও একমাত্র ম্যাগাজিন “রূপবান” সম্পাদনা করে। প্রতিবছর সমকামীদের অংশগ্রহণে রঙধনু র‍্যালির আয়োজন করে। দুটোর কোনটিই বাংলাদেশের মত দেশের প্রেক্ষাপটে কম সাহসী কাজ নয়। রঙধনু র‍্যালি থেকে চারজন সমকামীকে পুলিশ গ্রেফতার করলে, সে থানায় গিয়ে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। সেই দিক থেকে, সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আন্দোলনে জুলহাস মান্নান একজন অগ্রনী পথিক এবং অবশ্যই প্রথম শহীদ আন্দোলনকর্মী। তার বন্ধু মাহবুব তনয়ও এই আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। বাংলাদেশের এলজিবিটিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম দুই শহীদ হিসেবে তাদের নাম বেচে থাকবে। ইতিহাস তাদের স্মরণ করবে। একইসাথে ইতিহাস আওয়ামীলীগ সরকারের ভূমিকাও মনে রাখবে। ২০১৩ সালে নাস্তিক ব্লগারদের গ্রেফতার করে ও তাদেরকে ছিচকে চোর বা সন্ত্রাসীর মত মিডিয়ার সামনে হাজির করে (ল্যাপটপ- কম্পিউটার- কিবোর্ড নামক অস্ত্র-শস্ত্র সমেত) ২০১৫ সালের ধারাবাহিক নাস্তিক ব্লগার খুনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, একইভাবে ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল ৪ জন সমকামীকে গ্রেফতার করে ২৫ এপ্রিলে ২ জন সমকামী আন্দোলনের কর্মীকে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

সমকামীদের প্রতি ইসলামপন্থীদের রাগটা নতুন নয়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিত রায়কে হত্যা করা হয়েছিল যেসব কারণে তার অন্যতম ছিল- তার ‘সমকামিতা’ নামের বইটি। ২০১৩ সালে সরকারকে ইসলামপন্থী দলগুলো যেকজন নাস্তিক লেখক, ব্লগারের নাম দিয়েছিল- সেখানে অভিজিত রায়ের নাম ছিল এবং তার নাম রাখার কারণ হিসাবে তারা বলেছিল- অভিজিত রায় বাংলাদেশে সমকামিতাকে উৎসাহিত করছে। ফলে, সমকামিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা বই এর জন্যে এর লেখককে যেমন তারা সহ্য করতে পারেনি, একইভাবে সমকামিতা বিষয়ে প্রথম ও একমাত্র ম্যাগাজিনের সম্পাদককেও তারা সহ্য করতে পারবে না। তারা শিয়াদের সহ্য করতে পারে না, কাদিয়ানিদের সহ্য করতে পারে না, নাস্তিকদের সহ্য করতে পারে না, মূর্তি পুজারিদের সহ্য করতে পারে না, সেতারবাদক অধ্যাপককে সহ্য করতে পারে না, সংস্কৃতিকর্মীকে সহ্য করতে পারবে না, শিল্পী- সাহিত্যিক- নাট্যকর্মী- সিনেমার দর্শক- বিচারক … কাউকেই সহ্য করতে পারবে না। ফলে, তারা বিভিন্ন সময়েই চেস্টা করেছে আঘাত করতে, আক্রমণ করতে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার যদি- তা প্রতিহত করার উদ্যোগ না নেয়, উলটো উৎসাহিত করে- তখনই তার চাইতে ভয়ঙ্কর আর কিছু হতে পারে না। ফলে, এই সমস্ত খুনের চাইতেও সরকারের নিস্পৃহতা, নিস্ক্রিয়তা এবং দায়িত্বহীন বক্তব্যই এই ভয়ের পরিবেশকে বাড়িয়ে তুলতে সহযোগিতা করছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, মুক্তচিন্তার নামে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বিকৃত রুচি ও নোংরা রুচির পরিচয়। এই বক্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
– ব্যক্তি মানুষ হিসাবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রুচি সংস্কৃতি অনুযায়ী এরকম কথা বলতেই পারেন। মুক্তমনারা যখন ধর্মের সমালোচনা করে, যখন ইসলাম, নবী, কোরআন – এর সমালোচনা করে, তখন ধার্মিক ব্যক্তি হিসাবে তার কষ্ট হয়। এতটুকু পর্যন্ত বলাটা ঠিক আছে, যদিও সেই ব্যক্তিগত বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর মত সাংবিধানিক পদে বসে দিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। এরপরে- যখন তিনি মুক্তমনাদের ধর্মকেন্দ্রিক সমালোচনার যৌক্তিক জবাব না দিয়ে ঢালাওভাবে মুক্তমনাদের নোংরা, বিকৃত মানসিকতার মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেন, তাদের লেখাকে ঢালাওভাবে পর্ণ ধরণের বলেন, তখন তার মাঝে প্রচণ্ড অসহিষ্ণু, বিপরীত মতকে গায়ের জোরে তথা ‘গালাগালি’র মাধ্যমেই উড়িয়ে দেয়ার মনোভাব দেখতে পারি। এমন অবস্থান বা ভূমিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে যদিও প্রত্যাশিত নয়, তারপরেও একজন ধার্মিক ব্যক্তির মত হিসেবে দেখতে ও উপেক্ষা করতে পারি। কিন্তু, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরপরে আরো ভয়ানক দুটো কথা বলেছেন! তিনি বলেছেন, তার ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি লেখে তাহলে তিনি তা বরদাশত করবেন না! এটি সরাসরি চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সরাসরি হুমকি। ধর্মের সমালোচনা কারো ভালো না লাগলে, তিনি শুনবেন না বা পড়বেন না! শুনে বা পড়ে ফেললে- সমালোচনার যৌক্তিক জবাব দিবেন, একান্তই সেটা না পারলে- ইচ্ছেমত গালিও দিতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী যে কাজটি করেছেন, কিন্তু ধর্মের সমালোচনা করতেই দিবেন না, বন্ধ করবেন কিংবা ধর্মের সমালোচনাকারীকে শাস্তি প্রদান করবেন- এসব বলে হুমকি দেয়া একরকম স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ, আমাদের সংবিধানে বর্ণিত মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্পষ্ট লংঘন। আর, তিনি একইসাথে বলেছেন, ধর্মের বিরুদ্ধে ‘নোংরা’ কথা বললে যদি কোন অঘটন ঘটে যায়, তবে তার দায় সরকার নিবে না। বাস্তবিক অর্থে এই কথাটি বলার মধ্য দিয়ে সরকার এ পর্যন্ত ঘটা নাস্তিক-মুক্তমনাদের সমস্ত হত্যাকান্ড আক্রমণ এর বৈধতা দিলেন এবং ভবিষ্যতেও নাস্তিকদের যাতে একের পর এক খুন করা হয়- সে ব্যাপারে আমন্ত্রণ, উৎসাহ ও আহবান জানালেন।

প্রধানমন্ত্রীর ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ লিখলে তিনি জানিয়েছেন, তিনি কষ্ট পান; অথচ কারো উপর চাপাতি চললে তো প্রাণবায়ুই নিভে যায়। অথচ, এই কষ্ট পাওয়া, ধর্মীয় অনুভূতি আহত হওয়া, বা আক্রান্ত হওয়া ঠেকানোতে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার যতখানি যচেস্ট, ঠিক ততখানিই দায়িত্বহীন শারীরিক আঘাত বা আক্রমণ ঠেকানোর ব্যাপারে। “ভিকটিম ব্লেমিং” এর মাধ্যমে লেখককে প্রথমে নোংরা, বিকৃত, অসভ্য, অশালীন এসব বলে, তারপরে এসব লেখার জন্যে কোনও অঘটন ঘটলে কোন দায় সরকার নিবে না বলার মাধ্যমে বাস্তবে, এই বার্তাই দেয়া হয় যে, এরকম অসভ্য, অশালীল, নোংরা, পর্ণ টাইপের লেখার জন্যে, লেখককে যেকোন অঘটনের সম্মুখীন হওয়ার দায় নিজেকেই নিতে হবে (বাস্তবে লেখক খুন হত্যা আর অঘটন নয়- নৈমত্তিক ঘটন হয়ে দাঁড়িয়েছে), অর্থাৎ প্রকারান্তরে এই বলে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গী খুনীদের উৎসাহিতই শুধু করলেন না- নিজেদেরকেও এইসব খুনের সমর্থক, উৎসাহদাতা, পরামর্শদাতা, ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন, শেখ হাসিনা সরকার নিজেদের খুনী সরকার হিসাবেই পরিচিত করলেন।

বাংলাদেশের সরকার প্রধানের এই বক্তব্য কি মুক্তমনা ব্লগারদের আরো সঙ্কটে ফেলবে?
– ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা নাস্তিক ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের হত্যা করা হচ্ছে, নানারকম তালিকা দিয়ে, একরকম বলে কয়েই এই হত্যাকাণ্ডগুলো চলছে, অথচ আজ পর্যন্ত খুনীদের ধরা, এইসব জঙ্গীদের চিহ্নিত করা ও তাদের সমূলে উৎপাটন করা এবং হুমকিতে থাকা ব্লগারদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা- এই কাজগুলোর সামান্য কিছুই সরকার করেনি। উল্টো, সরকার প্রতিটি হত্যাকান্ডের পরেই ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ করেছে, অর্থাৎ নাস্তিক মুক্তমনা ব্লগারদের লেখাকেই দোষারোপ করেছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনেছে এবং ‘সীমা লঙ্ঘন’ না করে লেখার নির্দেশ দিয়েছে। একইসাথে সরকার দেশের আইএস, আলকায়দা বা আনসার আল-ইসলাম এর মত জঙ্গীদের সংগঠিত উপস্থিতির কথা সবসময়ই অস্বীকার করেছে, প্রতিটি ঘটনার পরে আনসার আল- ইসলাম বা আল কায়দার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখার কিংবা আইএস এর তরফ থেকে দায় স্বীকার করা হলেও, আইএস এর মুখপাত্রে দাবিক এর সর্বশেষ সংখ্যায় আইএস বা খেলাফতের বাংলাদেশ শাখার আমিরের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলেও, সরকার তাদের অস্তিত্ব খুজে পায় না। আমাদের সরকারের এই কাজগুলো, অর্থাৎ খুনী জঙ্গীদের ধরে বিচারের আওতায় না নিয়ে এসে উল্টো জঙ্গীদের আড়াল করা এবং যারা খুন হচ্ছে তাদেরকেই, তাদের লেখাকেই হত্যার জন্যে দোষারোপ করা- বস্তুত আজকের এই পরিস্তিতিকে এই জায়গায় নিয়ে আসার জনে দায়ী। ব্লগারদের আজকের এই চরম সংকটের পেছনে সরকারের চুড়ান্ত ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতা দায়ী। সেই একই ধারাবাহিকতায় সরকার প্রধান শেখ হাসিনার বক্তব্য, ব্লগারদের সংকটকে আরেকটু বাড়িয়ে তুলবে বৈকি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নাস্তিক, মুক্তমনা লেখক, ব্লগারদের এইরকম হত্যা-খুনকে বৈধতা প্রদান করেছে এবং খুনীদেরকে সরাসরি একরকম আহবান জানিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন, ধর্মের নোংরা সমালোচনাকারী- ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী মুক্তমনা ব্লগারদের খুন করার ব্যাপারে। নাস্তিকদের ফাসীর দাবিতে আন্দোলন করা এবং নাস্তিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে আহবান জানানো হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শফিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফলে, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য খুনীদের আগের চাইতেও আরো অনেক তৎপর করবে, ব্লগারদের অবস্থা আরো অনেক সংকটাপন্ন হলো।

জুলহাস মান্নানের হত্যার পরে তাদের কমিউনিটির অনেকেই এবং লেখক ব্লগাররা আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশে এখনো যারা এরকম হুমকির সাথে জীবন যাপন করছেন, তাদের ব্যাপারে আপনার কোন পরামর্শ আছে?

এখন অবস্থাটা এমন যে, বাংলাদেশে কে নিরাপদ খুজে পাওয়া মুশকিল! সরকার যদি নিরাপত্তা বিধান করতে না পারে, কিভাবে জনগণ তার নিজের জীবন রক্ষা করবে? জনগণকে নিজের জীবন রক্ষায় কি পরামর্শ দিতে পারি আমি? আমার অভিজ্ঞতা উপরে বলেছি- চার দেয়ালে বন্দী জীবন কাটানো এবং সুযোগ পেলে দেশ থেকে পালানো- এইরকম পরামর্শ দিবো? সকলের পক্ষে সেটা সম্ভব? আমার অফিসের যে গাড়ি আমি পেয়েছি, সেটা কতজন চাকুরিজীবি পায়? বাদুড়ঝোলা বাসে সন্ধ্যায় রাতে বাসায় ফিরতে হয়- এরকম সহব্লগার বন্ধু আমাকে যখন বলে- তার বৃদ্ধ পিতামাতা ও ছোট বোন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বিধায় চাকুরি ছাড়াও সম্ভব নয়, তখন তাকে কি পরামর্শ দিবো খুজে পাইনি। নিজ দেশে স্বেচ্ছাবন্দী জীবন কাটানোর মধ্যে মানসিক যন্ত্রণা আর কি আছে! জীবন হাতে নিয়ে দেশ থেকে পালানো যে কতখানি কষ্টের, তা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। এই পরামর্শ দিবো! কতমানুষ দেশ ছাড়বে? কোথায় যাবে? আমি জানি না, এই ভয়ের পরিবেশ থেকে বাচতে কি পরামর্শ দিতে পারি। শুধু এটুকু বুঝি যে- পালিয়ে ও স্বেচ্ছাবন্দী থেকে কিছু পাল্টাবে না। জোট বাঁধতে হবে ও প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। সরকারকে তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে।

আপনার পরিচয়টি বলবেন? মানে, কি হিসেবে এই সাক্ষাতকারে আপনাকে পরিচিত করা হবে?
আমি একজন প্রকৌশলী। একজন লেখক, একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য। একজন প্রামান্যচিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্র কর্মী। কিন্তু যে কারণে আমি আক্রান্ত, নির্বাসিত- সেই পরিচয়টিই এখন আমার কাছে মুখ্যঃ “নাস্তিক ব্লগার”।

[বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়েছি। পত্রিকায় তাদের পলিসি এবং স্থান- সংকুলান- সব কিছু মিলে পুরাটা বক্তব্য আসে না। সর্বশেষ দুটো মিডিয়ায় দেয়া সাক্ষাৎকারের প্রধান প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষিতে আমার জবাব ব্লগে প্রকাশ করছি।]

২ thoughts on “সাক্ষাৎকারঃ আমার পরিচয়- আমি একজন “নাস্তিক ব্লগার”

  1. সামুতে আপনার লেখা মূল্যবান
    সামুতে আপনার লেখা মূল্যবান অনেকগুলো ব্লগ এখন আর নেই। সেগুলো পাওয়ার ব্যবস্থা কী?

  2. বাংলাদেশ ধর্মের বিষবাষ্পে
    বাংলাদেশ ধর্মের বিষবাষ্পে হেরে গেছে। যে দেশ চিন্তাশীলদের দেশের মাটিতে নিরাপত্তা দিতে পারেনা, তার মত অভাগা দেশ নাই। অসহায় দেশটার জন্য খুব কষ্ট হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *