নিঃসন্দেহে মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ঠিক কথাই বলেছেন

২৪ এপ্রিল ২০১৩ একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। না শুধুমাত্র ভবন ধ্বসে একশো বা অজানা সংখ্যক শ্রমিক মারা যাওয়ার কারনে নয়। কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ভয়াবহ একটি দুর্ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা আর দায়িত্তপ্রাপ্ত ব্যক্তিবরগের অবদানের কথা মনে রেখে। আবার পাশাপাশি গৌরবের দিন হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে সাধারন মানুষের একতাবদ্ধ হয়ে বিপদে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসার কথা মনে রেখে। যারা এই মহা বিপদের মুহূর্তে নিজেদের জান জীবন বাজী রেখে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তারা অবশ্যই জাতীয় বীর। সাভার ট্রাজেডির বীর। এই জাতী তাদের মনে রাখবে বহু বছর।

ভাবার জন্য কিছু প্রশ্ন উঠানোই যায়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানাটা সবার জন্যই খুব জরুরী।

দুর্ঘটনার দিনে – কি হত যদি
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খবর পাওয়ার সাথে সাথে সাভার দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে ছুটে যেতেন?
রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান না হত?
সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাভার ট্রাজেডি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করার এক পর্যায়ে না বলতেন যে সাভারে ধ্বসে পড়া ভবনে অল্প কিছু লোক তাদের মালামাল উদ্ধার করতে গিয়েছিল? অল্প কিছু লোক? তাদের বেশির ভাগ কেন নারী? নারীরা তাদের কি মালামাল উদ্ধার করতে গিয়েছিল সেখানে?
বিরোধী দলীয় নেত্রী ঢাকায় বসে গভীরভাবে অবস্থা পর্যবেক্ষণ না করে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যেতেন?
বিরোধী দলের হরতাল না থাকতো অথবা দুপুর দুইটার পরিবর্তে সকাল নয়টায় খবর শোনার সাথে সাথে হরতাল প্রত্যাহার করতো?
মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বিল্ডিং ধ্বসে পড়ার অন্যতম কারন হিসেবে বিরোধী দলের দিকে আঙ্গুল না তুলতেন?
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
কিভাবে যেসব ষণ্ডা পাণ্ডা গুণ্ডা দুর্নীতিবাজদের দৌড়ের উপর থাকার কথা তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতা হয়? তারা কিভাবে বড় বড় পদে নিয়োগ পায়?
কেন যে কেউ সরকারি জায়গা দখল করতে পারে?
ষণ্ডা পাণ্ডা গুন্ডাদের সমন্বয়ে আওয়ামিলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাতের যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং এই ষণ্ডা পাণ্ডাদের জোরে ক্ষমতায় যাওয়া যে দল বা জোটই রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাক তাদের হাতে আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন কি নিরাপদ?
কিভাবে যে কেউ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা না রেখে, রাজউকের অনুমোদন না পেয়ে, বিল্ডিং কোড না মেনে পুকুর এবং ময়লার ভাগাড়ের উপর যেনতেন রকমে বিল্ডিং করার সুযোগ পায়?
২২/২৩ এপ্রিল ফাটল দেখা দেয়ার সাথে সাথে সমস্ত লোকজন সরিয়ে সাভারের রানা প্লাজা সিল গালা করে দেয়া হল না কেন?
সাভারের ইউএনও বিপদ ঘটতে পারে বোঝার পরে প্লাস্টার খসে গিয়েছে বলে ভুয়া রিপোর্ট দিল কেন?
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
রানা প্লাজার মত হাজার হাজার বিল্ডিং তৈরির সময় দুর্নীতি এবং বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বিল্ডিং তৈরি না করায় সেসব বিল্ডিঙে বসবাসরত নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা কে দিবে?
ভবিষ্যতে ফিনিক্স বিল্ডিং, স্পেকট্রাম গার্মেন্টস, হামিম গার্মেন্টস, তাজরিন গার্মেন্টস, রানা প্লাজার মত আর কোন বিল্ডিং কি ভাঙবে অথবা মালিকের অতি লোভের শিকার হয়ে আগুনে পুড়ে শ্রমিক মারা যাবে?
এর আগে ধ্বসে পড়া প্রত্যেকটা বিল্ডিঙের ডিজাইন থেকে শুরু করে নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্তপ্রাপ্ত দোষী লোকজনের দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি হয়নি কেন?
গার্মেন্টসে হওয়া প্রত্যেকটি দুর্ঘটনার জন্য দোষী ব্যক্তিদের রাষ্ট্র আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখে কেন?
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
কি হত যদি –
বন্ধু কল্লোল মুস্তফার স্ট্যাটাসে জানা যেত যে রাতের অন্ধকারেও খুব ভাল উদ্ধার কাজ চলছে? কিংবা তার স্ট্যাটাসে এটা না আসতো যে “অন্ধকার হয়ে গেছে, ভবনের পেছনের দিকে উদ্ধার কাজের কোন ব্যবস্থা নেই, ফায়ার ব্রিগেডের কাছে উদ্ধার কাজ চালানর মত একটা টর্চও নেই, উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত জেনারেটরের তেল প্রায় শেষ, পাবলিকের কাছ থেকে টাকা তুলে ৫০/৬০ টি টর্চ কেনা হয়েছে” ?
হাজার হাজার মানুষ তাদের যার যা সামর্থ্য তাই নিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে না দাঁড়াত?
হাজার হাজার সচেতন মানুষ, ছাত্র, তরুন, তরুণীরা খবর পাওয়ার সাথে সাথে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে না যেত? রক্ত সরবরাহ না করতো? যদি রাষ্ট্রের মত দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলত?
——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
কত টাকা লাগতো উদ্ধার কাজের জন্য পাথর কাটার যন্ত্র, স্ল্যাব কাটার যন্ত্র, রড কাটার মেশিন, পাথর ফুটো করার মেশিন এবং
এগুলো চালানর জন্য হেভি ডিউটি জেনারেটরের ব্যবস্থা করতে?

অনেকেই জানেন সম্প্রতি রাশিয়া থেকে ৮০০০ কোটি টাকার সামরিক অস্ত্র সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বা কেনার জন্য চুক্তি হয়েছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র না কিনে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় বন্ধ করে ঘনবসতি পূর্ণ এই রাষ্ট্রের সাধারন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম কেনা কোন কঠিন কাজ ছিলনা। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এই রাষ্ট্র আজকে রানা প্লাজার ধ্বসে পড়া সামাল দিতে পারছেনা প্রয়োজনিয় সরঞ্জামের অভাবে। তাহলে ভুমিকম্পের ঝুকির তালিকায় থাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যাপক ঘনবসতি পূর্ণ ঢাকা শহরে যদি সেরকম কোন ভুমিকম্প হয় সেক্ষেত্রে উদ্ধার কাজ চালানর মত প্রয়োজনীয় লোকবল, সরঞ্জাম এবং প্রস্তুতি আছে কিনা তা সহজেই বুঝা যায়।

এক একটি বড় বিপদ আমাদের সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন নিয়ে আসে। আমরা শতশত প্রানের বিনিময়েও এই সত্য বুঝতে পারিনা যে এই রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র না। এই রাষ্ট্রে যারা দেশপ্রেমিক, রাজপথের শ্রমিক, ব্লগার তারা অপরাধী হয়ে জেলে থাকে। আর রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে, দুর্নীতি প্রশ্রয় দেয়, ষণ্ডা পাণ্ডা গুণ্ডাদের আম জনতার নেতা বানায়, স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসায়, ফুলবাড়িতে, সুন্দরবনে মাটি-মানুষ-প্রকৃতি ধ্বংসকারী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশীদের সাথে চুক্তি করে আর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার সাথে সঙ্গতিহীন রাজনৈতিক দল ও তাদের চ্যালাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয়। মুক্তভাবে মত প্রকাশের অপরাধে ব্লগারদের নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে যদি জেল খাটতে হয় তাহলে এইসব দুর্নীতিবাজ খুনি গার্মেন্টস মালিকদের কি হওয়া উচিৎ জনগন নিশ্চয়ই সে বিচার করবে।

মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অবশ্যই ঠিক কথা বলেছেন। বিরোধী দলের কতিপয় সদস্যরা ফাটল ধরা পিলার এবং গেট ধরে নাড়াচাড়া করার কারনে বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়েছে। মাননীয় মন্ত্রীর কথা ঠিক, এই কারনে যে একটি ভবনের পিলারে যখন ফাটল ধরে তখন হালকা নড়াচড়ায় ভবন ভেঙ্গে পড়ে। তেমনি এই রাষ্ট্র, রাষ্ট্র কাঠামো, অত্যাচারী শাসক শ্রেণীর ভীত বহু বছর ধরে পড়ে যাবার মত নড়বড়ে হয়ে আছে। কিন্তু পড়ছেনা। মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী প্রকারান্তরে আমাদের সেটিই শিখিয়ে দিলেন। নিপীড়িত জনগন ঐক্যবধ্য হয়ে সেই নড়াচড়ার কাজটি সম্পন্ন করবে এবং এখানে জনগণের রাষ্ট্র কায়েম হবেই।

৬ thoughts on “নিঃসন্দেহে মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ঠিক কথাই বলেছেন

  1. এক একটি বড় বিপদ আমাদের সামনে

    এক একটি বড় বিপদ আমাদের সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন নিয়ে আসে। আমরা শতশত প্রানের বিনিময়েও এই সত্য বুঝতে পারিনা যে এই রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র না। এই রাষ্ট্রে যারা দেশপ্রেমিক, রাজপথের শ্রমিক, ব্লগার তারা অপরাধী হয়ে জেলে থাকে। আর রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে, দুর্নীতি প্রশ্রয় দেয়, ষণ্ডা পাণ্ডা গুণ্ডাদের আম জনতার নেতা বানায়, স্বার্থপর, দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসায়, ফুলবাড়িতে, সুন্দরবনে মাটি-মানুষ-প্রকৃতি ধ্বংসকারী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশীদের সাথে চুক্তি করে আর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার সাথে সঙ্গতিহীন রাজনৈতিক দল ও তাদের চ্যালাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয়। মুক্তভাবে মত প্রকাশের অপরাধে ব্লগারদের নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে যদি জেল খাটতে হয় তাহলে এইসব দুর্নীতিবাজ খুনি গার্মেন্টস মালিকদের কি হওয়া উচিৎ জনগন নিশ্চয়ই সে বিচার করবে

    দারুন লিখসেন ভাই।

  2. আপনার লেখার গুনগত মান দিন দিন
    আপনার লেখার গুনগত মান দিন দিন চমৎকার হচ্ছে। আপনাকে দিয়ে হবে ভাই। কি-বোর্ড ফাটাতে থাকেন। পাশে আছি।

  3. ধারালো বক্তব্য।
    “নিপীড়িত জনগন

    ধারালো বক্তব্য।
    “নিপীড়িত জনগন ঐক্যবধ্য হয়ে সেই নড়াচড়ার কাজটি সম্পন্ন করবে এবং এখানে জনগণের রাষ্ট্র কায়েম হবেই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *