বিশ্ব মা দিবসের ইতিহাস এবং বাঙালি চেতনা !!

মানব জাতির সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মা শব্দটির সাথে সবাই পরিচিত | সত্যি পৃথিবীর সর্ববহুল উচ্চারিত, সর্বোত্তম শ্রুতিমধুর একটি অক্ষরের একটি শব্দ, যে শব্দের সাথে অন্য কোনো শব্দের তুলনা হয় না , সে শব্দটি হচ্ছে ‘মা’ | এই শব্দটি এত শান্তির যে নিজের মনের অজান্তেই উচ্চারিত হয় ‘মা’ | সকল দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে দেয় এ শব্দটি | বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ অনুসারেও সৃষ্টিকর্তার পর মায়ের স্থান | এমনকি হিন্দু ধর্মালম্বীরা তাদের দেবতাকে মা বলে সম্বোধন করে | প্রতিটি মানুষের সৃষ্টির মূলে রয়েছে মা | মা বলতেই এক পরম পূজনীয় মানুষ | যুগে যুগে বহু মানুষ মাকে ভালবেসে সবার আদর্শ হয়ে উঠেছে | আমি মনে করি মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জ্ঞাপনের কোন নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই | তাঁর অবস্থান সবসময়ই এক এবং অপরিবর্তনীয় | তবু বিশ্ববাসী মায়ের সম্মানে একটি দিন ঠিক করেছে যা বিশ্ব মা দিবস নামে পরিচিত | আজ সেই বিশ্ব মা দিবস | চলুন প্রথমেই বিশ্ব মা দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক |

কিছু কিছু ইতিহাসবিদের মতে, মা নিয়ে এই দিনটি প্রাচীন গ্রিসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে সূত্রপাত হয় যেখানে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী সিবেল-এর উদ্দেশ্যে পালন করা হত একটি উৎসব | এশিয়া মাইনরে মহাবিষ্ণুব -এর সময়ে এবং তারপর রোমে আইডিস অফ মার্চ (১৫ই মার্চ) থেকে ১৮ই মার্চের মধ্যে এই উৎসবটি পালিত হত |

প্রাচীন রোমানদের ম্যাত্রোনালিয়া নামে দেবী জুনোরপ্রতি উৎসর্গিত আরো একটি ছুটির দিন ছিল, যদিও সেদিন মায়েদের উপহার দেওয়া হত |

মাদারিং সানডের মতো ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বহু আচারানুষ্ঠান ছিল যেখানে মেয়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবার আলাদা করে রাখা হতো | মাদারিং সানডে অনুষ্ঠানটি ছিল খ্রিস্টানদের বিভিন্ন পঞ্জিকার অঙ্গ | ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে বলা হয় লেতারে সানডে যা লেন্টের সময়ে চতুর্থ রবিবারে পালন করা হয় ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতার ও “প্রধান গির্জার” সম্মানে | প্রথানুযায়ী দিনটিকে সূচিত করা হত প্রতিকী উপহার দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রান্না আর ধোয়া-মোছার মত মেয়েদের কাজগুলো বাড়ির অন্য কেউ করার মাধ্যমে |

এছাড়া জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত “মাদার্স ডে প্রক্লামেশন” বা “মা দিবসের ঘোষণাপত্র” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের গোড়ার দিকের প্রচেষ্টাগুলির মধ্যে অন্যতম | আমেরিকান গৃহযুদ্ধ ও ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ১৮৭০ সালে রচিত হোই-এর মা দিবসের ঘোষণাপত্রটি ছিল একটি শান্তিকামী প্রতিক্রিয়া | রাজনৈতিক স্তরে সমাজকে গঠন করার ক্ষেত্রে নারীর একটি দায়িত্ব আছে, হোই-এর এই নারীবাদী বিশ্বাস ঘোষণাপত্রটির মধ্যে নিহিত ছিল |

ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৯১২ সালে “আনা জার্ভিস” স্থাপন করেন মাদার’স ডে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোশিয়েশন্ (আন্তর্জাতিক মা দিবস সমিতি) | এবং তিনিই “মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার” কে “মা দিবস” হিসেবে বহুল প্রচার করতে সক্ষম হন |
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবস হল একটি সম্মান প্রদর্শন জনক অনুষ্ঠান যা মায়ের সন্মানে এবং মাতৃত্ব, মাতৃক ঋণপত্র, এবং সমাজে মায়েদের প্রভাবের জন্য উদযাপন করা হয় | বাংলাদেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে বিশ্ব মা দিবস হিসেবে পালন করা হয় |

কিন্তু এই বর্তমান সময়ে এসে আধুনিকতার দরুন মায়ের প্রতি ভালবাসার যথেষ্ট বিকৃতি ঘটেছে | বিশেষ করে বাংলাদেশে তো সময়ে অসময়ে এমন অনেক ঘটনাই উঠে আসে যে কুলাঙ্গার সন্তানের হাতে মায়ের মৃত্যু | এছাড়া বিশ্ব মা দিবস হিসেবে বাঙালির কর্মকাণ্ড , তাদের চেতনা সত্যি ভীষণ হাস্যকর | বাংলাদেশের শতকরা ৯০% মানুষ এই দিনটিকে পালন করে ফেসবুকে মায়ের প্রতি ভালবাসা জাহির করতে নানা ছবি , স্টেটাস লিখে | কিন্তু আফসোস এসব কিছুই মা অবধি পৌছে না | অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই দিনটা হয়ে উঠেছে মায়ের প্রতি লোক দেখানো ভালবাসা প্রকাশের দিন |
অথচ মা দিবস উপলক্ষ্যে মাকে একটাবার ভালবাসি বলে এমন লোক খুব কম আছে | তাছাড়া সারা বছর মায়ের খবর না নিয়ে শুধু এই দিনে মা নিয়ে দুই একটা কথা বললেই মাকে ভালবাসা হয়ে গেল ! আপনি যদি আপনার মাকে সত্যি ভালবাসেন , তাবে তার গুণ গাওয়ার জন্য এই একটি দিনের প্রয়োজন হবে না , সারা বছরই স্মরণ রাখবেন |

আর একটি কথা মনে রাখবেন , আপনার মাকে আপনি কতটা ভালবাসেন তা আপনি এবং আপনার মা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেই যথেষ্ট | তার জন্য ফেসবুকে স্টেটাস দিয়ে বলে বেড়ানোর প্রয়োজন হবে না |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *