মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটক: “কভি নেহি ‘জয়-বাংলা’ বলতা” (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটক: “কভি নেহি ‘জয়-বাংলা’ বলতা” (প্রথম পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

দৃশ্য—১

[সময়: নভেম্বর, ১৯৭১। স্থান: বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত-অঞ্চল উত্তরবঙ্গের একসময়কার প্রবেশদ্বারখ্যাত ‘নগরবাড়ি-ঘাট’। জিলা: পাবনা।
পাকবাহিনীর টর্চার-সেল। একটি মাঝারি-আকৃতির ঘর। দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে পা উপরের দিকে আর মাথা নিচের দিকে করে অমানুষিক-কায়দায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর তাদের শরীরের বিভিন্নস্থানে সীমাহীন-নির্যাতনের চিহ্ন। তাদের সামনে ছড়ি হাতে পায়চারী করছে এক পাঞ্জাবি-মিলিটারি। আর সে ক্যাপ্টেন পদবীধারী।]

ক্যাপ্টেন: তুমলোগ বাঙালি সব গাদ্দার হ্যায়!
প্রথম মুক্তিযোদ্ধা: বাঙালি গাদ্দার নেহি। বাঙালি কভি নেহি গাদ্দার। গাদ্দার তোর চোদ্দোগোষ্ঠী। আর গাদ্দার তোদের বাপ জিন্না, আইয়ুব, ইয়াহিয়া, ভুট্টো। তোদের সব বাপই গাদ্দার। আর গাদ্দার সব পাকিস্তানী।

(কথাটা শোনামাত্র উত্তেজিত ক্যাপ্টেন ছড়ি চালালো প্রথম মুক্তিযোদ্ধার শরীরে।)
ক্যাপ্টেন: (পায়চারী থামিয়ে, দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধার সামনে এসে উদ্ধতমূর্তিতে) কভি নেহি ‘জয়-বাংলা’ বলতা! বল গাদ্দার, কভি নেহি বলতা ‘জয়-বাংলা’!

দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা: (কষ্টের মধ্যেও ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে) কেন রে গাদ্দারের বাচ্চা গাদ্দার! ‘জয়-বাংলা’ শুনলি বুঝি তোদের আব্বাহুজুর জিন্নার কবরে আজাব হবি? আর তোর বাপ জিন্নার কবরেও বুঝি মুক্তিবাহিনী ঢুকে যাবি?

(ক্যাপ্টেন এবার আরও উত্তেজিত হয়ে আর রাগে একেবারে বেসামাল হয়ে দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধার শরীরের বিভিন্নস্থানে সপাং-সপাং ছড়ি চালাতে থাকে।)

প্রথম মুক্তিযোদ্ধা: (ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে) ক্যাপ্টেন সাব, আমাগরে মারলে বুঝি আপনার জিন্না বাপের কবরের আজাব মাফ হবি! নাকি তার রুহের মাগফিরাতের জন্যি আমাগরে মারতিছেন?
ক্যাপ্টেন: (তার সামনে এসে দাঁত-মুখ খিচিয়ে) চুপ রহো বাঞ্চত! তুমলোগ বাঙালি সব গাদ্দার হ্যায়!
প্রথম মুক্তিযোদ্ধা: আরে, আমরা কীসের গাদ্দার? আমরা তো এই দেশের মানুষের ন্যায্য-অধিকার চাই। আর এখন, আমরা মানুষ তোমাদের মতো কুত্তার সঙ্গে থাকতে না পেরে স্বাধীনতা চাইছি। এই কি আমাদের অপরাধ? আরে, গাদ্দার তো তোদের বাপ জিন্না, গাদ্দার আইয়ুব খান, গাদ্দার ইয়াহিয়া খান, গাদ্দার…।

(কথাটা শেষ করার আগেই ক্যাপ্টেন প্রথম মুক্তিযোদ্ধার পিঠে জলন্ত-সিগারেট চেপে ধরলো। আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।)

ক্যাপ্টেন: (আরেকটি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে) শালা, বাঙালি গাদ্দার! শালা মালাউনকা বাচ্চা!
দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা: নেহি, নেহি, মালাউন আমরা নেহি। মালাউন তোদের বাপ জিন্না। আরও মালাউন তোদের দ্বিতীয় বাপ আইয়ুব খান, আরও মালাউন তোদের তৃতীয় বাপ ইয়াহিয়া খান, আরও মালাউন তোদের চতুর্থ বাপ টিক্কা কসাই খান, আরও মালাউন…।

(এবার হাতের জলন্ত-সিগারেটটা ক্যাপ্টেন দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধার পিঠে চেপে ধরলো।)

দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা: (ভীষণ যন্ত্রণায় কোঁকাতে-কোঁকাতে) জয়-বাংলা! জয়-বাংলা! জয়-বাংলা!

(পাকি-ক্যাপ্টেন দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধার মুখে বুট দিয়ে লাথি মারলো।)

ক্যাপ্টেন: (উত্তেজিত হয়ে) ‘জয়-বাংলা’ মাত কর। কভি নেহি বলতা ‘জয়-বাংলা’।
প্রথম মুক্তিযোদ্ধা: কেন ‘জয়-বাংলা’ বলবো না? ‘জয়-বাংলা’ শুনলে বুঝি তোদের সেনাপতি জেনারেল নিয়াজী-টিক্কা কসাইসহ পাকিস্তানীআর্মির পাতলা পায়খানা শুরু হয়ে যায়। অলরেডি তোদের আরেক আব্বাহুজুর নিয়াজীতো কয়েকবার পায়খানা করে ফেলেছে। (গন্ধ নাকে আসার ভান করে) ওয়াক থু! ওয়াক থু! থুথু!
ক্যাপ্টেন: (ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে প্রথম মুক্তিযোদ্ধার উপর হাতের ছড়ি দ্রুত চালাতে-চালাতে) শালা গাদ্দার বাঙালি, তুমলোগ সব নিকাল যাও। তুমলোগ সব গাদ্দার হ্যায়!
প্রথম মুক্তিযোদ্ধা: (মার খেতে-খেতে) তা আমরা নিকাল যাবো! কিন্তু তোরা কোন জাহান্নামে যাবি? তোদের বাপ জিন্নার জাহান্নামে? নাকি সরাসরি হাবিয়া দোজখে? নাকি তোদের আদি-আসল বাপ ইবলিশ শয়তানের সঙ্গে সবাই একসঙ্গে জাহান্নামে যাবি?

(প্রথম মুক্তিযোদ্ধাকে আরও বেদম প্রহার করতে থাকে ক্যাপ্টেন।)

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৪/০৫/২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *