শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ

১। বাঙলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সম্ভবত তিনটে পথই খোলা। একটি হল ব্যাপক উন্নয়ন এবং ন্যুনতম দুর্নীতি অর্থাৎ সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এমন কাজ করা। এটাই বোধকরি উত্তম পথ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল আজ পর্যন্ত কোন সরকারই এই পথে হাঁটে নি।
আরেকটা পথ হল ‘ডাণ্ডা’। হ্যা ঠিক ধরেছেন জলপাই রঙের ডাণ্ডা। এই পথে হেঁটেছেন জিয়াউর রহমান, হুমো এরশাদ, ফখরুদ্দিনরা।
সর্বশেষ এবং সবচেয়ে কার্যকর পথটি হল ইসলাম। এপর্যন্ত সব রাষ্ট্রচালকরাই কমবেশি এই পথে হেঁটেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার সাইনবোর্ড সেঁটে শেখ মুজিব খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি যদিও তথাপি যা করেছেন তা কম কিছু নয়, ‘জয় বাঙলা’কে খোদা হাফেজে নিয়ে গেছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন করেছেন আরও কত কি! এই পথে তার পরে খন্দকার মোশতাক, জিয়া, এরশাদ, খালেদা সবাই হেঁটেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল রাজনৈতিক ভাঁড় স্বৈরশাসক হুমো এরশাদ। সেনাবাহিনীর ডাণ্ডা দিয়েও যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না তখন ব্যক্তিগত জীবনে তেমন ধর্মচর্চা না করা এই স্বৈরাচারী বাঙলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিরই খতনা করে বসলো। ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বানালো। সেই ক্ষত আজও অক্ষত আছে, শুকোয়নি। দুর্নীতি দুঃশাসন থেকে জনগণের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এ এক মোক্ষম দাওয়াই, অব্যর্থ টোটকা।
রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতা প্রদর্শনের পর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এখন ধর্মীয় মৌলবাদকে দিলখুলে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে তিনি তার বিশেষ দূত পতিত স্বৈরাচারী এরশাদকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন ক্রমান্বয়ে। মৌলবাদ তোষণে সর্বোচ্চ অবস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথে আছেন।
২। ২০০৪ সালে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ধর্মীয় মৌলবাদীরা হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদকে। কয়েকদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে জয়ী হন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা তখন তীব্র নিন্দা জানান। আক্রান্ত হুমায়ুন আজাদকে দেখতে ৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে গিয়েছিলেন। যদিও দেখা করতে দেয়নি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী।
হুমায়ুন আজাদ ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক, ধর্ম ও ধর্মীয় মৌলবাদের কঠোর সমালোচক। সারাদেশের লোক তা জানতো, তার লেখার মাধ্যমেই হোক বা সাঈদীদের ওয়াজের মাধ্যমেই হোক। শেখ হাসিনা কি তা জানতো না? অবশ্যই জানতো। তবুও গিয়েছিলেন। কারণ সেখানে ছিল রাজনীতি, লাভ। হত্যাচেষ্টার বিচারে লাভ ছিলনা, তাই হয়নি।
২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন যখন ফুল ফর্মে তখন ধর্মসমালোচক ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে (থাবা বাবা) গলা কেটে হত্যা করা হয়। সেসময় আগাপাছতলা কিছু না ভেবেই রাজীব হায়দারের বাসায় ছুটে যান শেখ হাসিনা, তাকে ‘শহীদ’ ঘোষণা করেন। খুনিদের শাস্তির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। কারণ এসবে রাজনীতি ছিল, ছিল লাভ। বিচারের কথা নাইবা বললাম।
এরপর বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে, ব্লগার ওয়াশিকুর বাবুকে হত্যা করা হয়েছে, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যা করা হয়েছে, ব্লগার নিলয় নীলকে হত্যা করা হয়েছে, প্রকাশক দীপনকে হত্যা করা হয়েছে, সর্বশেষ একজন সরকার সমর্থক নাস্তিক অনলাইন এক্টিভিস্টকে হত্যা করা হয়েছে। এসব হত্যা কারা করেছে? সবাই জানে এসব কাদের কাজ? সরকার যে জানেনা তা নয়। হত্যার দায় স্বীকার করার পরেও, হত্যাকারী ধরা পড়ার পরেও কোন এক রহস্যজনক কারণে বিচার হচ্ছে না!
৩। বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব নববর্ষ উৎযাপন। ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবাই পহেলা বৈশাখে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরকে বরণ করে। এদিন পারতপক্ষে কেউ ঝগড়াঝাঁটি, বিদ্বেষ, শত্রুমিত্রভেদ করে না। শুধু এদিন কেন যেকোন উৎসবের দিনই মানুষ এসব থেকে বিরত থাকতে চায়।
সেই পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছেন ধর্ম এবং ধর্মসমালোচনা নিয়ে তার বালখিল্যতাপূর্ণ কথাবার্তা। তিনি বলেছেন, ” আমার ধর্ম
সম্পর্কে কেউ যদি নোংরা কথা
লেখে, সেটা কেনো আমরা
বরদাশত করবো?
ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে ধর্মের বিরুদ্ধে
কিছু লিখলেই তারা মুক্তচিন্তার
ধারক! কিন্তু আমি এখানে কোনও
মুক্ত চিন্তা দেখি না। আমি
দেখি নোংরামি।
এত নোংরা নোংরা কথা কেন
লিখবে? আমি আমার ধর্ম মানি,
যাকে আমি নবি মানি তার
সম্পর্কে নোংরা কথা কেউ যদি
লেখে সেটা কখনোই আমাদের
কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি
অন্য ধর্মের যারা তাদের সম্পর্কে
কেউ কিছু লিখলে তাও কখনো
গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা এগুলো
করে তা তাদের সম্পূর্ণ নোংরা
মনের পরিচয়, বিকৃত মনের পরিচয়।
এটা পুরোপুরিই তাদের চরিত্রের দোষ এবং তারা বিকৃত মানসিকতার।
একজন মুসলমান হিসেবে আমি
প্রতিনিয়ত আমার ধর্মকে অনুসরণ
করে চলি। কাজেই সে ধর্মের
বিরুদ্ধে কেউ লিখলে আমি কষ্ট
পাই। ”
এসব লেখার জন্য কোনও অঘটন ঘটলে তার দায় সরকার নেবে না,
উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,
সবাইকেই সংযমতা নিয়ে চলতে
হবে, শালীনতা বজায় রেখে
চলতে হবে। অসভ্যতা কেউ করতে
পারবে না। আর তা করলে তার
দায়িত্ব আমরা নেবো না। ”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসার জন্য।
আপনি যখন ‘আপনি’ তখন আপনার ধর্মের সমালোচনা কেউ করলে আপনি বরদাশত করবেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার কিন্তু আপনি যখন ‘একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘ তখন আপনার বোঝা উচিৎ সেই দেশে আপনার আচরিত ধর্ম ছাড়াও অন্য ধর্ম আছে, ধর্ম না মানা লোকও আছে এবং আপনার সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা এবং চিন্তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।
শালীনতা অশালীনতা সভ্যতা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কোন মেয়ে তার পোশাকে অশালীন তাই তাকে ধর্ষণ বৈধ এটা হতে পারে? কেউ একজন তার কথাবার্তায় অশালীন তাই তাকে হত্যা করা জায়েজ বা তাকে হত্যা করলে দেশের সরকার তার দায়িত্ব নেবে না এই স্টেটমেন্ট দ্বারা হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। তাই তো এতসব হত্যার বিচার হয়না।
শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আরও অভিজিতের রক্তে স্নাত হবে সন্দেহ নেই।
এতদিন অনেক মুক্তমনা, সেক্যুলার শেখ হাসিনাকে নিজেদের পথের অগ্রপথিক জ্ঞানে তার পশ্চাৎধাবন করতো। শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ তাদের ভুল ভাঙ্গানোয়।
এরপরেও যারা শেখ হাসিনার পিছু নেবে তাদের যেন শেখ হাসিনার মাজারের খাদেম হওয়া নসিব হয়। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *