মৃত্যু বিলাস

১।
ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রায় দুই মাইল অন্ধকার পথ দৌড়ে এসে একটা ঝড়া পাতার জমে থাকা স্তুপের ভেতর হুড়মুড় করে সেঁধিয়ে গেলো লোকটি।  ঢুকেই ‘চুপটি’ মেরে পড়ে রইল। তার পেছনে কম করে হলেও দশজন আততায়ী। তিনি জেমস নরউড; আইরিশ একজন রহস্যগল্প লেখক। কিন্তু ক’দিন ধরে তাকে কেউ একজন মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল বার বার বিভিন্ন ভাবে। ঘটনা কী বুঝে উঠার আগেই গতকাল রাতে তার বাসায় হামলাও হয়েছিল রীতিমত। তিনি বাসায় ছিলেন না বলে রক্ষা পেলেন সেবার। তার মাথায়ই আসছে না কার কী এমন ক্ষতি করেছেন তিনি। দেরী না করে তিনি পালিয়ে নির্জন এই জঙ্গলের মধ্যে একটা হোটেলে উঠে গেলেন কয়েকদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে। কিন্তু দু’দিনের মাথায় এখানেও পৌছে গেল তারা। হোটেলের পেছনের জঙ্গল ধরে তিনি পালালেন কোনরকমে। তারা যে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পিছু নিয়েছে এবং খুব কাছাকাছিই আসছে তাও বুঝতে পেরেছেন তিনি। আর দৌড়াতে না পেড়ে এই পাতার ঝোঁপে ঢুকে গেলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারলেন শ্বাস নিতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার, তবে কোনরকমে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে এই যা। হাতে ও মুখে কোনভাবে আঁচড় লেগেছে অনেক, জ্বলুনি শুরু হলো ঘাম ও ভ্যাঁপসা গরমে। কী রকম ধুলোমাখা গুমোট গন্ধ। সাথে কিছু একটা ইঁদুর-বাদুড় পচা গন্ধও আসছে। নাড়িভুড়ি উল্টে আসার জোগাড় হল তার। কিন্তু এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। কতক্ষন এভাবে থাকতে হবে তাও বুঝতে পারছেন না তিনি। ঢিপঢিপ করে উঠানামা করছে বুক। সারা শরীর কুটকুট করে চুলকাচ্ছে। কিন্তু চুলকানো যাচ্ছে না। বিন্দুমাত্র নড়াচড়া যেন না হয় খেয়াল রাখতে হচ্ছে। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, তবে বুঝতে পারছেন ছোট ছোট কোন পোকামকড় তার গা বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে। প্রচন্ড ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠলো তার। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলেন তিনি পোকাগুলিই কামড়াচ্ছে তাকে এবং সাথে বিষাক্ত একটা ব্যাথা সারা শরীরে ক্রমশই বাড়ছে। অথচ কিছুই করার নেই তার দাঁতে দাঁত খিঁচে সহ্য করে যাওয়া ছাড়া।
মনে হচ্ছে অনন্ত কাল ধরে পড়ে আছেন তিনি এই কবরে। তার বুকের ঢিপঢিপানি আর মৃদু খস খস শব্দ ছাড়া পুরোপুরি কবরেরই নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে তিনি আসলে মারা গেছেন। আবার মনে হচ্ছে, নাহ। চোখ জ্বলছে, সারা শরীর গরম হয়ে উঠছে ব্যাথায়।

হঠাৎ সরসর শব্দ করে কেউ দৌড়ে ঢুকলো পাতার স্তুপের ভেতর। তারপরই আবার সব চুপচাপ। চমকে ও ভয়ে হার্টবিট মিস হলো তার। কে? তারা কি তবে এসে গেছে? এইবার তার মৃত্যু? শিরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা  স্রোত বেয়ে গেল তার। নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেলেন তিনি। একদম কাঠ হয়ে থাকলেন। সব চুপচাপ। মিনিট খানেক কিছুই হলো না তার পর। হাঁপ ছাড়লেন তিনি। সাপখোপ কিছু একটা হবে হয়তো; ভয়ের কিছু নেই, মানুষ না।

কুটমুট শব্দ করে হাড় চিবানোর শব্দ হচ্ছে। হঠাৎই খুব বেশী দুর্গন্ধ আসতে শুরু করলো। তার কাছে মনে হল কিছু একটা এসে মরা প্রানীটাকেই খাচ্ছে যেন। এবার আর পারলেন না সহ্য করতে, বমি করে নিজেকে নিজেই ভাসিয়ে দিলেন। অনেক কষ্টে কাশি আটকালেন। চোখে পানি এসে গেলো। তবুও নড়লেন না তিনি। তীব্র দুর্গন্ধ, চোখের জ্বলুনী, অবিরাম বিষাক্ত পোকার কামড়, শরীরে অসহ্য ব্যাথা আর জ্বর নিয়ে গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন তিনি।

২।
শরীরে অসহ্য ব্যাথা নিয়ে ঘুম ভাঙল বদরুল সাহেবের। ডান দিকে ঘার ফেরাতেই দেখলেন নীলা চেয়ার থেকে উঠে আসছে। তাঁর পাশে জোবেদা দাঁড়িয়ে ছিল। জোবেদা বদরুল সাহেবের পার্সোনাল রোবট। নিলা  বিছানার কাছে এসে বলল,
   মামা। এখন কেমন লাগছে তোমার?
   ভালো।
   মোটেই ভালো না। তোমার টকটকে লাল চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
   নাহ। গায়ে একটু ব্যাথা, ঠিক হয়ে যাবে। এবার যে মানুষটার মৃত্যু দেখলাম এত জঘন্য মৃত্যুর অনুভূতি এর আগে হয়নি আমার। হট-টাব শাওয়ার নিব, ব্যাস। ব্যাথা পালাবার রাস্তা খুঁজে পাবে না।
   না, শুয়ে থাকো। আমি ডাক্তারকে সকালে একবার আসতে বলেছি, উনি আসছেন। কিন্তু মামা, তারচে বড় কথা আমি এখন তোমাকে কিছু কথা বলবো।
   কী কথা? বল।
   তুমি এসব কবে বন্ধ করবে?
   কীসের কথা বলছিস?
   এইযে তোমার ভূতপেত্নী খেলা। কীসব ‘ট্র্যাপ-ডিস্ক’ না কী।  
   ও, স্পেসিসবক্স।
   না, স্পেসিসবক্সও না। শুধু ট্র্যাপডিস্ক কেনা বন্ধ কর। তাহলেই হবে। আরো তো কত ডিস্ক পড়ে আছে বাজারে। আর তুমি কিনা এসব কী ছাইপাশ কিনে আনো তিনদিন পড়ে থাকতে হয় বিছানায়। হুঁ?
   হাঃ হাঃ
   হাসছ কেন? হাসির কি বললাম?
   নীলু, তুই এখনো বাচ্চা মেয়ের মত কথা বলিস। আমি তো ‘ট্র্যাপি’ ছাড়া ওসব ফালতু জিনিস পছন্দ করি না, আমার যেটা পছন্দ হবে সেটাই তো ব্যাবহার করা উচিত, তাইনা?
   কিন্তু যেরকম মনে হচ্ছে, দেখবে গভর্নমেন্ট থেকে কবে হুট করে বন্ধ করে দিবে একদিন; বিশেষ করে তোমার এই ট্র্যাপি। তখন? তাছাড়া তুমি যেভাবে দিনের পর দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকো, তোমার একটা কিছু হয়ে গেলে?
   নারে বোকা মেয়ে, ‘ট্র্যাপি’ না হলেই বরং ওটার সম্ভাবনা থাকে। যেকদিন বাঁচি, আমার মত করেই বাঁচতে দে মা।
  কিন্তু মামা জাতিসঙ্ঘ থেকে শুরু করে বড় বড় হিউম্যান রাইটস ও মেডিক্যাল অর্গানাইজেশনগুলো যেভাবে উঠে পরে লেগেছে, যেকোন সময় এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। জানো তো? তখন?
  তখন মানে? বললেই হলো নাকি? কত ত্যাগের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ এই স্পেসিসবক্স প্রতিষ্ঠিত করেছে জানিস না? পৃথিবীতে অন্যান্য রিলাক্সেশান ডিভাইস এবং স্পেসিসবক্স যদি চলতে পারে, স্পেসিসবক্সের অন্যসব ডিস্ক যদি চলতে পারে তবে ট্র্যাপডিস্ক কেন চলবে না? বল।
   মামা, অন্যান্য ডিস্ক দিচ্ছে বিভিন্ন ‘প্রানীর’ মৃত্যুর অনুভূতি, আর ট্র্যাপডিস্ক দিচ্ছে মানুষের। এটাই প্রোবলেম। তুমি জানো, তবুও কেন তর্ক করছ?
   আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম। তাহলে ট্র্যাপি যখন এলো তখনও তো বাধ সেধেছিলো বিজ্ঞানীরা। যখন মানুষ বেঁচে থাকার এই নতুন বিনোদনটি খুঁজে পেলো তখনও তো তারা বলে যাচ্ছিলো, ”এটি স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর এবং লংজিবিটি আইনের বিরুদ্ধে যায়।(ল অব লংজিবিটি প্রতিটি মানুষের মিনিমাম জীবনকাল ১০০ বছর নিশ্চিতকারী আইন।) এই ডিভাইস নিশ্চিতভাবে মানুষের আয়ু কমিয়ে দিবে অনেক। এতে করে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন কন্ট্রোল ভেঙ্গে পড়বে। পপুলেশন ব্যালেন্সড রাখতে না পারলে ঘটে যাবে মহা প্রলয়।” ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে কী হলো? এর সব ধরনের ব্যাবহার ও বাজারজাতকরন নিষিদ্ধ হলো। হয়নি? তারপর আবার কি বৈধতা দেয়নি? তাহলে তখন কেন দিয়েছিলো, হুঁ?
    মামা জানি তো এসব।
   জানি তো কি জানিস তোরা। ইতিহাসে সব লেখা থাকে না। সবকিছুর দায়ভার ইতিহাস নিতে পারে না। ২৭৯০ এর দিকে এসে আচমকাই প্রতিবাদ সরূপ একদল মানুষ হার্ভার্ড ইউনিভারসিটির সামনে একসাথে আত্মহত্যা করে। আছে কোথাও লেখা? দেখাদেখি শুরু হয় বিভিন্ন দেশে। বছরজুড়ে লাখ লাখ লোক মরতে থাকে। আছে কোথাও লেখা? বলা হয় এগুলো মানুষের বানানো কথা। আর আত্মহত্যার এই গণপ্রবনতা ঠেকাতেই ওই বছর সারা বিশ্বে অনেক বাক বিতন্ডার পর স্পেসিসবক্সের বৈধ ব্যাবহারের আইন প্রচলন করে জাতিসঙ্ঘ। অনেক বড় মড়কের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল মানব জাতি এই ট্র্যাপির কল্যানে।
    এহ, কল্যান না ছাই! ঠোঁট উল্টালো নিলা। এমন সময় টিংটং। টিংটং। বদরুল সাহেবের ঘড়িতে নোটিফিকেশন এলো। বিছানার পাশ থেকে ঘড়িটি হাতে নিয়ে দেখলো নিলা, কে এলো। তারপর কাকে ফোন দিতে দিতে চলে গেল।

শাওয়ার শেষ করে নাস্তার টেবিলে আসতেই ওই রহস্য লেখক ভদ্রলোকের কথাটা নাড়াচাড়া করতে লাগল মাথায়। তিনি সাধারণত স্বাভাবিক সময়গুলোতে ট্র্যাপি ট্রুপি ভুলে থাকতে চান, তাই এদিক ওদিক তাকাতাকি করতে লাগলেন। কটা বাজে জানতে ইচ্ছে করল বদরুল সাহেবের। তারচে বড় কথা, আজ কি বার? সোম বার রাতে নিয়েছিলেন তিনি ট্র্যাপ ডিস্ক, হিসেবে বুধ বা বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা। কিন্তু তার ক্ষুধা বোধ হচ্ছে না। জোবেদা এলো কাচের জারে করে জুস নিয়ে। জোবেদা এই বাড়ীর রোবট; কাজের রোবট হা হা হা। মনে মনেই যেন হো হো করে হাসলেন তিনি। কাজেরই বটে। মানুষ তো আর কাজ করে না আজকাল। মুহূর্তেই যেন খুশি খুশি ভাবটা উবে গেল। আজকালকার দিনে সমস্ত কিছুই তাদের দখলে। পারস্পরিক যত্নআত্তির জায়গায় চলে এসছে রোবটের সেবা। একসময় মানুষ দামী মোবাইলফোন, গাড়ী, ঘড়ি কিনে স্ট্যাটাস মেন্টেইন করত, এখন করে রোবট দিয়ে। ছোট্ট করে যেন শ্বাস ফেললেন তিনি । যার যত চাহিদা তার তত রোবট, ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই। যেমন তার জন্য জোবেদাই যথেষ্ট, কিন্তু নিলার সাথে থাকে চারটা রোবট। দিন দিন রোবটের ব্যাবহার মানুষকে কর্মবিমূখ করে দিয়েছিলো সেই কবেই। এই রোবটের প্রতি এতটা নির্ভরশীলতা যে কত ভয়ঙ্কর পরিনতি এনে দিয়েছিল মানুষের জন্য, তা বলাই বাহুল্য।

শুধুমাত্র আনন্দ অবসর কতদিনই আর ভাল লাগে। এক সময় মানুষ একঘেয়েমিতে প্রায় পাগলের মত হয়ে গেল। ঘটতে থাকলো বড় বড় যুদ্ধ, হতে থাকলো মানুষের অবনতি। সে এক দীর্ঘ সময়। ধীরে ধীরে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়লো হাজার হাজার মানসিক রোগ মহামারীর মত। মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ড্রাগস বের হতে লাগলো বাজারে। বেশীর ভাগ ড্রাগসেই ‘প্যারালিন এক্স ফোর’ নামক একটা ইনগ্রেডিয়েন্ট ছিলো, যা ছিল একটি মোস্ট এডিক্টিভ কম্পাউন্ড। ড্রাগসের কল্যানে মানুষ সুস্থ্য হতে লাগলো ঠিকই, কিন্তু আসলেই সুস্থ্য কি? না, পরবর্তীতে কেউ আর ছাড়তে পারেন নি প্যারালিনের এডিকশান। কর্ম কাজহীন সুখী মানুষের এই বিনোদনটি হয়ে উঠলো নিত্যপ্রয়োজনীয়। কত আন্দোলন, কত আদালত পেরিয়ে নতুন আইন হলো। প্যারালিন বৈধতা পেল।

হালকা ক্ষুধা বোধ হচ্ছে তার। জোবেদাকে ‘উইসা’ দিতে বলবেন নাকি? ট্র্যাপডিস্কের ট্রিপ শেষে বা শুরুতে এটা সবচে জনপ্রিয় মেন্যু ট্র্যাপিয়ারদের কাছে। উইসা মঙ্গলের পাখী। এখন অবশ্য সব জায়গায়ই চাষ হয়। তবে ‘উইসা’ জিনিসটা খেতে অতি উত্তম। দেশী কবুতরের মত স্বাদ। খানিকটা ঝাল বেশী দিয়ে খেতে অসাধারন লাগে। রহস্য লেখক মিঃ নরউডের ভুত যেন আবারো খোঁচাচ্ছে; কিরকম একটা অস্থিরতা, তাড়াহুড়া টের পেলেন নিজের মধ্যে। তিনি গলা চড়িয়ে ডাকলেন, 
    জোবেদা। জোবেদা। নাস্তা দিতে কতক্ষণ লাগে? এই নীলা, কোথায় তোরা?

নাস্তা শেষ করে নিজের রুমে ফিরলেন তিনি। জোবেদাকে নোটিফাই করে রেখেছেন নীলা এলেও যেন এবার ডিস্টার্ব না করা হয়। তারপর রুম লক করে আবার বসলেন তার রিলাক্সেশন চেয়ারে। হেলমেটটা মাথায় তুলে নিলেন, সুইচ অন্য করতেই একটা মৃদু ঘোঙ্গানির মত শব্দ করে ঘাড়ের পেছনে ও চোখের ওপর একটু চেপে বসল ওটা। ঘুমের মত কোথায় যেন তলিয়ে গেলেন বদরুল সাহেব সেকেন্ড দশেকের মধ্যে।

৩।
কতক্ষন অজ্ঞান ছিলেন বুঝতে পারলেন না, জ্ঞান ফিরতেই বুঝতে পারলেন ডান হাতের আঙ্গুলে কিছু একটা কামড়াচ্ছে। হেঁচকা টান দিয়ে হাতটা আনতেই দেখতে পেলেন ইঁদুরের চেয়েও ছোট্ট এক ধরনের একটা প্রানী তার মধ্যমা আঙ্গুলে ছয় পা পেঁচিয়ে দাঁড়ালো দাঁত দিয়ে আঙ্গুলের মাংস কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে আর টপটপ করে রক্ত ঝড়ছে। সাথে সাথেই তিনি আরো বুঝলেন যে, তার শরীরের আরও বিভিন্ন জায়গায় এরকম কামড়াচ্ছে; যেন তাকে জ্যান্ত ছিঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলেন তিনি। পাতার স্তুপ থেকে সরে এসে হাত দিয়ে ধরে ধরে ফেলতে লাগলেন একটার পর একটা তার শরীরে কামড়ে থাকা মাংসাশীগুলোকে আর চিৎকার করতে থাকলেন। এরই মধ্যে তার মাথায় এলো তার পেছনে মৃত্যু ঘুরছে। সে দৌড়াতে শুরু করলো আবার। কিন্তু ততক্ষণে যা ভুল করার করে ফেলেছেন। আততায়ীরা আশেপাশেই ছিলো।

এলোমেলো দৌড়াদৌড়ির পাঁচ মিনিটের মাথায় তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হলেন যে তিনি ধরা পড়ে গেছেন। শরীরের অসহ্য ব্যাথা নিয়ে দৌড়াতেও পারছিলেন না, শেষ চেষ্টা হিসাবে একটা মোটা গাছের আড়ালে ধপাস করে বসে পরলেন। যতটুকু পারা যায় এদিকওদিক চোখ রাখতে লাগলেন। মাথা ঘুরছে বনবন করে। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন ইয়া বড় একটা হাতুড়ি দিয়ে বুক ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে। গলা এতই শুকিয়েছে যে ঢোঁক গিলতে গিয়ে দম বন্ধ হবার যোগার হল কয়েকবার। কামড়ের জায়গাগুলি থেকে রক্ত ঝড়ছে গলগল করে। ওপাশের ঝোঁপে ওটা কী? জ্বলজ্বল করছে দু’টি চোখ। বাঘ? নাকি নেকড়ে? সরসর করে সারা শরীরের রোম দাঁড়িয়ে গেলো তার। আর ঠিক তখনই প্রচন্ড জোড়ে তার পেটে কেউ একজন লাঠি দিয়ে বাড়ি মারলো। বিদ্যুৎ চমকের মত চমকে উঠলো তার চারপাশ, তারপর সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘোঙাতে লাগলেন তিনি। দশ সেকেন্ড বিরতিতে শুরু হলো ধারালো অস্ত্রের কোপ; হাত, পা, শরীর, মাথায়। দু’তিনবার কেঁপে কেঁপে উঠলো তার পুরো শরীর তারপর নাক আর মুখ দিয়ে সাদা ফেনা ভেঙ্গে নিথর হয়ে গেলো তার দেহ।
 
মৃত্যুর একটু আগে কিছুক্ষণের জন্য তার জ্ঞান ফিরলো, না ফেরাই উচিত ছিলো। তিনি নড়তে পারছেন না। খানিক দূরে চার পাঁচটি নেকড়ে একটি মাংসখন্ড নিয়ে টানা হেঁচড়া করছে। তিনি বুঝতে পারলেন না ওটা কি তারই হাত বা পা কিনা। কানে কেবল শোঁ শোঁ আওয়াজ হচ্ছে। পুরো দুনিয়াটা দুলছে ক্রমাগত। একসময় শ্বাস আটকে এলো তার। মনে হচ্ছে গলা ও শ্বাসনালীতে রক্ত ঢুকেছে। বুক ফেটে যাচ্ছে একটু অক্সিজেনের অভাবে। চোখ ফেটে রক্ত বেরুবার জোগার হলো। ভেতরে ভেতরে দম আটকে পাগলের মত হাঁপড়ে মরছেন তিনি। অথচ ছিন্ন ভিন্ন দেহটা একটুও নড়ছে না, ততটুকু শক্তি নেই এই মুহূর্তে। এক সময় গলগল করে মুখ দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। আকাশ, মাটি পাহাড়, নদী, গাছপালা সব ভেঙ্গে পড়লো যেন তার উপর। লকলকে আগুন যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকেসহ পুরো দুনিয়াটাকে। কিন্তু সব অন্ধকার। এরপর কেউ যেন আচমকাই হেঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলল তার কলজেটা। পর পর দু’বার নাকমুখ দিয়ে কালো রক্ত ছিটকে বেরুলো তার। তারপর, সব শেষ। 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *