চৈত্র সংক্রান্তিঃ বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক খন্ডচিত্র।

যে পুকুরটায় সকাল বেলায় মুখ ধুতাম ঘাটটা ছিল পুকুরের পশ্চিম-দক্ষিন কোনায়। সেটা মসজিদের ঘাট এবং তার পাশে কবরস্থান। মসজিদের পঞ্চাশ গজ পুর্বেই ছিল মঠ আর চিতা। পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আমাদের বাড়ী পুর্বপাড়ে হিন্দুদের তারা পুকুরের পুর্ব পাড়ের ঘাটটা ব্যবহার করতো। এলাকায় আরো মুসলমান বাড়ী ছিল যারা নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে এখানে উদ্বাস্তু হয়ে বসতি গড়েছে তাদের চাইতে হিন্দুদেরকে বেশী আপন মনে হতো, কাছের মনে হতো। পুকুরের উত্তর পাড়ে ছিল প্রাইমারি স্কুল; যেটাতে আমি পড়তাম তখন। আমার সহপাঠি বন্ধুদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু।

চৈত্র সংক্রান্তিকে আমরা বলতাম ‘হরব’। রিউমার ছড়ানো ছিল হরবের আগে আম খাওয়া যাবেনা তাতে পেট খারাপ হয় কিন্তু এর পরে নিশ্চিন্তে খাওয়া যাবে। এমনকি হরবের দিনে বাদি গাছের ফল সাথে না ছুঁয়ে আমের লেজ খেতে পারলে বিদ্যা বুদ্ধি বাড়ে। কথাটা যেমনি ভাবে আমরা বিশ্বাস করতাম, হিন্দু বন্ধু গুলোও তাই মানতো।

মেয়ের স্বামীর বাড়ীতে ঈদের সময় যেমন করে উপড়োকন পাঠানো হয় চৈত্র সংক্রান্তিতেও এর ব্যতিক্রম করা যেতোনা। নয়তো মেয়েটাকে শ্বশুর বাড়ীর লোকজনের কথা শুনতে হবে। সে উপড়োকনটাও ছিল হিন্দুদের মতো করে খই, মুড়ি, চিড়া, গুড়, নাকিকেল ইত্যাদি। একটু সামর্থবানরা জামাইয়ের জন্য লুঙ্গী পাঞ্জাবীও পাঠাতো। জামাইয়ের দাওয়াতও বাদ পড়তোনা সংক্রান্তি উপলক্ষে, তারাও নানা ব্যাস্ততার মাঝেও শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে দেখাটা অন্তত করে যেতো।
ছোটদের জন্য সব চেয়ে মজা ছিল শিবের গাজন। শুরু হতো চৈত্র সংক্রান্তির অনেক আগ থেকেই। সেখানে একজন শিব সাজতো একজন গৌরী সাথে আরো অনেকে থাকতো বিভিন্ন বেশে। সাথে বাদক দল, গান না হলেও বাদ্যের তালে তালে প্রচুর নাচ হতো। আমরাও খেলাধুলা ছেড়ে ছুটতাম ঐ দলটার পিচু পিচু।
ঐ স্থানীয় দলটাই রাতের বেলায় যাত্রার আয়োজন করতো। আজকে এ বাড়ীর উঠানতো কাল ও বাড়ীর। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো দর্শক মাঝখানে চলতো অনুষ্ঠান। অনেক রাত অব্দী চলতো বলে আমাদের খুব বেশী থাকা হতোনা। হিন্দুদের নানা রকম ধর্মীয় বিষয়কেই তার জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা করতো।

চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে মেলা হবার মতো অবস্থা এলাকায় ছিলনা। মেলা হতো অনেকটা দুরে ছোট ছিলাম বলে যাওয়া হতোনা। তবে একটা ব্যাপার ছিল, ঘুড়ি উড়ানো। সারা বছর যত ঘুড়ি বানাতাম তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঘুড়িটা রেখে দিতাম এ দিনে উড়াবো বলে। মাঝে মাঝে বাবাও ঘুড়ি বানিয়ে দিতেন, সাথে থেকে উড়াতেনও। সুতায় ভাতের মাড় মাখা হতো কাটা কাটি খেলবো বলে। ঐ খেলায় আমন্ত্রিত হতো হিন্দু বন্ধুরাও। ভোঁকাট্টা হলেতো ছুট্ তেপান্তরে। একটা দলই থাকতো ঘুড়ি কুড়ানোর, এ বাড়ীর টিনের চালে ঘুড়ি হলে সুতা পড়ে থাকতো অন্যবাড়ীর কড়ই গাছে।
হিন্দু বাড়ীতে আমাদেরকে নিমন্ত্রনের কোন ব্যাপার ছিলনা এতো। আমরাও দাওয়াত করতামনা। এতো মনের মিল ছিলযে নিমন্ত্রন দেয়ার প্রয়োজনই পড়তোনা কখনো, তারাও আসতো যখন তখন। এমনকি তাদের নানা রকম সবজি দিয়ে নিরামিষ রান্নার কিছু অংশ আমাদের বাড়ীতেই আসতো। যেটা মহিলাদের জন্য যারা যাবার সুযোগ পায়না কিংবা যেতে চায়না, আমরা তো খেয়েই আসতাম। সারাদিন ঘুরতাম এ বাড়ী ও বাড়ী।

পাঁচনের বিষয়ে কিংবা বছরের শেষ দিন একটু ভিন্ন বা কড়া কিছুতে প্রথম চয়েজ ছিল বিষ কচু। অনেক কড়া কচু, গলা ধরাতে উস্তাদ। খাওয়ার আগেও এর ঝাঁঝ টের পেতেন মা কিংবা আপুরা। কাটা-ধোয়ায় প্রচুর হাত চুলকাতো আবার সেটা পাটায় বেটেও নিতে হতো। কিন্তু এ পাঁচন ছাড়া বাবা বছর শেষ করবেন তা ভাবাও যায়না। আমরাও পথ্য হিসেবে খেতাম একটু একটু করে, এতে নাকি আগামী বছর রোগ শোক কম হয়।

চৈত্র সংক্রান্তি হিন্দুদের অনুষ্ঠান নাকি মুসলমানদের অনুষ্ঠান এটা কখনো কেউ চিন্তা করেনি। ভেবেছে এটা বাঙালীর ঐতিহ্য। আজও সে হিসেবেই পালন করে মানুষ। টিকে থাকুক ঐতিহ্য, টিকে থাকুক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

১ thought on “চৈত্র সংক্রান্তিঃ বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক খন্ডচিত্র।

  1. নাইস পোস্ট। আমি ব্যক্তিগতভাবে
    নাইস পোস্ট। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সাম্প্রদায়িকতার বীজ ধর্মের থেকে মানুষের কলুষিত এবং স্বার্থান্বেষী মনে বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *