‘বাংলা নববর্ষ’, ‘পহেলা বৈশাখ’, ‘বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশীদের প্রাণের উৎসব’ এবং ‘বঙ্গাব্দ অথবা বাংলা সন’ এর আদ্যোপান্ত!


আমাদের দেশটা একটা অদ্ভুত সুন্দর আর মায়াময় দেশ। ভাষার নানা বৈশিষ্ট্য অদ্ভুত (ফিক্সড ট্রাকচার নেই অথবা অনেক ফ্লেক্সিবল। যেমন, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’, ‘তোমাকে ভালোবাসি আমি’, ‘আমি ভালোবাসি তোমাকে’, এর সবই সঠিক), মানুষগুলা অদ্ভুত (বাঙ্গালীদের মধ্যে বেটে, খাটো, মাঝারী, বেশ লম্বা, কালো, শ্যামলা, ফর্সা, নাক বোঁচা, নাক ঊঁচু সহ সব বৈশিস্টের মানুষই আছে), দেশের রাজনীতি অদ্ভুত (বিতর্ক অপ্রাসঙ্গিক), ঋতু গুলা অদ্ভুত (দুনিয়ার আর কোথায় ৬ টা ঋতু আছে?), আমাদের দেশের প্রায় জাতীয় ঝড় ‘কালবৈশাখী’, সেটাও মন ভার করে দেয়া অদ্ভুত আবেদনময়ী। আর আমাদের এই অদ্ভুত সুন্দর দেশের একটা উৎসবের উপলক্ষ পহেলা বৈশাখ। অনেকে হয়তো বলবে, এটা বাঙ্গালীর একার উৎসব, কিন্তু আমি বলবো, এটা বাংলাভাষী সব মানুষের মিলনের একটা উপলক্ষ। সেই সাথে বাংলাদেশী উপজাতি এবং আদিবাসী সহ সকল ধর্মের, সকল বর্ণের এবং ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের সবচেয়ে বড় উদাহরন। বাঙ্গালী, বাংলাভাষীদের মতই নানা উপজাতির লোকেরাও প্রায় একই সময়ে মেতে ওঠেন প্রাণের উৎসবে। পান্তা ইলিশ হাল জমানার ফ্যাশন, কিন্তু এই উৎসব শত বর্ষ ধরে এই জনপদের একটা অকৃত্তিম, মাটির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া প্রানের উৎসব।

পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন,তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে ভারত উপমহাদেশে বাংলা ১২টি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত।

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল অথবা ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যে কোন পঞ্জিকাতেই এই বিষয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

বাংলা দিনপঞ্জীর সঙ্গে হিজরী ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। আর বাংলা সনের দিন শুরু হয় ভোরে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে।



“আর সে কারণেই বলা যায়, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাঙালীর পহেলা বৈশাখের উৎসব।“

তবে ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। যদিও ভারত সহ অন্যান্য দেশে এই রীতির পরিবর্তন হয়নি এবং এখনো বাঙ্গালী এবং বাংলাভাষার সাথে সম্পর্কিত যেকোনো অনুষ্ঠান সূর্যোদয়ের পরেই শুরু হয়।

ভারতের সমস্ত বঙ্গভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে সনাতন নিরয়ণ (জ্যোর্তিমণ্ডলে তারার অবস্থানের প্রেক্ষিতে গণিত, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর প্রকৃত সময়ই নিরয়ণ বর্ষপঞ্জী। অর্থাৎ নিরয়ণ বর্ষপঞ্জীর দৈর্ঘ্য হল ৩৬৫.২৫৬৩৬০২ সৌর দিবস যা ক্রান্তীয় সায়ন বর্ষপঞ্জি থেকে ২০ মিনিট ২৪ সেকেন্ড দীর্ঘ) বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বর্ষপঞ্জী ক্রান্তীয় বা সায়ন বর্ষপঞ্জী (যেমন সংস্কারকৃত বাংলা সন এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী) থেকে ভিন্ন। এই উভয় ধরণের বর্ষপঞ্জির মধ্যে সময়ের যে গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে তার কারণেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নতুন বর্ষ শুরুতে দিনের পার্থক্য হয়। এই সময়ের পার্থক্যের কারণে নিরয়ণ সৌর বর্ষপঞ্জিতে মাসের দৈর্ঘ্যে পার্থক্য রয়েছে।

উপমহাদেশের আদি পঞ্জিকাসমুহের ইতিহাস

এমন ভাবার কারন নেই যে বিদেশী শাসন আসার আগে আসমুদ্র-হিমাচল অঞ্চলে বর্ষপঞ্জি ছিল না; অবশ্যই ছিল; এবং বাংলা বর্ষপঞ্জি সম্ভবত প্রচলিত সৌর শকাব্দের ঘাড়ে চড়েই বেড়ে উঠেছে। শকাব্দের প্রভাব প্রথমে বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা বাহিত হয়েও পরে তামিল চোল শাসনে আশপাশের সব জায়গায় ছড়িয়ে যায় ও একটা আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে ফেলে, যেজন্য দেখা যায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশের নববর্ষ বাংলা নববর্ষের মতোই গ্রেগরিয়ান বা খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পড়ছে। এ-উৎসব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রীলংকা, ক্যাম্ভোডিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, এমনকি দক্ষিণ চীন, আর ঘরের কাছের আসাম, মিথিলা, উড়িষ্যা, তামিলনাড়–, পাঞ্জাব, সর্বত্র কাছাকাছি ধরনের আকৃতি পেয়ে বসেছে। মৈথিলীদের শীতল জুড়ি উৎসব বাংলা একাডেমির ক্যালেন্ডারের মতোই খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে পড়ে;এবং তা সরকারি ছুটি হিসেবেই পালিত হয়। পহেলা বৈশাখের ছুটি প্রাক-১৯৭১ সময়েও এদেশে প্রাদেশিক পর্যায়ে ছিল।

অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায় সারা উপমহাদেশ জুড়েই মাস এবং দিনের নামের মিলে। যেমন পাঞ্জাবে, নয়া সাল অথবা বিসাগি উৎসব হয় ঠিক একই দিনে। দক্ষিন ভারতেও তাই। পাঞ্জাবে যেমন মাসগুলোর নামঃ বিছাগ, জেঠ, আ’ঢ়, শাওন, ভাদো, আশুন, কাত্তাক, মা’আঘর, পো’হ, মাঘ, ফাগুন, চেত। আবার ভারতে থাকাকালীন সময়ে যেমন লক্ষ্য করেছিলাম ঠিক ১৪ই এপ্রিল ওদের নববর্ষের ছুটি আর ব্যাপক উৎসব পালন করে ওরাও।

নববর্ষ পালনের মূলে রয়েছে কৃষি। তাই প্রাচীন সময় থেকেই দেখা যায়, কালের পরিমাপের ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বছর হিসাব করে গণনার প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছে। বছর গণনায় প্রধাণত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করে এগিয়ে গেছে। সৌরবর্ষ, চন্দ্রবর্ষ এবং নক্ষত্রবর্ষ।

সৌরবর্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে সূর্যের বার্ষিক গতি অনুসারে। ৩৬৫ দিনে এক সৌরবর্ষ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এই সৌরবর্ষ পালন করা হয়ে থাকে। চাঁদের গতি অনুসারে চন্দ্রবর্ষ এবং নক্ষত্র অনুসারে যে বছর গণনা করা হয় তা হচ্ছে নক্ষত্রবর্ষ। সে কারণে বলা যেতে পারে, এই উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল বেশ কিছু বর্ষপঞ্জিকা। এর মধ্যে ১০টি প্রধান বর্ষপঞ্জিকার কথা জানা যায়- বঙ্গাব্দ, হিজরি, শকাব্দ, সংবৎ, মগী, বগড়ী, বুদ্ধাব্দ, চৈতন্যাব্ধ, লানকাব্দ এবং ইংরেজি।

জেনে নেই এই উপমহাদেশের আরো কিছু নববর্ষসমুহের নাম

বিশু – তেলেগু নববর্ষ – (১৩ এপ্রিল – ১৪ এপ্রিল)
রঙ্গালি বিহু – আসাম – ১৪ এপ্রিল
ঈদ্মায়ার – কোদাভা নববর্ষ – ১৪ এপ্রিল
জুলশিতল – মৈথিলী নববর্ষ (নেপাল এবং বিহার) – ১৪ এপ্রিল
মহা বিসুভা সংক্রান্তি – উড়িষ্যা – (১৪ এপ্রিল – ১৫ এপ্রিল)
নায়ারেহ – কাশ্মীর – ১৪ এপ্রিল
শ্রীলঙ্কান নববর্ষ – শ্রীলঙ্কা – (১৩ এপ্রিল – ১৪ এপ্রিল)
তামিল পুঠান্ডু – তামিলনাড়ু – ১৪ এপ্রিল
ভিষু – কেরালা – ১৪ এপ্রিল
বিখাউতি – উত্তরখন্ড (ভারত) – ১৪ এপ্রিল

বঙ্গাব্দের ইতিহাস

এবার আসা যাক বাংলা সালের প্রচলনের বিষয়ে। আর এই সালের শুরু নিয়ে চালু আছে দুটি মত।

প্রথম মত অনুযায়ী, প্রাচীন বাংলায় (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর শুরু দিকে শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার রাজচক্রবর্তী রাজা। আধুনিক ভারতের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার অধিকাংশ এলাকা ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। অনুমান করা হয় যে, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১২ এপ্রিল ৫৯৪ এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল।

দ্বিতীয় মত অনুসারে, ভারতে ইসলামি শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হত। ভারতের সুলতানদের পর এই ধারাবাহিকতা মোগল শাসনামলের প্রথমদিক পর্যন্ত বজায় ছিল। এর প্রমান পাওয়া যায়, সম্রাট আকবরের সভাসদ এবং ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’তেও। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আগে মোগল সম্রাটরা রাজ্য পরিচালনায় ও রাজস্ব আদায়ে হিজরি সন ব্যবহার করতেন।’

পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন সালের প্রচলন তো ছিলই। ফলে কোনো সালই সেভাবে সার্বিক স্বীকৃতি পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই সালের এই সব ভিন্নতা প্রজাদের জন্য বেশ বিব্রতকর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মূল হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্রবছর সৌরবছরের চেয়ে ১১ থেকে ১২ দিন কম হয়। কারণ সৌরবছর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্রবছর ৩৫৪ দিন। এ কারণে চান্দ্রবছরের ঋতুগুলি ঠিক থাকে না।

মোঘল সম্রাট আকবর শাহি লেনদেন এবং প্রজাসাধারণের সুবিধার্থে একটি সৌরসাল প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। চাষাবাদ ও এ ধরনের অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। ফসল ঘরে উঠলেই তো প্রজারা কর দিতে পারবে। দিন, তারিখ গণনার সময়োপযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপঞ্জি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর এজন্য দায়িত্ব দেয়া হয় ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে।

১৩১৮ ফসলী সনে লেখক আনন্দ নাথ রায় তার “বারভূইয়া”গ্রন্থে লিখেছেন- “আকবর বাদশাহর রাজত্বকালে হিন্দু সম্প্রদায় বাদশাহের নিকট জ্ঞাপন করে, আমাদের ধর্মকর্ম সম্পর্কীয় অনুষ্ঠানে হিজরী সন ব্যবহার করতে ইচ্ছা করি না। আপনি আমাদের জন্য পৃথক সন নির্দিষ্ট করে দিন। আকবর হিন্দু প্রজার মনোরঞ্জনার্থে হিজরী সন হতে দশ এগার বৎসর ন্যূন করে এলাহী সন নামে একটি সনের প্রচলন করেন। যা আমাদের বঙ্গদেশের সন বলে চলে আসছে।”

তাঁর কাজ শেষে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (১৫৫৬) থেকে। আর এজন্যই বঙ্গাব্দের সঙ্গে খ্রিস্টাব্দের পার্থক্য (১৫৫৬-৯৬৩ বঙ্গাব্দ)। নতুন চালুকৃত এই বর্ষপঞ্জি পরবর্তীতে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে পরিচিত হয়।

সম্রাট আকবর যখন দরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে দিয়ে নতুন ফসলি সন বের করান, তার মাথায় ছিল রাজস্ব আদায়ের সুবিধা।সম্রাট আকবর সুনিশ্চিতভাবেই ভাবেননি তিনি এক ভবিষ্যৎ জাতিগোষ্ঠীর জন্য তাদের সবচেয়ে বড় ধর্ম নিরপেক্ষ উৎসবের ভিত্তি রচনা করে যাচ্ছেন।

প্রথমদিকে এই সালের নাম ছিল ‘তারিখ-ই-এলাহি’। এই মোগলাই সালের মাসের নামগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত ছিল ফার্সি ভাষায়। পরে ‘তারিখ-ই-এলাহি’ পরিচিত পায় ‘ফসলি সাল’, ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা বর্ষ’ নামে।

সম্রাট আকবরের আমলে প্রতি মাসের ৩০/৩১ দিন প্রতিটি দিনের আলাদা করে নাম ছিল। এতসব দিনের নাম সাধারণ মানুষের মনে রাখা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। সম্রাট আকবরের পৌত্র সম্রাট শাহজাহান পরে আবার বঙ্গাব্দ সংস্কার করেন। ধারণা করা হয়, কোনো এক পর্তুগিজ জ্যোতির্বিদের সহায়তায় পশ্চিমের পঞ্জিকা অনুসরণে সম্রাট শাহজাহান মাসের ৩০/৩১ নাম বিলুপ্ত করে ৭ দিনে এক সপ্তাহ এবং ৭ দিনের নাম রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবারের প্রচলন করেন।

বঙ্গাব্দ বা ফসলি সাল প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তখন প্রচলিত স্থানীয় চান্দ্রমাসগুলো সৌরমাসে পরিণত করা হয়। ফলে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ প্রভৃতি নামও বঙ্গাব্দের বিভিন্ন মাসের নামরূপে গৃহীত হয়। তবে সেটা স্থানীয়দের সুবিধার জন্য। তবে খাতাপত্রে স্থান পেতো ‘তারিখ-ই-এলাহি’ সালের ফার্সি ভাষার মাসগুলো। প্রাচীন বাংলা পুঁথিতে বঙ্গাব্দের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। গত চারশ’ বছরে অর্থাৎ আকবরের বাংলা সাল প্রবর্তনের পর হয়ত কৃষি ও ঋতুর সঙ্গে যুক্ত অনেক অনুষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

বাংলা সনের নানা খুটিনাটি

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ বাংলাদেশ এবং ভারত বর্ষের একটি সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘন্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। গ্রেগরিয়ান সনের মতো বাংলা সনেও মোট ১২ মাস। এগুলো হল বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আকাশে রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়ে থাকে। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।

বাংলা সন শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে যে দিনটি ইংরেজী বর্ষপঞ্জির ১৪/১৫ এপ্রিল (ভারতে) এবং ১৪ এপ্রিল (বাংলাদেশে)।

বাংলা সন সব সময়ই গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির চেয়ে ৫৯৩ বছর কম।

মাস
সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী-র মাসের নামগুলি প্রচলিত ছিল ফারসি ভাষায়, যথা: ফারওয়াদিন, আর্দি, ভিহিসু, খোরদাদ, তির, আমারদাদ, শাহরিযার, আবান, আযুর, দাই, বহম এবং ইসকান্দা মিজ। বঙ্গাব্দতে যা, বৈশাখ, জৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রাহায়ন, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন এবং চৈত্র।

বঙ্গাব্দের ১২ মাসের নামকরণ করা হযেছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এই নাম সমূহ গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ “সূর্যসিদ্ধান্ত” থেকে। বাংলা মাসের এই নামগুলি হচ্ছেঃ

• বৈশাখ – বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• জ্যৈষ্ঠ – জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• আষাঢ় – উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• শ্রাবণ – শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• ভাদ্র -উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• আশ্বিন – অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• কার্তিক – কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• অগ্রহায়ণ – মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• পৌষ – পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• মাঘ – মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• ফাল্গুন – উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
• চৈত্র – চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে

দিন
বাংলা সন অন্যান্য সনের মতোই সাত দিনকে গ্রহন করেছে এবং এ দিনের নামগুলো অন্যান্য সনের মতোই তারকামন্ডলীর উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।

• শনিবার হচ্ছে শনি গ্রহের নাম অনুসারে
• রবিবার হচ্ছে রবি বা সূর্য দেবতার নাম অনুসারে •
• সোমবার হচ্ছে সোম বা শিব দেবতার নাম অনুসারে
• মঙ্গলবার হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে
• বুধবার হচ্ছে বুধ গ্রহের নাম অনুসারে
• বৃহস্পতিবার হচ্ছে বৃহস্পতি গ্রহের নাম অনুসারে
• শুক্রবার হচ্ছে শুক্র গ্রহের নাম অনুসারে

ঐতিহ্যগত ভাবে বাংলা সনে দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয়ে।

অধিবর্ষঃ
বাংলাদেশে সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে ফাল্গুন (যা গ্রেগরীয় ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি শুরু হয়) মাস প্রতি চতুর্থ বর্ষে ৩১ দিনের হয়। মিল রাখবার উদ্দেশ্যে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর সাথে সাথেই বাংলা অধিবর্ষ হয়। সংস্কারকৃত বর্ষপঞ্জিতে ইংরেজী সনের মত কোনো ২৮ কিংবা ২৯ দিনের মাস নেই।

পশ্চিমবঙ্গে প্রাচীন সূর্যসিদ্ধান্তভিত্তিক নিরয়ণ বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বর্ষপঞ্জির মাসগুলো নির্ধারিত হয় সূর্যের প্রকৃত আবর্তনকে ভিত্তি করে। এই বর্ষপঞ্জিতে বর্ষ সংখ্যা হতে সাত বিয়োজন করে তা ৩৯ দিয়ে ভাগ করতে হয়। যদি ভাগশেষ শূন্য হয় বা ৪ দিয়ে বিভাজ্য হয় তাহলে সে বর্ষটিকে অধিবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ৩৬৬ দিনের এই বর্ষের চৈত্র মাস ৩১ দিনের হয়। প্রতি ৩৯ বছরে ১০ টি অধিবর্ষ হয়। সনাতন পদ্ধতিতে ২৯,৩০,৩১ এবং ৩২ দিনেও মাস গণনা করা হয়।

সংশোধিত বাংলা সন
বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলা সন সংশোধন উদ্যোগ নেয়া হয় ১৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৬ সালে । ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে এ কমিটি বিভিন্ন বাংলা মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করে সেগুলো হতে উত্তরণের প্রস্তাববালী প্রদান করেন । বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের । যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে । এ প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট এবং ৪৭ সেকেন্ড । এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয় । ব্যতিক্রম হচ্ছে সে শতাব্দীতে যে শতাব্দীকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায় না বা বিভাজ্য । জ্যোর্তিবিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে এই অতিরিক্ত দিনকে আত্মীকরণ করা হয়নি । বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতোই বিভিন্ন পরিসরের । এই সমস্যাগুলোকে দূর করবার জন্য ডঃ মুহম্মদ শহীদূল্লাহ কমিটি বাংলা একাডেমীর কাছে কতকগুলো প্রস্তাব করে । এগুলো হচ্ছে- • বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের • বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস • প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের।

বাংলা একাডেমী সরকারীভাবে এই সংশোধিত বাংলা মাসের হিসাব গ্রহণ করে । যদিও ভারতের পশ্চিম বাংলায় পুরোনো বাংলা সনের প্রচলনই থেকে গেছে ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সরকারি কাজকর্মে বাংলা সন লেখাটা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যদিও অবশ্যই বলতে হয়, এর একটা সাংবিধানিক অন্তর্ভুক্তি থাকলে ব্যাপারটাকে আরও মহৎ মনে হতো।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস
আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। যা পরে সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। সময় সময় এসব অনুষ্ঠানের উদযাপনে এসেছে পরিবর্তন।

সম্রাট আকবরের আগে সম্ভবত অগ্রহায়ণ মাসে বছর শুরু হত। অনেক স্থানে চৈত্র অথবা পৌষেও সন শুরুর কথা জানতে পারা যায়। তবে খাজনা প্রদানের শেষ দিন ছিলো খুব সম্ভবত চৈত্রের শেষ দিনেই। পহেলা বৈশাখ বছরের প্রথম দিন হিসেবে ধরা হচ্ছে আকবর পরবর্তী সময় থেকে।

আধুনিক বাংলা নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম লিখিত তথ্য পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়।

এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ উদযাপনের কথা জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয় নি।

নাগরিক জীবনে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের শুরুটা হয় গত শতকের ষাট দশক থেকে। এ সময়ে এসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা বাংলা নববর্ষের উদযাপনকে কখনোই সুনজরে দেখেনি। সেই আমলে এ অঞ্চলে নববর্ষের বদলে ইরানের মীনাবাজারকে জনপ্রিয় করা চেষ্টাও চালিয়েছিল তারা। তবে সফল হয়নি।

তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপই বৈশাখের প্রথম দিনে (বঙ্গাব্দ ১৩৭২, ইংরেজী ১৯৬৭ সন) ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কণ্ঠে রবীন্দসঙ্গীত এবং নানা গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান করে। পরে ক্রমশই এ অনুষ্ঠান বিপুল জনসমর্থন লাভ করে এবং স্বাধীকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙালি আদর্শের লালনে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য ঘোষিত হয় সরকারি ছুটি।


বাংলাভাষীরা অবশ্যম্ভাবী ভাবেই নববর্ষের অনুষ্ঠানের জন্য রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ, এসো হে এসো” গানটিকে বেছে নিয়েছেন। জাতীয় সংগীত বাদে আর কোনো বাংলা গান এতবার এত কণ্ঠে গাওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। গানটি বৈশাখী অনুষ্ঠানের এক ধরনের এনথেমই বলা যায়।

গ্রামাঞ্চলে এখনও সবাই চৈত্র-সংক্রান্তি আর তার পরের দিন পহেলা বৈশাখ হিসাব করেন প্রথাগত পঞ্জিকা দেখে। এতে একদিনের হেরফের হয় সরকারি দিনের সঙ্গে। আর ভারত প্রজাতন্ত্রের পশ্চিম বঙ্গ তো আগের বর্ষপঞ্জিই অনুসরণ করছে। ওদের পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় আমাদের কিংবা রমনার বটমূলের অনুষ্ঠানের একদিন পরে।

নববর্ষের সাথে সম্পর্কিত নানা উৎসব


হালখাতাঃ

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

বৈশাখী মেলাঃ


নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন: চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন।

মঙ্গল শোভাযাত্রাঃ


ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মতো পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আবশ্য অনুসঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। বৈশাখের প্রথমদিনের সকালবেলায় এতে অংশগ্রহণ করে চারুকলার শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন বয়সের মানুষ। এই শোভাযাত্রায় থাকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকী শিল্পকর্ম। থাকে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বহনকারী নানান উপকরণ, রং-বেরংয়ের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে শুরু হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে বছরই লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। তারপরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। সেটা বের করে চারুশিল্পী সংসদ।

শুরুর দিকে চারুকলার এই শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। তখন এটি পরিচিত হত ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবেই। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের বলীখেলা এবং রাজশাহীর গম্ভীরা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া উৎসবঃ
লুপ্ত হয়ে গেছে এরকম একটি অনুষ্ঠান ‘পুণ্যাহ’। এর উদ্ভব কাল সম্পর্কে ঠিক জানা যায় না, তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির আগে পর্যন্ত তা ছিল। পুণ্যাহ যুক্ত ছিল নববর্ষের সঙ্গে। ওইদিন প্রজারা ভালো পোশাক পরে জমিদারির কাচারিতে গিয়ে খাজনা নজরানা দিত। খাজনা দিয়ে প্রজারা জমিদারদের কাছ থেকে পান গ্রহণ করত। জমিদারের হাত থেকে পান গ্রহণ করে প্রজারা যেন ধন্য হয়ে যেত; এ যেন পুণ্য করে ধন্য হওয়ার মতো ব্যাপার। তাই ‘পুণ্য’ থেকে ‘পুণ্যাহ’র উদ্ভব।

ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল এক সময় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু এ দুটিসহ ঘোড় দৌড়, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, পটের গান, বুড়াবুড়ির লড়াই, নৌকা বাইচ, বহুরূপীর সাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা বর্তমানে আর তেমন প্রচলিত নেই।

বাংলাদেশী উপজাতীয় অথবা আদিবাসীদের বর্ষবরনঃ

বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বিজু’ পালিত হয়। পুরানো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়ীরা তিনদিন ব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়ীদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।

নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীয়রা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়ীদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীরা বৈসাবি উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এ দিন শিশুকিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুরুবিজু। এদিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এদিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাজন। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে।

পহেলা বৈশাখ এবং পান্তা ইলিশ

পহেলা বৈশাখের দিন এখন শহরের অলিগলি, রাজপথ, পার্ক, রেস্তোরাঁ সর্বত্রই বিক্রি হয় পান্তা-ইলিশ। এমনকি এখন অভিজাত হোটেলগুলোতেও শুরু হয়েছে পান্তা-ইলিশ বিক্রি এবং এই পান্তা-ইলিশ খাওয়া এখন একশ্রেণীর মানুষের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এমনকি আমার নিজের মা নিশ্চিতভাবেই ফ্রিজে ইলিশ সংরক্ষন করে রেখেছেন পহেলা বৈশাখে ভেজে দেবেন বলে। যদিও পান্তা থাকবে না, কারন আমরা দুই ভাই জীবনেও পান্তা গলা দিয়ে নামাতে পারিনি। ঠিক কবে থেকে শুরু করেছেন জানিনা, তবে বছর দশেকের বেশি হবেনা। তার আগে অযথা বিলাসিতার সামর্থ্য ছিলোনা।

আবহমানকাল থেকেই পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এই পান্তা-ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা শহুরে নব্য বাঙালিদের আবিষ্কার। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে অনেকটা ব্যঙ্গই করা হচ্ছে। পহেলা বৈশাখে গ্রামের মানুষ ইলিশ মাছ কিনে পান্তাভাত তৈরি করে খায়, এমনটা কখনও দেখিনি এবং শুনিনি। শহরের যেসব ধনী লোক পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খায় তারা কৃষকের জীবনযাত্রা দেখেনি এবং গ্রামের সংস্কৃতি সম্বন্ধে তাদের সঠিক কোনো ধারণা নেই।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন,

“পান্তাভাত গরিব মানুষের খাবার। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনো উপায় ছিল না, তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলুভর্তা, পোড়া শুকনা মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো। আমি ছোটবেলায় খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনীলোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। পান্তাভাত একদিন নয়, সারা বছরই খাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন ছিল না। আমরা চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় যেতাম এবং বিভিন্ন ধরনের খেলনা কিনতাম। পহেলা বৈশাখে হালখাতার অনুষ্ঠানে যেতাম। তখন এসব অনুষ্ঠান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এর মধ্যে কোনো বাণিজ্যিকতা ছিল না।”

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন বলেছিলেন,

“পহেলা বৈশাখে ইলিশ-পান্তার কালচার একদমই নতুন প্রজন্মের। যারা শালিধান কিংবা জলমুকুট ধানের নাম জানে না, যারা এই শহরের হাসপাতালে জন্মেছে, বড় হয়েছে কবুতরের খুপরির মতো একটা রুমে, আমাদের শেকড়ের কথা যারা জানে না, যারা এই ঢাকা শহরের তরুণ নাগরিক, ইরি ধানের আমলে তারাই পান্তা-ইলিশ নিয়ে—নগরের রাস্তায় রাস্তায় পান্তা-ইলিশ কালচার নিয়ে ব্যস্ত থাকে।”

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন,

“আজকাল আমরা পহেলা বৈশাখের দিন পান্তাভাতের আয়োজন করি। পান্তাভাত নিয়ে বাড়াবাড়ি কম হচ্ছে না। কবে কোন ফাইভস্টার হোটেল বলে ফেলবে, আমাদের কাছে পাওয়া যাবে স্ট্রবেরি ফ্লেভারড পান্তা—আমি সেই অপেক্ষায় আছি। এভাবে আমাদের সংস্কৃতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।”

পান্তা ইলিশের এই ফেক অপসংস্কৃতি খুব বেশিদিন টিকবেনা। কেবল এই দেশের মানুষের মাথায় যেইভাবে একশ্রেনীর ধান্ধাবাজ মানুষ ঢুকিয়ে দিয়েছিলো যে বৈশাখে পান্তা ইলিশ বাঙ্গালী সংস্কৃতির অংশ, ঠিক সেভাবেই অল্প কিছুদিনের চেস্টা অথবা প্রচারনা থেকে এর থেকে মুক্তিও পাওয়া সম্ভব। প্রচারনার মধ্যে দিয়েই বাঙ্গালীর মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে, পান্তা ইলিশ আসলে বাঙ্গালীর শেকড়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু নয়, নয় ঐতিহ্যের অংশ। পান্তা ইলিশের জুগলবন্দী নব্য ধনীক একদিনের বাঙ্গালীদের লোকদেখানো অপসংস্কৃতি।

পুরো দেশ কিংবা ভারতীয় অংশের বাঙ্গালীরা সহ আমরা জাতিতে বাঙ্গালী, মানে বাংলাদেশের ৯০% মানুষ নিজেদের বাঙ্গালী দাবী করেন। যারা নিজেদের আদিবাসী, উপজাতি কিংবা পাহাড়ি বলে দাবী করেন, তাদের সাথেও আমাদের বৈশাখী উৎসবের সময় এবং অন্যান্য ব্যাপারে আছে অনেক মিল। যাইহোক, বাঙ্গালীদের মধ্যে অনেক কমন ব্যাপার আছে। সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হচ্ছে ভাষা, যেটা আমাদের এক করে। এর বাইরে খাদ্যাভ্যাস অথবা নানা আচার অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। গ্রামের মানুষ পান্তা খেতো, একসময় শহরের মানুষও খেতো সীমিত পর্যায়ে যখন ফ্রিজ আসেনি এবং দিনে ঝামেলা কমাতে বাড়িতে একবারই রান্না হতো। এখন গ্রামে পান্তা কিছুটা আছে, শহরে একদমই নেই। শহরে কেবল পহেলা বৈশাখে ফিরে আসে যেটা পান্তা না। গরম ভাতেই পানি ঢেলে পান্তা নাম দিয়ে দেয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার পান্তাও পছন্দ না, আমি জীবনে মুখে দেবারও চেষ্টা করিনি। পান্তার গেঁজে যাওয়া গন্ধটা আমার পছন্দ না। একেক মানুষের রুচি একেকরকম। তবে একসময় ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণী এক অদ্ভুত ব্যাপার শুরু করে দেয়, শুরুটা সম্ভবত আশির দশকেই। তারা পান্তার সাথে ইলিশ জুড়ে দিলো। শুরুটা হলো দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশেই। তখনকার শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অংশ কিংবা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশ কি সংস্কৃতি সচেতন ছিলো না?

এটাকে একটা ফিউশন বলা যেতে পারে। শহরের মধবিত্ত শ্রেণীর অতি পছন্দের ইলিশের সাথে গ্রামের গরীব কৃষক শ্রেণীর পান্তার ফিউশন। এবং তারা ধীরে ধীরে এ ব্যাপারটা জনপ্রিয়ও করে ফেলে। হুজুগে বাঙ্গালী বলে একটা কথা আছে, সে কথাটা খুব বেশি মিথ্যাও যে নয় তার প্রমাণ এই পান্তা ইলিশের ব্যাপারটাও। সারা বাংলাদেশের এমন একটা পরিবার দেখাতে পারবেন কেউ, যেখানে পহেলা বৈশাখ ছাড়া অন্য কোনদিন ইলিশ পান্তার সাথে খাওয়া হয়? ব্যাপারটা ব্যাঙ্গাত্মক এবং বিভ্রান্তিকর নতুন প্রজন্মের জন্য। তারা ভাবছে এটাই সংস্কৃতি, হাজার বছরের হয়তো নয়, তবে বাপ দাদার মধ্যে ছিল সেটা তারা সম্ভবত সেটা ধরেই নেয়।

আমরা যারা সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নগরবাসী। আমরা যারা একেবারে ঢাকায় বেড়ে উঠেছি তাদের সংস্কৃতির শেকড় আর যারা গ্রামে কিংবা অন্য অঞ্চলে বড় হয়েছে তাদের সংস্কৃতির বোধ এক নয়। এখন যে এতো মানুষ পান্তা ইলিশ খাচ্ছে এটাও ক্ষুদ্র অংশের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি সবসময় পরিবর্তনশীল এবং তার সাথে অনেক নতুন কিছু যোগ হবে। জব্বরের বলি খেলা বাংলার সব অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ নয় আবার এটা বাঙ্গালীরই সংস্কৃতির অংশ, সেইসাথে ঐতিহ্যেরও অংশ। যদি বলি পান্তা ইলিশ সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রাও আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। এগুলো তো শুরুই হলো অল্প সময় আগে। তবে এখন এর সবই আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। আর শত বছর ধরে বা হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে যা আছে, ধরে রেখেছি আমরা, তা হচ্ছে ঐতিহ্য। সে হিসেবে ইলিশ আমাদের ঐতিহ্য যা সংস্কৃতিতেও প্রভাব রাখছে। তবে আমরা আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে এমন একটা ব্যাঙ্গাত্মক ব্যাপার না করলেও পারতাম। পান্তা ইলিশের ব্যাপারটাকে আমি বলবো অপসংস্কৃতি। এই ফিউশন করে শেষ পর্যন্ত লাভটা হলো কি? ধোঁকা দিলাম কাকে?

এসব হয়তো কোন বড় ব্যাপার নয়। এই দেশের মানুষ নিজের শেকড়ের টানেই নিজের সংস্কৃতিকে ধরে রাখবে বলে আমি নিজে বিশ্বাস করি। নতুন প্রজন্ম আরো মাটির কাছাকাছি থাকবে, এটার আশা আমরা করতেই পারি। অকৃত্তিমভাবে নিজেদের ধরে রাখতে না পারলে সেটা জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতাই হবে। বাঙ্গালী সব বালিকা এই দিনে ম্যাক লিপস্টিক ঠোটে না মেখে একটু ফ্যাকাসেই রাখুক ঠোঁটটা, আই শ্যাডো গরমে লেপ্টে না গিয়ে চোখের কাজলই লেপ্টে যাক, কি মায়াময় একটা অবয়ব ফুটিয়ে তুলবে সেটা কল্পনা করতেও ভালোলাগছে। অথবা শিশু বালিকার ছোট ছোট পায়ে কড়া লাল আলতা, কপালে বড় লাল একটা টিপ পড়লে কি অদ্ভুত সুন্দরই না লাগবে এই দিনে! শুধু এই দিনে কেন বলছি, এই বঙ্গভুমিতে, নতুন সূর্যের প্রতিটা দিনেই!

সবাইকে ১৪২৩ সনের বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা! 🙂

সহায়তা নেয়া হয়েছে যে সুত্র সমূহ থেকেঃ
বাংলাপিডিয়া,
উইকিপিডিয়া,
সমকাল,
বিডিনিউজ২৪,
প্রথম আলো,
বাংলা ট্রিবিউন,
রবীন্দ্র ভারতী ওয়েবসাইট
এবং অন্তর্জাল

৭ thoughts on “‘বাংলা নববর্ষ’, ‘পহেলা বৈশাখ’, ‘বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশীদের প্রাণের উৎসব’ এবং ‘বঙ্গাব্দ অথবা বাংলা সন’ এর আদ্যোপান্ত!

  1. বাংলা নববর্ষ নিয়ে একসাথে এত
    বাংলা নববর্ষ নিয়ে একসাথে এত তথ্যসমৃদ্ধ লেখা অনলাইনে চোখে পড়েনি। অনেক অজানা তথ্য লেখাটিতে আছে।

    1. কোনো বিষয় নিয়ে পড়লে সবকিছু
      কোনো বিষয় নিয়ে পড়লে সবকিছু নিয়েই পড়তে চেষ্টা করি। আর লেখাটাও হয় মনের আনন্দে। আমি বিশ্বাস করি কিছু পড়লে ভাসাভাসা না পড়ে পুরোটাই পড়া উচিত। ভাসা ভাসা তো সবাই জানে, ভাসা ভাসা চুম্বর অংশগুলোই শেয়ার করে। তবে বিস্তারিত বিহয়গুলোও কথাও না কোথাও থাকা দরকার।

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. অপূর্ব্ লেখা. বাঙলাদেশের্
    অপূর্ব্ লেখা. বাঙলাদেশের্ সাম্প্র্তিক্ ঘ্টনাবলী খুবই ব্যথা দেয্. এই লেখা যেন্ এক্ মূক্ত‌ অনবিল্ সতেজ্ বাযু.নতুন্ বছরের্ shuvechha janai sabaike.
    ( bangla key board e daksho noi. tai badhyo holam bijatiya haraf byabohar korte.)

  3. একটা ব্যাপার বুঝতেছি না । আমি
    একটা ব্যাপার বুঝতেছি না । আমি কনফিউজড ।এখানে সংশোধিত পঞ্জিকায় ১৪ এপ্রিল ফিক্সড করে আমাদের কি লাভ হয়েছে ? ঘুরেফিরেতো পশ্চিম বাংলার পঞ্জিকাতেও ১৪/১৫ এপ্রিলেই হচ্ছে কোন পরিবর্তন নাই। এটা কেন ? এর ব্যাখ্যাটা কি? যেই ২০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড এর ব্যাবধানের কথা বলা হচ্ছে সেই পরিবর্তনের কোন ছাপতো পশ্চিম বাংলার পঞ্জিকাতে নাই।এতবছর পরেও কিন্তু সেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ১৪/১৫ এপ্রিলেই ওদেরও বৈশাখ শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *