কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হয়ে মুসলিম থাকা যায় না

আল্লাহ বলেছেন- তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, তাঁর রসুলের আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর তোমাদের আদেশদানের অধিকারীর (অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের) (সুরা নেসা, 59)।
.
এটা মুসলিমদের চেইন অব কমান্ড। সর্বদা তারা কর্তৃপক্ষকে মেনে চলতে, কর্তৃপক্ষের নিঃশর্ত আনুগত্য করতে বাধ্য। কেউ কর্তৃপক্ষের আনুগত্য লঙ্ঘন করল মানে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল মানে সে আল্লাহর বেঁধে দেওয়া চেইন অব কমান্ডের বাইরে চলে গেল। তার গলা থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে গেল। সে নামাজ পড়লেও, রোজা করলেও, নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করলেও সে জাহান্নামের জ্বালানি পাথরে পরিণত হবে (হাদীস: তিরমিযী ও আহমদ-হাকেম)।
.
কতৃপক্ষের আনুগত্য করার ঈমানী বাধ্যবাধকতা বুঝেই ভারতবর্ষে আগত মুসলিম সেনানায়ক মুহাম্মদ বিন কাশিম নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও খলিফার আদেশ শিরোধার্য করে সিন্ধু ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ইচ্ছা করলে খলিফার আদেশ অমান্য করতে পারতেন। বিদ্রোহ করার মত সেনাবাহিনীতে যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও তার ছিল। উপরন্তু তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনা দোষে- এটা সবাই জানত। কিন্তু তথাপি তিনি আনুগত্য থেকে হাত গুটাননি, কারণ কর্তৃপক্ষের আনুগত্য লঙ্ঘন করা মানে রসুলের আনুগত্য লঙ্ঘন করা, সর্বোপরি আল্লাহর হুকুম অমান্য করা। এর পরিণতি জাহান্নাম।
.
আল্লাহর রসুল বলেছেন- যদি কিসমিসের ন্যায় ক্ষুদ্র মস্তকবিশিষ্ট নাক বা কানকাটা ((অর্থাৎ বিকলাঙ্গ) ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমীর (আদেশদানের কর্তৃপক্ষ) নিযুক্ত করা হয় তোমরা তার কথা শুনবে ও মান্য করবে, বিনা বাক্যব্যয়ে তার আনুগত্য করবে (হাদীস: উম্মুল হোসাইন (রা.) থেকে মুসলিম, আনাস (রা.) থেকে বোখারী)। সুতরাং কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার করার সুযোগ আর যাই হোক ইসলাম ধর্মে নেই। বরং বলা যায় কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করাই ইসলাম।
.
অথচ আজ ইসলামের এত গুরুতর একটি ধারণাকে, আকীদাকে বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে। অনেকের ধারণা- এই চেপে যাওয়ার কারণ হচ্ছে প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা কর্তৃপক্ষের বিরোধিতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈধতা দিয়ে রেখেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার ভেতরে রাখা, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে অন্য। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ভালো-খারাপ যাই হোক না কেন, তার সমালোচনা-বিরোধিতায় অবতীর্ণ হওয়া যেন একটি রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.
তবে এই অবাধ্যপ্রবণতার জন্য মূলত দায়ী ধর্মনিরপেক্ষতা, যা দুই ধরনের কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করেছে। একটি রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, অপরটি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ। এই দুই কর্তৃপক্ষের নৈতিকতার মানদণ্ডও সম্পূর্ণ আলাদা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাংঘর্ষিক বিধায় জাতি না পারে কোনো একটি কর্তৃপক্ষকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে তার আনুগত্য করতে, আর না পারে কোনটাকে প্রত্যাখ্যান করতে। এই জটিলতা থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিরোধ।
.
আমার ধারণা- এই বিরোধকে কাটিয়ে উঠতে চাইলে প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মানসিকতার সাথে সামঞ্জস্যহীন এই ধর্মহীন রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার ঘটাতে হবে। ধর্মকে বর্জন না করে ধর্মকে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে উপস্থাপন করে জনসাধারণের ঈমান বা ধর্মবিশ্বাসকে জাতিবিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণ হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। ধর্ম দিয়েই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব যদি ধর্মের গায়ে লেগে থাকা পঙ্কিলতা দূরীভূত হয়ে ধর্মের শাশ্বত-সনাতন রূপ উদ্ভাসিত হয়। তখন কর্তৃপক্ষও দাঁড়াবে অভিন্ন, যে কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করা প্রত্যেক ঈমানদার মানুষের জন্য হবে ‘ঈমানী দায়িত্ব’।

১ thought on “কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হয়ে মুসলিম থাকা যায় না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *