বাঙালীর শিকড়কে অস্বীকারকারীরা ই শিকড়হীন।

পহেলা বৈশাখ বাঙালীদের সর্বজনীন লোকউৎসব। বাঙালীরা তাদের নববর্ষের প্রথম দিনটা তাদের প্রানের উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে। তবুও বাঙলার কতক আলেম হারাম হিসেবে উল্লেখ করেছে বাঙালীর ঐতিহ্যের এ উৎসবকে। তাদের অভিযোগের প্রধান কারণ, এটা বিজাতিয় সংস্কৃতি। কোন সাচ্ছা মুসলমান কখনো এসব হিন্দু সংস্কৃতির সাথে একাত্ব হতে পারেনা, করলে তার মুসলমানিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। পালন করাতো অনেক দূরের ব্যাপার। পহেলা বৈশাখে মেলায় অংশ গ্রহণ, শুভেচ্ছা জানানো, এমনকি পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ছাড়ে কোন পন্য কেনাকাটা করাও হারাম।

বিজাতীয় সংস্কৃতির অভিযোগে যদি পহেলা বৈশাখ হারাম হয় তবে বাংলা নববর্ষও হারাম করা উচিত।
বাঙলা মাস হিসেবে বৈশাখ-জৈষ্ঠ হিসেব করা হয় সেটাও পৌরানিক নাম থেকে এসেছে। বিশাখা-বৈশাখ, জাইষ্ঠা-জৈষ্ঠ, আষাঢ়া-আষাঢ়, শ্রাবণা-শ্রাবণ, ভাদ্রপদা-ভাদ্র, আশ্বিনী-আশ্বিন, কৃতিকা-কার্তিক, আগ্রৈহনী-আগ্রহায়ন, পুস্যা-পৌষ, মাঘা-মাঘ, ফাল্গুনী-ফাল্গুন, চিত্রা-চৈত্র। বৈদিক যুগে সৌর গণনা পদ্ধতিতে এসব নক্ষত্রের নাম প্রচলিত ছিল। বাঙলার মোল্লারা কি করে ঐসব বৈদিক সূর্য কেন্দ্রীক বাঙলা সনের হিসেব করেন? তাদের তো বছর গণনার জন্য হাস্যকর চন্দ্র ক্যালেন্ডারই অনুসরণ করা উচিত। সৌর গণনা পদ্ধতি পুরোপুরি ইসলাম বিরোধী, এটা ৯২% মুসলমানের দেশে কোন ভাবেই থাকতে পারেনা।

বড় বড় মাওলানারা যে ভাষাতে ওয়াজ করেন কিংবা লিখে লিখে পহেলা বৈশাখকে হারাম করার পক্ষে প্রচারণা চালান ঐ ভাষাটাওতো বিজাতিদের ভাষা। এ ভাষাতেই বৌদ্ধ সহজিয়া মত প্রচারের জন্য চর্যাকরগন চর্যাপদ (এখন পর্যন্ত আবিস্কিত বাঙলা ভাষার প্রাচীন গ্রন্থ) রচনা করে। ঐসব কবিদের কেহই মুসলমান ছিলনা, সবাই ছিল নাথ সম্প্রদায়ের। মধ্যযুগে অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি আরবির সংস্পর্শে এলেও বাঙলা এখনো খৎনা করে মুসলমান হতে পারেনি। বাঙলার মুসলমানরা জন্মের পর থেকে যে ভাষায় কথা বলে আসছে সেটাও বৈদিক ভাষা, বিজাতিদের ভাষা। তবেকি তারা বাঙলায় কথা বলা ছেড়ে দেবে, হারাম ঘোষনা করবে?

বাঙালী সব ক্ষেত্রেই আরাম প্রিয় সেটা পোষাকের বেলাতেও। জাতীয় পোষাকও তেমন লুঙ্গী-পাঞ্জাবী। পাঞ্জাবীর পরিবর্তে তারা জুব্বা পরে ভালকথা কিন্তু লুঙ্গীর বিকল্পকি তারা চিন্তা করতে পারে? এ লুঙ্গীও যে আরব সংস্কৃতি থেকে আসেনি, তামিল নাড়ুতেই এর প্রথম প্রচলন। এ বিজাতীয় পোষাক পরে তারা রাত্রী যাপন করতে তাদের একটুও মনে খটকা লাগেনা, হারাম ঘোষনা করতে মন চায়না?

বাঙালী মুসলমানদের বড় জুব্বা পরলে একসাথে লুঙ্গী-পাঞ্জাবী দুটোর কাজ সারলেও ভাততো তাদের খেতে হবে। ভাত প্রধান খাদ্য আর মাছ হলো প্রধান ব্যঞ্জন। কিন্তু এ ভাত-মাছ কি সহি্ ইসলামী খাবার?
প্রচুর উৎপাদনের কারণে ইসলাম আসার আগে থেকেই বাঙলার মানুষ ভাতকেই প্রধান খাদ্য হিসেবে নিয়েছে। যাদের পহেলা বৈশাখ উৎযাপন নিয়ে চুলকানি তারা কেন হাজার বছরের বাঙালীর ভাত খাওয়াকে অস্বীকার করছেনা। তাদের তো খেজুর আর উটের মুত ই শ্রেয়।

বাঙলার এটা ঠিক নাই, ওটা ঠিক নাই। এখানে হারাম, সেখানে হারাম। বিধর্মী বিধর্মীতে ভরে গেছে বাঙলা। বিধর্মীদের বাঙলার মাটিতে ঠাঁই নেই বলে যারা শ্লোগানে শ্লোগানে রাজপথ মাতায় দেশতো তাদের নয়, বিধর্মীদের।
পত্নতাত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, প্রায় চার হাজার বছর আগে দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মীরা এখানে বসতি স্থাপন করে। শাসন করে আর্য, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল বংশ, হিন্দু সেন রাজ বংশ। ১২০৫-৬ এর দিকে বাঙলার মানুষ প্রথম অবগত হয় ইসলাম সম্পর্কে।
বিধর্মীদের পত্তন করা এবং একের পর এর বিধর্মীদের শাসন করা দেশকে ঐ মুসলমানরা কি করে নিজের দেশ বলে দাবী করে? দেশটাওতো তাদের জন্য হারাম হওয়া উচিত, যদি না হয় তবে দেশের সংস্কৃতি কেন হবে?

বাঙলাদেশে শরিয়া আইন নেই। মুসলমান কি
করে ধর্ম-কর্ম করে একজন নারীর অধীনে। ঐ পুরুষদের কি পৌরুষত্ব নেই, এটাকে হারাম বলতে পারেনা? চলে যেতে পারেনা এ সবুজ শ্যামল বাঙলা ছেড়ে।

বাঙলার সংস্কৃতিকে হারাম ঘোষনা করার আগে কি তারা আশে পাশে তাকিয়েছে? যে সবুজ তারা দেখছে এটা বিজাতীয়, যে মাটির ঘ্রান তারা পাচ্ছে সেটা বিজাতীয়, পানি-নদী-ফুল-পাখী বাঙলার সবই বিজাতীয়। যে বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে হয় সেটাওতো বিজাতীয়। বাঙলার বাঘ, দোয়েল, আম, কাঁঠাল, ইলিশ, গোলাপ, গাঁদা বিজাতীয়। তারা বাস করছে কি করে এত হারামের মধ্যে?

অবশ্য ঐ মোল্লাদের দুর্ভাগ্য তারা বাঙলায় জন্ম নিয়েছে। তাদের পুর্ব পুরুষ আদম নয়, মনু। যত মুসলমান সবাই ই ধর্মান্তরিত মুসলমান। ফতোয়াবাজদের চৌদ্দ পুরুষ হিসেব করলে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে বিধর্মী-মুর্তি পুজারী।বংশানুক্রমে সবার শরীরে বইছে বিধর্মীদের রক্ত। তারা কি নিজের জন্মকে অস্বীকার করতে পারবে, আত্বীয়তা ত্যাগ করতে পারবে, হারাম বলতে পারবে নিজের জন্মকে?

আদিকাল থেকেই বাঙলার মানুষ সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। একসাথে মেতেছে-কেঁদেছে। কিন্তু বর্তমান বাঙালী-মুসলমান নিজেদের বাঙালী পরিচয় দেয়না, মানুষও নয়, তারা মুসলমান।
বাঙলার সবুজ তাদের সহ্য হচ্ছেনা তারা এটাকে মরুভুমি বানাতে চায়, বাঘ হরিনের বদলে তারা উটে সৌন্দর্য খুঁজে পায়। তাতেই নাকি তাদের চির সুখের সন্ধান মিলবে। বাঙলার প্রকৃতিতো মরুভূমির মতো রুক্ষ নয়, মানুষগুলোও কাদা মাটির মত কোমল। তাদের সংস্কৃতির মধ্যেও কোমলতা বিদ্যমান। কিন্তু সৌন্দর্য সহ্য হয়না খুনিদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *