পর্দার সংস্কৃতি ও আন্দোলনের সংস্কৃতি; ভাবনার জায়গা কোথায়?

এখানে একটা প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশে কেন দিন দিন হিজাব বা বোরকার ট্রেন্ড বাড়ছে। বিষয়টা আমি এইভাবে বুঝি। আমাদের দেশ একটা কালচারাল ডাইভার্সিটির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। হিজাব বা বোরকার কারণে বা হেফাজত বা ওলামা লীগের কারণে এই দেশ আফগান ও হবে না পাকিস্থান ও হবে না। ভবিষ্যতে এই দেশ হতে পারে আংকারা ও ইস্তাম্বুল কেন্দ্রিক তুরস্কের মত। দুই পক্ষের লোকই থাকবে দুই জায়গায়। এই ডাইভার্সিটির একটা পার্ট পোষাকে ও আসছে। আগে আমাদের মেয়েরা জিন্স পড়ত না,এখন সব মেয়েরাই পড়ে। এই জিন্স আবার সকল মেয়েদের দিন দিন পছন্দ হচ্ছে। এখন রক্ষনশীল মেয়েরা ও এই জিন্স পড়তে চায়। কিন্তু জিন্স পড়তে গেলে সমস্যা হল,তাঁর নিচের দিকটা খুব আটশাটো হয়ে যায়। যা পর্দানশীলতার মধ্যে পড়ে না। তাহলে কি করা,অপশন একটাই সেটা হল -যেহেতু নিম্নদেশ আগের থেকে কিছুটা প্রকাশিত হয়ে গেছে , তাতে করে আবার তাঁর ইচ্ছা বা শখ ও পূরণ হচ্ছে সেক্ষেত্রে উপরটা ডেকে রাখলেই ভাল। তাই দেখবেন হিজাবের ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে। এই ট্রেন্ড বেশি এসেছে ইউরোপের মুস্লিমদের থেকে ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে। ওখানে জিন্স যারা পড়ে তাঁরা সবাই হিজাবী,এটা একটা ধর্মীয় সাইকোলজির সমস্যা। আবার এই হিজাব পড়া এখন একটা ভাল ফ্যাশন ও হয়ে গেছে ফলে ট্রেন্ড চলবে কিছুটা বাজারের চাহিদার উপর ভিত্তি করে ও, সেজন্য বোরকা বা হিজাব অনেক শেইফড হচ্ছে। তাঁর সাথে কালচারাল কমোডিফিকেশন ও মিশে একাকার হয়ে গেছে। যেহেতু বাজার সবার রুচি বা চাহিদাকে বার্বিডলের দিকে নিয়ে গেছে সেজন্য কাপড় সেটা হিজাব হোক আর বোরকা হোক, সেও বার্বিডল হবে। আবার এখানে যারা পর্দানশীল হয়ে ও এই রকম স্মার্ট হিজাব পড়ছেন বা স্কার্ফ না করে সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেটার হাশিম আমলার বউয়ের মত বোরকা পড়ছেন, স্বাভাবিকভাবে তাঁরা ইগো, অল্টার ইগোর বাইরে অবস্থান করছেন । এরা শুধু নন হিজাবী নারী নয়, যারা তাঁদের মত হিজাব পড়ছেন সে তাঁর থেকে অনেক দূরেই ইগো নিয়েই বসবাস করছেন ।

তাঁর বাইরে আমি হিজাব বা ধর্মীয় রক্ষন্ধীলতার আরেকটা কারণ খুঁজে পাই সেটা হল সোশাল ইন্সিকিউরিটির প্রশ্ন। এইখানে কিন্তু অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক সব বিষয় আছে। এটা ও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ব্যাবস্থা আমাদের মধ্যে যে গলদ তৈরি করছে তা থেকেই এটা উদ্ভূত হচ্ছে। কেউ কোন সফলতা অর্জন করলে সে তাঁর পুরোটা কৃতিত্বটাই জানাচ্ছে ইশ্বর বা আল্লাহকে, সে ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্যাসিভ ধরে নিয়েছে। কারণ তাঁর ব্যাক্তিত্ব্য তৈরি হয় নাই এই শিক্ষা ব্যবস্থায়। ব্যাক্তিত্ববান মানুষ নিজের কৃতিত্বের ভাগ সকল মানব সমাজকে দিতে পারে কিন্তু কাল্পনিক কাউকে দেয় না। একইভাবে সে অপরাধ করলে ও তাঁর দায়ভার মুক্তির জন্য উপরের দিকেই চেয়ে থাকে না, নিজের অনুশোচনার মধ্যেই খুঁজ । কিন্তু দূর্বল ব্যাক্তিত্বের একজন মানুষ ভাবে উপরের ইশারায় সব হয়েছে, তাঁর অপরাধ ও। ফলে তাঁকে ডাকা ছাড়া উপায় নাই। এই যখন অবস্থা তখন অর্থনীতির তলানীতে থাকা একজন বাবা মা যখন জীবন যুদ্ধে পরাজিত হতে হতে মেয়েকে মেডিকেলে বা বুয়েটে বা কোন ভার্সিটিতে ভর্তি করাতে পারেন বা গ্রাম থেকে শহরে পাঠাতে পারেন , তখন নিশ্চিত ভাবে মেয়ের সুরক্ষার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃপাশ্রী হয়ে পর্দা মানারই কথা বলেন। এই অবস্থা তৈরি করেছে রাষ্ট্র। সে ভার্সিটিতে পড়া বা কোন মানুষের সফলতা অর্জনকে দিন দিন দুর্লভ বানিয়েছে। লটারিতে জেতার লাকি চান্স বানিয়েছে। সেজন্য গত দু দিত দশকে গ্রাম থেকে শহুরে আসা প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে পর্দার প্রকাশ দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তাই হচ্ছে। তাঁর সাথে ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাবতো আছেই।

এই বিষয়টা নিয়ে এসেছি, সাম্প্রতিক তনু ইস্যুতে। বোরকা বা হিজাব পড়ে ও তনুর মত নারীরা নিরাপদ না। প্রগতিশীল বা বস্তুবাদীরা যতবেশি এই ধরনের কথা বলবেন,ততই রক্ষনশীলতা শার্প মেরুকরণের দিকে আগাবে,মানে হিজাব বা পর্দার সংস্কৃতি বাড়বে। প্লিজ, তনুর জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে,সে হিজাব পড়ে ও নিরাপদ না এই খেলো যুক্তি না দেয়াই উত্তম। আপনারা যেহেতু জানেন বোরকা/হিজাব/পর্দা কখনোই নারীর জন্য সুরক্ষা না,তাহলে এই ভঙ্গুর সুরক্ষা বলয়ে একজন ভিকটিমকে আইডেন্টিফাই করছেন কেন? হ্যা,আপনাদের যুক্তি ও আছে,আপনারা বলবেন যে,তারাতো ( রক্ষনশীলরা) নিজেদের সুরক্ষার জন্য পর্দার কথা বলে, তাহলে আমরা বলবো না কেন? দয়া করে আপনারা এই যুক্তি ও দেবেন না, কারণ-পর্দার ভৌগলিক কারণ হয়তবা কিছু আছে কিন্তু এইটা সম্পূর্ণই মিথ্যা যে, পর্দা কোনকালে নারীকে সুরক্ষা দেয় নাই। একটা মিথ্যা আর্গুমেন্ট যে আঁকড়ে আছে, তাঁকে তাতানোর প্রয়োজন বোধ হয় আপনার ঠিক হবে না। আপনাদের জানা থাকা দরকার, প্রগতিশীলতার খোঁচাতেই আফগান বা ইরানের এই দশা হয়েছে।

এখানে যারা হিজাব পড়েছ না সেটা তাঁদের ইগো আবার যারা হিজাব যারা পড়ে বা পড়তে চায় সেটা তাঁদের অল্টার ইগো। এখন বার বার ‘ হিজাব পড়ে কেউ নিরাপদ না’ এই কথাটা বলার মানে আপনি অলটার ইগোকে স্ট্রং করছেন। পুলিং করছেন। এই অল্ট্রার ইগো মানুষের মধ্যে মানসিক অবস্থার এমন একটা ফেইজ তৈরি করে যে, সে সেখান থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বের হতে চায় না। কারন সে এখানে একটা আইডেন্টিটি তৈরি করে। এখানে তাঁর বিলংগিংনেস তৈরি হয়। আরব বা মধ্য প্রাচ্যের যে সব নারীরা ভিক্টিম হন তাঁরা পর্দা পড়েই নির্যাতিত হন।

এখন, কেন হিজাবের ট্রেণ্ড বাড়ছে, সাথে নারীর উপর নির্যাতন ও বাড়ছে, উপরের আলোচনার সাথে মিলিয়ে, হিজাব বা বোরকা সংস্কৃতির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে নেন, কেউ হিজাব বা বোরকা পড়ে ধর্ষিতা হলে তাঁকে নিয়ে আপনার আন্দোলনের রাস্তা কিভাবে ডিল করবেন সেটা ও ভেবে নেন। ভাবতে আপনাকে হবেই , কারণ এখানে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদটাই জরুরী। সে হিজাব পড়ুক আর নাই পড়ুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *