ক্ষত !

(১ )
আষাঢ় মাস। সারাদিন ঝুম বৃষ্টি হয়েছে। এখন কিছুটা কমতির দিকে, গুড়ি গুড়ি পড়ছে। সারাদিনের বৃষ্টিতে হাটলক্ষীগঞ্জ বাজারের ব্যস্ততা কম ছিল। এখন মানুষ বাজারের দিকে আসতে শুরু করেছে। এদের বেশির ভাগই কেরোসিন তেল,পান-বিড়ির ক্রেতা।কয়েকজন গোয়ালাও আসছে বাজারের দিকে।মাথায় দুধের বালতি নিয়ে তাদের মৃদু দৌড়ের মধ্যে একধরনের ছন্দ লক্ষ্য করা যায়। পিছন পিছন কয়েকটি কুকুর দৌড়াচ্ছে। তারাও যেন সেই ছন্দ রক্ষা করেই গোয়ালাদের অনুসরন করছে।


(১ )
আষাঢ় মাস। সারাদিন ঝুম বৃষ্টি হয়েছে। এখন কিছুটা কমতির দিকে, গুড়ি গুড়ি পড়ছে। সারাদিনের বৃষ্টিতে হাটলক্ষীগঞ্জ বাজারের ব্যস্ততা কম ছিল। এখন মানুষ বাজারের দিকে আসতে শুরু করেছে। এদের বেশির ভাগই কেরোসিন তেল,পান-বিড়ির ক্রেতা।কয়েকজন গোয়ালাও আসছে বাজারের দিকে।মাথায় দুধের বালতি নিয়ে তাদের মৃদু দৌড়ের মধ্যে একধরনের ছন্দ লক্ষ্য করা যায়। পিছন পিছন কয়েকটি কুকুর দৌড়াচ্ছে। তারাও যেন সেই ছন্দ রক্ষা করেই গোয়ালাদের অনুসরন করছে।

প্যান্ট হাটু অব্ধি ভাজ করে, প্লাস্টিকের সেন্ডেল হাতে এইমাত্র বাজারে পৌছাল শাওন।মাথায় সবুজ রঙের পলিথন ব্যাগ মুড়ানো। দুই পা কাদায় ছড়াছড়ি। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মাইল দুই-এক মাটির পথ মাড়িয়ে বাজারে এসেছে। এসেই ধপাস করে বসে পড়ল নুরু মিয়ার চায়ের টঙের বেঞ্চিতে।যদিও তার বসাতে ধপাস শব্দটি হয়নি। হয়েছে স্যান্ডেল আছড়ে ফেলার কারনে। সেই শব্দে চায়ের দোকানদার নুরু মিয়া কেপে ওঠলো। মুরগীর পালক দিয়ে কান খোচাচ্ছিল। হঠাত শরীরের ঝাকুনিতে পালকের গোড়াটির নুরু মিয়ার কানের পর্দাতে গিয়ে লাগল।এবার নুরু মিয়া এবং তার ক্যাশ বাক্সের পাশে লুকিয়ে থাকা বিড়ালটি, দুজনেই একসাথে গলা বাড়িয়ে বাইরে তাকাল।

বাজারের দক্ষিন দিকেই নৌকাঘাট। ছোট ছোট ইঞ্জিনের নৌকা ছেড়ে যায় এখান থেকে।শাওন নৌকায় করে যাবে কলা গাইচ্ছা, বোনের বাড়িতে। জরুরী ভিত্তিতে বোন বাপের বাড়ি খবর পাঠিয়েছে তাকে যেন শীঘ্রই এখান থেকে নিয়ে যায়। কেন নিয়ে যেতে হবে কারন কিছুই জানায়নি। ঘটনা সাক্ষাতে বলবে। শুধু বলেছে এখানে তার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।আর দু-এক সপ্তাহ থাকলে লাশ দেখতে পাবে। বিবাহের ৪ বছরের জীবনে তার বোনের কাছ থেকে এরুপ খবর আরো বহুবার এসেছে। সুতরাং ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সময় করে যাওয়া যাক। ৫টায় যে ট্রলারটি ছাড়ে সেটা ধরলে শম্ভু পুরা ঘাটে পৌছাতে পৌছাতে সাতটা বেজে যাবে। সেখানে থেকে বোনের বাড়ি মাইল দুয়েক হাটার পথ।পৌছে গিয়েই রাতের খাবারে সামিল হওয়া যাবে।সুতরাং তাড়াহুড়ার কিছুই নেই।

শাওন- কৈ নুরু ভাই ? দুধ চিনি বেশি দিয়া একটা কড়া চা দেওতো।

নুরু মিয়ার কানে শাওনের কথা পৌছেছে বলে মন হলো না। মুখ হা করে, চোখ দুটো প্রায় বন্ধ করে বিশেষ আরাম নিয়েই কান চুলকাচ্ছে। পাশে বিড়ালটি কৌতুহল নিয়ে বাজারের মানুষের আনাগোনা দেখছে।
শাওন এবার আগের থেকে বেশি শব্দে গলা খাকারি দিল;
নুরু ভাই ! ট্যাকা কয়টা যে পাইতাম খেয়াল আছে। দিবা কবে?
নরু মিয়া- ট্যাকা ! কিয়ের ট্যাকা?
শাওন- এইতো জ্ঞান ফিরছে। চা দেও। দুধ চিনি বেশি দিয়া। আর হুন গরুন দুধ না, ডিব্বার দুধ দেও।চার আসল স্বাদ হইল ডিব্বার দুধে।শহরের মানুষ চিনে চায়ের স্বাদ। হেরা চা খায় ডিব্বার দুধ দিয়া।আমাগো গাও গেরামের মানুষ খায় গরুর দুধ। ব্যাক্কল হগল।গরুদ দুধ খাওন যায়। খালি কচুরীর গন্ধ।

নুরু মিয়া তার মুরগীর পালকটী কান থেকে বের করে নাকের সামনে নিয়ে একবার গন্ধ নিল। তারপর নাক কুচকে পালকটি রেখে দিল ক্যাশ বাক্সের উপর। বাতাসে গড়িয়ে পালকটি পড়লো চিনির পোটলাতে। পালকের আগমনে চিনির পোটলার কয়েকটী পিপড়ে থেমে গেল।মাইক্রস্কোপে দেখতে পারলে হয়তো পিপড়ার বিস্মিত হবার চিত্রও দেখা যেতো।

(২)
নৌকার কিনারায় বসে ধ্বলেষরীর ঘোলা পানিতে পা ধুচ্ছে শাওন। দু একজন নৌকায় তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছে বাজারের দিকে। কখন আরো কিছু যাত্রী আসবে।কখন নৌকা ছাড়বে।একজন শাওনকে জিজ্ঞেস করল,

বাই, যাইবেন কই? মাজি কেডা, হেয় কই?

শাওন কথার কোন উত্তর না দিয়ে একটা হাসি দিল। লোকটী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তার হাসিতে কি উত্তর মিলল বোধগম্য না। এবার শাওন পাটাতনে বসে নৌকার বেড়িতে হেলান দিয়ে বসল।পশ্চিমের আকাশে সূর্যের অনুপস্থিতি শাওনকে জানিয়ে দিল সময় ৫টা ছাড়িয়ে গেছে। দু একজন করে নৌকায় যাত্রী ওঠতে লাগল। শাওন একমহুর্তের জন্য নৌকার যাত্রীদের দেখে নিল। মনে মনে অবচেতনে একটী সংখ্যা তাকে সংকেত দিল, যাত্রীর সংখ্যা দশ-পনের হবে। নৌকার ইঞ্জিনের ঠিক কোনার দিকে চোখ আটকে গেল শাওনের। কিশোরী বয়সের একটী মেয়ে আড় দৃষ্টীতে তার দিকে তাকাচ্ছে। শাওন দ্বীতিয়বার তাকাতেই মেয়েটী চোখ সরিয়ে নিল। শাওন এবার কিছুটা আড় চোখে তাকিয়ে দেখল মেয়েটী আবার তার দিকে তাকাচ্ছে।পাশে হাসির শব্দ শুনতে পেল। এবার শাওন ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকাতেই বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটা আসলে তাকে লক্ষ্য করে তাকাচ্ছে না। তাকাচ্ছে পাশে বসা লাল রঙের গেঞ্জি পড়া ১৬-১৭ বছরের এক কিশোরের দিকে। যার গেঞ্জিতে নায়ক সালমান শাহ-শাবনুরের ছবি ছাপা। গেঞ্জির এক কোনে লিখা–

“ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”

গেঞ্জিতে যাই লিখা থাক, তাড়া যে একে অপরের কাছে চোখে চোখে চিঠি লিখছে তা বুঝার বাকি রইল না শাওনের। শাওন নিজ ঘাড়টা নৌকার কিনারার বেরিতে এলিয়ে দিল।তারপর চোখ বন্ধ করে দিয়ে তাদের চিঠি লেখা-লেখির পথটা সহজ করে দিল। সেই সাথে সেও ডুবে গেল ভাবনার গভীর জগতে। তার কাছে মনে হচ্ছে এইতো সেদিন অথচ পাচটি বছর কেটে গেছে এর মাঝে।একবারো দেখা হয়নি সুবর্নার সাথে। দেখা হয়েই বা লাভ কি।নিজের অজান্তেই প্রশ্ন ওঠল? চার বছরের সম্পর্ক এক বিকেলের কয়েক মিনিট সময়ের মধ্যে ইতি ঘটেছিল। কেন ঘটেছিল সে বিষয়গুলি আর মনে করতে চায় না শাওন।মনে হলে কেমন যেন করোটী বেয়ে এক ধরনের শীতল শিহরন বয়ে যায়। প্রচন্ড ব্যাথা লাগে কিন্তু এর উৎপত্তিস্থল কোথায় বুঝে ওঠতে পারে না।তখন শুধু হারু পাগলার কথা মনে পড়ে। শ্রীপল্লী গায়ের নামকরা পাগল। সবাই একনামে চিনে। তার কাজ শুধু আমপাতা সংগ্রহ। অন্য কোন গাছের পাতা ধরে না।আমপাতার একটী বস্তা সবসময় সাথে রাখে। আর একটী পাতা নিয়া আপন মনে কি যেন পড়ে। কারো দেখা পেলেই সামনে গিয়ে বলে, হারু পাগলার শিল্লুক কেউ ভাঙাইতে পারে না, তোমারে একটা শিল্লুক দেই…

“রক্ত নাই, রক্ত ক্ষরন বুকের ভিতর,
কাটে নাই চিড়ে নাই ব্যথারো বহর।
ব্যাথা কি ব্যাথা! ক্ষত কি ক্ষত!
দিন যায় যতো, বাড়ে ক্ষত ততো।”

কও দেহি মিয়া বিষয় কি?

তার শিল্লুকের উত্তর কারো কাছ থেকে মিলে না, শুধু মিলে তালুতে জিহবা মিশিয়ে বিরক্তির স্মরের ধমক, ‘’হর হেন্তো পাগলা, খাইয়া লইয়া কাম নাই হের শিল্লুক ভাঙ্গাইতাম।’’ হারু পাগলা ধমক খায় আর হাসে। তার হাসি কমে না। সে হাসি বাড়তে বাড়তে এক সময় কান্নায় রুপ নেয়। তারপর আম পাতা ধরে আঝোর নয়নে কান্না। কে জানে এই আমপাতায় কি স্মৃতি লুকিয়ে আছে।

শাওন এখন হারু পাগলার শিল্লুকের উত্তর জানে।কিন্তু বলতে ইচ্ছে করে না। হারু পাগলার সামনে যেতেও ইচ্ছে করে না।কেন যেতে ইচ্ছে করে না কখনো ভাবেনি। সুবর্নার সাথে তার শেষ দেখার স্মৃতিগুলো সে কখনোই মনে করতে চায় না। কিন্তু প্রকৃতি তার সাথে এ বিষয়টা নিয়েই বেশি খেলে। ভুলে থাকতে চায়, ভুলে থাকতে পারে না। ভুলে থাকার ঔষধ হিসেবে সে সব সময় তাকে নিয়ে আগের স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করে। এখন সে ডুবে আছে, মনির খানের অঞ্জনা কেসেটের স্মৃতি নিয়ে।সুবর্নাকে তার দেয়া প্রথম উপহার। ক্যাসেটের কভার পোস্টারে অঞ্জনা নামটি কলম দিয়ে কেটে লিখেছিল সুবর্না। সে স্মৃতি তার চেহারায় একটি শুখনো হাসির রেখা ফুটিয়ে তুল্ল। সেই সাথে বন্ধ চোখ সিক্ত হল নোনা জলে। মনে পড়ে গেল, কালী মন্দিরের বট গাছটির কথা। যেখানে সেই কবে নিজ হাতে সুবর্না লিখেছিল শ+স। খুব ইচ্ছে করছে এখন গিয়ে দেখে আসতে। সেই লেখাটি এখন আছে কি না। নাকি সময়ের সাথে সাথে লেখাটিও মিশে গেছে। এরুপ শত স্মৃতি এখন ভর করেছে তার চোখে।সব কিছু পারিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। সব স্মৃতির মাঝে ঘুরে ফিরে একটি স্মৃতি বার বার উকি দিচ্ছে। তার সাথে শেষ দেখার স্মৃতি।বিচ্ছিন্ন হবার স্মৃতি।সব বিচ্ছেদই একটী ক্ষত সৃষ্টি করে যায়। সে ক্ষত কখনো শুকায় না। দিনে দিনে বাড়ে।সময়ে বাড়ে অসময়ে বাড়ে।কেন বাড়ে সে নিয়ে নজরুল যেমন প্রশ্ন করেছিলেন। ‘’ফুল গেলে কাটা কেনো যায় না? প্রিয়া মন।’’
একসময় স্মৃতি রোমন্থনে ক্লান্ত হয়ে ওঠে শাওনের চোখ।

সাড়ে আট্টায় নৌকা কলাগাইচ্ছা ঘাটে ভিড়ল। নৌকা ঘাটে ধাক্কা খেতেই ঘুম ভাঙল শাওনের। চারিদিক অন্ধকার। যাত্রী নামার কাঠের সিড়িটির সামনে একটি হারিকেন জ্বলছে। তার পাশে তাকাতেই লক্ষ্য করল শালমান শাহ-শাবনুর ছবি মার্কা ছেলেটি তার পাশে নেই। মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখল, ছেলেটি এখন তার অনেক কাছে গিয়ে বসেছে। বুঝতে বাকি রইল না চোখের ভাষার পর্ব শেষ করে তা এখন মুখের ভাষায় পৌছেছে। চোখের ভাষায় যদিও বাড়ির ঠিকানা মিলে না।তাতে কি কাছে যাবার অনুমতিতো মিলে। সবাই এক এক করে ঘাটে নামছে।শাওন নৌকায় বসে সবার সাবধানী পা টিপে টিপে ঘাটে নামার দৃশ্য দেখছে আনমনে।সবার মাঝে শাওন সুবর্নাকেও নামতে দেখছে।হাল্কা আলোয় সেও পা টিপে টিপে নামছে। তাকে সাহায্য করছে তার বয়সের অন্য একটি ছেলে।সে ছেলের কোলে একটী দুবছরের ফুটফুটে বাচ্চা।শাওন স্বপ্ন দেখছে না বাস্তবে দেখছে বুঝতে পারছেনা।

তার শুধু হারু পাগলার কথা মনে পড়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *