“অর্থনীতির ইসলামীকরণঃ তাত্ত্বিক অযৌক্তিকতা ও অসামঞ্জস্যতা”( পর্ব-১)

সামাজিক কাঠামোতে ধর্ম যতটা সফল অর্থনৈতিক কাঠামোতে ধর্ম ততোটা সফল নয়। আস্তিক, নাস্তিক এসব সামাজিক বিবর্তনের ফলাফল হলেও অর্থনীতির বেলায় সবাই তাত্ত্বিক। ধর্মের ব্যবহার অর্থনীতিতে “ইকোনোমিক মোটিভ” বা “ম্যাস মোটিভ” সার্ভ করার চেয়ে বেশি “পলিটিকাল মোটিভ” সার্ভ করে।


সামাজিক কাঠামোতে ধর্ম যতটা সফল অর্থনৈতিক কাঠামোতে ধর্ম ততোটা সফল নয়। আস্তিক, নাস্তিক এসব সামাজিক বিবর্তনের ফলাফল হলেও অর্থনীতির বেলায় সবাই তাত্ত্বিক। ধর্মের ব্যবহার অর্থনীতিতে “ইকোনোমিক মোটিভ” বা “ম্যাস মোটিভ” সার্ভ করার চেয়ে বেশি “পলিটিকাল মোটিভ” সার্ভ করে।

ধর্ম, আবেগ, অনুভূতি এসব একটি অন্যটির সাথে ভীষণভাবে সম্পর্কিত। তবে অর্থনীতি আবেগ, অনুভুতি মাথা খায় না, অর্থনীতি চলে থিওরী দিয়ে, নিজের তালে। আজকের সর্বস্বীকৃত থিওরী আগামীতে নাও চলতে পারে। পরিবর্তনশীলতা অর্থিনীতির চলমান বৈশিষ্ট্য। ধর্ম যেখানে “এক সাইজ” সবার জন্য প্রযোজ্য সেখানে অর্থিনীতিতে সবার জন্য আলাদা আলাদা সামঞ্জস্য নীতি গ্রহণ করে এবং এতে প্রত্যেকটি এনটিটি(Entity) কেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় । অর্থনীতির আরেকটি সুস্থ্য স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি সমালোচনা প্রিয়। সমালোচনা মানে হত্যা বা গলা কাটা নয় বরং নতুন করে গবেষণায় উৎসাহ দেয়া, বর্জনীয় ব্যাপারগুলো পরিহারের সুযোগ করে দেয়া। অর্থনীতি যতটা সমালোচনার সুযোগ পায় ততো নিজেকে পরিবর্তনশীলতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে; ধর্ম পরিবর্তনশীলতায় একেবারেই চুপ থাকে কিংবা সুবিধাভোগী রাজনৈতিক কারণে একে অপরিবর্তনশীল করে রাখা হয়, ব্যাখ্যার অনুপোযোগী করে রাখা হয়। যে কোন ধর্মীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির জন্য আশির্বাদ নাকি অভিশাপ সেটা গবেষণার বিষয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধর্ম ভিত্তিক হলেও তা সকলের জন্য উন্মুক্ত কিনা কিংবা তা সর্বজনীন কিনা তাও ভাববার বিষয়। অন্ধ বিশ্বাস এক দিনে পরিবর্তন সম্ভব নয়, পরিবর্তন হতে সময়ের প্রয়োজন, পড়াশুনার প্রয়োজন।

ইসলাম সর্বশেষ মনোনীত দ্বীন এবং শরীয়া, সুন্নাহ দ্বারা বিবর্তিত বা পরিবর্তিত ধর্ম। উলামাগণ তথা ইসলামিক স্কলাররা তাদের নিজেদের জ্ঞানের পরিধির মধ্যে থেকেই সময় অনুযায়ী কোরানের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ মডিফাই করেন । ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে বড় লিমিটেশন বা স্কোপ মূলত এটাই । ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ইসলাম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে বেশি প্রচারমুখী । “অর্থনীতির ইসলামীকরণ” এই প্রচারমুখীতার অন্যতম একটি মিডিয়াম বা একটি সম্ভাবনা বলা যায়।

ইসলামিক অর্থিনীতি মূলত “সুদ”, “যাকাত” এবং “ব্যবসায়” এই শব্দ তিনটি কে নিয়ে কেন্দ্রীভুত। অর্থনীতির বিস্তর আলোচনা ইসলামিক অর্থিনীতিতে সীমিত। কনভেনশনাল অর্থনীতির সাথে “ইসলামিক” শব্দটি এড করেই মূলত ইসলামিক অর্থনীতির আবির্ভাব। ১৯৪০ সালের আগ পর্যন্ত ইসলামিক অর্থনীতির আলাদা তেমন অস্তিত্ব ছিল না; ১৯৭০ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি শুরু হয়। কনভেনশনাল অর্থনীতির তত্ত্ব কে ভিত্তি করেই আবেগের তত্ত্ব কে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া হয় । কোরআনে অর্থনীতি নিয়ে তেমন কিছু বলা নেই বিধায় অর্থনীতির “ইসলামীকরণে” ইসলামিক স্কলাররা খুব বেশি একটা সুবিধা করতে পারেন না। তাছাড়া, কোরআন নিয়ে গবেষণা করে রিকমেন্ডেশন দেয়াটাও বেশ বিপদজনক।

সুদ এবং প্রফিট –লস অংশীদার বিতর্কঃ

একটি রাষ্ট্রের যেমন কোন ধর্ম থাকতে নেই তেমনি অর্থনীতিরও নির্দিষ্ট কোন ধর্ম নেই। অর্থনীতি চলমান নীতিতে বিশ্বাসী। রাষ্ট্রের ধর্ম হবে সেটি স্বাধীন নাকি পরাধীন। রাষ্ট্রের ধর্ম পলিটিক্যাল কারণে ইসলাম হলেও অর্থনীতির ইসলামীকরণ খুব একটা ইফিশিয়েন্ট কনসেপ্ট না এখানে। কিছু সাম্রাজ্যবাদী ইসলামিক বিনিয়োগ পাওয়া গেলেও দেশের অর্থনীতির ইসলামীকরণ অনেকটা লবণ দিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মত। অর্থনীতিতে ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করা সর্বজনীন কিনা সেটা একটি দেশের ইফিসিয়েন্সির উপর নির্ভর করে। ইন্ডিকেটরে দেশ যদি গরীব হয় তবে ভিন্ন ভিন্ন কমিউনিটির বিনিয়োগ ক্ষেত্র সেখানে তৈরি হয়, এক্সপ্লয়টেশনের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থের প্রয়োজনীয়তা তো সব সময়ই রয়েছে। যে উৎস থেকে আসুক না কেন, যে ফর্মেই আসুক না কেন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ধর্মের প্রয়োজনীয়তা সেখানে কম। “প্যোর(Poor)” আর “রিচ(Rich) এই দুই শ্রেণির মানুষের ধর্ম থাকে না । ধর্ম হচ্ছে এই দুয়ের মাঝামাঝি যারা তাদের জন্য। বিহেভিয়্যরাল ইকোমিক্সে (Behavioral Economics)এর সত্যতা পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, আপনার লোন দরকার হলে আপনি যেখানে কম রেটে লোন পাবেন সেখানেই যাবেন। ইসলামী বা শরীয়া ব্যাংক হোক আর কনভেনশনাল ব্যাংক হোক তাতে খুব বেশি একটা আসে যায় না।

কোরআন অনুযায়ী ইসলামিক অর্থনীতিতে সরাসারি সুদ কে হারাম মনে করা হ্য় । ইসলামিক স্কলারদের মতে সুদ আভাবগ্রস্থকে আরো আভাবগ্রস্থ করে, বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং শয়তানি প্রতারণা তথা কাফেরি উদ্ভাবন বলে থাকেন। ইসলামিক স্কলারদের এই ধরনের মতবাদ অর্থনীতিতে সবসময় প্রযোজ্য নয় বা মাঝে মাঝে হাস্যকরও বটে। কেননা বাংলাদেশ আর সৌদী-আরবের অর্থনীতি দু’টোই আলাদা রীতিতে চলে। তাত্ত্বিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অর্থনীতিতে সুদ সব সময় নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলে তা না; অর্থনীতিতে সুদের প্রয়জনীয়তা রয়েছে।

বিস্তর এসামশন(Assumptions) আলোচনা না করে বরং ছোট্ট একটি ব্যক্তি পর্যায়ের উদাহরণ দিয়ে সুদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা যায়। ধরুন, আপনি একজন রিটায়ার্ড কর্মকর্তা । আপনার প্রভিডেন্ড ফান্ড দিয়ে আপনাকে সংসার চালাতে হবে। আপনার নিকট অপশন দুটোঃ

অপশন ১ঃ- আপনি সঞ্চয়প্ত্র/এফডিআর কিনবেন এবং প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদের যে টাকা আপনি পাবেন তা দিয়েই সংসার চলে যাবে অনায়াশে।

অপশন ২ঃ- আপনি “মুদারাবা (Profit/Loss Sharing)” চুক্তিতে আবদ্ধ হবেন। মুদারাবা চুক্তিতে আপনি লাভের কোন নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না বরং লস হলে আপনার আসল টাকা থেকে লসের অংশ কাটা হবে। অর্থাৎ মুদারাবা আপনার ভবিষ্যতের নিশ্চিত সুরক্ষা দিতে পারছে না ।

এই দুটি অপশন থেকে আপনি কোন অপশন গ্রহণ করবেন সেটা আপনার রিস্ক বা ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতার উপর নির্ভর করে। বিনিয়োগ তত্ত্ব অনুযায়ী আপনি যদি অবসর প্রাপ্ত হয়ে থাকেন বা যাদের ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা কম তারা প্রথম অপশনই পছন্দ করবে। সুতরাং সুদ প্রথা সকলের জন্য হারাম করা ফলপ্রসূ নয়। ইসলামিক অর্থনীতিতে “মুদারাবা” জোরপূর্বক একজন ঝুঁকি বিমুখ বিনিয়োগকারীকে “ লাভ/ক্ষতি” চুক্তিতে আবদ্ধ করে; ঝুঁকি বিমুখ কে জোর করে ঝুঁকি গ্রহণে উৎসাহিত করে।

অন্যদিকে, প্রফিট/লস ফিক্সড না হওয়ার সাথে শ্রম বৈষম্যের সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই কম বেশি সব শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট(Fixed) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করেন। ধরুন, আপনি “মুসারাকা( Joint Venture” বা “মুদারাবা (Profit/Loss Sharing)” পদ্ধতিতে লোন নিলেন, ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলেন, কিন্তু ব্যবসায় লস হল। কর্মচারীদের বেতন যেহেতু ফিক্সড সেহেতু তাদের বেতনের খরচও আপনাকেই বহন করতে হচ্ছে এবং এতে প্রতিষ্ঠানে লসের পরিমাণ আরো বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে যায়। আবার ধরুন, প্রতিষ্ঠানে লাভ হলেও শ্রমিকেরা মুনাফার অংশ পাবে কিনা কিংবা ক্ষতি হলেও তা শ্রমিকেরা বহন করবে কিনা সে সম্পর্কেও ইসলামিক অর্থনীতিতে সর্বসম্মত কোন গাইডলাইন নেই।

মুনাফার নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীত্ব ও ব্যবসায় প্রসারণের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যে প্রতিষ্ঠানের লাভ ক্ষতির নির্দিষ্ট কোন নিশ্চয়তা নেই সেই কর্ম পরিবেশে শ্রমিকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করবে কিনা সেটা শ্রমিকের ভবিষ্যত ক্যারিয়ার প্ল্যানের উপর নির্ভর করে।

আয়াত নাজিলের পূর্ব পর্যন্ত সুদ প্রথা (Fixed Assurance) বৈধ ছিল। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কখন কোন পরিস্থিতিতে সুদ অর্থনীতির জন্য নেগেটিভ হয় সেটা ভাবা দরকার। প্রগ্রেসিভ ইসলামিক স্কলাররা সুদ কে সহনীয় রেখে তা চালু রাখার পক্ষেও মতবাদ দিয়ে থাকেন। ঢালাও ভাবে সুদ প্রথা বাতিল মানেই যে অর্থনীতি চাঙা তা কিন্তু নয়।

“……I am sad to finally have to admit that Islamic finance in the UK has been a huge flop” [ তথ্য সুত্রঃ Junaid Bhatti, The Times, June 21, 2010]

বস্তুত, মুসলমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রবণতা বেশি অথচ পরিবর্তনশীলতার সুযোগ সেখানে কম; ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ কম। অর্থনীতিতে ইসলামকে টেনে আনা অনেকটা প্যাকেট লাগানোর মত, চশমার গ্লাসে রঙ মাখানোর মত । চার’জন মানুষ কে দিয়ে যেমন ষোল কোটি মানুষকে বিচার করা যায় না তেমনি চার জন মানুষের আচার আচরণগত বিষয় থেকে ষোল কোটি মানুষের অর্থনীতিকেও বিচার বিশ্লেষণ করা যায় না। আবেগ ও অর্থনীতি দু’টো ভিন্ন অর্থ বহন করে।

ইসলামকি স্কলাররা ব্যক্তি পর্যায়ের ইসলাম কে সামাজিক কাঠামোতে তুলে ধরতে পারলেও অর্থনীতিতে তা তুলে ধরতে পারছেন না। এর কারণ হচ্ছে মূলত অর্থনীতি তত্ত্ব নির্ভর এবং পরিবতর্নশীল। এছাড়া ইসলামিক ফিন্যান্সের সব নীতি শরীয়া, সুন্নাহ, ইসলামিক ল থেকে প্রণীত এবং স্কলার সমর্থিত। আর কোরআনে অর্থনীতি নিয়ে তেমন কিছু বলা না থাকলেও কোরানের আয়াতের সাথে যদি কোন নীতির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তবে ব্যাখ্যার দায়িত্ব পড়ে শরীয়া উস্তাদ, উলামাদের। অর্থনীতির বেলায় ইসলামের উস্তাদরা কিছুটা লিবারাল; তারা আয়াত নির্ভর হলেও আয়াতের ব্যাখ্যায় ব্যক্তি পর্যায়ের প্রেফারেন্স প্রাধান্য পায়। ইসলামি স্কলারদের মূল দায়িত্বই থাকে শরীয়ার উদ্দেশ্য ঠিকঠাকমত পূরণ করা ।

“Indeed, the Qur’an is a book of moral principles that contains few specific injunctions, while the Sunna expresses the perceived institutional and normative ideals of the first few generations of Muslims that produced it.” ( তথ্য সুত্রঃ Ignaz Goldziher, Muslim Studies, vol. 2, ed. S. M. Stern, trans. C. R. Barber and S. M. Stern (London: George Allen and Unwin, 1971, first German ed. 1889); and Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, 3rd ed. (London: Oxford University Press, 1959)

যাকাত ও বৈষম্য বিতর্কঃ

যাকাত ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির মধ্যে অন্যতম। যাকাতের সুবিধা ভোগকারীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে দরিদ্র, বেকার, এতিম, দাস দাসি, ইসলাম প্রচারকারী এবং আরো অন্যান্য। যাকাত প্রদানের ব্যাপারে কোরআনে উল্লেখ আছে, ‘‘যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য’’ (সূরা তওবা, আয়াতঃ৬০)। যাকাতের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ধনী দরিদ্রের ভেদাভেদ কমানো, সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও বন্টন। আসলেই কি তাই ?

যাকাতের মূল লিমিটেশন হচ্ছে, যাকাত আদায়ের ব্যাপারে ইসলামিক স্কলাররা স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করে দেন কিন্তু যাকাত বন্টনের উপর তাদের কোন স্ট্যান্ডার্ড নেই বা তাগিদ নেই। যেমন ধরুন, একজন ইসলাম প্রচারকারী ঠিক কতটুকুন পরিমাণ যাকাত পাবে আর একজন হত দরিদ্র ঠিক কতটুকুন পরিমাণ যাকাত পাবে সে সম্পর্কে ইসলামিক স্কলাররা একেবারেই চুপ।

যাকাতের অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে “এলোকেশন প্রসেস”। অনেকেই মনে করেন সরকারি ভাবে যাকাত আদায় করা হলে “এলোকেশন প্রসেস” সুষ্ঠু হয় এবং ধনী দরিদ্র বৈষম্য দূর হয়। কিন্তু ব্যাপারটি এরকম না হয়ে ঠিক উল্টোও হতে পারে। যেমন ধরুন, রাষ্ট্র যদি নিজেই সমস্যাগ্রস্থ হয় তবে রাষ্ট্র নিজেই যাকাত গ্রহনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। আর সেক্ষেত্রে “মার্জিনাল এলোকেশন” রাষ্ট্র সঠিকভাবে করতে পারে না। ফলে গরীব গরীবই থাকে আর ধনী ধনীই থাকে।

যাকাতের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে এর গনণা কার্য। প্রাচীন আরবের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে এর গননাকার্য ঠিক করা হয়। এর বড় লিমিটেশন হচ্ছে “কৃষি পেশার” উপর যাকাত চাপ সৃষ্টি করে যা অন্যান্য পেশার উপর করে না। যাকাতের একটি সাধারণ গণনা দেখা যাক,

মূলনীতি/ সূত্রঃ “নীট যাকাত যোগ্য সম্পদ এর মূল্য সাড়ে ৫২ তোলা রুপোর মূল্যের সমান বা তার বেশি হয় তবে ২.৫০% হারে যাকাত দিতে হবে”

চন্দ্র বছর হারে ২.৫০%
সৌর বছর হারে=২.৫৭৭%

অর্থাৎ,

যাকাতের পরিমাণ = নীট যাকাত যোগ্য সম্পদ X ২.৫% X উশর বা পশু সম্পদের উপর নির্ধারিত যাকাত

এখানে,

নীট যাকাত যোগ্য সম্পদ = (যাকাত যোগ্য সম্পদ – যাকাত মুক্ত মোট দেনা)
যাকাত যোগ্য সম্পদ = হাতে নগদ/ লিকুইড এসেট/তরল সম্পদ + সোনা/ রুপা+ শেয়ার/বিনিয়োগ+ স্থাবর সম্পত্তি+ পেনশন+ অন্যকে ধার দেয়া অর্থ+ ব্যবসায়িক সম্পদ

(তথ্য সুত্রঃ http://www.nzf.org.uk/Knowledge/Calculation_Rules/Personal_liabilities_Debts_and_loans)

যাকাত মুক্ত মোট দেনা = ব্যক্তিগত দায়+ ব্যবসায়িক দায়

ব্যক্তিগত দায়= নিজ প্রয়োজনে বা সাংসারিক প্রয়োজনে গৃহীত ঋণ+ সরকারি পাওনা/ সরকারি ট্যাক্স/খাজনা/ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি
ব্যবসায়িক দায় = সকল প্রকার ঋণ ( পাওনাদার/ বকেয়া খরচ/ ব্যাংক ঋণ/ জমাতিরিক্ত ঋণ/বন্দকী ঋণ প্রভৃতি)

উশর বা পশু পাখি ও ফসল এবং ফসলী সম্পদের উপর নির্ধারিত যাকাতঃ

–প্রাকৃতিক উপায়ে সিক্ত বা চাষাকৃত ফসলের ১০% বা ১০ ভাগের ১ ভাগ ফসল/ সমমূল্য
–অপ্রাকৃতিক উপায়ে সিক্ত বা চাষাবাদকৃত ফসলের ৫% বা ২০ ভাগের ১ ভাগ ফসল/ সমমূল্য
–উটের হিসেবে সর্বনিম্ন সংখ্যা পাঁচটি,
–গরু-মহিষের সর্বনিম্ন সংখ্যা ত্রিশটি এবং
— ছাগল/ভেড়ার সর্বনিম্ন সংখ্যা চল্লিশটি।

উল্লেখ্য, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছাড়া যদি পশু মুক্ত ভাবে থাকে তবে সংখ্যাভিত্তিক হারে যাকাত দিতে হবে। সেক্ষত্রে যদি ৩০টি গরু বা মহিষ হয় তবে ১ বছর বয়েসী ১ টি অথবা সংখ্যা যদি ৪০ টি হয় তবে ২ বছর বয়েসী ১ টি। আবার ছাগল/ভেড়া এর সংখ্যা যদি ৪০ টি হয় তবে ১ বছর বয়েসী ১ টি; আবার মোট সংখ্যা যদি ১২১ টি তবে ২ টি,সংখ্যা যদি ২০১ টি হয় তবে ৩টি এভাবে প্রতি শতক হারে বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায়, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যদি পশু পালন করা হয় তবে মুল্য ভিত্তিক হারে যাকাত আদায় করতে হবে। আরো বিস্তারিত যাকাত ফরমে উল্লেখ রয়েছে। সাধারনত এভাবেই যাকাতের পরিমাণ নির্নয় করা হয়।
(তথ্য সুত্রঃ http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=53370)

যাকাতের গণনা কার্য থেকে একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয় যে, যার কৃষি জমি রয়েছে এবং উশর যার উপর আদায়যোগ্য সে কিন্তু বঞ্চিত। একজন “ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট” এর যাকাত বিধান আর একজন “কৃষক” কিংবা “পশু পালকের” এর যাকাত হার একই হলে সেখানে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত হয় না। আয় বৈষম্যের শিকাড় হয় কৃষক শ্রেণির মানুষ। আবার কিছু অর্থনীতি বিশেষ করে যেসব অর্থনীতি “মেনাফেকচার” নির্ভর, “কমিউনিকেশন” এবং “সার্ভিস” সেক্টর নির্ভর সেসব ক্ষেত্রে যাকাতের সুযোগ কম বা যাকাতের সাথে সামঞ্জস্য নয় । সুতরাং যাকাত সব অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ নাও হতে পারে।

ইজারা ও আবেগের ক্ষতিবহনঃ

সুদ ব্যবসায় বন্ধের আরেকটি ইসলামীয় মাধ্যম হচ্ছে “ইজারা” সম্পর্ক। কিন্তু ইজারা কনসেপ্টও সকল পরিস্থিতিতে খুব বেশি একটা কার্যকর নয়। এটা তাত্ত্বিক দিক থেকে ঋণ চুক্তিই প্রকাশ করে। এমনকি এটি ভয়াবহ ক্ষতি/ লোকাসানের কারনও হতে পারে। যারা অর্থায়ন বোঝেন বা যারা দক্ষ ও প্রকৃত ব্যবসায়ী তারা হিসেব নিকাশ করেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। উদাহরণের মাধ্যমে ব্যপারটি তুলে ধরা যায়,

আপনার প্রতিষ্ঠানে একটি যন্ত্র প্রয়োজন যার ক্রয়মূল্য ৩,৩৫,২২০ টাকা। আপনার কাছে দুটি অপশনঃ

অপশন ১ঃ ইসলামিক শরীয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে ইজারা নেয়া। ৫ বছরের ইজারা চুক্তি। প্রতি বছর শেষে ইজারা বাবদ দিতে হবে ১,২০,০০০ টাকা।

অপশন ২ঃ কনভেশনাল ব্যাংক থেকে লোন নিবেন । সুদের হার ১৫%, ৫ বছর মেয়াদী ঋণ। এখানে উল্লেখ্য, উভয় অপশনে বিবেচ্য বিষয় সরল রৈখিক অবচয় হার এবং ট্যাক্স রেট ৪০%
যারা ফিন্যান্সের বর্তমান মূল্যের(Present Value) সূত্রানুযায়ী দুটি অপশনের সিদ্ধান্ত হবে

(ক) ইজারার বর্তমান মূল্যঃ ২৮০,০৫১ টাকা এবং
(খ) ঋণের ক্ষেত্রে বর্তমান মূল্য দাঁড়াবেঃ ২,৩০,৯০৬ টাকা । (বিস্তারিত ক্যালকুলেশন ছবির লিংকে http://i67.tinypic.com/8vzygk.jpg)

সুতরাং ইজারা অপশন বাছাই করলে আপনাকে ৫০,০০০ হাজারের মত বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনি আবেগে ক্ষতি বহন করবেন নাকি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা আপনার উপর নির্ভর করছে ।

প্রথম পর্বের সারাংশঃ

আসলে, “অর্থনীতির ইসলামীকরণ” একটি সাম্রাজ্যবাদী কনসেপ্ট। ব্যক্তি আচরণ এবং আবেগ কে অর্থনীতির আদলে খাপ খাওয়ানো কঠিন। ভয় কিংবা লোভ কোনটিই অর্থনীতির প্রভাবক নয়। ভয়, লোভ ব্যক্তি পর্যায়ের আচরণ কে প্রভাবিত করে। কোরআন অর্থনীতি বিষয়ে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যাহীন। ইসলামিক ফিন্যান্স বা অর্থনীতির সব কিছুই ধার করা এবং শরীয়া “মোড়কে” সজ্জিত। ইসলামিক স্কলাররা অর্থনীতির ইসলামীকরণে যতটা লিবারাল, সমাজ কাঠামোর ইসলামীকরণে ততোটা লিবারাল হলে কিছুটা হলেও এই কমিউনিটি অন্ধ বিশ্বাস আর পলিটিক্যাল এক্সপ্লোয়টেশন থেকে রক্ষা পেত। ইসলামিক অর্থনীতির বেলায় এই কথাটি বেশ যায়ঃ “There is no secret ingredient…… To make something special you just have to believe it’s special… It’s just you”

২ thoughts on ““অর্থনীতির ইসলামীকরণঃ তাত্ত্বিক অযৌক্তিকতা ও অসামঞ্জস্যতা”( পর্ব-১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *