তনুঃ ক্রিকেটীয় উম্মাদনায় আমাদের লজ্জা

আজকের বাংলাদেশ উত্তাল। পাড়ায় পাড়ায় আলোচনার স্রোত বইছে। যদিও আমরা জাতিগতভাবে এমন যে আমাদের আলোচনার জন্য কোনও বিষয় খুঁজে দিতে হয় না। বরং আলস সময় কাটানোর জন্য আমরাই খুঁজে নেই। আর দেশ হিসেবে আমাদেরটা এতই বেশী মহান যে আমাদের আর আজকাল বিষয় খুঁজতে হয় না ।


আজকের বাংলাদেশ উত্তাল। পাড়ায় পাড়ায় আলোচনার স্রোত বইছে। যদিও আমরা জাতিগতভাবে এমন যে আমাদের আলোচনার জন্য কোনও বিষয় খুঁজে দিতে হয় না। বরং আলস সময় কাটানোর জন্য আমরাই খুঁজে নেই। আর দেশ হিসেবে আমাদেরটা এতই বেশী মহান যে আমাদের আর আজকাল বিষয় খুঁজতে হয় না ।

তনু কে ? তাকে এই সপ্তাহখানেক আগে আমরা কেউ চিনতাম না। ও আমাদেরই কোনও এক অখ্যাত বোনের মতো কলেজ যেতো। টুকটাক নাটকও করতো। গোপনে প্রিয়তমার স্বপ্নে ঘুমাতেও যেতো হয়তো। এখন আমরা সবাই তাকে চিনি। ও এখন তারকা। তবে সেটা জীবনের বিনিময়ে। তার কাছে তার প্রিয়তম সম্পদ সম্ভ্রমের বিনিময়ে। গগনবিদারী চিৎকারের বিনিময়ে। ঘটনা পরিস্কার করা একান্তই অপ্রয়োজনীয় কারণ পত্রিকা আর সামাজিক গণমাধ্যম থেকে আহরিত জ্ঞ্যান চা এর দোকানে ফলাতে গিয়ে আমরা সবাই জানি।

কি জানি ? অথবা কি জানতে চাই ? আমরা জানি মেয়েটার নাম সোহাগী জাহান তনু। তার গ্রামের বাড়ি তিতাস উপজেলায়। তারা অলিপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সোহাগী মেজ। তার আর্থিক অস্বচ্ছলতা হেতু তাকে টিউশনি করানো লাগতো। আর সেটা করাতে গিয়েই পুরষেরা তাদের পুরষত্ব ফলাতে গিয়েছিলো আর সেই পুরষত্বের জোরে মেয়েটার জীবন আর সম্মান দুই গেলো। তাতে অবশ্ব পুরষের কিছু যায় আসে না । পুরষের রাষ্ট্রযন্ত্র কি আর পুরষকে বিচার করতে পারে ? হ্যাঁ কিছু নারী অবশ্য ক্ষমাতায় আছে। তবে তারা যে পুরষের ক্ষমতাকেই বাস্তবায়ন করতে পুতলের ভূমিকা পালন করছে তা নিয়ে সচেতন নারী মাত্রই কোন সন্দেহ থাকতে পারে না অথবা থাকাটাই অসম্ভব। সে আলোচনা আজকে তোলা রইলো। তনু সম্পর্কে আমরা আরো জানবো। তবে এখন নয় । কারণ পুরষেরা এখন আপাতত তনুকে কিভাবে ধর্ষন করা হতে পারে তা নিয়েই কল্পনাবিলাসে মত্ত আছেন। যখন এই কল্পনাবিলাস আর কোনও ভাবে যতেষ্ট হবে না তখন অনলাইন চটিসুচক পত্রিকার কল্পনাতে যা বের হবে তা রসময় গুপ্তকেও হার মানাবে। ধর্ষিত তনুর জন্য অপেক্ষা করে আছে মৃত্যু পরবর্তী আরেকদফা ধর্ষণ তবে তা কিছুটা সাম্যবাদী আকারে। একেবারে গনপরিসরে। পড়ামাত্রই পুরষালী রস আস্বাদন করা যাবে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা তনু যেন মৃত্যু পরবর্তী আরেকদফা ধর্ষণের স্বীকার না হয়।

এবার একটু যাই আরেকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে। সম্প্রতি তাসকিন নিষিদ্ধ হয়েছে। কেন হয়েছে ? মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের সকলের মোটামুটি জানা। আইসিসির মতে তার বোলিং এ নাকি সমস্যা আছে আর এই সমস্যাটা নাকি এতটাই মারাত্বক যে একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাকে একেবারে নিষিদ্ধ করে দিতে হলো। আর বাংলাদেশ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে কারণ এদেশীয় আপামর ক্রৃকেটবোদ্ধাদের কাছে মনে হয়েছে এ দাবি যৌক্তিক নয়। আর এ বোদ্ধাদের কল্যাণে আপামর জনতাও জেনে গেছে আইসিসির ফাঁকফোকর । তাই উত্তাল দেশ। উত্তাল দেশের ক্রিকেট বোর্ডও বাধ্য হয়েছে রিভিউ আবেদন করতে। এদিকে আপামর জনতাও একেবারে গালিগালজে একেকজন ক্রিকেটবোদ্ধায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। তাতে আবার নতুন একাত্তর ফিরে আসতে পারে। খুব বেশী আশ্চর্য হবো না যদি দেখি কেউ কেউ রব তুলেন “ এবারের সংগ্রাম আইসিসির কাছ থেকে বাংলার ক্রিকেটকে মুক্ত করার সংগ্রাম।” জাতীয়তাবাদকে নতুন করে ইতিবাচকভাবে বিনির্মানের প্রচেষ্টা দেখে একেবারে মন্দ লাগে না । তবে এ প্রচেষ্টা যখন মুনাফা সবচ্চকরণের একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহারের উপায় হিসেবে ধরা দেয় তখন একে সাধুবাদ জানাবার উপায় আর থাকে না । তবে কীভাবে এই সর্বচ্চকরনের কাজটা হচ্ছে তা নিয়ে আজ আর আলোচনা করবো না কারণ তা এখানে খুব বেশী গুরত্বপুর্ন হিসেবে ধরা দিবে না।
এতক্ষন ছিলাম দেশের ভিতরে। এবার একটু দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসা যাক। সানি লিওনকে চেনে না এমন কাউকে এই বাংলায় পাওয়া না যাওয়াটাই স্বভাবিক। তবে তিনি যদি সফি হুযুর বা তার কোন মুরিদ হন তবে তিনি নাও দেখতে বা শুনতে পারেন। আর তা তাদের নিজেদের বিষয় বলে ইস্তফা দিতে হচ্ছে। সানি লিওনের একটা মজার বিষয় আছে যার কারণে তিনি এই মুহুর্তে অন্য যে কেন বলিউডের নায়িকা থেকে আলাদা। আর এই কারণটি হচ্ছে তিনি যেকোনো সাহসী চরিত্রে অভিনয় করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে আমাদের মাথায় রাখা দরাকার সাহসী শব্দের ব্যাবহারগত অর্থ খোলামেলা চরিত্র যেখানে পোশাক নিয়ে চিন্তা করাটা অমুলক। সেন্সর বোর্ড পাশ দিলেই চলবে নায়িকার কোন বক্তব্য নেই। তার আগে এটা বলে নেয়া ভালো যে এই নায়িকার পর্নোগ্রাফি এর একটা অতীত ইতিহাস ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের আলোচনা পর্ণের বৈধতা বা এর সামাজিক প্রভাব এমন কিছুর উপরে নয়। বরং জাতি হিসেবে আমাদের বর্তমান অবস্থার সাথে তুলনার জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা।

তনু, তাসকিন অথবা সানি এই তিনজনকেই আমাদের কাছে তিনটি পুরোপুরি ভিন্ন জগতের মনে হতে পারে। হ্যাঁ এটাই বাস্তবতা কিন্তু এদের সাথে আমাদের বর্তমানের একটা ভয়ংকর মিল আছে । আর এই মিলটি দেখানোর জন্যই এতদূর পর্যন্ত আলোচনা গড়ানো। আজকের দিনে একেরপর এক ধর্ষণ হচ্ছে। তনুদের লাশের বহর একেবারে ছোট নয় সময় যত যায় ততো এই লাশের বহর বাড়ে। আশাবাদীরা হয়তো বলে বসবেন যে এখন অবস্থার উন্নয়ন হয়েছে বিধায় অন্ততপক্ষে ধর্ষণের খবরগুলো প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের উদ্ধেস্যে একাটাই কথা বলা যায় ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হওয়া ধর্ষণকে কতোটুক থামিয়ে রাখতে পারছে ? উত্তর দেয়া সম্ভব নয় । তবে যে ধর্ষণের যে ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে সেটা চোখ বুঝে বলা যায় কারণ ধর্ষন না ঘটলে তা তো আর ছড়াবার কথা না। আমরা বাঙ্গালী জাতী অথবা বাংলাদেশীরা কী এখানে শাক দিয়ে মাছ ডাকবার চেষ্টাটি করছি না ? যেখানে আমাদের মানসিকতা অনেকটা সানি লিওয়নের নির্লজ্জতাকে হার মানাচ্ছে। সানি লিওন তার বেঁচে থাকার জন্য এ কাজটি করছে অথবা তার জীবিকার তাড়নায় তাকে এই অভিনয়গুলি করতে হয়। কিন্তু আমাদের কী তাড়নাটি থাকে ? উথিত পুরষাঙ্গের তাড়না ? আশা করি আমরা এ বিষয়ে একমত যে উথিত পুরাষাঙ্গের তাড়না জীবিকার তাড়নার চেয়ে বেশী গুরত্বপুর্ন তাড়না নয় । সানি লিওয়নের অভিনয় এর নির্লজ্জতা তার প্রয়োজনে আর আমাদের নির্লজ্জতা আমাদের পুরাষাঙ্গের প্রয়োজনে। আর আমাদের এই পুরষাঙ্গের প্রয়োজনের যে লজ্জা তা সভ্য জগতের কাছে একজন পর্নস্টারের নগ্ন অভিনয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। একজন পর্নস্টারের অভিনয়কে নারীবাদী তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ আছে। যদিও নারীবাদী এই আলোচনাগুলি আমাদের দেশে এখন প্রতিষ্ঠিত নয়। আর বর্তমান আলচনায় এর তাত্ত্বিক ভিত্তি আলোচনা করা খুব বেশী একটা প্রয়োজনীয় হবে না। তবে নারীর প্রতি সহিংসতার এই রূপকে ইতিবাচকভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। আর তাহলে আমরা বাঙ্গালী কি করছি ? মুড়ি চানাচুরের আয়োজন করছি খুব আয়েশ করে মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে বাঙ্গালীর ক্রিকেটযুদ্ধে ভারতবধ কাব্যের একজন ঐতিহাসিক স্বাক্ষী হবো এই ভেবে। আর খুব আয়েশ করে ঘুম দিবো এই প্রশান্তিতে যে আমাদের তাসকিন সানিরা খেলবে। হ্যাঁ স্বীকার করছি ক্রিকেট আমাদের জাতীয় আবেগ বিনির্মানে একটি ভূমিকা পালন করতে পারে কিন্তু এই সানি তাসকিনের আলোচনায় আমরা এতটাই মত্ত যে আমাদের পাশের রুমে আপন বোনটি ধর্ষিত হচ্ছে আর আমরা সানি তাসকিন বিতর্ক নিয়েই বাস্ত। আর এ কারণে বাঙ্গালী জাতি যেন নির্লজ্জতার প্রতীকী জাতিতে পরিণত হচ্ছে আর যা সাহসের অথবা প্রতিবাদের সংস্কৃতি আছে তাও আমাদের বর্তমান কার্যকলাপের সাথে একেবারে মানানসই নয়। তাই খুব অবাক হওয়া যাবে না যদি আমরা দেখি আমাদের ইতিহাস থেকে সেই শৌর্য বীর্যের ইতিহাস আছে তা মুছে দেয়া হয় এ কারণে আমাদের বর্তমান ক্রিকেটীয় জাতীয়তাবাদের কাছে সেগুলি বেমানান অথবা দৃষ্টিকটু । আর তাতে সানি লিওনের নির্লজ্জতাই প্রতিষ্ঠিত হবার একটা ভিত্তিভূমি পেয়েও যেতে পারে।

নির্লজ্জতায় থেমে থাকলে খুব বেশী মন্দ হতো না । কিন্তু সাহসী কিছু আছে পুরষত্বের সাহসে সাহসী। তারা গ্রাম ময় , শহরময় তাদের ধর্ষণের মতবাদের বাস্তবায়ন করে পুরষবাদকে একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছে। তাতে খুব বেশী ক্ষতি হবে না । আর তাই আপনি যখন খেলার রিমোটটি বন্ধ করতে যাবেন তখন হয়তো খেয়াল হবে আপনার স্ত্রী বাসায় ফেরে নি, আপনার মেয়ে বাসায় ফেরে নি, আপনার বোন বাসায় ফেরে নি এমনকি আপনার মাও বাসায় না ফিরতে ফেরে। তারা সবাই দলে দলে তনুদের অনুগামী হন নি বরং হতে বাধ্য করা হয়েছে। ঠিক ঐ পুরষের দ্বারা যারা বা যাদের উত্তরসূরিরা আজকের তনূদের তনূ হবার কারণ। তখনো আপনি ডাল দিয়ে ভাত খাবেন ইলিশ মাছের স্বপ্ন দেখবেন। আর রিমোটটা তে চ্যানেল পরিবর্তন করে আপনি বাস্ত হবেন হয় ক্রিকেটে অথবা সানির শরীরের ভাঁজে।

অতঃপর ধর্ষণ হবে আমাদের সংস্কৃতি। আর আমরা আরব থেকে তাশাহুরকে আমদানী করে বিদেশী ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য দাবি জানাবো রাজপথে।

তবে মৃত্যুর পরে আমরা জাতিগতভাবে এড়ানোর চেষ্টা করবো ৫২ কে ৫৮ কে ৬৯ কে এবং ৭১ কে। জাহান্নামকে সহ্য করা যেতে পারে তবে এদের রক্তচক্ষু যুগলদেরকে নয়

২ thoughts on “তনুঃ ক্রিকেটীয় উম্মাদনায় আমাদের লজ্জা

  1. সস্তা হুজুগে জাতির গায়ে জ্বর
    সস্তা হুজুগে জাতির গায়ে জ্বর আসে, কিন্তু বুকের রক্তক্ষরণে কারও মরে কষ্ট হয় না। তনুর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে জাতির আরও বেগবান হওয়া উচিত ছিল।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. হেডার আলাপ চলে, তনুর পরেও
    হেডার আলাপ চলে, তনুর পরেও দেশে ৫টা ধর্ষণ গেসে, দেশের ব্যাংকের তুন ৩ক টাকা পুটকিমারা খাইসে, এই দেশ নানা সমস্যায় যর্জরিত, একটা বিগ ইস্যুর পুটকি মাইরা লিটল ইস্যু নিয়ে চুদাচুদি করা আমাগো খাইচ্ছত! পুনশ্চঃ তনু হত্যা কোন লিটল ইস্যু না কিন্তু কথা হচ্ছে শুধু এক বড় ধন নিয়ে ফাল দিলে হবে না, দেশে তো এক হাহারটা বড় ধন আছে, অগুলাকেও সাথে নিতে হবে! নাইলে বিপ্লব হবে না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *