সাম্প্রতিক অপরাধ: কারণ ও প্রতিকার বিশ্লেষণ

দেশের নানা বিষয় নিয়ে অনেক কথা বার্তা হয় প্রতিদিন। আমাদের ভালো কিছু থাকে খুব অল্পই। বেশীরভাগ থাকে বাজে, অসুস্থ, নোংরা ধরণের। ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর হলো তনু ঘটনা। কি এক অবস্থা, একটা জলজ্যান্ত সুস্থ স্বভাবিক মানুষকে চূড়ান্ত রকমের শারীরিক অত্যাচার, লাঞ্ছনা, ধর্ষণ এসব করেও শেষ পর্যন্ত হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখা। মানুষের পক্ষে এও সম্ভব! আর খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সবাই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, আমাদের রাগ, দু:খ, ক্ষোভ সব বের হয়ে আসছে। এটাই হবার কথা, তাই হচ্ছে। সবসময়েই হয়। আমরা সাথে সাথেই ফুঁসে উঠি, বিচার চাই, এবং আস্তে আস্তে সব কিছু ঠিক হয়ে আসে। আমরা আবারো রাস্তার কোনায় টং দোকানে এটা সেটা নিয়ে কথা বলি, হয়তবা অন্য কোন জালিয়াতি বা অন্য কোন অত্যাচারের বিরূদ্ধে গলা ফাটাই। অন্যায়ের প্রতিবাদ মানুষের একটি মৌলিক অধিকার, সেই সাথে দোষী পক্ষকে খুঁজে বের করে যথাযথ শাস্তি দেয়ার দাবীও তাই। একারণেই, প্রতিটি ধর্ষণ, ধর্ষণ-হত্যা, শিশুর উপর অমানবিক অত্যাচার ও শিশুহত্যা এসবের পরপরই আমরা দেখতে পাই সাধারণ জনগনের রাগ, ক্ষোভ, উষ্মা, আমরা দেখতে পাই পথসভা, মানব-বন্ধন, প্রতিবাদী কন্ঠ।

এর সবই ঠিক আছে, কিন্তু যা ঠিক নেই তা হলো, আমরা কিছু একটা হবার অপেক্ষায় বসে থাকি। নিজেরা আগে থেকে কিছু ঠিক করার উদ্যোগ নেই না। কিভাবে যেন মানুষ বেশীরভাগ সময়ে নিজের গা বাঁচিয়ে চলার পদ্ধতি বের করে ফেলেছে এবং কিছু একটা অঘটন বা বাজে কিছু হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা নিজেদেরকে বোঝাতে পারি সবকিছু ঠিক আছে, এখন কিছুই করার নেই। আমাদের চিন্তাধারার এই স্বরূপ বর্তমানে বিরাজমান মূল সমস্যাগুলির প্রধান একটি। আমরা যদি মানসিকভাবে স্বীকার করে নেই যে আমাদের সমাজে ধর্ষন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সরকারি কাজে গাফলতি, দেশের মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলগুলির দায়বদ্ধতা এবং নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব, ধর্ম নিরপেক্ষতা – এই বিষয়গুলি ও তাদের ধারণা, সংজ্ঞা, বর্তমান পরিস্থিতি এসব নিয়ে ব্যপক সমস্যা বিদ্যমান শুধু তাহলেই সমস্যা সমাধানের পথে আমরা বিশাল এক ধাপ এগিয়ে থাকবো।

সমস্যাকে স্বীকার করে নেয়ার মধ্যে গ্লানির কিছু নেই, সমস্যা থাকবে, কিন্তু সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত হলো সমস্যার অস্তিত্বের উপস্থিতিকে সন্দেহাতীতভাবে জানা, এ বিষয়ে জাতিকে সামগ্রিকভাবে অবহিত করা এবং সেইসাথে এর সমাধানের লক্ষ্যে সকলে মিলে উপায় খুঁজে বের করা। এই প্রাথমিক কাজটুকু না করে কোন সমস্যার যা তা তড়িঘড়ি সমাধান করা হবে একটি সাময়িক স্বস্তি মাত্র, ভালো করে নিশ্বাস নেবার আগেই প্রায় একই রকম আরেকটি ঘটনার খবর পেয়ে যেতে পারি। শিশু হত্যা, নারী ধর্ষণ-হত্যা এসব তাই আমরা কিছুদিন পরপরই দেখতে পাই এবং এর বিভৎসতায় কেঁপে উঠি। অন্যায়ের যথার্থ বিচার, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এর কোনটাই এইসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যদিও এইটুকু পাওয়াটাই এখন আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি মনে করি এজাতীয় কোন সমস্যা পুরোপুরিভাবে দূর করতে হলে এ ব্যাপারে একটি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে আগানো চাই। সমস্যা যত গভীর এর সমাধানও ততো কঠিন হবার কথা। তাই বলে আমরা কঠিন পথ পাড়ি দিব না তা তো আর হতে পারে না। ধর্ষণ, হত্যাকান্ড, পরিবারের মধ্যে শারীরিক অত্যাচার, শিশু হত্যা এসব সমস্যা অনেক গুরুতর এবং এইসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে তার উপর ভিত্তি করে সমাধান ঠিক করে সেই লক্ষ্যে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে।

দেশের হাজারো সমস্যার মাঝে ধর্ষণ, হত্যাকান্ড, পারিবারিক শারীরিক অত্যাচার, শিশু হত্যা এইগুলো সবচাইতে বেশী পীড়াদায়ক এবং আমাদের মনুষ্যত্বকে তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমি তাই আজকের এই লেখায় এই সমস্যাগুলির সমাধানের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কারণ এবং উপায় বের করার চেষ্টা করবো। প্রথমেই একটা কথা বলে নেয়া ভালো। এইসব ঘটনার কোনটাতেই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা যায় না, যেটা আমরা সাধারণত করে থাকি। এটা আজকে আমাদের সবারই জানা থাকা উচিৎ, কোন একজন মানুষের পোশাক, তাঁর আচরণ, কাজের ধরণ ও সময়, দিন বা রাতের বেলায় চলাফেরা বা কাজের জন্য যাতায়াত এসব কখনই ধর্ষণ, হত্যাকান্ড বা অত্যাচারের কারণ হতে পারে না। একজন ধর্ষক, হত্যাকারী, অত্যাচারী সে যেই হোক না কেন সে নিজেই তার অপরাধের জন্য দায়ী, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা আর অপরাধীকে সমর্থন করা আসলে একই জিনিষ। তাই এইসব সমস্যা এবং তার সমাধান খুঁজতে গেলে সবচেয়ে প্রথম আমাদের যে কাজটি করতে হবে তা হলো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা বা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।

পৃথিবীর সকল ধর্ষণের ৯৯% এর জন্য দায়ী পুরুষেরা। এ থেকে পরিস্কার ভাবে বোঝা যায় এর জন্য পুরুষের দায় একচ্ছত্র, আর তাই এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে পুরুষের দায়িত্বও সবচাইতে বেশি। কেন তবে শুধু পুরুষেরা? কারণ খুবই সহজ, সাধারণভাবেই আমরা নারী মানেই ভাবি দুর্বল। মেয়েদের শারীরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা আমরা সহজ ও স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তা করে নেই। একজন নারীও সাধারণ ভাবে তাই চিন্তা করেন। যদিও আজকের দিনে অনেক দেশেই ব্যপকভাবে এবং এমনকি আমাদের দেশেও ছোট করে হলেও এই ধরণের চিন্তার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে, তবুও সাধারণ ভাবে নারী মানেই তুলনামূলক ভাবে পুরুষের চাইতে শক্তিতে কম এটাই আমরা ভাবতে পছন্দ করি। আমাদের অন্তঃস্থিত শক্তির তারতম্যের প্রাক-ধারণাই ধর্ষণ, হত্যাকান্ড, অত্যাচার এসবের প্রাথমিক কারণ। তবে এই শক্তির তারতম্য শুধু শারীরিক নয়, এ তারতম্য অর্থনৈতিকও বটে। যে মুহূর্তে কোন পুরুষ তার শক্তির আধিপত্য নিয়ে নিশ্চিত হয় ঠিক সে মুহূর্তেই সে এমন একটি অপরাধের সম্ভাবনার জন্য নিজেকে তার অজান্তেই সেই সম্ভাব্য অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর শুধু সুযোগের অপেক্ষা, দুর্বলের চিহ্নিতকরণ, অপরাধ চরিতার্থ করে তার নিশানা দূর করা এবং পলায়ন। অর্থনৈতিক শক্তির তারতম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং তা আমাদের মতো দেশের জন্য তো অবশ্যই। উন্নত দেশ গুলিতে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রশ্নে দেশের সব মানুষই প্রায় সমান, সেখানে নিরাপত্তা, বিচারবিভাগ এসবের সাথে ধনী গরীবের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের মতো দেশগুলিতে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা শহরের দিকে কেন্দ্রিভূত থাকার কারণে একটি বিরাট অংশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা সর্বজনস্বীকৃত। সেই সাথে যোগ হয় পারবারিক শক্তি এবং নিজ এলাকার সামাজিক শক্তি। পুরুষ হবার কারণে শারীরিক শক্তির অগ্রাধিকারের ধারণা, শহর থেকে দূরে থাকার অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক দুর্বলতা, পারিবারিক-সামাজিক-ভৌগোলিক অবস্থানের তাত্ত্বিক নিম্নতা – এসব কিছুর একটা সমন্বয়ে একজন পুরুষ অপরাধের অনুকূল পরিবেশে হয়ে উঠে ধর্ষক, খুনি, শারীরিক বা মানসিক অত্যাচারী।

পুরুষত্ব, শারীরিক ও অর্থনৈতিক তারতম্য, পারিবারিক-সামাজিক-ভৌগলিক নিম্নতা – এসব হলো একজন মানুষের অপরাধী হয়ে উঠবার পেছনে প্রত্যক্ষ কারণ। আরো কিছু বিষয় আছে যা কিনা পরোক্ষভাবে এসবে নিরন্তর প্ররোচনা দিয়ে যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের মধ্যে মানবিক স্বাধীনতাবোধের অভাব। একজন মানুষ ঠিক শুধু মানুষ হবার কারণেই অন্য সব মানুষের সমান। নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরীব, ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে সব মানুষ সমান। একজন সত্যিকার মানুষ হবার পূর্বশর্ত হলো নি:শর্ত ভাবে এই মানুষের এই মানবিক স্বাধীনতার সত্যকে স্বীকার করে নেয়া। পরোক্ষ প্ররোচনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ধর্ম। একজন অপরাধীর চিন্তার যৌক্তিকতাটা এরকম – যেহেতু ধর্মে পর্দাপ্রথার কথা বলা আছে সেহেতু সব মেয়েদেরই তা মেনে চলা উচিৎ, যারা মানে না তার অবশ্যই শাস্তির যোগ্য, আর একজন সাচ্চা মুসলমান হিসেবে এই দায়িত্ব কিছুটা আমার উপরে এসেও পরে, আজকে আমি পর্দাপ্রথার অমন্যকারীকে ধর্ষণ করে যদি ভবিষ্যৎকে ইসলাম এবং পর্দার পথে নিয়ে আসতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। এই চিন্তাধারা থেকেই একজন ধার্মিক অপরাধের পক্ষে পরোক্ষ প্ররোচনা পায়, এমনকি সাধারণ মডারেট ধার্মিক মানুষেরাও অবচেতন ভাবে এসব অপরাধের পক্ষে নি:শব্দ সায় দিয়ে যায়। কিন্তু একবারের জন্যেও চিন্তা করে না, সিনেমার নায়িকা, বিজ্ঞাপনের মডেল, রাজনৈতিক নেত্রী, গুলশান-বনানী-ধানমন্ডির মতো জায়গায় পশ্চিমা কায়দায় ও জামা কাপড়ে বেড়ে উঠা মানুষেরা এইসব অপরাধের সাধারণ ভুক্তভোগী নয়, কারণ এরা হচ্ছে আমাদের সুরক্ষিত শ্রেণী। রাষ্ট্র হচ্ছে আমাদের আরেক বড় পরোক্ষ প্ররোচনাদায়ক। রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের নির্লিপ্ততা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের অকার্যকারিতা, দুর্নীতি – এসব কিছুই একজন মানুষকে অপরাধী করে তুলতে উস্কানি দেয় এবং সার্বিক সহায়তা করে। আমরা খুব ভালো করেই জানি এইসব অপরাধের পর রাষ্ট্র এমন ভাব করে যেন কিছুই হয়নি, কোন কোন মন্ত্রী এমনটাও বলে থাকেন এরকম সব দেশেই একটু আধটু হয়ে থাকে, ব্যাপার না। জ্বী স্যার, এগুলো আমাদের কাছে ব্যাপার। আমরাই একজন ধর্ষিতার চিৎকার শুনতে পাই, একটি শিশুর ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনতে পাই, কারণ, এরা আমাদেরই মা, বোন, সন্তান। আপনার এইসব শুনতে পাবেন না, কারণ এগুলো আপনাদের পাশে হয় না, আপনি এবং আপনাদের পরিবার সুরক্ষিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

ধর্ষণ, ধর্ষণ-হত্যা, শিশুদের উপর শারীরিক অত্যাচার, শিশুহত্যা এই ধরনের ভয়ানক, পাশবিক, অমানবিক অপরাধ বন্ধ করতে এবং অপরাধীদের অপরাধ-অনুকূল পরিবেশ তৈরি বন্ধ করতে হলে আমাদেরকে উপরে আলোচিত সবগুলি বিষয়ের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর সাথে সাথে এটাও মনে রাখতে হবে কোন অপরাধই সম্পূর্ণ নির্মূলযোগ্য নয়। তাহলে পশ্চিমা ও উন্নত দেশগুলিতে ধর্ষণের মতো অপরাধ থাকতো না। সেসব দেশে এগুলি কম হয় না, বরং এই অপরাধের বিচারে বিশ্বের প্রথম দিকের পাঁচ-দশটি দেশ গুনতে গেলে ইউরোপ আমেরিকা দিয়েই তালিকা ভরে যাবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এখানে একটি বিশাল পার্থক্যও আছে, এইসব উন্নত দেশে এইধরণের অপরাধের বিচার চেয়ে অভিযোগের সংখ্যাও অনেক বেশী, কারণ এখানে বিচার অনেকটাই নিশ্চিত একটি অধিকার, এবং এখানে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা হয় না। অন্যদিকে আমাদের মতো দেশে মরে গেলে তো শেষ, কিন্তু বেঁচে থাকলে ভোগান্তি চিরজীবনের জন্য নিশ্চিত। আর তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত যে কারণগুলিতে একজন পুরুষ মানুষ ধর্ষক, খুনি, অত্যাচারী হয়ে উঠে সে কারণগুলিকে আক্রমণ করা, সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা। রাষ্ট্রকে আরো বলিষ্ঠ, সময়োপযোগী, মানবতা প্রশ্নে পক্ষপাতহীন হয়ে উঠতে হবে। আমাদের লক্ষ্য এক তনু হত্যার বিচার নয় বরং লক্ষ তনুর মান-সম্ভ্রম-জীবন রক্ষা। আমাদের লক্ষ্য ঠিক থাকলে এইসব অপরাধের সংখ্যা কমিয়ে আনা যাবে অনেক। এরপরেও যখন এধরণের ঘটনা ঘটবে, তখন আমরা সবদিক থেকেই তার অপরাধীদের সঠিক বিচারের জন্য প্রস্তুত থাকবো আশা করি, কমপক্ষে আমরা জানবো সেই অপরাধ দুর্বলের প্রতি সবলের অন্যায় সুযোগ থেকে হয়নি, আমরা আমাদের দায়িত্ব আগে থেকেই পালন করেছি, এখন শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করে তার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *