সুন্দরবনের ভিতর বিদ্যুৎকেন্দ্র — কি কি মূল্য দিতে হবে এই দেশকে, দেশের মানুষ কে!!

বাঘেরহাটের রামপালে ভারতের সাথে যৌথ সহযোগিতায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্প করার চুক্তি সম্পন্ন করেছে সরকার। দুইটা আলাদা বিষয় খেয়াল রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত – ঝড় ঝাপটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে থেকে বুক পেতে বাংলাদেশ রক্ষাকারী এই বনের মধ্যে বা কাছা কাছি ক্ষতিকর দূরত্বে এমন কোন প্রকল্প করা উচিৎ কিনা যা জীব – বইচিত্রের আধার এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী, সর্বোপরি দুর্যোগ থেকে রক্ষাকারী এই প্রাকৃতিক দেয়াল ধ্বংস করে দিবে? সচেতন মানুষ মাত্রেই একমত হবেন নাবোধক উত্তরে। এমন বিদ্যুৎ আমাদের দরকার নাই যে বিদ্যুতের জন্য আমাদের দেশটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় জরুরী প্রশ্ন হল- অন্য কোথাও বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হলেও আমরা কি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতি সামাল দিতে পারব? সঙ্গত কারনেই প্রশ্নটা রাখলাম। যে বিদ্যুৎ প্রকল্প বন ছাড়া অন্য যেকোনো স্থানে করলেও তার অপরিসীম ক্ষতিকর প্রভাব দিয়ে যুগের পর যুগ মানুষের ক্ষতি সাধন করে সে ধরনের একটি কয়লা প্রকল্প সুন্দরবনে করার অর্থ কি?

কয়লা ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত এবং পরিবেশগত প্রভাব আলোচনা করতে গেলে একে সভ্যতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপাদান হিসেবে সারা পৃথিবীতে ব্যাপক হারে কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ মানুষের উপকারেও লাগছে কিন্তু মানবজাতি কয়লার এই উপকার গ্রহন করার জন্য বড় বেশী মূল্য দেয়। এর ক্ষতিকর দিক আলোচনা করে শেষ করার মত নয়। তবুও সংক্ষেপে কয়লা ব্যবহারের কিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হল।

• সারা বিশ্বের কয়লা খনি গুলোতে প্রতি বছর দুর্ঘটনা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে অক্রান্ত হয়ে ২৪,০০০ এর বেশী মানুষ মারা যায়।
• উড়ন্ত ছাই (ফ্লাই অ্যাশ), বার্নারের নিচে জমা হওয়া ছাই (বটম অ্যাশ ), মারকারি, তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, আর্সেনিক, ভারি ধাতু সহ কোটি কোটি টন বর্জ্য উৎপাদন।
• উচ্চ মাত্রার সালফার মিশ্রিত কয়লা থেকে এসিড বৃষ্টি হওয়া।
• বিষাক্ত পদার্থ সমুহের ভূগর্ভস্থ জলাধারে এবং খনি এলাকায় মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়া।
• স্থলভূমি, নদনদী, খাল–বিল বিষাক্ত উড়ন্ত ছাই এর কারনে বিষক্রিয়ায় অক্রান্ত হওয়া।
• কয়লা খনি এলাকা এবং এর আসে পাশের এলাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাওয়া।
• কয়লা খনিতে বজ্রপাত অথবা আসেপাশের বনাঞ্চল থেকে লাগা আগুন কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত জ্বলতে থাকা।
• কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উড়ন্ত ছাই নিয়ন্ত্রন করার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হওয়া।
• কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত হওয়া বিষাক্ত মারকারি, সেলেনিয়াম, আর্সেনিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।
• কার্বনডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ – বায়ুমণ্ডলে কয়লার কারনে সবচেয়ে বেশী পরিমানে কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরিত হয় যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী।

যে ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করা হল সেগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী যে জানেনা তা নয়। খুব সচেতন ভাবে বর্তমান সরকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ৯ কিলোমিটারের মধ্যে বাঘেরহাট জেলার রামপালে ভারতের সাহায্যে দুই পর্বে ২৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা ও চুক্তি সম্পাদন করেছে। যেকোনো একটি ১০০০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্দুতকেন্দ্র থেকে

৩০০,০০০ টন ছাই
৪৪,০০০ টন সালফার ডাই অক্সাইড
২২,০০০ টন নাইট্রাস অক্সাইড
৬০০০,০০০ টন কার্বন বর্জ্য হিসেবে তৈরি হয়
এছাড়া ৭১৪,০০০ গ্যালন পানি প্রতিদিন দরকার হয় বিভিন্ন প্রক্রিয়া ঠাণ্ডা করার কাজে

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় কয়লা আসবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদী দিয়ে। ফলে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত জাহাজের কারনে

বনের শব্দ দূষণ
নদীর পরিবেশ দূষণ
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পশুর নদী থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবহৃত পানি, নিঃসরিত গরম পানি নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করা।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাভাবিক দূষণ

এই সব মিলে পশুর নদী একটি মৃত নদীতে পরিণত হবে এবং ব্যাপক মাত্রায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক বছরের মধ্যে সুন্দরবন বলে কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবেনা। যে সুন্দরবন ধ্বংস হলে বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকবে না।
সারা পৃথিবীতে মানুষ যখন ফসিল ফুয়েল জ্বালানো বন্ধ করে বিকল্প নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করছে কিংবা নিদেনপক্ষে চেষ্টা করছে তখন বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী কেন ভারতের সাহায্যে আমদানি নির্ভর কয়লার সাহায্যে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করছে তাও আবার সুন্দরবনের ভেতর তা সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।

৭ thoughts on “সুন্দরবনের ভিতর বিদ্যুৎকেন্দ্র — কি কি মূল্য দিতে হবে এই দেশকে, দেশের মানুষ কে!!

  1. যে জিনসের উপকারিতা আছে তার
    যে জিনসের উপকারিতা আছে তার অপকারিতাও থাকবে ।সুন্দরবনের ১৪কিলোমিটার দুরে হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ।পরিবেশের ক্ষতি এমনিতেই হচ্ছে এবং হবে,তাই বলে শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা উচিৎ নয় ।বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে যে পরিমান ক্ষতি হতে পারে সরকার সে ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কি পরিমান পদক্ষেপ নেয় তার প্রতি নজর দিন ।যদি সরকার সে রকম কোন ব্যবস্থা না নেয় তবে সরকারকে পরিবেশের ক্ষতি যাতে না হয় সে জন্য অনুরোধ বা পরামর্শ দেয়া যেতে পারে ।এরপর ও সরকার যদি গুরুত্ব না দেয় তবে আন্দোলন করা যেতে পারে ।

    1. ধরেন আপনার পা কাটার পরিকল্পনা
      ধরেন আপনার পা কাটার পরিকল্পনা করল কেউ। আপনি কি পাটা কেটে ফেললে প্রতিবাদ করবেন নাকি আগেই সাবধান হবেন????
      ক্ষতি করলে আপনি ক্ষতি পোষানোর কথা ভাবছেন কেন? সরকার ক্ষতি করবে কেন?

  2. আমরা সোচ্চার না হইতে
    আমরা সোচ্চার না হইতে পারি……মাগার পশু পাখি খ্যাপলে……… :জলদিকর: :জলদিকর: :জলদিকর: :টাইমশ্যাষ: :টাইমশ্যাষ: :টাইমশ্যাষ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *