স্বাধীনতা! একটি স্বপ্নের নাম। স্বাধীনতা দিবস সেই স্বপ্নকে ফিরে দেখবার উপলক্ষ্য!

স্বাধীনতা! একটি স্বপ্নের নাম! স্বাধীনতা দিবস সেই স্বপ্নকে ফিরে দেখবার একটি উপলক্ষ্য!

কেন যেন এই দিনটা আসলেই অনেকের মনে স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। হাজার হাজার সুপ্ত আফসোস এইদিনেই উগড়ে দেয়া হয়। এত এত আফসোসের কথা পড়ে ঠিক হোক কিংবা ভুল, মনে হয় যে স্বাধীনতা মনে হয় সত্যিই আসেনি, স্বাধীনতা রয়ে গেছে অধরা। দেশ জাতি এবং তার প্রতিটা মানুষ ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার বৃত্তে। সব অর্জন, আত্মত্যাগ বৃথা এই ভাবনার দিকে ধাবিত হই আমরা। কিন্তু কেন?


স্বাধীনতা! একটি স্বপ্নের নাম! স্বাধীনতা দিবস সেই স্বপ্নকে ফিরে দেখবার একটি উপলক্ষ্য!

কেন যেন এই দিনটা আসলেই অনেকের মনে স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। হাজার হাজার সুপ্ত আফসোস এইদিনেই উগড়ে দেয়া হয়। এত এত আফসোসের কথা পড়ে ঠিক হোক কিংবা ভুল, মনে হয় যে স্বাধীনতা মনে হয় সত্যিই আসেনি, স্বাধীনতা রয়ে গেছে অধরা। দেশ জাতি এবং তার প্রতিটা মানুষ ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার বৃত্তে। সব অর্জন, আত্মত্যাগ বৃথা এই ভাবনার দিকে ধাবিত হই আমরা। কিন্তু কেন?

আজকে এই বিশেষ দিনটিতে শত আফসোস, অনুযোগ, অভিযোগের বাইরে বেরিয়ে কিছু ইতিবাচক কথা বলি। আমি মনে করি, আমাদের প্রাপ্তির পরিমাণ অনেক অনেক বেশি অপ্রাপ্তির এবং আফসোসগুলো থেকে এই স্বাধীনতা অর্জনের কারণে।

ভাষা এবং সংস্কৃতিঃ
স্বাধীনতার কারনে আমরা উর্দুর প্রভাব থেকে একেবারেই মুক্ত হতে পেরেছি। কেবল একবার ভেবে দেখুন, স্বাধীনতা না আসলে আমাদের জাতীয় সংগীত হত উর্দু ভাষার। আপনার সন্তানেরাও গাইতো, “পাক সার জামিন সাদ বাদ”। এর বাইরেও দেখুন, বাংলা এখন কতটা প্রচলিত, কতগুলো সংবাদপত্র, একটি নয়, বেশকিছু জনপ্রিয় বাংলা ব্লগ সহ বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির বিস্তারে স্বাধীনতার অবদান কতটা। আমাদের নিজেদের ভাষার যতগুলো চ্যানেল আছে পাকিস্তানের কি তা আছে? প্রতিবছর সাহিত্যে জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয় জাতীয়ভাবে তার ছিটেফোটাও উর্দুপ্রিয় পশ্চিমাদের হাত থেকে পাওয়া যেতো? বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য কিন্তু পিছিয়ে থাকতো এমন অনেক কারণে। হয়তো বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সরকারী ছুটি তো দুরের কথা, নববর্ষ বোনাসের প্রচলনের কথা কল্পণাতেও আনা যেত না। নববর্ষের কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেটাও হয়তো শুরু হতো “পাক সার জামিন সাদ বাদ” দিয়ে।

রাস্ট্র হিসেবেঃ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ নানা সূচকে আমাদের অবস্থান পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র থেকে অনেক ভালো। একমাত্র সামরিক বাহিনীতে আমরা পিছিয়ে আছি। সত্যি কি সেটাতেও পিছিয়ে আছি? আমি মনে করি না। আমরা আমাদের জাতীয় জিডিপির দেড় ভাগ ব্যয় করি সামরিক খাতে যা মোট বাজেটের ৫% ও নয়। পাকিস্তান ব্যয় করে ২০ ভাগ, যা মোট বাজেটের ২৫% এর বেশি। আমরা আক্রমনাত্মক প্রতিরক্ষা নীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা প্রতিবেশীদের বন্ধুই ভাবি। এত বিশাল জনসংখ্যার একটি দেশে এত কম সামরিক ব্যয় করেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে পারাও রাস্ট্র হিসেবে বিশাল এক সাফল্য।

আত্মনিয়ন্ত্রণঃ
স্বাধীনতা লাভের আগে বাঙ্গালীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সরকারী চাকুরিতে বাঙ্গালীরা ছিল মাত্র ২০-২৫ ভাগ। সামরিক বাহিনীতে তা আরও কম ছিল। শতকরা হিসেবে ১০% ও না। আর এখন এদেশে সরকারী কর্মচারীর সংখ্যা ২৪ লক্ষ। দেশ যদি স্বাধীন না হত তবে এ সংখ্যাটা কত শতাংশ হতে পারতো সর্বোচ্চ? সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে রাজনীতির নানা অন্ধকার দিকের পরও আমাদের মানুষ যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং যেকোনো সরকার এমন দাবীর কাছে মাথানত করতে বাধ্য হয়েছে। স্বোইরাচার বিরধী আন্দোলন থেকে সমসাময়িক শিক্ষার উপর ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন তার প্রমাণ। পুলিশের বিচ্ছিন্ন গোলাগুলি বাদ দিলে এই স্বাধীনতার কারনেই কেউ অন্তত আরেকটি ২৬ শে মার্চের নৃসংশ দমন পন্থা অবলম্বনের সাহস করতে পারবে না। কারণ, যারা এ কাজ করবার নির্দেশপ্রাপ্ত হতে পারে তারাও জানবে যে জনগনের মধ্যে তাদেরই আত্মীয়, বাবা মা, ভাই বোনেরা রয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নতিঃ
নিজেদের একটি দেশ আছে বলেই আজকে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা। এত বিস্তার হয়েছে এই শহরের। দেশ স্বাধীন না হলে প্রাদেশিক ক্যাপিটাল হয়েই থাকতে হত একে। প্রসাশনিক বিকেন্দ্রিকরণ এবং বিস্তারের কারণে নানা জেলা শহর পর্যন্ত তখনকার ঢকার থেকে উন্নত। সারাদেশে মহাসড়ক সহ নানা অবকাঠামোর ব্যাপক বিস্তার এবং উন্নতি হয়েছে। অর্থের প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক কাজকর্মের বিস্তার অনেক বেড়েছে। দেশে ভিক্ষা করে খাওয়া মানুষের পরিমাণ এখনো কম না হলেও কমে গেছে অনেক। বছর বছর মঙ্গায় না খেতে পেয়ে মানুষের মৃত্যুর কথা এখন কমই আসে খবরের কাগজের পাতায়।

দেশের বাজেটের পরিমানঃ
দেশের মোট বাজেটের পরিমাণ এখন পাকিস্তান নামের রাষ্টের সমান সমান। অন্যভাবে বলতে গেলে পাকিস্তানের থেকে বেশি, কারণ, আমাদের সামরিক খাতে ব্যয় কম বলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাত সহ নানা ক্ষেত্রে ব্যয়কৃত অর্থের পরিমাণ বেশি। মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও পাকিস্তানিদের থেকে অনেক কম। পাকিস্তান আমলে দেশের মোট বাজেটের একটা ক্ষুদ্র অংশ আসতো পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। যদিও দেশের মট জিডিপির ৬০% এর মত অবদান রাখতো পুর্ব পাকিস্তান। দেশ স্বাধীন না থাকলে এ অবস্থা কি খুব বেশি পরিবর্তিত হত?

রাজনৈতিক স্বাধীনতাঃ
স্বাধীনতার পর ৪৫ বছরে আমরা যতদিন স্বৈরাচার কিংবা সামরিক শাসনের অধীনে থেকেছি, তার থেকে অধিক সময় গণতন্ত্রের মধ্যেই ছিল দেশ। পাকিস্তানে সেটা অর্ধেকেরও বেশি সময়। জে জিয়া, জেঃ মোশাররফ একটা বড় সময় শাসন করেছেন দেশ। এর বাইরেও সেনাবাহিনী সেখানে সরকারের উপর ব্যাপক প্রভাব রাখে। তাদের সম্মতি ছাড়া কিছুই হয়না। আমাদের দেশটার অবস্থা কিন্তু স্বাধীনতার পর জে এরশাদ ছাড়া লম্বা সময় কেউ সামরিক বাহিনীর প্রভাবের ভেতর রাখতে পারেনি। নানা অভিযোগের পরেও আমাদের দেশটা ওদের দেশের থেকে অনেক অনেক বেশি গণতন্ত্রের কথা বলে, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে আওয়াজ তোলা যায়।

আইন শৃংখলা পরিস্থিতিঃ
পৃথিবীর যেকোন দেশের মানুষ পাকিস্তানে যেতে ভয় পায়। বোমা হামলা সহ নানা সন্ত্রাসী ঘটনা অহরহ হয়। ১০-২০ জন মানুষ মারা গেলেও সংবাদ মাধ্যম তা তেমন গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে না। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো একটা ককটেল বিস্ফোরণ হলেও সংবাদপত্রের হেডলাইন হয়ে যায়। খুন, ধর্ষন ডাকাতির মাত্রা আমাদের দেশে অনেক কম অদের থেকে। ধর্ষন দিয়ে বিচার করলে আমরা আমেরিকা থেকেও ভাল অবস্থায় আছি। কারণ, সেখানে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি ধর্ষন হয়। সামাজিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় এবং অন্যান্য কারনে আমাদের দেশে ধর্ষিতাকে নীচু চোখে দেখা হয়। এ পরিস্থিতিও কিন্তু ভাল হচ্ছে। শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টাচ্ছে।

অর্থনীতিঃ
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বৈশ্বিক মন্দার সময়েও আমাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েনি, তখনো প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এখনো আমাদের প্রবৃদ্ধির হার খুব একটা খারাপ নয়। টাকার মান বেশ অনেক বছর ধরে স্থিতিশীল এবং ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের এবং তেলের দাম কমে যাওয়ার কারনে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিক গতিতে। দেশের জন্য তা অনেক ইতিবাচক। আমাদের হাতে থাকা রিজার্ভ দিয়ে ৮ মাসের আমদানী ব্যয় মেটানো যাবে, যা বিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড মান হিসেবে তিন মাসের হলেই ভাল বলে ধরে নেয়া হয়। পাকিস্তান মেটাতে পারবে মাত্র দেড়মাসের আমদানী ব্যয়। আমরা কি এক্ষেত্রেও অদের থেকে এগিয়ে নেই?

খাদ্য উৎপাদনঃ
জনসংখা বৃদ্ধির হার এখনো অনেক বেশি, তবে অনেকটাই কমে এসেছে। পাকিস্তানের কিন্তু এখনো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হলেও দেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে ধারাবাহিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোন বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে দেশে ভাল পরিমাণ মজুদ আছে এবং বিদেশ থেকে দ্রুততম সুয়ে আমদানীর সক্ষমতাও বেশ ভাল। এসব কি উন্নতি নয়? দেশ স্বাধীন না হলে এতটুকুও কি আমরা আসতে পারতাম?

খেলাধুলা এবং অন্যান্যঃ
এর বাইরেও অনেক অনেক ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া যাবে। খেলার কথা দিয়েও বলা যায়। নিজেদের একটা পতাকা না থাকলে হয়তো কখনো সাকিব, মুশফিক কিংবা মুস্তাফিজের নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উঠে আসতো না। সাকিব পাকিস্তান দলে সুযোগ পেতো না। মুস্তাফিজকে কেউ তুলে এনে সরাসরি জাতীয় দলে সুযোগ দিয়ে মাশরাফির মত জুয়া খেলার সুযোগ নিত না। নিজের মানুষ তো নিজের জন্যই করে। পাকিস্তানীরা কি এমন করতো?

একটা দেশের স্বাধীনতা একটি স্বপ্নের নাম। সবসময় তা অসমাপ্ত স্বপ্ন হিসেবেই থেকে যায়, একদম পরিপূর্ণ কিছু কখনোই হয়তো হয়না। আমাদের দেশটাও অন্যরকম স্বপ্নের একটা অসমাপ্ত অধ্যায়, আর একে পরিপূর্নতার দিকে আরেকটু এগিয়ে দিতে প্রথমেই দরকার দেশের প্রতি মায়া ভরে দিয়ে সম্পুর্ন নতুন এক প্রজন্মের। দেশের প্রতি বুকে মায়া ধারন করা কোটি কোটি দেবশিশুর যারা নিজেদের দেশটাকে একসময় নিজেদের মত করে গড়ে তুলবে। আর এ দ্বায়িত্বটা নিতে হবে আমাদেরই। স্বাধীনতা নামের যে স্বপ্ন এত বছর ধরে বুকে ভেতর সযত্নে লালন করে রেখেছে কোটি কোটি মানুষ, তা আমাদেরই সুখ স্বপ্নে পরিণত করতে হবে। একদিন না একদিন এ দেশটা সত্যি হয়ে উঠবে স্বপ্নের মত।

সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *