এইসব গোলাপের দিন(২২-২৫)

২২.
সখী যাতনা কাহারে বলে?
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নার্সটি বলল,
– এবার পহেলা ফাগুনে আপনি ঘুরতে গিয়েছিলেন?
– নাহ্।
– জানেন আমিও যাই নাই।
সে ঠোঁট বাঁকাল। ঠোঁটই তো। কিন্তু বাকঁলে সমস্ত ব্রক্ষান্ড সমেত বেঁকে ওঠে। আমাদের ঘরটি রোদহীন। তাই নার্সের কামিজটি এখন গাঢ় সবুজ।
সে আমার হাত থেকে লেবুগুলো নিল। বলল
– শরবত খাবেন?
– জ্বি।
– আপনাদের রান্নাঘর কোথায় দেখেছি। চিনি খুঁজে পাই নি। চিনি কোথায় রাখেন আপনারা বলুন ত।
– আমি ঠিক জানি না। আমার ওয়াইফ জানে।
– অ
আমি ফোন দিলাম স্ত্রীকে। সে ফোন ধরে বলল
– কি ?
– আই লাভ ইউ সো মাচ বেবি।
– দেন হোয়াই ডু ইউ টর্চার মি? কেন এত কষ্ট দাও।

২২.
সখী যাতনা কাহারে বলে?
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নার্সটি বলল,
– এবার পহেলা ফাগুনে আপনি ঘুরতে গিয়েছিলেন?
– নাহ্।
– জানেন আমিও যাই নাই।
সে ঠোঁট বাঁকাল। ঠোঁটই তো। কিন্তু বাকঁলে সমস্ত ব্রক্ষান্ড সমেত বেঁকে ওঠে। আমাদের ঘরটি রোদহীন। তাই নার্সের কামিজটি এখন গাঢ় সবুজ।
সে আমার হাত থেকে লেবুগুলো নিল। বলল
– শরবত খাবেন?
– জ্বি।
– আপনাদের রান্নাঘর কোথায় দেখেছি। চিনি খুঁজে পাই নি। চিনি কোথায় রাখেন আপনারা বলুন ত।
– আমি ঠিক জানি না। আমার ওয়াইফ জানে।
– অ
আমি ফোন দিলাম স্ত্রীকে। সে ফোন ধরে বলল
– কি ?
– আই লাভ ইউ সো মাচ বেবি।
– দেন হোয়াই ডু ইউ টর্চার মি? কেন এত কষ্ট দাও।
তিনি মৃদু চিৎকার করলেন। কাঁদছেন এখন। কান্না পাচ্ছে আমারও। বেইবি..বেইবি…অহ্ মায় বেইবি।
নার্সটি অবাক হল। ছুটে এসে বলল
– আপনি কাঁদছেন কেন? না , না দেখি। ছিঃ ছিঃ বাবু কাঁদে না।
তিনি আমাকে জড়িয়ে রেখেছেন। তিনি খুব উষ্ণ। শরীরে গভীর ঘ্রাণ।

২৩.
the locusts have no king, yet all of them go out in ranks
– (all the lights we cannot see: Anthony Doerr)

আমার বিরক্তি ঘটছে। বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। নার্সটির সাথে।
তখন মনসুর সাহেব ডাকলেন। বাসার নীচে এসে চেঁচাচ্ছিলেন আমার নাম ধরে ।

আমার মনে হচ্ছিল সবাই শুনছে। চারদিকের লোকেরা। কিসব জানি ভাবছে তারা। টেনশন হচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি নেমে এলাম। নইলে নামতাম না। নার্সটি বলেছিল আজকে আমরা পহেলা ফাগুন করব।

নীচে নামলে মনসুর সাহেব বললেন
– চলেন হসপিটালে যাই
– আমি যাব না। আমার শরীরটা খারাপ।
– ভাবীর সাথে দেখা করবেন। গতকাল রাতের থেকে অবস্থা খারাপ করেছে। আপনাকে যে বলসিলাম অবস্থা ভাল, ওটা মিথ্যা করে বলসিলাম। আপনে এমনেতেই শকে ছিলেন…
– আমার ওয়াইফ তো গাইবান্ধা গেছে, আপনে জানেন না?
মনসুর সাহেব আমার হাত ধরে টানলেন। বললেন যে
– আপনে আসেন তো ভাই।

তার গলা ভেঙে গেল। কিছুদুর হেঁটে একটা চায়ের দোকানের বেন্চে বসে পড়লেন তিনি। আমি অস্থির হলাম। “এই কি হল! কি হল!” বললাম। মনসুর সাহেব বলতে লাগলেন
– আমি ভাবীকে দেখতে গেসিলাম। চিনতে পারি নাই, হায় খোদা এরা কি মানুষ , আমি চিনতে পারি নাই…..

তিনি চিৎকার করছেন এবং কাঁদছেন। সুতরাং চারপাশে লোক জমতে লাগল। ধীরে ধীরে বিশাল জনতা হয়। তাদের কৌতুহল খুব। প্রশ্ন শুরু করে তারা।
“ বাই কী-ইছে?” “ ওনারে মাচ্ছে?” “ ক্যাডায় মাচ্ছে?” “ ওনার পোলারে মারছে?” “ সরকার বাইনীর হাতে মরছে নাকী বিপ্লবীগো হাতে?” “বিপ্লবীগো কুন পার্টি এই এলাকায় আছে এখন?” “ ওনার কি-ইছে?” “ ভাই কাইন্দেন না, আল্লাহ্ রে ডাকেন” “কী-ছে” “ কী-ছে?”
আমি জনতার পানে তাকাই। সোজা হেঁটে যাই লাল গেনজি পরা একজনের দিকে। জিগাশা করি যে
– ভাই আপনার নাম?
লোকটি খুশি হয়। একটু ঝুঁকে এসে বিনয় জড়িত কন্ঠে বলে
– আমার নাম পল্লব। আমি বিবিএ কমপ্লিট করলাম লাস্ট মান্থে। আপনারা সবাই একটু আমার জন্যে দোয়া করবেন।
আমি উল্লসিত গলায় বলি
– পল্লব ভাই আপনার সাথে পরিচিত হয়ে আমি চমৎকৃত। চলুন আমরা দেখি যে মনসুর সাহেব কানছেন কেন।
আমরা জনতা সমেত হাঁটি। মনসুর সাহেবকে ঘিরে দাড়াই আমরা। তিনি কিছু বলেন না। তার কান্না অবিরত রয়। আমাদের বিরক্তি ঘটে। আমি অন্যদের সাথে পরিচিত হতে থাকি
“ আমি সোহেল। এখানে দোকানে কাজ করি”
“ আমি মজনু । রিক্সা চালাই। আমরার দাদায় আছিল জমিদার”
“ আমি এই বছর এইচ এস এসি দিমু। এদিকেই থাকি। নামটা খেয়াল রাখবেন ইশরাক। কুন গ্যানজাম ঝামেলা হইলেই আমার নাম কইবেন।“
“ আমার জন্যে একটু দোয়া করবেন ভাইয়া। আমিও এই বছর মেডিকেল থেকে পাশ করলাম”
সবাই অনেক কথা বলে। হাসে। আমিও হাসি হাসি থাকি। আমার গালে ব্যাথা করে। তখন সবাই বিদায় নেয়। আমি হ্যান্ডশেকের পরে হ্যান্ডশেক করি। আমার হাতের তালু চুলকাতে থাকে। কাঁধে ব্যাথা হয়। পল্লব বিদায় নেয়, মজনু বিদায় নেয়, বিদায় নেয় আশরাফ, সাকিব, মমতাজ, করিম, হাসিব, সিজান, ইশরাক, কবির, খাইরুল। “ ভাল থাকবেন ভাই” “ আবার দেখা হবে” “ সময় দেয়ার জন্যে থ্যাংকিউ”। আপনারা ভাল থাকবেন। শালা শুয়োরের বাচ্চারা।

২৪.
এখন চৈত্রের দিন নিভে আসে, আরো নিভে আসে
– জীবনানন্দ দাশ

আমরা রিক্সায়। হাসপাতালে যাচ্ছি। মনসুর সাহেব মোবাইলে আলাপরত। তিনি কাঁদছেন না আগের মত। রিক্সায় উঠেই ভদ্রলোক নর্মাল হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন,
– আপনার শ্বশুরের সাথে দেখা হল সকালে। তিনি আজকে ভোরবেলা বাংলাদেশে পৌছালেন। আমার সাথে কথা হইল।
– কথা হইসে আপনার সাথে?
– জ্বি।
– অ
তারপর তার মোবাইল বাজে। আমি দেখছিলাম মনসুর সাহেবকে সুন্দর লাগছে। কম বয়স ফুর্তি ফুর্তি একটা ভাব। তারপর তিনি ফোন রেখে দিলে আমি জিগেশ করলাম
– ভাই, বসন্ত কি এসেছে?
তিনি বললেন
– হ্যা , আপনার মনে নাই সেদিন পহেলা ফালগুনে আমি আর ভাবি ঘুরতে গেলাম।
– ভাবী, ইউ মিন আমার ওয়াইফ?
– জ্বি।
আমি চিন্তিত হই। আমার মনে পড়ে না ঘটনাটি। বললাম যে,
– আপনে আর জিনিয়া ঘুরতে গেসিলেন পহেলা ফাগুনে?
– হুমম। আপনি বললেন আপনার ভীড় হইচই ভাল্লাগে না। যাবেন না। তখন আমি আর ভাবী গেলাম।
আমি চুপ থাকি। মনে করতে পারি না। জোলাক্সের স্মৃতিনাশক গুনাবলী আছে। আজকাল অনেক ঘটনাই মনে পড়ে না। আমার রাগ হতে থাকে। স্ত্রীটির স্বভাবে মাগীভাব বিদ্যমান। যার তার সাথে যেখানে সেখানে চলে যান। রাস্তায় কোকিল ডাকছিল। মনসুর সাহেব বললেন
– কোকিল ডেকে ডেকে কি বলে জানেন?
আমার কথা বলার আগ্রহ হচ্ছিল না। সংক্ষিপ্ত করে বললাম
– না।
– বলে যে ‘বসন্ত চলে যায়’ ‘বসন্ত চলে যায়’। সে ডাকাডাকি করে একজন কম্পানিয়ানের জন্য।
– ভাল।
– এ বিষয়ে আমার একটা কবিতা আছে।
– আমার কবিতা ভাল্লাগে না। আপনে চুপ থাকেন।
– তাই নাকী? আগে তো কোনদিন বলেননি।
– ভদ্রতা করে বলি নাই। এখন পরিস্থিতি খারাপ, ভদ্রতা করা বাদ দিসি।
– আই এম স্যরি। বাট লাস্ট এটা শুনে নিতে পারেন। প্লিজ।
আমার বিরক্তি হয়। ভদ্রলোক ছ্যাড়রামি করছেন। এমন তো, ছিলেন না উনি। আমার মনে হল মনসুর সাহেব পাল্টাচ্ছেন। সময়ের সাথে সাথে আরও পাল্টে যাবেন।
ভদ্রলোক আবৃত্তি করছেন।
“ বসন্ত যায়গা
ও সখী বসন্ত যায়গা
ফুরায়ে যেতে লেগেছে
রোদের বাসন্তী
ঈষৎ দক্ষিণ হয়ে আসছে হাওয়া
আমাদের পালকের রং
ক্রমান্বয়ে ধুসর
দৃশ্যহারা হইয়া গেলেগো সখী
আমাদের আর বসন্ত হবে না।“
রাস্তায় ফাগুনের ঝিকঝিকে রোদ।

২৫.
সব ভালবাসা যার বোঝা হল, দেখুক সে মৃত্য ভালবেসে
– জীবনানন্দ দাশ

শ্বশুরকে দেখতে পাচ্ছি। তিনি খানিকটা দূরে। সাথে দুজন ডাক্তার। তিনজনই কথা বলছেন মনে হলো। প্রত্যেকের ভাব বিমর্ষ। ডাক্তারদের আচরণটি অস্বাভাবিক। তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে কারো সাথে আলাপ করছে এমনটা দেখি না। ‌এরা সর্বদা গতিশীল ও ব্যাস্ত। তবে শ্বশুর লোকটি ধনী ও ক্ষমতাবান। এ ধরণের লোকেরা সবকিছুর গতি নিয়ন্ত্রণকারী।
শ্বশুর ভাল লোক। আমাকে স্নেহ করেন। আমি আগাচ্ছি ওদিকে। ডাক্তারদ্বয় বিদায় নিয়েছে। দৃশ্যে এখন শুধুই শ্বশুর সাহেব। দূর থেকে বুঝতে পারছি তার চোখে পানি। আমি ওনার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। তিনি হতভম্ব হয়ে আমাকে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
আমার শার্ট ভিজে যাচ্ছে। আশেপাশের লোকেরা ঘুরে তাকাচ্ছে। খুব অস্বস্তি লাগছে আমার। আমি শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছি।

(চলবে..)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *