বাংলাদেশের সংবিধানঃ কতোটুকু জনগনের?

বাংলাদেশ একটি রিপাবলিক স্টেট হিসাবে যে শাসননীতি প্রণয়ন করেছে সেটি বিগত ৪৫ বছরে ঠিক কতোটুকু গণমুখীতাকে অনুসরন করতে পেরেছে অথবা তাঁর নিজস্ব অবয়বে ন্যায়সঙ্গতা, গণতান্ত্রিকতা এবং সাধারন জনভিত্তিকতাকে স্পর্শ করার নিরিখে কোন মানদ্বন্ডে পৌছেছে এ প্রশ্নটি এখনো গৌণ। সংবিধানকে গৃহীত করার পরপরই জাসদ কর্তৃক এর মৌলভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ জানানো ,এবং সমাজতান্ত্রিক শাসনের আবেদনকে অবজ্ঞা মূলত সংবিধানের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় বিরাট ফাক রেখে দেয় । বিগত ৪৫ বছর ধরে এই সংবিধান ১৬ বার সংশোধন হয়েছে কিন্তু প্রশ্ন হল এই সংবিধানটি কি কোনবারও বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনে পরিবর্তন তথা সংশোধিত হয়েছে?

বাংলাদেশ একটি রিপাবলিক স্টেট হিসাবে যে শাসননীতি প্রণয়ন করেছে সেটি বিগত ৪৫ বছরে ঠিক কতোটুকু গণমুখীতাকে অনুসরন করতে পেরেছে অথবা তাঁর নিজস্ব অবয়বে ন্যায়সঙ্গতা, গণতান্ত্রিকতা এবং সাধারন জনভিত্তিকতাকে স্পর্শ করার নিরিখে কোন মানদ্বন্ডে পৌছেছে এ প্রশ্নটি এখনো গৌণ। সংবিধানকে গৃহীত করার পরপরই জাসদ কর্তৃক এর মৌলভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ জানানো ,এবং সমাজতান্ত্রিক শাসনের আবেদনকে অবজ্ঞা মূলত সংবিধানের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় বিরাট ফাক রেখে দেয় । বিগত ৪৫ বছর ধরে এই সংবিধান ১৬ বার সংশোধন হয়েছে কিন্তু প্রশ্ন হল এই সংবিধানটি কি কোনবারও বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনে পরিবর্তন তথা সংশোধিত হয়েছে?
অন্যদিকে সংবিধানের আগাগোড়া গনমানুষের সাম্য,স্বাধীনতা, ঐক্য প্রতিষ্ঠার আড়ালে কী পরিমান অসঙ্গতি যে লুক্কায়িত সেটি দেখা দরকার এবং সেটিও অনেকটা “inter-conflickted”।
# অনুচ্ছেদ ২ এর (ক) তে -“ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন”।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রস্তাবনায় কি বলা আছে-
“আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল -জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে ।
আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।”
এ দুটি সংবিধানের দুটি আলাদা অংশ । লক্ষ্য করার বিষয় হলো যে রাষ্ট্রের প্রস্তাবনায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক সাম্য, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে পরক্ষনেই তাকে অস্বীকার করা হয়েছে ২ অনুচ্ছেদে।
যদি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজের কথাও বিবেচনা করি তবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতির রাষ্ট্রে রাষ্ট্রধর্ম অন্যায়, বৈষম্যমূলক এবং বাতুলতা । একটি বিশেষ ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া মানে অন্য ধর্মের অবস্থানকে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে ২য় শ্রেনী বলে মান্য করাই বোঝায়। এই সহজ অপ্তবাক্যের মানবিকতা শাসকরা বুঝতে চান না।
# অনুচ্ছেদ ৪ (ক) তে-
“ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারী ও আধা-সরকারী অফিস, স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে”।
এই বিধানটি সংবিধানে জুরে দেয়া আছে। কিন্তু এই বিধানটি দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ধারার কারনে সরকার বদলের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়। দুটি রাজনৈতিক শক্তি এই দ্বিধাবিভক্তিকে নিয়েই সরকার বদলের সমান্তরালে কাটাছেড়া চলছে রুটিনমাফিক। সংবিধান নামের যে ভাবগাম্ভীর্য সেটা এভাবেই নষ্ট হয়ে যায়।
# অনুচ্ছেদ৬ (২) তে-
“ বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন”।
এই অনুচ্ছেদ হচ্ছে বাংলাদেশে জাতিগত আধিপত্যবাদের স্পষ্ট নমুনা। বাঙালি ব্যাতীত অন্য কোন জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ত্ব এখানে প্রকারান্তরে অস্বীকার করা হয়েছে । বাংলাদেশের সমগ্র মানুষকে বাঙালি জাতিসত্ত্বার আত্নপরিচয়ে আশ্রয়ত নিতে বাধ্য করা রাষ্ট্রীয় গনতান্ত্রিক ,শোষণহীন সমাজচেতনার পরিপন্থী।
যেটিও সংবিধানের মধ্যকার অসঙ্গতি এবং বৈষম্যকে স্পষ্ট করে।
# অনুচ্ছেদ
৮ – (১) তে-
“জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে”।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকে ঘিরে বাংলাদেশের শাসনকাঠামো অত্যাধিক মাত্রায় অন্তদ্বন্দে পরিপূর্ণ ।সমাজতন্ত্রের কথা বলে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরন করা, প্রাইভেটাইজেশনকে উৎসাহিত করা, সাম্রাজ্যবাদী ,পুঁজিবাদী ঘরানায় সমগ্র রাষ্ট্র পরিচালনার আয়োজন দাড় করানো জনগনের সাথে প্রতারনা ছাড়া কিছু নয়। অন্যদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু অন্তত নয়। গনতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক বিশেষ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা স্রেফ অন্যায়।
৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে-“ ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি”। এদেশের সমগ্র ভূখণ্ডে বাঙালি ছাড়া কি অন্য কোন জাতি নেই? আদসিবাসী জনগণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সবাইকে বাঙালির কাতারে ফেলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন মাত্র ।

# অনুচ্ছেদ ১০ এ-
“মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে”।
সাম্যবাদী সমাজ ,সমাজতান্ত্রিক সমাজ যাই বলি না কেন সাংবিধানিক ব্যাবস্থায় যে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার কথা বলা হয়েছে সেটিও কি আছে ? সাম্রাজ্যবাদী দেশি বিদেশি লুটেরা গোষ্ঠীর সাথে শ্রমশোষণ যেন প্রথাগত বাংলাদেশের পরিচয়।অথচ সংবিধানে পরিহাসস্বরূপ সেটে দেয়া আছে “সমাজতন্ত্র”।
# অনুচ্ছেদ ১৩ (গ) তে-
“ ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা”।
কিন্তু প্রকৃত অর্থে মালিকানার উপর যাবতীয় বিধিনিষেধ নেই। অবাধ ব্যাক্তিমালিকানার সাথে রাষ্ট্রীয় ‘সমাজতন্ত্র’ শীর্ষক মূলনীতির যে মৌলিক বিরোধ সেটাও এই সংবিধান গোজামিল দিয়ে চালাচ্ছে।
# অনুচ্ছেদ ৭০ এ-
“ কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন”
যেখানে আমরা রাষ্ট্রে গনতন্ত্রের চর্চার কথা বলি সেখানে এই বিধানটির মাধ্যমে একজন সংসদ সদস্যের গণতান্ত্রিকতাকে গলা কেটে মেরে ফেলা হয়েছে সংবিধানে। এখানে শাসকদের ক্ষমতার গ্যারান্টেড প্রেক্ষাপট তৈরি করার জন্য এমন অগন্তান্ত্রিক ব্যাবস্থাকে আত্তীকরন করা হয়েছে । যে সদস্যদের ভোটে সংসদ টিকে থাকে তাদের অগনতান্ত্রিকতা রাষ্ট্রীয় শাসনের বৈকল্যতা প্রকাশ করে।

এবার দেখা যাক বাংলাদেশে বিগত ৪৫ বছরের সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্য এবং প্রেক্ষাপট কতোটুকু গণমুখী ছিলো। যে ১৬ টি সংশোধনী আণা হয়েছে তাঁর অধিকাংশের সাথেই জনগনের সংযোগ ছিলো না । এদেশে সংবিধানকে সংশোধনের আয়োজনে শাসকদের লাভক্ষতির হিসাব কখনোই জনগণের লাভোক্ষতির উপরে উঠতে পারে নি এবং ইতিহাস তাই বলে।

চতুর্থ সংশোধনী
‘সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তন।’ এই সংশোধনী আনা হয়েছিলো শুধুমাত্র তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ তৈরি করতে। সেসাথে একদলীয় আওয়ামী বাকশাল কায়েমের পথ প্রস্তুত করা। সরাসরি প্রধানমন্ত্রী থেকে এই সংশোধনবলে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন যেখানে জনগনের আশা আকাঙ্খার কোন কিছু ছিলো না।

পঞ্চম সংশোধনী
১৯৭৯ সালে এ সংশোধনী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রহন করা হয়।বিষয়বস্তু ছিলো-
“১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকান্ডকে বৈধতা দান”
এই সংশোধনীর মাধ্যমেই যাবতীয় শেখ মুজিব হুত্যাকান্ডকে ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছে। সেইসাথে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনায়ক হওয়া থেকে শুরু করে সকল সামরিক ফরমানকে বৈধতা প্রদানই ছিলো এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য।

ষষ্ঠ সংশোধনী
১৯৮১ সালে এ সংশোধনীও জিয়ার আমলেই গ্রহন করা হয়। এর বিষয়বস্তু –
“উপ-রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের বিধান নিশ্চিতকরন”
বিচারপতি এম এ সাত্তারকে নির্বাচিত করে আনতে সামরিক শাসকের ইশারায় এ সংশোধনী আনা হয়।

সপ্তম সংশোধনী
১৯৮৬ সালে এ সংশোধনী আনেন সামরিক শাসক এরশাদ। বিষয়বস্তু-
“১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ৯ই নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন সময়ে প্রণীত সকল ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ ও অধ্যাদেশসহ অন্যান্য সকল আইন অনুমোদন”।
এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার যেখানে এরশাদের অবৈধ ক্ষমতাদখল, সামরিক ফরমান এর বৈধতা আনয়নই ছিলো মূলে।

অষ্টম সংশোধনী
১৯৮৬ সালে গ্রহন করা এ সংশোধনীও এরশাদের জামানায় আনা।বিষয়বস্তু-
“রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতিদান ও ঢাকার বাইরে ৬টি জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন। Dacca-এর নাম Dhaka এবং Bangali-এর নাম Bangla-তে পরিবর্তন করা হয়”।
আদতে এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিলো দুটি-
# সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ভোট টানা
# এরশাদের সামরিক ভাবমূর্তিকে ভিন্ন দিকে পরিবর্তন করা।
এই সংশোধনী সংবিধানের মূলনীতিকে পাশ কাটিয়ে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার পথ তৈরি করেছিলো। সমগ্র বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক ,ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় ছেদ ঘটিয়েছিলো এ বিধান।

নবম সংশোধনী
১৯৮৯ সালে এ সংশোধনী আনেন এরশাদ । বিষয়বস্তু-
“রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের সাথে একই সময়ে উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, রাষ্ট্রপতি পদে কোন ব্যক্তিকে পর পর দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখা”
ব্যাক্তিবিশেষকে সুবিধা দিতেই উপরাষ্ট্রপতি ,রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এ বিধান করা হয়।

একাদশ সংশোধনী
১৯৯১ সালে গৃহীত এ সংশোধনী সম্পূর্ণভাবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের ব্যাক্তিগত ও পেশাদারি জটিলতা নিরসনে ব্যাবহৃত হয়। বিষয়বস্তু-
“অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের স্বপদে ফিরে যাবার বিধান”।
এখানে যুক্তি আসতে পারে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের এমন সুবিধা গ্রহন জাতীয় প্রয়োজনেই তো হয়েছিলো। প্রকৃত অর্থে এরূপ যুক্তি সামরিকায়িত,ভঙ্গুর গন্তান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে সত্য তবে এ ভঙ্গুরতার পেছনে যারা দায়ী তাদের ক্ষমতার দ্বন্দেই এমন সাংবিধানিক অপব্যাবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে,সেটা অবশ্যই অস্বীকার করা যাবে না।

ত্রয়োদশ সংশোধনী
১৯৯৬ সালে গৃহীত এ সংশোধনীটি বর্তমানের আলোচিত ইস্যু।এর মাধ্যমেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করা হয়েছে। বিষয়বস্তু-
“অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ-নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন”।
এ বিধানটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে ।তবে সংবিধানের মৌলনীতিতে জনগনের শাসনের কথা বলা থাকলেও যখন ৩ মাসের জন্য জনসম্পর্কহীন শাসক আসে তখন সেই ‘গনতান্ত্রিক শাসন’র অপ্তবাক্য কতোটুকু টেকে? টেকে না তো বটেই বরং সংশোধনীটি ছিলো শুরু থেকেই অসাংবিধানিক যেখানে আদালতের রায় তো এল সেদিন। শাসকগোষ্ঠিকে এখন জিজ্ঞেস করা উচিত, এমন অসাংবিধানিক বিধান আনতে তারা সংবিধানকে ব্যাবহার করে কেন? এমন বিধান আনার প্রেক্ষাপট তারা কেনো তৈরি করেন?
এ বিধানটি এক দিকে দ্বিদলতন্ত্রের রাজনীতিবিদদের দেউলিয়াত্ব প্রমান করে আবার সাংবিধানিক যুক্তি ব্যাবহারের যথেচ্ছতাও প্রমাণ করে। তারাই নিজেরা সংবিধানের আশ্রয় নিয়ে ঘোষনা করছে –‘আমরা নির্বাচন পরিচালনার যোগ্য নই’।
এখন প্রশ্ন হলো এ বিধানটিতে জনগনের কি লাভ? সহজ উত্তর হলো দুটি দলের স্ব স্ব ক্ষমতার দ্বন্দে এ বিধান সংবিধানে অনিবার্য ছড়ি ঘুরানো যাতে জনগনের প্রত্যাশা গৌণ এবং যেটি জনগনের উপর আরোপ করা হয়েছে।

চতুর্দশ সংশোধনী
২০০৪ সালে গৃহীত এ সংশোধনী সর্বশেষ বিএনপি সরকারের আমলে বাস্তবায়িত হয়। বিষয়বস্তু-
“নারীদের জন্য সংসদে ৪৫টি সংসদীয় আসন সংরক্ষণ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংরক্ষণ, অর্থ বিল, সংসদ সদস্যদের শপথ, সাংবিধানিক বিভিন্ন পদের বয়স বৃদ্ধি ”।
‘সাংবিধানিক বিভিন্ন পদের বয়স বৃদ্ধি’ এই বিধানবলেই বিচারপতি কে এম হাসানের বয়স বাড়িয়ে তত্ত্ববধায়ক সরকার বানানোর পথ তৈরি করা হয়, যদিও সফল হতে পারেন নি। বিএনপি জামাত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে আওয়ামী লীগ এর প্রতিবাদ করে এবং ধারাবাহিক সংঘাতের পর নেমে আসে ১/১১ যেটি কিনা আরেক রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করে। এখানেও শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করতে সংবিধানকে যথেচ্ছা ব্যাবহার করা হয়েছে।

পঞ্চদশ সংশোধনী
২০১১ সালে গ্রহন করা এ সংশোধনবলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যাবস্থা বাতিল করা হয়। বিষয়বস্তু-
“সংবিধানের প্রস্তাবনা সংশোধন, ১৯৭২-এর মূলনীতি পূনর্বহাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তকরণ, ১/১১ পরবর্তী দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ম বহির্ভুতভাবে ৯০ দিনের অধিক ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি প্রমার্জ্জনা, নারীদের জন্য সংসদে ৫০ টি সংসদীয় আসন সংরক্ষণ, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি”
এখানে কয়কটি বিষয় রয়েছে। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থাটি বাতিল করার পেছনে গনতান্ত্রিক চেতনার চাইতে ক্ষমতার সময় দীর্ঘায়িত করার চিন্তাই যে মুখ্য তা পরিষ্কার হয় এটি বাতিলে সরকারের তড়িঘড়ি দেখলে। জনগনের মতামত কিংবা আগ্রহের দিকটি বরাবরই যেমন সামনে আসে নি এখানেও তাই। এছাড়াও সংবিধানের কাঠামোতে যে ৭২ এ ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিলো সেটিও যে অন্তঃসারশুন্য তা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে।

ষোড়শ সংশোধনী
২০১৫ সালে গৃহীত এ সংশোধনী আরেকটি অসঙ্গতি । বিষয়বস্তু-
“বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেয়া”
এই সংবিধানেরই ২২ অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন’৷
১৬ তম সংশোধনী বলছে বিচারপতিদের অপসারন ক্ষমতা সংসদের কিন্তু ২২ অনুচ্ছেদ বলছে প্রজাতন্ত্রের দুটি অঙ্গ প্রজাতন্ত্রই আলাদা করবে যার অর্থ “পৃথকীকরণ” বুঝায়, যেটি কিনা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রই বিরাজ করবে এই রাষ্ট্রে। যদি তাই হয় ‘অপসারন ক্ষমতা’ কি সেই ‘পৃথকীকরণ’ শব্দকে ধারন করে? স্পষ্টত না…বরং সংসদের ‘প্রভাব বিস্তার’ ক্ষমতা বিচার বিভাগের উপর নিরঙ্কুশ বোলে প্রতীয়মান হয় ১৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে।
সংবিধানের অপব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা, নিজের ইচ্ছামতো সংবিধানকে ব্যাবহার করা, অসঙ্গতি প্রভৃতি আমাদের রাজনৈতিক ব্যাবস্থার নিত্যসঙ্গী। বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এবং জনগনের আকাঙ্খার মানদ্বন্ডে শাসকদের ইচ্ছা, খামখেয়ালি,ক্ষমতালিপ্সুতা জয়ী হয়েছে। এছাড়া যেসকল “inter conflickted” উপাদান সংবিধানে রয়েছে সেটিতেও শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতি, ক্ষমতার পথ বানানো, নিজেদের দেউলিয়াত্ব স্পষ্টরূপে অবলোকন করা যায়। কাজেই সংবিধানের উপযোগিতা ও গণমুখী হওয়ার বিচারে বিরাট প্রশ্ন – এ সংবিধান কতোটুকু জনগনের?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *