ডিপ্রেশন কী ও তার প্রতিকার!

ইদানিং আমাদের সবার কাছে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা একটি কমন মানসিক রোগ হয়ে ওঠেছে | কখনো কখনো আমরা ভীষণ ডিপ্রেশ্ড জীবন যাপন করছি আবার কখনও বা ডিপ্রেশনের মানে না বুঝেই সামান্য একটু মন খারাপ থাকলেই নিজেকে ডিপ্রেশনের রোগী ভাবছি | তবে এটা ঠিক যে ইউরোপ আমেরিকার মত বাংলাদেশেও এখন ডিপ্রেশনে অাক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক | আমাদের আশেপাশে প্রায়ই আমরা এমন মানুষ দেখি যারা সত্যিই ডিপ্রেশনের শিকার | আর বেশীরভাগ সময়ই তাদের সান্তনা দেয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার থাকে না | কারণ এ রোগ দূরীকরণের উপায় বা এ রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা থাকে না | তাই এসব দিক বিবেচনা করে ডিপ্রেশন বিষয়ে আজ একটু খোলামেলা আলোচনা করছি |


ইদানিং আমাদের সবার কাছে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা একটি কমন মানসিক রোগ হয়ে ওঠেছে | কখনো কখনো আমরা ভীষণ ডিপ্রেশ্ড জীবন যাপন করছি আবার কখনও বা ডিপ্রেশনের মানে না বুঝেই সামান্য একটু মন খারাপ থাকলেই নিজেকে ডিপ্রেশনের রোগী ভাবছি | তবে এটা ঠিক যে ইউরোপ আমেরিকার মত বাংলাদেশেও এখন ডিপ্রেশনে অাক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপক | আমাদের আশেপাশে প্রায়ই আমরা এমন মানুষ দেখি যারা সত্যিই ডিপ্রেশনের শিকার | আর বেশীরভাগ সময়ই তাদের সান্তনা দেয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার থাকে না | কারণ এ রোগ দূরীকরণের উপায় বা এ রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা থাকে না | তাই এসব দিক বিবেচনা করে ডিপ্রেশন বিষয়ে আজ একটু খোলামেলা আলোচনা করছি |

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা বলতে আমরা বুঝি এমন এক ধরণের মানসিক রোগ যা অব্যাহত মন খারাপ থাকা অবস্থার সৃষ্টি করে | বিষণ্নতা এমন একটি রোগ যা কিনা হালকা মাত্রায় হলে ব্যক্তিকে পুরোপুরিভাবে জীবন আনন্দ উপভোগ করতে দেয় না আর বেশি মাত্রায় হলে ব্যক্তিকে নিয়ে যায় আত্মবিনাশের পথে।

ডিপ্রেস্ড ব্যক্তির মাঝে কিছু বিষয় লক্ষ্য করা যায় | যেমন –

# উদ্বিগ্নতা
# শূন্য শূন্য মন মেজাজ
# আশাহীনতা, অসহায়ত্বত , হতাশা
# আত্ম-অপরাধবোধ
# বেশি বেশি ঘুমানো অথবা একদমই ঘুম না হওয়া
# অলস হয়ে যাওয়া বা সবসময় ক্লান্তির ভাব
# অস্থিরতা,বিরক্তি-রাগ-উত্তেজনা
# স্মরণ করতে না পারা
# সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়া
# আত্মহত্যার চিন্তা-ভাবনা করা ….ইত্যাদি

ডিপ্রেশন সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বিভিন্ন মত রয়েছে | তবে আমার মতে ডিপ্রেশন দুই ধরণের হয়ে থাকে –
১- টপিক্যাল ডিপ্রেশন
(অবস্থার ভিত্তিতে সাময়িকের ডিপ্রেশন)
২- মেজর ডিপ্রেশন (দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ী ডিপ্রেশন)

টপিক্যাল ডিপ্রেশন:-
ব্যক্তিভেদে ডিপ্রেশনের বিভিন্ন কারণ থাকে | তবে টপিক্যাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু কারণ বেশি মাত্রায় লক্ষণীয় থাকে | যেমন-

** চাপপূর্ণ জীবনের কোনো ঘটনা। চাপপূর্ণ পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং অন্যান্য মনোসামাজিক কারণগুলো ডিপ্রেশন ঘটাতে ভালোভাবে ভূমিকা রাখে

** মারাত্মক ক্ষতি (ব্যবসায়িক বা পারিবারিক বা আন্তসম্পর্কীয়)

** রোগব্যাধি

** কঠিন সম্পর্ক বা সম্পর্কের কাঠিন্যতা

** অর্থনৈতিক সমস্যা

এছাড়া জীবনের নানা ক্ষেত্রে অনাহূত পরিবর্তনও ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনাকে উস্কে দিতে পারে |

টপিক্যাল ডিপ্রেশন বা অবস্থার ভিত্তিতে সাময়িকের জন্য ডিপ্রেশ্ড ব্যক্তি আমাদের আশেপাশে তুলনামূলক বেশী দেখা যায় | এটি অতি সাধারণ মনে হলেও মাঝে মধ্যেই জটিল রূপও ধারন করতে পারে | অনেক সময় কেউ কেউ সামান্য ঝোকের বশে আত্মহত্যাও করে বসে |

টপিক্যাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে রোগীর মাঝে উপরোক্ত লক্ষণগুলো যেমন তাড়াতাড়ি সৃষ্টি হয় , ঠিক উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে তেমনি দ্রুত আবার চলেও যায় | এসময় রোগীর সাথে সকলের অত্যন্ত ভাল ব্যবহার করা উচিত | যে বিষয় নিয়ে ব্যক্তির ডিপ্রেশনের শুরু সেই বিষয়টি রোগী যাতে ভুলে যেতে পারে সেজন্য ভাল যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে সৎ পরামর্শও দেয়া যেতে পারে | কিন্তু মনে রাখতে হবে ডিপ্রেশ্ড ব্যক্তির সাথে কোন কিছু নিয়ে জোড় বা রাগারাগি করা যাবে না | কিংবা এমন কিছুও বলা যাবে না যাতে তার হতাশা বাড়ে | একটু অসতর্কতা বড় বিপত্তির সৃষ্টি করতে পারে |

টপিক্যাল ডিপ্রেশনের শিকার ব্যক্তির আশেপাশের বা কাছের মানুষের একটু সচেতনতাই রোগীকে মুক্তি দিতে পারে এর ভায়বহতা থেকে | এছাড়া মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেয়া যেতে পারে |

মেজর ডিপ্রেশন:-
মেজর ডিপ্রেশন বা স্থায়ী ডিপ্রেশন এমন এক জটিল মানসিক সমস্যা যা সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে বেশীরভাগ সময়ই সঠিক কোন কিছু জানা যায় না | অনেক কম বয়সই এ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে | কিছু মানুষের এর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পেছনে পারিবারিক ইতিহাস অর্থাৎ জেনেটিক লিঙ্ক বা বংশগত যোগসূত্রের ব্যাপার থাকে | অনেক সময় আবার ব্যক্তি সারা জীবনের মত কিছু হারিয়ে ফেলেছে এমন ভাবনা থেকেও এর সৃষ্টি হয় | মেজর ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির কোন রূপ কারণ ছাড়াই মন খারাপ থাকতে পারে | আশেপাশের হাজারো মানুষের মাঝে থেকেও নিজেকে ভীষণ একা মনে হয় | কখনো ব্যক্তির ইচ্ছে করে একাকী থাকতে | আবার যখন একাকী থাকে,তখন তার কাছে মনে হয় যেন একাকিত্বই তাকে গ্রাস করছে | এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনোই বুঝে উঠতে পারে না যে কী করলে সে শান্তিতে থাকতে পারবে | যে কোন প্রকারের উপদেশও তার কাছে বিরক্তি ও যন্ত্রনার কারণ হয়ে দাড়ায় | স্বাভাবিক কথাও তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় | আসলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের মনের মাঝেই প্রতিনিয়ত মরতে থাকে | তার মনে হয় যেন পুরো পৃথিবী তার সাথে বর্বর আচরণ করে |

তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে এ রোগের পিছনে দীর্ঘমেয়াদী কোন বিষয় জড়িত থাকে | ব্যক্তির মনে এমন কষ্টের সৃষ্টি হয় যে তার কাছে শরীরের উপর দেয়া যে কোন কষ্ট মনের মাঝে থাকা কষ্টের তুলনায় অনেক কম মনে হয় | যার ফলে ব্যক্তি নিজেই নিজের শরীরকে কষ্ট দিতেও বিন্দু মাত্র দ্বিধা করে না |

অনেকে আবার অজ্ঞের মত ডিপ্রেশ্ড ব্যক্তির কথা শুনে দুখানা চড় থাপ্পর মাড়ার ইচ্ছা পোষণ করে | কিন্তু এ কথা বুঝতেই চায় না যে এ ধরণের শারিরীক কোন কষ্টই তার অনুভূত হবে না | বরং তার মানষিক অবস্থার অবনতি হবে |

মেজর ডিপ্রেশনের সব থেকে বড় সমস্যা হল ব্যক্তির মনে কী চলছে সচরাচর তা ধারণা করা যায় না বা ব্যক্তি কারও কাছেই আত্মপ্রকাশ করে না | সবকিছুই নিজের মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে | ফলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই বেশীরভাগ সময় আত্মহত্যা করে |

মেজর ডিপ্রেশনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীকে ঘুমের ওষধ দেয় | কিন্তু আমি মনে করি ঘুমের ঔষধ এ রোগের চিকিৎসা হতে পারে না | বরং এটি আর এক ভয়ানক নেশার সৃষ্টি করে | তাই এ রোগ থেকে মুক্তি লাভের জন্য ডাক্তারের চিকিৎসার চেয়ে নিজের চেষ্টা,ইচ্ছা এবং ধর্মীয় নীতি মেনে চলার প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত |

আমি নিজে এক সময় ডিপ্রেশনের শিকার ছিলাম | তাই ডিপ্রেশন দূর করতে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু করণীয় সম্পর্কে বলব -সবসময় অন্য মানুষের সাথে থাকতে চেষ্টা করুন | একা একা থাকার চেয়ে আপনার সাথে কেউ থাকলে বা আপনি কারো সাথে থাকলে তা আপনার জন্য খুবই ভালো হবে | বড় বড় কাজকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করে নিন | কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করুন | কোন কাজগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা আগে করুন এবং যেটি আপনি সব সময় করতে অভ্যস্ত সেটিই বেছে নিন | অযথা না জানা বা কঠিন কোনো কাজের দায়িত্ব নিতে যাবেন না | বেশি বেশি ও কঠিন কঠিন কাজ ব্যক্তির মধ্যে মনোশারীরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে | তাই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া জরুরি | নিজের জীবনের জন্য বড় কোনো লক্ষ্য তৈরি করতে যাবেন না | কারণ এটি আপনার ডিপ্রেশনের সমস্যাকে চরমতম করে তুলতে পারে | অন্য কারো দায়-দায়িত্ব নিজের ওপর না নেয়াই ভালো | কারণ বেশি দায়-দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে তা মানষিক অবস্থাকে আরো নষ্ট করতে পারে |

ডিপ্রেশনের চরম অবস্থায় জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে যথাসাধ্য বিরত থাকুন | যেমন-বর্তমান চাকরি পরিবর্তন করা বা ছেড়ে দেয়া অথবা বিয়ে করা বা ডিভোর্স দেয়া | আপনার ডিপ্রেশন রোগটি ভালো না হওয়া পর্যন্ত আপনি আপনার সব সিদ্ধান্তকে দূরে সরিয়ে রাখুন | প্রথমে সেরে উঠুন, তারপর সব করা যাবে |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *