আমরাই অভিজিৎদের হত্যাকারী

রাষ্ট্র যদি ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করে তাহলে একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করবে, তেমনি উগ্রপন্থি ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় মৌলবাদও দানা বেধে উঠে। এটি কেবল ইসলাম নয়, প্রযোজ্য সকল ধর্মের জন্যেই। এতে না হয় রাষ্ট্রের উপকার, না হয় ধর্মের। দুটোরই বারোটা বাজে, ক্ষতি হয় দুটোরই।


রাষ্ট্র যদি ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করে তাহলে একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করবে, তেমনি উগ্রপন্থি ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় মৌলবাদও দানা বেধে উঠে। এটি কেবল ইসলাম নয়, প্রযোজ্য সকল ধর্মের জন্যেই। এতে না হয় রাষ্ট্রের উপকার, না হয় ধর্মের। দুটোরই বারোটা বাজে, ক্ষতি হয় দুটোরই।

রাষ্ট্র প্রগতিশীলতার কথা বলবে, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলবে, কিন্তু তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতো দ্বিচারী আচরণ করবে, এ বড় দুঃখজনক। এ বড় লজ্জার। এ অনেকটা চোরকে চুরি করতে বলে, অন্যদিকে গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলার মতো। বলা হবে মুক্তচিন্তার কথা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা, কিন্তু মুক্তবুদ্ধির, বিজ্ঞান চর্চার, দর্শন চিন্তার, মানুষগুলোকে খুনে, হত্যায় নির্বিকার আচরণ, দ্বিচারিতা, রাষ্ট্রের চরিত্রহীনতা ভিন্ন কিছু নয়।

১১ বছর হয়ে গেছে ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যার বিচার ও শাস্তি এখনও নিশ্চিত হয়নি। ব্লগ লিখতো ছেলেটি রাজিব, তাকেও একই কায়দায় কুপিয়ে মারা হয়েছে, তার হত্যার অভিযুক্তদের কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে কেবল বাইরে নয়, রাজিব হত্যার অন্যতম প্রধান আসামী, আত্বস্বীকৃত একজন খুনি এখন দেশের বাইরে। খুনি, সন্ত্রাসীরা, আসামীরা কিভাবে দেশের বাইরে চলে যায়, রাষ্ট্রের পৃষ্টপোষকতা, সহযোগিতা ছাড়া? ব্লগার অ্যাক্টিভিষ্ট আসিফ মহিউদ্দিনের বুকে পিঠে যারা ছুরি মেরেছে তারাও হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ইউনূস, অধ্যাপক তাহেরকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার ও শাস্তি এখনও নিশ্চিত হয়নি। এমনকি শফিউল আলমকে যারা হত্যা করেছে, তাদেরও। শুধু তাই নয় শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে যারা আঘাত করেছে, তাদের কারও কোনও শাস্তি নিশ্চিত হয়নি এখনও। অথচ, ব্লগ লেখার অভিযোগে ২০১৩ সালে কারাগারে যেতে হয়েছে সুব্রত শুভ, রাসেল পারভেজ আর মশিউর রহমানকে। আইসিটি অ্যাক্ট বড় বিচিত্র। এই অ্যাক্টের রিঅ্যাক্টও বড় ভয়ংকর। লেখক–ব্লগারদের ধরে নেওয়া হয়, কারাগারে পুরা হয়, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, অথচ ‘অভিজিৎ রায় আমেরিকা থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না,তবে সে যখন দেশে আসবে তখন তাকে হত্যা করা হবে’– এই পোষ্টটি চোখে পড়ে না। ফেসবুক, টুইটার, ব্লগে এসব ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের এমন বার্তা, কথাবার্তা নিয়মিতই চোখে পড়ে।

যে জামায়াতকে নিষিদ্ধের আন্দোলন করেছিলাম আমরা, সেই জামায়াত কিন্তু নিষিদ্ধ হয়নি। যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাস্তি যেমন জরুরি, তেমনি যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত ইসলামের নিষিদ্ধতাও জরুরি। কিন্তু না, হয়নি তা। জামায়াত দেদারসে ব্যবসা করছে, তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, জঙ্গি অর্থায়ন করছে। সেই অর্থায়ন যুক্ত হচ্ছে সহিংসতায়। এই তো সেদিন, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে নবম পদাতিক ডিভিশনের বিজয় দিবস উদযাপনের কো–স্পন্সর হয়েছিল ইসলামি ব্যাংক। কেন, মুক্তিযুদ্ধের উৎসব উদযাপনের জন্য আর কোনও প্রতিষ্ঠান ছিল না দেশে? মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার– সব মিলেমিশে একাকার!

জামায়াতকে রেখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর মুক্তিযুদ্ধের উৎসব করে লাভ হবে না। জঙ্গিবাদ–মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ–মৌলবাদ, বলে কেন মুখে ফেনা তুলছি, ফেনা বুদবুদ বাইরে থেকে দেখা যায় বলে? কাওমী মাদ্রাসায় দেশ ভরে গেছে। এসব মাদ্রাসায় কী পড়ানো হয়, কী শেখানো হয় সেখানে? একটা কোচিং সেন্টার খুলতেও অনুমতি লাগে, এসব মাদ্রাসা খুলতে, ধর্মের বাণিজ্য করতে কারও কোনও অনুমতি লাগে না। মান নেই, মনিটর নেই। এখান থেকে বের হয়ে পরবর্তীতে কোথায় যাচ্ছে, কী কাজ করছে, কোথায় যুক্ত হচ্ছে, কাদের সঙ্গে, তা দেখার কেউ কেই।

ধর্ম নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কে বিশ্বাস করবে, করবে না কে, সেটি নিতান্ত তার ব্যাক্তিগত। সেটি নিয়ে কেন আমার তোমার আমাদের মাথা ব্যাথা হবে? অভিজিৎ বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ছিলেন, ছিলেন অসম্ভব ভালো, উচুমানের একজন গবেষক। জগতের সব লোক কী একই রকম হবে? জগত নিজেই তো এক রকম নয়। কোথাও মরুভূমি, কোথাও তুষারপাত, কোথাও সুউচ্চ পর্বত, অতল সাগর কোথাও। জগত এক জায়গায় থেমে থাকত যদি না নতুন নতুন চিন্তা, দর্শন, যুক্তি, বিজ্ঞান এসে যুক্ত হতো। মুর্খরা চিরকালই নতুন চিন্তা, মুক্তচিন্তা, মুক্ত–চিন্তক মানুষদের খুন করেছে, হত্যা করেছে, কিন্তু নতুন চিন্তা, ভিন্ন চিন্তা থেমে থাকেনি। এগিয়ে নিয়ে গেছে জগতকে। সক্রেটিস, গ্যালিলিও, কোপারনিকাস, জিনোদানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়েও মানুষের জগত নিয়ে, জীবন নিয়ে, সৃষ্টি নিয়ে জিজ্ঞাসার আগুনকে থামানো যায়নি কোনও কালে।

মৃত্যুর আগেই মৃত্যু, মেনে নেবার নয়। দুর্বৃত্তরা আজ আজরাইলের ভূমিকায় অবতীর্ণ, কোথায় থাকে তখন তাদের ধর্ম বিশ্বাস? নাকি নিজেকেই ঈশ্বর বলে ভাবে, এই ধর্মান্ধ বর্বর, ইতরেরা? আমরা কি কেবল জানাযাই পড়ব, হত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াব না? কফিনে কেবল পেরেক ঠোকা, সেই পেরেক খুনির করোটিতে হাতুরি পেটা হবে না কেন? শোকসভা, স্মরণসভা, স্মারক গ্রন্থ আর লোকটি বড় ভালো ছিল বলে কেবল স্মৃতিচারণ করব? মূলত আমরাই অভিজিৎদের হত্যাকারী। এই রাষ্ট্র ও সমাজ। যারা প্রতিবাদ করি না, বিচার করি না, শাস্তি দিই না এদের।

অভিজিতেরা হেরে গেলে, হেরে যাবে বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *