লেখক শিবিরের চতুর্দশ সম্মেলন ও নতুন কমিটি গঠন

‘মুক্তির লড়াইয়ে সৃজনশীলতা, সৃজনশীলতায় মুক্তি’ শীর্ষক স্লোগানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হলো বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের দুই দিনব্যাপী চতুর্দশ জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন। ১৮ মার্চ বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর।


‘মুক্তির লড়াইয়ে সৃজনশীলতা, সৃজনশীলতায় মুক্তি’ শীর্ষক স্লোগানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হলো বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের দুই দিনব্যাপী চতুর্দশ জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন। ১৮ মার্চ বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বদরুদ্দীন উমর বলেন, হত্যা, লুটপাট, পরিবেশ ধ্বংস তো চলছেই, মতপ্রকাশের অধিকার ও চিন্তার অধিকারও এমনকি আজ এই সমাজে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। এসব সঙ্কটকে বিচ্ছিন্ন বলা হলেও আসলে তা সবই ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে জড়িত। বিদ্যমান রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন ছাড়া এই দুরবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। দেশে আজ লেখালেখির ক্ষেত্রেও বিরাট সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এটা দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়।

রাজনীতি ও সংস্কৃতির যুঁথ বাঁধার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, লেখালেখি বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন আলাদাভাবে এখানে কিছু করতে পারবে না, সামগ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে তাকে যুক্ত হতে হবে। এরা একে অপরের পরিপূরক। উচ্চ সংস্কৃতি না থাকলে কখনই উচ্চ রাজনীতি হতে পারে না। লেখক শিবির তাই সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সব সময়ই রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়েছে। আগামীতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ সময় সারা দেশ থেকে আগত লেখক শিবিরের প্রতিনিধিবর্গ ছাড়াও লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতিতে সম্মেলনস্থল ছিল জনাকীর্ণ। সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত আলী, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, লেখক নূর মোহাম্মদ, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক খালেকুজ্জামান ইলিয়াস, অধ্যাপক আজফার হোসেন প্রমুখ।

বক্তারা দেশে চলমান বিচারহীনতা, লুটপাট, সন্ত্রাস, পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতা ও সর্বত্র ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকার কুক্ষিগত করার তীব্র সমালোচনা করেন। লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর তাগিদ দিয়ে নতুন একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার আহবান জানান।

সম্মেলনে উপস্থিত আলোচক, প্রতিনিধি ও অতিথিবর্গের হাতে লেখক শিবিরের পক্ষ থেকে একটি প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়, মানব সমাজের বিভিন্ন কালপর্বে প্রগতির পক্ষের কোনো লড়াই একমাত্রিক ছিল না। প্রতিটি লড়াই ছিল বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যে ঠাসা। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কেউ লড়াই করেছেন হাতিয়ার হাতে, কেউ লড়াই করেছেন চিত্র এঁকে, কেউবা কবিতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে, আবার কেউ গান গেয়ে।

এতে আরও বলা হয়, প্রতিবাদহীনতা, প্রতিরোধহীনতা, নির্লিপ্ততার মধ্য থেকে কখনও সৃজনশীলতা জন্মায় না। তাই যাঁরা সৃজনশীলতার পক্ষে, মানব সমাজের অগ্রগতির পক্ষে, প্রগতির পক্ষে তাদের সামনে এক ঐতিহাসিক দায় এসে হাজির হয়েছে। সে দায় প্রতিবাদের দায়, প্রতিরোধের দায়। সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতন-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মধ্য থেকেই জন্ম নেবে সৃজনশীল কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ কালজয়ী সাহিত্য। জন্ম নেবে জাগরণের গান, ভয় ভাঙানোর গান, কারফিউ ভাঙার গান- প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের গান। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের মধ্যেই সৃজনশীলতার ঠিকানা।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে জাতীয় গ্রন্থাগারের সেমিনার কক্ষে হাসিবুর রহমানকে সভাপতি ও ড. কাজী ইকবালকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় লেখক শিবিরের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। কমিটিতে আরও রয়েছেন, সহ-সভাপতি হাসান ফকরী ও অধ্যাপক অজয় বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক বরকত আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক নাদিরা অনু। সদস্যসহ অন্যান্য পদে রয়েছেন বদরুদ্দীন উমর, শওকত আলী, শান্তনু কায়সার, অধ্যাপক আজফার হোসেন, পাভেল চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম, অরূপ বড়ুয়া, ফারুক আহমেদ, সামিউল আলম, আবিদুল ইসলাম, মহিউদ্দিন আহমেদ, হেমন্ত দাশ, পারভেজ লেলিন, ডঃ সাইফুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, নিবিড় কান্তি ঘোষ, জামিউল কবীর সোহেল, ইউনুস আলী, মীর্জা রানা, উদয় পাল, মুঈনুদ্দীন আহমদ, মিনহাজ আহমেদ, মিলন বিশ্বাস।

সম্মেলন থেকে সমাজ পরিবর্তন আকাঙ্ক্ষী সকলকে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হতে, বাঙলাদেশ লেখক শিবিরে যোগ দেয়ার উদাত্ত আহবান জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *