বাংলাদেশের আদিবাসীঃ স্বীকৃতি পাবার দৌড়ে কতদুর?


একজন আদিবাসীর সাথে আরেকজন অআদিবাসীর প্রথম সাক্ষাতের প্রথম প্রশ্ন, আপনি বাংলাদেশী? অহ আচ্ছা আপনি নিশ্চই উপজাতি ! অবশ্য সরকার তো এখন বলছে আপনারা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। আদিবাসীটির উত্তর কি হতে পারে? হবে হয়তোবা এই ধরণের সরকার আমাদেরকে স্বীকৃতি দিচ্ছেনা তাই কদিন পর পর নাম চেঞ্জ করছেন। তবে আমরা আদিবাসী। সাবলীল এই উত্তরটির সামনে এবং পেছনে খোলা ম্যানহূলের গর্ত থাকে। পেছনে পরে থাকা ম্যানহূলের ঢাকনাটি একজন আদিবাসীর জন্মের পর থেকেই ধীরে ধীড়ে টেনে হিঁচড়ে দুরে ফেলে দেওয়া হয়। মুখে অনেকে আদিবাসী বল্লেও কাগজে কলমে নিজেদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অদ্ভুত নামকরণে সিগন্যাচার করতে হয়। আর সামনে ম্যানহূল মানেই অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যত, আন্দোলন সংগ্রাম নিজেদের বিভিন্ন নামে আবিষ্কার করতে করতে দিন-মাস-বছরের রদবদল।

কিছুদিন আগের ঘটনা। পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে আলুটিলা সংলগ্ন এলাকায় একজন বাঙালীর লাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সমস্যায় শংকিত ছিলো গোটা পাহাড়ী জনপদ। ঐ এলাকার একজন পাহাড়ী ছেলে বলছিলো, আমাদের অখানে এইসব ডালভাত হয়ে গেছে। প্রতিদিন একেকটি সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে কোন উপলক্ষ বা দিন ক্ষন, পর্ব এলেই অনিশ্চয়তায় থাকি, এই বুঝি কেউ আগুন লাগিয়ে দিলো, কারোর লাশ পড়লো অথবা কেউ গুম হয়ে গেলো। আমরা সবাই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি। আসলে কেনো এমন হয়? সেখানকার অআদিবাসীরা পাহাড়ীদের সহ্য করতে পারেনা ? নাকি আদিবাসীরা অতি উগ্র ? সাতপাঁচ মিলাতে গেলেই আবারও ঝগড়া বাধবে। সহিংসতা চলবে। পাহাড় অশান্ত থেকেই যাবে। কিন্তু প্রশ্নটা হলো পাহাড়ে শান্তি আনার জন্য এই দেশ কিছু করেছে কিনা ? পাহাড়ী বাঙালীর বিভেদ বৈষম্য নিয়ে কথা বলার দায়িত্ব কি শুধুই আদিবাসীদের? আজ প্রায় ১৯ বছর পরও পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নেই, পর্যটনের নাম করে আদিবাসীদের উচ্ছেদ, আদিবাসীদের ৫০০ একর জমি দখল করে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, সহিংসতা হানাহানির সুবিচারের অভাব, মিথ্যা মামলা এইসব সহ্য করে একজন নিরীহ আদিবাসী কতদিন নিরীহ থাকতে পারে ? একটু বুঝিয়ে বলবেন কি ?

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট সরকারের জারি করা বিবরণীতে আদিবাসী শব্দ ব্যাবহারে কঠোড় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। জারি করে দেশকে এবং বিশ্বকে হয়তো জানানো হয়েছিলো দেশের সব আদিবাসীদেরকে আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি ! তাঁদের রেখে যাওয়া জমাজমি এখন আমাদের দখলে ! শান্তি চুক্তি নাম করে আদিবাসীদের বোকামীর চুরান্ত প্রমান পেয়েছি ! এরপরও যদি দেশের ভেতর আদিবাসী নামক কেউ থাকে তাহলে তাঁদের মারো, ধরো, জমিজমা কেড়ে নাও… ! এইতো ? কিন্তু দেশ এই মুহুর্তেও ভাবার চেষ্টা করছে আদিবাসী নেই। কোন আদিবাসী নামক প্রানীর ক্ষতি সাধন হলে নিশ্চই টিস্যু দিয়ে হাত মুছে বলতেও ভুল করবেনা যে আমি দায়ী নয় ! এমতাবস্থায় ঐ পাহাড় চুড়ার আগ্নেয়গিরি হঠাৎ গর্জে উঠলেই সমস্যা বাড়ছে। সমতল/পাহাড়ের অবাঙ্গালীরা দিনকে দিন নিজের পিঠে দেওয়ালের ঘষা খাচ্ছে। দেওয়াল ভাঙার হাতুড়ীটা এই দেশ মাতৃকার প্রতিনিধিদের কাছে জিম্মি।

আদিবাসী শব্দের উপর নিষেধাজ্ঞার পর কিছু সাংবাদিক, সুশীল, গণ্যমান্যরা এনজিও সংস্থাগুলোর উপর ক্ষেপে গেছেন। তাঁরা নাকি আদিবাসী শব্দের ব্যাবহার করে খুবই অন্যায় করছেন। আবার কিছু এনজিও সংস্থা খাতাপত্রে লেখা আদিবাসী শব্দটি কেটে কুটে কাগজ ছিড়েও ফেলেছেন। কেউ কেউ আদিবাসী হতে হলে সেই জাতি গোষ্ঠীকে কি কি যোগ্যতা রাখতে হবে তা নিয়েও গবেষনা শুরু করে দিয়েছেন। এইদিকে দেশে কিছু লেখক বেড়িয়ে এলো গবেষক বেড়িয়ে এলো আর বন্ধ হবার উপক্রম এনজিও গুলোও আদিবাসীদের হেয় করে সুবিধা লুটে নিলো ! কিন্তু ঐ একটি শব্দের উপড় এতো এলার্জির মানেটা বিশ্ববাসীর কাছে কেমন তা জানার আগে বলে রাখা ভালো কিছু মুখোশধারী আদিবাসী বান্ধবরা নাকি আদিবাসীমনা জাতিদের কষ্ট পাবার ভয়ে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বলে সম্বোধন করেন না ! এবং এতে অনেকেই মতামত দিয়ে জানিয়েছেন যে অন্তত তাঁদের মন রক্ষা করার জন্য মাঝে মাঝে আদিবাসী শব্দটি বলা যায় ! কেনো ভাই ? আপনাদের দেওয়া নৃতাত্ত্বিক শব্দটিকি তাহলে সজ্ঞানে দেওয়া টিটকারি ? বাংলাদেশকে বাংলার মানুষ চিনেনি বোধয়। বাংলার মানচিত্রের খাঁজ, ভাজ, বাংলার মানুষ, জাতি গোষ্ঠী এইসব না চিনলে একজন আদিবাসীকে ইচ্ছামতো নাম দেওয়াটা হয়তো অতটা ভুল কাজ নয় ! আদিবাসী আছে, আশা করি একদিন দেশে একটা সুদিন আসবে। দেশকে ভালো জানে এমন কেউ একজন দেশের আদিবাসীদেরকেও চিনতে শিখবে। আদিবাসীদের আদিবাসী বলবে। আশায় বেঁচে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের স্বীকৃতি পাওয়ার দিন খুব কাছেই হয়তো। দেশটা সেই সুদিনের আশায় দৌড়ে নাই পৌছালো, তবুও ধীরে এগিয়ে যাক, সকল জাতিগোষ্ঠির স্বাধীন বাংলার আগামী দিনে।

১ thought on “বাংলাদেশের আদিবাসীঃ স্বীকৃতি পাবার দৌড়ে কতদুর?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *