রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে কারণে সুন্দরবনের জন্য বিপদজ্জনক

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণ বৈচিত্রের আধার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষাকারী সুন্দরবনের অস্তিত্ব প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট নানা দুর্বিপাকে বিপন্ন। তার উপর এখন মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে বিশাল এক কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদুৎ প্রকল্প- ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দেশের ভেতরে প্রবল জনমত, দেশি-বিদেশী বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, ব্যাক্তি ও সংগঠনের আপত্তি স্বত্বেও ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের এই প্রকল্প থেকে সরে আসছে না সরকার। সম্প্রতি ভারত হেভি ইলেক্ট্রিক্যালস লিমিটেড(ভেল) কে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের জন্য ঠিক কি কি কারণে বিপর্যয় ডেকে আনবে সে বিষয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।

সুন্দরবন থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপদজনক দূরত্ব:
কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বলে সাধারণত কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২০ কিমি এর মধ্যে এ ধরণের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় না। যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেই ভারতেরই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইআইএ গাইড লাইন, ২০১০ এ স্পষ্ট বলা আছে-

Locations of thermal power stations are avoided within 25 km of the outer periphery of the following:
• – metropolitan cities;
• – National park and wildlife sanctuaries;
• – Ecologically sensitive areas like tropical forest, biosphere reserve, important lake and coastal areas rich in coral formation;
তথ্যসূত্র: http://envfor.nic.in/sites/default/…

অর্থাৎ ভারতের পরিবেশ মন্ত্রাণলয়ের গাইড লাইন অনুসারে নগর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিমি সীমার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এড়িয়ে চলতে হবে। দেখা যাচ্ছে, যে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের এত কাছে পরিবেশ দূষণকারী কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেই কোম্পানি সেটা করতে পারতো না!

নির্মাণ পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ:
কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুইটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট থাকবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণের জন্য ৪৮ মাস বা চার বছর এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি শেষ হতে আরো ৬ মাস বাড়তি অর্থাৎ মোট সাড়ে ৪ বছর সময় লাগবে। এই সাড়ে চার বছর সময় জুড়ে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস ও পানি সম্পদের উপর নিম্ন লিখিত প্রভাব সমূহ পড়বে:

১) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নি:সরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নি:সরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে সরকারি ইআইএ রিপোর্টেই আশংকা করা হয়েছে।(সূত্র: রামপাল ইআইএ,পৃষ্ঠা ২৬৮)
২) প্রকল্পের জন্য ব্যবহ্রত যন্ত্রপাতি, যানবাহন, জেনারেটর, বার্জ ইত্যাদি থেকে তেল পুড়িয়ে ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস নির্গত হবে।
৩) নির্মাণ কাজের যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ব্যাবহারের ফলে শব্দ দূষণ হবে।
৪) নির্মাণ পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের কঠিন বর্জ্য তৈরী হবে যা সঠিক পরিবেশ ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে পরিবেশ এর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে;
৫) নির্মাণ স্থলের নিকটবর্তি নদী-খালের পানিতে নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের তেল নি:সরিত হয়ে পানি দূষণ ঘটাতে পারে।
৬) ড্রেজিং এর ফলে নদীর পানি ঘোলা হবে। ড্রেজিং সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তেল গ্রীজ ইত্যাদি নি:সৃত হয়ে নদীর পানির দূষিত হবে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপারেশনে থাকার সময়কার প্রভাব:
রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইআইএ রিপোর্টে পরিচালন পর্যায় কে ২৫ বছর ধরা হয়েছে। এই ২৫ বছর ধরে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের পরিবেশের উপর নিম্নলিখিত প্রভাব ফেলবে:

১) বায়ু দূষণ:
কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে যার ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার(প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে(প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি) যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি সহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন ১৪ কিমি দূরত্বের কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে এভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। এমনকি কিছু দিন পরে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৯০ মেগাওয়াটে উত্তীর্ণ করা হয়। ফলাফল সাথে সাথে বোঝা না গেলেও ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উচু বিশালাকৃতি পেকান বৃক্ষগুলো যখন একে একে মরতে শুরু করলো ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের হিসেবে ফায়েত্তি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নি:সৃত বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস বিশেষত সালফার ডাই অক্সাইডের বিষ ক্রিয়ায় পেকান, এলম, ওক সহ বিভিন্ন জাতের গাছ আক্রান্ত হয়েছে, বহু পেকান বাগান ধ্বংস হয়েছে, অন্তত: ১৫ হাজার বিশালাকৃতির পেকান বৃক্ষ মরে গেছে। এবং এই ক্ষতিকর প্রভাব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এমনকি ৪৮ কিমি দূরেও পৌছে গেছে।


সূত্র: http://www.huffingtonpost.com/2010/…

ফায়েত্তি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন সালফারডাই অক্সাইড নি:সরণের ফলে সালফার ও এসিড দূষণে হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি জুড়ে গাছপালার এই অবস্থা যদি হতে পারে তাহলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরকারি হিসেবেই দৈনিক ১৪২ টন হারে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড নি:সৃত হলে মাত্র ১৪ কিমি দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের কি অবস্থা হবে তা ভাবতেও ভীষণ আতংক হয়!

২) ছাই দূষণ:
কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪ ৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূতি ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। (সূত্র: রামপাল ইআইএ,পৃষ্ঠা ২৮৭-২৮৮)

ভয়ংকর ব্যাপার হলো , একদিকে বলা হয়েছে এই বিষাক্ত ছাই পরিবেশে নির্গত হলে ব্যাপক দূষণ হবে(পৃষ্ঠা ২৮৭) অন্যদিকে এই ছাই দিয়েই প্রকল্পের মোট ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করার কথা বলা হয়েছে!(পৃষ্ঠা ২৬৩) এই বর্জ্য ছাই এর বিষাক্ত ভারী ধাতু নিশ্চিত ভাবেই বৃষ্টির পানি সাথে মিশে, চুইয়ে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে যার প্রভাব শুধু প্রকল্প এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমন্টে কারখানা, ইট তৈরী ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যাবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে কোন কারখানায় এর আদৌ কোন ব্যাবহা হবে এরকম কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করা হয়নি । বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই উৎপাদিৎ ছাই এরই উপযুক্ত ব্যাবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না। সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ফ্লাই অ্যাশ ব্যাবহার করতে উৎসাহিত নয়,বরং অনেক কোম্পানি ফ্লাই অ্যাশ মুক্ত সিমেন্টের বিজ্ঞাপনও প্রচার করে। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক৩০০ মেট্রিকটন বর্জ্য ছাই কোন সিমেন্ট কারখানায় ব্যাবহারের বদলে ছাই এর পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে ছাইয়ের পুকুরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ঝুকি হলো এটি পশুর নদীর ঠিক তীরেই তৈরী করা হবে।

এই ছাই বাতাসে উড়ে, ছাই মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নীচে ও নদীর পানিতে মারাত্মক দূষণ ঘটাবে। আরেকটা বড় ঝুকি হলো, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় কিংবা অন্যকোন কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ছাই মিশ্রিত পানি সুন্দরবনের নদীতে ও পরিবেশ ছড়িয়ে যাওয়া।

বিভিন্ন দেশে ছাইয়ের পুকুর থেকে এ ধরণের দূষণ ঘটার বহু উদাহরণ রয়েছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ড্যান নদীতে ডিউক এনার্জির ছাইয়ের পুকুর থেকে ছাই মিশ্রিত পানি দূষণ ও টেনিসিতে কিংস্টোন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এমোরি ও ক্লিনচ নদীতে ছাই দূষণের ঘটনার কথা বলা যেতে পারে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে কিংস্টোন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাইয়ের পুকুর থেকে ১১০ কোটি গ্যালন বা ৪২ লক্ষ ঘনমিটার ফ্লাই অ্যাশ স্লারি এমোরি ও ক্লিনচ নদীতে বাহিত হয়ে মারাত্মক দূষণ ঘটায়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিউক এনার্জির ছাইয়ের পুকুর থেকে ৫০ হাজার থেকে ৮২ হাজার টন ছাই ও ২ কোটি ৭০ লক্ষ গ্যালন ছাই দূষিত পানি ড্যান নদীতে বাহিত হয়ে যে বিপর্যয় ঘটায় তার রেশ এখনও ঐ অঞ্চলে রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: http://www.northcarolinahealthnews.org/…
https://www.scienceleadership.org/m…

৩) সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিপদ:
রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই পরিবহন করা হবে! এ জন্য সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রায় সারা বছর ধরে হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করে গোটা সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলবে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্র পথে আমদানী করতে হবে। আমাদানীকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে মংলা বন্দরে এনে তারপর সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর গভীরতা সর্বত্র বড় জাহাজের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার কারণে প্রথমে বড় জাহাজে করে কয়লা সুন্দর বনের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে একাধিক ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা মংলাবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য সুন্দর বনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কিমি নদী পথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিমি পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!

সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাতেই স্বীকার করা হয়েছে, এভাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে-

১) কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানি সহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নি:সৃত হয়ে নদী-খাল-মাটি সহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে;
২) সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্টে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা উঠানো নামানোর সময় পানি-বায়ু দূষণ ঘটবে;
৩) চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুইপাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে;
৪) কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দ দূষণ হবে;
৫) রাতে জাহাজ চলের সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণী সহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশু-পাখির জীবনচক্রের উপর মারাত্বক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ইত্যাদি।
(সূত্র: রামপাল ইআইএ, পৃষ্ঠা ২৯৩-২৯৪)

সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির প্রতারণা:
সরকার বলছে, রামপালে সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, ফলে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজির কথা বলে এভাবে আশ্বস্ত করা চেষ্টা একটা প্রতারণামুলক কাজ। তাপীয় কর্মদক্ষতা বা ইফিসিয়ান্সি অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিন প্রকার: সাব ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল এবং আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল। সাব ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যায় সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, পারদ, সীসা, আর্সেনিক মিশ্রিত বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হয়। পার্থক্য হলো, সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইফিসিয়ান্সি সাব ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ বেশি। বলা হয়, প্রতি ১ শতাংশ ইফিসিয়ান্সি বৃদ্ধির জন্য ২ শতাংশ হারে পরিবেশ দূষণ কারী উপাদান কম নির্গত হয়। এ হিসেবে সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায় যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। যদি পুরাতন সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দৈনিক ১০০ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়, তাহলে সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যাবহার করলে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গমন সর্বোচ্চ ১০ টন কমে ৯০ টন হতে পারে। এখন সুপারক্রিটিক্যাল টেকনলজি ব্যাবহারের ফলে এই সামান্য ১০ টন হ্রাস পাওয়ার ঘটনা থেকে যদি প্রচার করা হয় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনলজি ব্যবহারের ফলে কোন পরিবেশ দূষণ হবে না- তাহলে সেটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্দরবনের কাছে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটির এমন কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে যেগুলো সাবক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল বা আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল- যেই টেকনোলজিই ব্যবহার করা হউক না কেন ঐ ক্ষতিগুলো হবেই। যেই টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক- বিদ্যুৎ কেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবেই, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মতো সুন্দরনের পশুর নদী দূষণের ঝুকি থাকবেই, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে দিনে রাতে কয়লার জাহাজ চলাচলের ফলে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।

সবচেয়ে বড় কথা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দৈনিক ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, বার্ষিক সাড়ে ৯ লক্ষ টন বিষাক্ত ছাই উৎপাদনের যে হিসেব সরকারি পরিবেশ সমীক্ষাতেই রয়েছে, সেটা কিন্তু সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনলজি ব্যবহার করা হবে- এটা ধরে নিয়েই বের করা হয়েছে। আমরা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনলজি ব্যবহার হবে ধরে নিয়েই করা এই হিসেব থেকে দেখিয়েছি যে- এই বিষাক্ত গ্যাস পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৭ এর নির্ধারিত সীমা লংঘন করছে। সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনলজি ব্যবহার করা স্বত্বেও সুন্দরবনের মাটি পানি ও বাতাসে এই যে বিপুল পরিমাণ সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস, বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হবে তা নিশ্চিত ভাবেই সুন্দরবন ধ্বংস করবে।

বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে ভ্রান্ত তুলনা:
প্রায়ই দাবী করা হয় যে বড় পুকুরিয়ার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কোন পরিবেশ দূষণ হচ্ছে না, ফলে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কোন পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা নেই। বাস্তবে বড়পুকুরিয়ায় কোন পরিবেশ দূষণ হচ্ছেনা কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে গেলেই দেখতে পাবেন পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ উদাহরণ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশের কৃষিজমি কয়লা দূষণে রীতিমত কালো রঙ ধারণ করেছে, মাটির নিচের পানির স্তর নেমে গেছে, বিদুৎ কেন্দ্রের ছাই পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে, ছাইয়ের পুকুর থেকে নালার মাধ্যমে নির্গত পানি নিকস্থ নদী ও জলাভূমি দূষিত করছে যে পানিকে স্থানীয়রা বিশেষ গন্ধের কারণে ‘কেরোসিন পানি’ বলে উল্ল্যেখ করেন।

তাছাড়া বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনা করাই সঠিক নয়। কারণ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছোট আকারের এবং বড়পুকুরিয়ার পাশে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বনাঞ্চল নেই। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট যার মধ্যে আবার কার্যত ১২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিটই কেবল চালু থাকে। অথচ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট যা বড়পুকুরিয়ার কার্যকর (১২৫ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১০ গুণেরও বেশি। ফলে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে তার দশগুণেরও বেশি ক্ষতি হবে।

কর্মসংস্থানের মিথ্যা আশ্বাস:
ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ণ হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। বাস্তবতা হলো, একটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় মূলত কারিগরী জ্ঞান সম্পন্ন লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে এসব কর্মসংস্থানের খুব সামান্যই স্থানীয় জনগণের ভাগ্যে জুটবে। চার থেকে সাড়ে চার বছরের নির্মাণ পর্যায়ে বড় জোর মাটি কাটা, মালামাল পরিবহণ, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি কিছু অস্থায়ী মজুরি ভিত্তিক কর্মসংস্থান জুটতে পারে স্থানীয় কিছু মানুষের। কিন্তু পরিচালনা পর্যায়ে যে ৬০০ কর্মসংস্থান হবে তার বেশিরভাগই কারিগরী হওয়ার কারণে সেখানে খুব কম সংখ্যক স্থানীয় মানুষেরই কাজ জুটবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও চালু হলে কি পরিস্থিতি হবে তার লক্ষণ কিন্তু এখনই ধরা পড়ছে। কৃষি জমি থেকে যাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের পরিস্থিতি কি? তাদের কি অনেক উন্নয়ণ হয়েছে? সাপমারী ও কৈগরদাসকাঠী মৌজায় ৮টি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের ২ হাজার পরিবার এই প্রকল্পের কারণে ইতিমধ্যেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বহু সম্পন্ন কৃষক জমি হারিয়ে ৩০ টাকা মজুরীর দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। কৃষি মজুরেরা কাজের অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে মাটি পানি বাতাস মারত্মক দূষিত হয়ে সুন্দরবন ও তার চারপাশের জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মউয়াল সহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হবে।

রামপাল প্রভাবিত ওরিয়ন ও অন্যান্য প্রকল্পের সম্মিলিত বিপদ:
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরেকটি বিপদের দিক হলো, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে আরো বিভিন্ন ধরণের দূষণকারী শিল্পের আনাগোনা ও ভূমি দখলের মহোৎসব শুরু হয়ে গেছে সুন্দরবনের পাশে। এরকমই একটি প্রকল্প হলো সুন্দরবন থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে ওরিয়ন গ্রুপের ৫৬৫ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র।

সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে, পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ অনুমোদন ও সাইট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই জনগণকে অনেকটা অন্ধকারে রেখে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে ওরিয়ন গ্রুপ। রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ওরিয়নের ৫৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও সুন্দরবনের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। ওরিয়ন গ্রুপের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সুন্দরবনের আরো কাছে হওয়ায় ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই বিষাক্ত ও ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেনের গ্যাস, বিষাক্ত ভারী ধাতু ও ছাই, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, পানি দূষণ ইত্যাদি ঘটানোর মাধ্যমে সুন্দরবনের ধ্বংসকে আরো তরান্বিত করবে। রামপালের ১৩২০ ও ওরিয়নের ৫৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র একসঙ্গে যখন চলবে, তখন ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আলাদা আলাদাভাবে যে ক্ষতি হওয়ার কথা, একত্রিত ভাবে (কিউমুলেটিভ ইমপ্যাক্ট)তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে; কারণ উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ আগের চেয়ে বেশি হবে।

দেশি বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার আপত্তি ও উদ্বেগ:
সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিপদ নিশ্চিত জেনেই রামসার ও ইউনোস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে একাধিক বার চিঠি দিয়েছে। সুন্দরবনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনেস্কো সরকারকে প্রথম চিঠি দেয় ২২ মে ২০১৩ তারিখে। ১৫ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে সরকারের ইআইএ রিপোর্ট ইউনেস্কোর হাতে পৌছে। ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে ইউনেস্কো ইআইএ রিপোর্টের ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা উল্ল্যেখ করে সরকারকে চিঠি পাঠায়। সরকারের মতামত ইউনেস্কোর কাছে পৌছাতে লাগে ১৫ এপ্রিল ২০১৪। এর মধ্যে ইউনেস্কো সুন্দরবনের পাশে একই স্থানে আরেকটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের(ওরিয়ন গ্রুপের ৫৬৫ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র) পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। ইউনেস্কো এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ১১ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে সরকারকে আবার চিঠি দেয়। ইউনেস্কোর ৩৮ ও ৩৯ তম অধিবেশনে সুন্দরবনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং অন্যান্য দূষণকারী কারখানার ব্যপারে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। (এ বিষয়ে ইউনেস্কোর বিস্তারিত কার্যবিবরণী পাওয়া যাবে এখানে http://whc.unesco.org/en/soc/2868)

নিয়ম অনুসারে, কোন একটি স্থানকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করেই ইউনোস্কোর কাজ শেষ হয় না, তারা সাইটগুলো নিয়মিত মনিটরিং করে, সরকারের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট চায় এবং সেই অনুযায়ী তাদের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছে পাঠায়।তারপরও সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এবং ফলাফলস্বরুপ কোন বিশ্ব ঐতিহ্য বিপদাপন্ন মনে হলে তারা সেটাকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়।সরকার যেভাবে রামপাল ও ওরিয়নের বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আগাচ্ছে, তাতে অচিরেই হয়তো সুন্দরবনকে আমরা বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় দেখতে পাব।

এছাড়া সুন্দরবনের জন্য বিপদজনক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি থেকে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমনকি খোদ সরকারের বিভিন্ন বিভাগও লিখিত ভাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে! জলাভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক রামসার কনভেনশনের সচিবালয় থেকে গত ২২ জুন ২০১১ তারিখে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত চিঠিতে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আনা কয়লা সুন্দরবনের ভেতরে আক্রাম পয়েন্টে লোড আনলোড করা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

রামসারের চিঠি পাওয়ার পর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে মতামতের জন্য বন অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য বিভাগের কাছে চিঠি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে খাদ্য বিভাগ ও শিল্প মন্ত্রণালয় কোন মতামত প্রদান থেকে বিরত থাকে। বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়, মূল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে গোজামিল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার যে প্রকল্প এগিয়ে নিতে মরিয়া, সেই প্রকল্প বিষয়ে সরকারেরই অন্যান্য দপ্তর যেমন: বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের ক্ষতি করে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি প্রকাশ করা হয়।

২৯ সেপ্টম্বর ২০১১ তারিখে পরিবেশ ও বনমন্ত্রালয় বরাবর চিঠি দিয়ে জানায়: “বন সংরক্ষক, খুলন অঞ্চল সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কয়লা ভিত্তিক Power Plant স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। Sundarbans Ramsar Site (World Heritage Site) বিধায় কয়লা ভিত্তিক Power Plant প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি জীববৈচিত্র সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে পুন:বিবেচনা করার জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হলো।”

পরিবেশ অধিদপ্তর তার ২১ জুলাই ২০১১ এর চিঠিতে প্রথমে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বলে উল্ল্যেখ করলেও যেহেতু এর সাথে পরিবেশের বিষয়যুক্ত আছে সেজন্য মতামত প্রকাশ করে বলে: “পরিবেশ অধিদপ্তর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সুন্দরবনের জৈববৈচিত্র বিশেষত সুন্দরবন রামসার সাইটের গুরুত্বপূর্ণ জৈববৈচিত্রের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্ন।”

প্রস্তুতি পর্বেই সুন্দরবনের যে বিপদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে
মূল কেন্দ্র নির্মাণের আগে মাটি ভরাট ড্রেজিং ইত্যাদি প্রস্তুতিমূলক কাজে খুব বেশি পরিবেশ দূষণ হওয়ার কথা না। কিন্তু এই প্রস্তুতিমূলক কাজের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণটুকুও নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি বলে খোদ সরকারি মনিটরিং রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে! মাটি ভরাটের সময় বাতাসে ধুলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার জন্য পানি ছিটানো এবং ভরাটের স্থান ঘিরে রাখা,ড্রেজিং এর সময় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্মদক্ষ(ইফিশিয়ান্ট)ড্রেজার ব্যাবহার,ইফিশিয়ান্ট যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার মাধ্যমে জেনারেটর, ড্রেজার ও বালু বহন কারী জলযানের সালফার ও নাইট্রোজেনের বিষাক্ত অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। কিন্তু এসবের কোন কিছুই করা হয়নি বলে স্বীকার হয়েছে সরকারি রিপোর্টে।

বর্জ্য ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার বন্ধ করার কথা থাকলেও প্রকল্প এলাকায় সেরকম কোন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখা যায় নি, শ্রমিকরা খোলা টয়লেট ব্যাবহার করছেন এবং টয়লেট থেকে বর্জ্য উপচে পানিতে মিশছে বলে লিখা হয়েছে ঐ রিপোর্টে। নদী থেকে বালু উত্তোলণ ও মাটি ভরাটের সময় মৎস সম্পদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রজনন মৌসুমে কাজ বন্ধ রাখা, উপযুক্ত নিষ্কাশন নালা নির্মাণ, দেয়াল নির্মাণ ও দুর্ঘটনা ঘটলে যন্ত্রপাতি থেকে তেল ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ব্যাবস্থা থাকার কথা ছিল। কিন্তু এগুলো কোনটাই সম্পূর্ণ ভাবে পালন করা হয় নি। এই পর্যবেক্ষণগুলো সবই সরকারের নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস এর ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালের মনিটরিং রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে। এই দুষণগুলোর জন্য হয়তো সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে না, কিন্তু এগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের কি ঘটবে তার পূর্বাভাস।

আর সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে কয়লার জাহাজ চললে কি ধরণের বিপর্যয় ঘটতে পারে তার কিছু নিদর্শন আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি। গত ৯ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে শেলা নদীতে তেলের ট্যাংকার এবং ৩ মে ২০১৫ তারিখে সুন্দরবনের ভোলা নদে সার বোঝাই জাহাজ ডুবির ঘটনার পর তেল/সার ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে মারাত্মক অবহেলা ও সমন্বয়হীনতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উপসংহার:পুঁজিতন্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যাবস্থায় শাসক শ্রেণী ব্যাক্তি-গোষ্ঠী মুনাফা ও দেশী-বিদেশী শক্তির স্বার্থ নিশ্চিত করতে গিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নানান সংকটে ফেলে দেয় এবং পরে আবার সেই সংকট থেকে উদ্ধারের নামে মুনাফার প্রাধান্য দিয়ে আরো বড় সংকট ডেকে আনে। নাওমি ক্লেইন তার ‌‌”ডিসাস্টার ক্যাপিটালিজম” গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন: ”সামরিক ক্যু, সন্ত্রাসী আক্রমণ, বাজারের ধ্বস, যুদ্ধ, সুনামি, হারিকেন ইত্যাদি বিপর্যয় সমস্ত মানুষকে একটা কালেক্টিভ শক বা আঘাতের সম্মুখীন করে ফেলে। নিক্ষিপ্ত বোমা, সন্ত্রাসের আতংক কিংবা শো শো ঝড়ো হাওয়া সমগ্র সমাজকে কাদার মত নরম করে ফেলে- যেমন আঘাতের পর আঘাত নরম করে ফেলে কারবন্দী আসামীকে। আতংকিত বন্দী যেমন বিপর্যস্ত হয়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহযাত্রী বন্ধুর নাম ফাঁস করে দেয়, বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে আতংকিত সমাজও অনেক সময় এমন সব কাজের অনুমোদন দিয়ে ফেলে যেগুলো অন্যসময় হলো তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তো।” বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানুষকে এরকমই একটি “কালেক্টিভ শক” এর মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে যে শক বা আঘাতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যূৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে শাসক শ্রেণী দেশী বিদেশী লুটেরা পুঁজির মুনাফার আয়োজন করছে। গ্যাস ব্লক বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে অতি উচ্চ মূল্যে বিদ্যূৎ ক্রয়, ভারতীয় বিনোয়োগে সুন্দরবন-কৃষিজমি ধবংস কারী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, রিলায়ান্স-আদানীর সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সমঝোতা চুক্তি ইত্যাদি সবকিছুই এই মুনাফা ও লুটপাটের আয়োজনের অংশ। এই কারণেই স্থানীয় জনগণ, সারা দেশের জনমত, বিশেষজ্ঞ মতামত এমনকি রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের মতামত পর্যন্ত উপেক্ষা করে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে সরকার। গত ৬ জুন ২০১৫ নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় রামপালের পাশের মংলায় উপজেলায় ভারতীয় বিনিয়োগের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘোষণা দেয়া হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধী নই কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের অযুহাতে জল-জমি-জঙ্গল-জীবন ও অর্থনীতি ধবংসকারী কোন প্রকল্প মেনে নিতে রাজী নই। আমরা মনে করি, কৃষিজমি, সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনভূমি কিংবা জীবন-অর্থনীতি ধবংস না করেও বড়-ছোট-মাঝারি নানান আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব যদি মুনাফার আগে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

৯ thoughts on “রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে কারণে সুন্দরবনের জন্য বিপদজ্জনক

  1. পরিবেশ ও জলবায়ুর উপর
    পরিবেশ ও জলবায়ুর উপর জাতিসংঘের পুরুস্কারপ্রাপ্ত আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীপরিষদকে অনুরোধ জানাব কল্লোল দা’র এই লেখায় উত্থাপিত রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কারণে সুন্দরবনের জন্য বিপদজ্জনক সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো খন্ডাতে।

    শুধুমাত্র আওয়ামীলীগের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের স্বার্থ রক্ষায় দেশের পরিবেশ ও জলবায়ুকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার এমন দেশবিরোধী সিদ্ধান্তকে আমরা কেন মেনে নেব? সুন্দরবনের ক্ষতি করে রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্র কার স্বার্থ রক্ষা করবে? প্রয়োজন নেই দেশের ক্ষতি করে এমন বিদ্যুৎকেন্দের। বিদ্যুৎকেন্দ্র করার মত দেশে জায়গার অভাব নেই। এটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হোক।

  2. একেই বোধহয় বলে নিজের পায়ে
    একেই বোধহয় বলে নিজের পায়ে কুড়াল মারা।এই প্রকল্পে বাংলাদেশের লাভের পরিমান যা হবে ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি।যে কোন মূল্যে থামাতেই হবে এই প্রকল্প কে।

  3. ভারতের লাভের জন্য রামপালে
    ভারতের লাভের জন্য রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বলাটা হয়তো অনেক বেশি কল্পনা প্রবন।তবে কেন্দ্রটা সরিয়ে অন্য কোথাও নিতে বাধা কি কি এসব নিয়ে কোন লেখার অনুরোধ করছি।রামপালের ক্ষতি নিয়ে অনেক লেখাই আমরা পড়েছি।

  4. যাদের বোঝার দরকার তারা যদি
    যাদের বোঝার দরকার তারা যদি বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকলে বৃহৎ অান্দোলন ছাড়া উপায় নেই।

  5. ….তিতাস খেল, তিস্তা নিল
    ….তিতাস খেল, তিস্তা নিল
    পদ্মা, যমুনা শুকিয়ে দিল,
    বাংলার শত ফেলানী নিল
    বিডিআর দিয়ে আর্মি খেল
    পঙ্কজ রকিব এক হল
    ওপার থেকে সুজাতা এল
    এরশাদকে ঝাড়ি দিল
    বন্দুক ধরে সিএমএইচে পাঠাল
    গনতন্ত্রও সাথী হল
    ইলেকশনের ভুত তাড়াল
    সুন্দরবনে রামপাল হল
    বাঘ হরিণ সব পালাল
    তালপট্টি তলে তলে গেল
    আম্বানী, মুকেশরা বাগাতে এল
    এক্সক্লুসিভ বলে ঘাঁটি বাঁধল
    ট্রানজিট, পোর্টস, টিভি সব ফ্রি হল
    এক তরফা সব চুক্তি হল,
    বিলিয়নস অব টাকা ওপার গেল,
    এপারেতে ফেলানীদের মৃতদেহ এল . . .
    চেতনার আর কত বল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *