ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন : গণতন্ত্রের ভিত হোক শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত

গ্রামে জন্মের সুবাদে ছোটবেলা থেকেই যে নির্বাচনটি প্রত্যক্ষ করে আসছি সেটি হলো ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। এখনো স্পষ্ট মনে আছে, খুব ছোটবেলায় বিরিয়ানির লোভ সামলাতে না পেরে এলাকার জনৈক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর মিছিলে বডজনদের সাথে স্লোগান তোলেছিলাম। আহ…..! সে কি ছন্দের ফুলঝুঁডি, শ্রুতির মোহনীয়তা। আমার ভাই তোমার ভাই/অমুক ভাই অমুক ভাই। অমুক ভাইয়ের মার্কা কী? তমুক ছাডা আর কি। অমুক ভাইয়ের চরিত্র/ফুলের মতো পবিত্র। অমুক ভাইকে দিলে ভোট/শান্তি পাবে গ্রামের লোক। এভাবে আরো কত কি! সম্ভবত নির্বাচনই একমাত্র মৌসুম যে মৌসুমে বাবা, চাচা, দাদা, মামা কোনো পার্থক্য থাকেনা, সবাই ভাই। নির্বাচনকে ঘিরে অমুক প্রার্থী সমর্থক ও তমুক প্রার্থী সমর্থকদের মধ্যে দা-কুডাল মারামারিও কম দেখিনি। হাট-মাঠ, গ্রাম-গঞ্জ, পাডা-মহল্লা, চায়ের দোকান সর্বত্র সরবর। সকাল থেকে সন্ধ্যা মাইকের আওয়াজ। স্পিকারে প্রার্থীদের শ্রুতিমধুর প্রতিশ্রুতি। ভোটারদের দোয়ারে দোয়ারে প্রার্থীর আনাগোনা। প্রতিটি মহল্লায় মহাল্লায় আলোচনা-সমালোচনা। কে হবে মেম্বার? কাকে প্রয়োজন চেয়ারম্যান? ইত্যাদি ইত্যাদি। জল্পনা-কল্পনার যেন শেষ নেই। সব মিলিয়ে নির্বাচনকালীন সময়ে ভিন্ন আমেজ বিরাজ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সময়ের বাস্তবতায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে আবারো এসেছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়নে লেগেছে নির্বাচনী হাওয়া। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী আগামী ২২শে মার্চ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সারা দেশে মোট ৪ হাজার ২৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদে ৬ ধাপে এ নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। উল্লেখ্য, এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে দলীয় মনোয়নে। কাজেই আম, আনারস, নলকূপ মার্কা প্রতীকের বদলে প্রার্থী তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্ত দলের (নৌকা, ধানের শীষ, নাঙ্গল ইত্যাদি) প্রতীকে সম্পন্ন করবে নির্বাচন। এর মধ্যে দিয়ে অবসান ঘটতে যাচ্ছে বিগত সোয়া’শ বছর ধরে অনুষ্টিত নির্দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান ঐতিহ্য। অবশ্য মেম্বার পদে বিগত দিনের মতোই নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ নেতৃত্বধীন ১৪ দলীয় জোটসহ বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি ও নিবন্ধিত ছোট-বড অনেক রাজনৈতিক দল দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিন্ধান্ত নিয়েছে। মূলত বিগত দিনে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ, সিটিকর্পোরেশন, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন অনুষ্টিত হয়ে আসছিলো নির্দলীয়ভাবে। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের প্রচেষ্টায় দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এবং সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাঁর সূচনা হয়। দলীয় মনোয়ন বা দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে বিশিষ্টজনরা অনেক যৌক্তিক বিশ্লেষণ দাঁড করেছেন। বিএনপি এবং তাঁর অঙ্গসংগঠনগুলো মনে করছেন, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ তৃণমূল পর্যন্ত তাঁদের ক্ষমতা বিস্তৃত করার নতুন পায়তারা করেছে। এ নির্বাচন জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবেনা বলেও মত ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ও তাঁদের নেতৃত্বাধীন সকল জোট মনে করেন, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন তৃণমূলের রাজনীতিতে যুগান্তকারী মাইলফলক এবং যুগপযোগী সিদ্ধান্ত। এর মধ্য দিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে বলেও মনে করেছেন তাঁরা। দলীয় রাজনীতির বাইরে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতোদিন নির্দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্টিত হওয়ায় প্রার্থীদের দলীয় পরিচয় সম্পর্কে জনগণ প্রকাশ্যভাবে অবহিত থাকত না। প্রার্থীরা দলীয় পরিচয়ের উর্ধ্বে থেকে সব ভোটারের কাছে ভোট প্রার্থনা করতেন। এবার দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হওয়ায় বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে সম্পর্কের দারুণ অবনতি ঘটবে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও এ ধারণার প্রতিফলন ঘটবে বলে তাঁরা আশাবাদী। তাছাডা সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনে আমরা দেখেছি দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন তৃণমূলে ততটা সুফল বয়ে আনেনি। আমরা দেখিছি জাতীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব তৃণমূলেও সক্রিয় ছিলো। পত্র-পত্রিকার মারফত জানতে পারছি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচলেও পৌরসভা নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থীদের একচেটিয়া আধিপত্য। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অত্যাচার-নির্যাতন, দমন-পীডন, ভোট কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ইত্যাদি। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দলীয়করণ করায় অতীতে যেমন এর নেতিবাচক প্রভাব দেখেছি, ভবিষ্যতেও ইতিবাচক কিছু ঘটবে কিন্তু তা না। আগামীতেও যে দল ক্ষমতার মসনদে আসীন হবেন সে দলের আধিপত্যই জিয়ে থাকবে। ফলে নির্বাচন বার বার নির্যাতনে পরিণত হবে। কাজেই ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অন্যান্য স্তরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। ভাবার বিষয়, জোর যাঁর মুল্লুক তাঁর নীতিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা অনেকটা ম্লান। মোদ্দা কথা হচ্ছে ঔপনিবেশিক ধাঁচের রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা দিয়ে দেশ পরিচালনায় রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির অসম ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। একসাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আত্মঅহংকার ও গর্বের স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের গত ৪৫ বছরেও আমরা স্বাধীন দেশ উপযোগী গুণগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে সক্ষম হয়নি। স্বকীয়তার বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ, সংস্কৃতির বিকাশ, স্বনির্ভর অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং চিন্তার জগতে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনতে পারিনি। স্বাধীন দেশের উপযোগী কেন্দ্রীয় প্রশাসন, পার্লামেন্ট গঠন, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের অনেক জনকাঙ্খিত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ব্যর্থতার বৃত্তে ঘোরপাক খাচ্ছে। এতো কিছুর পরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, তৃণমূলের অধিকাংশ অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত সহজ-সরল জনগণের কাছে কোন পদ্ধতিতে, কোন প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেটির চেয়েও বড চিন্তা থাকবে- নির্বাচিত প্রতিনিধি কেমন হবে। তাঁরা চাইবে তাঁদের অজস্র লোকের যাতায়াতের একমাত্র ভাঙা রাস্তাটি পিচঢালা কে করবে? যুগযুগান্তরের বাঁশের সাঁকোটি ব্রীজ কে করবে? চালের বস্তা ও ডালের বস্তা কে দেবে? গ্রামীণ জনগণের মধ্যে প্রাগৈতিহাসিককাল ধরে যে চিন্তা-চেতনা কাজ করে আসছিলো এবার নতুন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সে চিন্তা-চেতনা বলভত্‍ থাকবে বলে আশা করা যায়। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, ভবিষ্যত তৃণমূল নেতারা কি রাজনৈতিক বিচার বিবেচনার উর্ধ্বে উঠে সার্বিক কল্যাণমুখী হবেন, নাকি গ্রামীণ জনগণের চিন্তা-চেতনাকে পুঁজি করে ক্ষমতায় গিয়ে জাতীয় রাজনীতির দ্বিধাবিভক্তি তৃণমূলেও বিস্তৃত করবেন? এসব নানানমুখী সম্ভাবনার মধ্য থেকে বাস্তবতার আলোকে অপরিহার্য বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে অধিকতর শক্তিশালী করা। সরকারকে যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝতে হবে তা হলো রাষ্ট্রব্যবস্থাপনায় গণতন্ত্র চর্চার ভিত পর্যায় হলো স্থানীয় সরকার। এর মাধ্যমেই গ্রামীণ জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করতে পারে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ফলে শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা এবং উত্পাদন-উন্নয়ন-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এ সকল সুযোগ সৃষ্টি ও সুবিধা ভোগের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় সকল শ্রম-কর্ম-পেশার প্রতিনিধিত্ব যুক্ত করে স্ব-শাসিত সংস্থা হিসেবে গডে তোলা এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা। গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী ও সুসংহত করতে হলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে দেশের গ্রামপ্রধান সিংহভাগ মানুষের মাঝে গণতন্ত্রের ভিত সম্প্রসারিত হবে। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র বিকাশে সহায়ক হবে। সে লক্ষ্যে কাজ করতে হলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষতার যথেষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। সর্বোপরি প্রত্যাশা রইলো সব দল মতের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্টিত হোক আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। চোর-চোট্টা, টাউট-বাটপার, কালোটাকার আধিপত্যবাদীরা পরাজিত হোক। তৃণমূলের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়, সত্য, সুন্দর ও মানবিক রাজনৈতিক ধারা। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে আসুক যোগ্য ও আদর্শিক গণতান্ত্রিক জনকল্যাণমুখী নেতৃত্ব। গণতন্ত্রের ভিত হোক শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত।

(ভূল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে মার্জনা করবেন)

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
Email: ahmshahin71@gmail.com

৪ thoughts on “ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন : গণতন্ত্রের ভিত হোক শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত

  1. দেশে চলছে একনায়কতন্ত্র।
    দেশে চলছে একনায়কতন্ত্র। গনতন্ত্রের লেশমাত্র নাই। ভিত শক্ত কিভাবে হবে? বলতে পারেন ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে গনতন্ত্র গনতন্ত্র খেলার ভিত শক্ত করবে সরকার।

    1. আমি কিন্তু আপনার কথাগুলো আমার
      আমি কিন্তু আপনার কথাগুলো আমার কলামের উপযুক্ত বর্ণনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তোলে ধরার চেষ্টা করেছি!

  2. বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার
    বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দলীয় পরিচয়ে ইউপি-নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য সরকারকে সাধুবাদ। আর যোগ্য চেয়ারম্যান বাছাই করাটা জনগণের দায়িত্ব? জনগণ সেই কাজটি কি করছে?
    আপনাকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *