শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ এবং আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মডেল

“কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে,তার জন্য দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুলমাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো এবং বোঝানো। লেখক এবং পাঠকের মধ্যে এখানে স্কুল মাস্টার দন্ডায়মান। এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে যাক,চার চক্ষুর মিলনও ঘটেনা। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে, শুধু তার গুণ শুনি। টীকা- ভাষ্যের প্রসাদে আমরা কাব্য সম্পর্কে সকল নিগূঢ় তত্ত্ব জানি, কিন্তু সে যে কি বস্তু তা চিনি নে।” – সাহিত্যে খেলা,প্রমথ চৌধুরী-

“কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে,তার জন্য দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুলমাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো এবং বোঝানো। লেখক এবং পাঠকের মধ্যে এখানে স্কুল মাস্টার দন্ডায়মান। এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে যাক,চার চক্ষুর মিলনও ঘটেনা। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে, শুধু তার গুণ শুনি। টীকা- ভাষ্যের প্রসাদে আমরা কাব্য সম্পর্কে সকল নিগূঢ় তত্ত্ব জানি, কিন্তু সে যে কি বস্তু তা চিনি নে।” – সাহিত্যে খেলা,প্রমথ চৌধুরী-

আমরা সাহিত্য পাঠ করি কোথায়? প্রথমত,স্কুলে এবং কলেজে। স্কুলে এবং কলেজে যেহেতু মার্কস তোলার জন্য পড়াশুনা করি এবং ‘একটা ভাল চাকুরি’ পাইয়ে দেয়ার জন্য আমাদের পড়াশুনা করানো হয় সেহেতু সেখানে বাংলা বই-এ আমরা যে সাহিত্য পাঠ করি সেটা ‘সাহিত্য পাঠ’ হয়না, পরিণত হয় ‘সাহিত্য ব্যবচ্ছেদ’-এ। আমরা যেমন চিনিনা সাহিত্য কে, তেমনি চিনিনা লেখক বা কবিকেও। ‘লেখক পরিচিতি’/’কবি পরিচিতি’ থেকে আমরা কিছু গৎবাধা তথ্য, সাল তারিখ আর কিছু বইপত্রের নাম জানি, আরও ভাল করে বললে নাম মুখস্থ করি। ফলে কবির সাথে আমাদের আর পরিচয় ঘটেনা। একজন সাহিত্যিকের সাথে পরিচিত হতে হলে তাঁর সমগ্র না হোক,অধিকাংশ সৃষ্টির সাথে পরিচয় থাকা আবশ্যক। কিন্তু যেহেতু সেটা হচ্ছেনা,তাই সাহিত্যের যে দীপ্তি, সেটা আর আমাদের চক্ষু- কর্ণ ভেদ করে অন্তরে প্রবেশ করছেনা।

আর কোন সাহিত্যিকের সৃষ্টিজগৎ যদি হয় কল্পনার থেকেও বিশাল,তাহলে? সেই সাহিত্যিককে অনুধাবন করার মত দুঃসাধ্য কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই। সহজ-সাধ্য কাজ করতেই যেখানে আমাদের এত অনীহা,সেখানে দুঃসাধ্য কাজ মানুষ কেন করবে? সে আশাও দুরাশা। তবে কিছু বিষয় নিয়ে কথা না বললেই নয়। কারণ আমাদের অনেক বর্তমান সমস্যার সমাধানের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে সেই বিশাল সম্পদের ভিতরে। তাই সেগুলো খুঁজে দেখা আবশ্যক।

বাঙালি- এর সমার্থক শব্দ কী? কেউ যদি আমাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে আমি নির্দ্বিধায় উত্তর দিব- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিনিনা ভাল মত। স্কুল কলেজের পাঠ্য বই এ রবীন্দ্রনাথে কবিতা পড়ে কিংবা দু একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেই রবীন্দ্রনাথকে চেনা সম্ভব নয়। গোটা গীতবিতান,সঞ্চয়িতা,গল্পগুচ্ছ কিংবা উপন্যাস সমগ্র পড়েও তাঁকে পরিপূর্ণ ভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। সাহিত্য জগতের বাইরেও একজন রবীন্দ্রনাথ আছেন। দুঃখ জনক ব্যাপার হল, আমরা কবি রবীন্দ্রনাথকে তাও যা চিনি, সাহিত্যের বাইরের রবী বাবু আমাদের অপরিচিত। কিন্তু তিনি যদি সাহিত্যিক নাও হতেন, নোবেল পুরষ্কার নাও পেতেন তারপরও অন্যান্য কার্যাবলীর জন্যও তিনি বাঙালির মনে শ্রদ্ধার আসনে আসীন থাকতেন।

“কবি রবীন্দ্রনাথের সাথে পৃথীবির যে কোন বড় কবির বা সাহিত্যস্রষ্টার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টরূপে বোঝা দরকার। সাহিত্য নির্মাণকে ব্যক্তিপ্রতিভা বিকাশের একমাত্র বা শ্রেষ্ঠ শিল্পক্ষেত্র বলে তিনি গণ্য করেন নি।যাপনীয় জীবনকেই শিল্পরচনা বিবেচনা করেছিলেন,তবে সাহিত্য সাধনা তন্মধ্যে একটি তো বটেই।” -শিক্ষাচিন্তাঃরবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা, হায়াৎ মামুদ।

এই কথা গুলো একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে খন্ডিত হোক বা আংশিক হোক- আমরা মোটামুটি চিনি। কিন্তু সমাজসংস্কারক রবীন্দ্রনাথকে আমরা কতটুকু চিনি? সরাসরি তাঁর ছেলের মুখ থেকেই শোনা যাক কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“ ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে তখনকার দেশনেতারা কলকাতা এবং বড় বড় শহরেই এই আন্দোলন নিয়ে মেতে রইলেন- কিন্তু তখন বাংলাদেশের গ্রামবাসীদের কথাই বাবার বেশি মনে হতে লাগল। তিনি অনুভব করলেন, কেবল আন্দোলন করলেই হবেনা, ভিত থেকে কাজ শুরু করার সময় হয়েছে। বিরাহিরামপুর ও কালীগ্রাম- এই দুটি পরগণা তাঁর হাতে ছিল। তিনি সেখানকার গ্রামবাসীদের দুরবস্থা ঘোচাবার জন্য একটা প্ল্যান করলেন। মহাজনের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করা,চাষের উন্নতি করা, ঘরে ঘরে ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠা করা,ইত্যাদি গ্রামোন্নতির নানা দিকে চেষ্টা যাতে হয় তার ব্যাপক পরিকল্পনা তৈরি করলেন। বাইরে থেকে অজস্র টাকা ঢেলে কোন কাজই করা যাবেনা,গ্রামবাসী নিজেদের চেষ্টাতেই নিজেদের অবস্থার উন্নতি করবে, এটাই ছিল বাবার উদ্দেশ্য।
কালীগ্রাম পরগণাকে কাজের সুবিধার জন্য তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হল। পল্লীসংগঠনের কাজ একটি সাধারণ সভার হাতে ন্যস্ত করা হল। প্রজারা স্বেচ্ছায় একটা কর দিতে রাজি হল। খাজনা আদায়ের সময় প্রতি টাকায় এক আনা করে প্রজারাই দিত, সেই টাকা সাধারণ ফাণ্ডে জমা হত। এই উপায়ে ফাণ্ডের যে আয় হত সাধারণ সভা বাজেট করে স্থির করত সেই টাকা কিভাবে খরচ করা হবে। একে একে প্রত্যেক গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা খোলা হল, আর পতিসরে স্থাপিত হল একটি মাইনর ইস্কুল- পরে সেটা হাই স্কুলে পরিণত হয়। চিকিৎসার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে করা ব্যয়সাপেক্ষ বলে পতিসরেই কেবল চিকিৎসালয় স্থাপন সম্ভব হল।পরে তিন বিভাগে তিনজন ডাক্তার বসানো হয়েছিল। গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নতি হতে থাকল,পানীয় জলের ব্যবস্থা হল। বয়নশিল্প শেখানোর জন্য শ্রীরামপুর থেকে একজন ভাল তাঁতিকে নিয়ে যাওয়া হল।

পতিসরে বাবা পল্লীসংগঠনের যে পরীক্ষা করলেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে তার যে আশাতীত ফল পেলেন,দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের লোকের দৃষ্টি সেদিকে গেলনা।পতিসরের গ্রামোন্নতির কাজের ফলাফল দেখে বাবা খুব উৎসাহিত হয়েছিলেন; তাঁর মনে সন্দেহ রইল না যে, এই পথেই দেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।”

রবীন্দ্রনাথের কথা চিন্তা করলেই আমাদের মানসপটে শ্বেত-শুভ্র লম্বা চুল দাঁড়ি বিশিষ্ট একজন বৃদ্ধের ছবি মাথায় আসে, মনে হয় নিজের মনে সারাদিন কবিতা ও সাহিত্য সাধনাতেই মগ্ন ছিলেন তিনি,মনে হয় জগৎ সংসারের আর কোন কিছু নিয়ে যেন তাঁর মাথা ব্যথা নেই – এর সাথে এই পল্লী সংস্কারক রবীন্দ্রনাথের কোন মিল নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি কোন খেয়ালি উদাসীন বৃদ্ধ ছিলেন না, ছিলেন সত্যিকারের একজন সমাজ সংস্কারক যিনি বুঝেছিলেন সাধারন জনগোষ্ঠীর উন্নতি করতে না পারলে, তাদের কে স্বাবলম্বি করতে না পারলে সকল রাজনৈতিক আন্দোলন অর্থহীন, তথাকথিত স্বাধীনতার কোন মূল্য নেই সেখানে। তাই অন্যান্য নেতারা যখন ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত, সেই সময় তিনি সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের পরিচিত কবি রবীন্দ্রনাথকে আমরা এখানে পাই নতুন রূপে।

তিনি বুঝেছিলেন কৃষিভিত্তিক এই দেশে কৃষির উন্নতি ছাড়া কোন গতান্তর নেই। তিনি তাঁর দুই পুত্রকে বিদেশে পড়াশুনা করতে পাঠিয়েছিলেন- বিষয় ছিল- কৃষি ও পশুপালন বিদ্যা।আমরা কি জানি রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কারে প্রাপ্ত অর্থ কী করেছিলেন? রথীন্দ্রনাথের থেকেই শুনে নেয়া যাক-

“কিছুদিন পরে বাবা দেখলেন প্রজারা ঋণমুক্ত না হলে তারা কোন বিষয়েই উন্নতি করতে পারবেনা। কৃষির বা শিল্পের জন্য যেটুকু মূলধন দরকার তা তাদের হাতে কখনই থাকবেনা।এই জন্য বাবা পতিসরে একটি ব্যাংক খুললেন।কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ব্যাংকের কাজ শুরু হল। পরে বাবা যখন নোবেল প্রাইজ পেলেন এক লাখের উপর সব টাকাটাই এই কৃষিব্যাংকের কাজে দিলেন। কৃষিব্যাংক হয়ে প্রজাদের খুব উপকার হল- কয়েক বছরের মধ্যেই তারা মহাজনদের দেনা সম্পূর্ণ শোধ করে দিতে পেরেছিল।”

তবে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কাজ কিন্তু পাতিসর নামক একটি অঞ্চলের উন্নতি ঘটানো নয়, আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মডেল স্থাপনে। আমরা আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থার নানা রকম মডেল খুজি, এদশ ওদেশে। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই বিদ্যমান সেই মডেল। সেই মডেল স্থাপন করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মডেলটির নাম ‘শান্তিনিকেতন’। শিক্ষাক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এই যে অবদান এটা নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তা হয়না। অবশ্য আমাদের দোষ দেয়া যায়না, কারণ তাঁর সাহিত্য জগতের দ্যুতি এতটাই প্রখর যে সেই ঔজ্জ্বল্যে আশেপাশের অন্যান্য ব্যাপার গুলো হুট করে চোখে পড়েনা, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। সেই দ্যুতিতে চোখ একটু সয়ে এলে তবেই আমরা আশেপাশের জিনিস গুলোর দিকে তাকানোর ফুসরত পাই।

দেশ-রাষ্ট্র-ধর্ম-জাতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন উদারনৈতিক চেতনার অধিকারী। নোবেল পুরষ্কার পাবার কিছুকাল পরে ১৯১৪ সালে কোন এক গুণমুগ্ধ ইংরেজ পাঠিকাকে কবি চিঠিতে লেখেন-

“I do not belong to any religious sect nor do I subscribe to any particular Creed.That I know that the moment my God has created me he has made himself mine.”

আর একারণেই তিনি বিশ্বকবি। সমগ্র পৃথিবীর,সমগ্র মানব জাতির সম্পদ। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি এই আন্তর্জাতিক উদার চেতনা লালন করতেন।

অল্প বয়সেই শিক্ষা ব্যবস্থার অসাড়তাটুকু ধরতে পেরেছিলেন তিনি। হয়তো একারণেই গতানুগতিক শিক্ষালাভ করেননি তিনি। রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন মাত্র ষোল বছর তখন ‘ভারতী’ পত্রিকায় এক প্রবন্ধে তিনি লেখেন-

“বঙ্গদেশে এখন এমনি সৃষ্টিছাড়া শিক্ষাপ্রণালী প্রচলিত হইয়াছে যে তাহাতে শিক্ষিতেরা বিজ্ঞান দর্শনের কতকগুলি বুলি এবং ইতিহাসের সাল ঘটনা ও রাজাদিগের নামাবলী মুখস্থ করিতে পারিয়াছেন বটে,কিন্তু তাহাতে তাঁহাদের রুচির উন্নতি করতে পারেন নাই বা স্বাধীনভাবে চিন্তা করিতেও শিখেন নাই।”

আমাদের বর্তমান ‘শিক্ষিত সমাজের’ ক্ষেত্রেও কথাগুলো আজও কত তীব্র ভাবে সত্য!

অল্প বয়সের এই চিন্তা পরিণত বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন নামে দুটি শিক্ষা-আশ্রম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকে ১৯০১ সালে এক চিঠিতে তিনি লেখেন-

“শান্তিনিকেতনে আমি একটি বিদ্যালয় খুলিবার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করিতেছি।সেখানে ঠিক প্রাচীন কালের গুরুগৃহ বাসের মত সমস্ত নিয়ম। বিলাসিতার নাম গন্ধ থাকিবেনা। উপযুক্ত শিক্ষক কোনমতেই খুঁজিয়া পাইতেছিনা।এখনকার কালের বিদ্যা ও তখনকার কালের প্রকৃতি একত্রে পাওয়া যায় না।”

১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নাম দিয়ে। ডিগ্রী পাওয়া ও চাকরি করা এগুলোর সামাজিক গুরুত্ব যাই থাকুক, রবীন্দ্রনাথ বরাবরই এদের গৌণ স্থান দিয়েছেন। বলেছেন,
“মরা মন নিয়েও পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীর ঊর্ধ্বশিখরে ওঠা যায়, আমাদের দেশে প্রত্যহ তার পরিচয় পাই।” মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশে এখনও প্রত্যহ আমরা এর পরিচয় পেয়ে থাকি।

এক চিঠিতে তিনি লেখেন-

“আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটা বড় জিনিস লাভ করছে যেটা ক্লাসের জিনিস নয়- সেটা হচ্ছে বিশ্বের মধ্যে আনন্দ, প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তার যোগ। সেটাতে যদিও পরীক্ষায় সহায়তে করেনা কিন্তু জীবনকে সার্থক করে।আমাদের ছেলেরা বৃষ্টিতে ছুটে বেড়ায়, জ্যোৎস্না রাত্রিতে আনন্দ ভোগ করে, তারা রৌদ্রকে ডরায় না, তারা গাছে চড়ে বসে পড়া করে- এগুলোকে আমি সামান্য জিনিস মনে করিনে।”

না এগুলো আসলেও সামান্য জিনিস ছিলনা। ছিল অসামান্য রকম সাধারণ জিনিস,যা তাঁর আগে কেউ চিন্তা করেনি,চিন্তা করলেও বাস্তবরূপ দিতে পারেনি। এখানে শিশুরা সত্যিকার অর্থে ‘শিখছিল’। গতানুগতিক পড়াশুনা কিন্তু শান্তিনিকেতনে বাতিল করা হয়নি। পরিবর্তন এসেছিল পদ্ধতিতে। তথ্য স্বর্বস্ব গর্দভ নয়, সত্যিকারের মানুষ সৃষ্টিই ছিল শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্য। কিছুদিন পরেই স্থাপিত হয় ‘শ্রীনিকেতন’ অল্প সংখ্যক ছাত্র নিয়ে, যারা হয় ছিল পিতৃমাতৃহীন অথবা যাদের পিতা মাতা এতই নিঃস্ব ছিল যে যেকোন স্কুলে পাঠানো তাদের সাধ্যের অতীত ছিল। তিনি এখানে সৃষ্টি করলেন বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আশাহত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৯ সালে,মৃত্যুর দু বছর আগে শান্তিনিকেতনের শিক্ষক যিনি এক সময় এরই ছাত্র ছিলেন,সেই তেজেসচন্দ্র সেনকে এক চিঠিতে লেখেন-
“আমি কেবল দুঃখ পাই- প্রত্যহ দেখিতে পাই যেখানে এই আশ্রমের প্রাণ সেখানে সেবা পৌছায় না। আশ্রম হয়েছে ইস্কুল- এই জড়ভার বহন করতে হচ্ছে সহজে নয়, যোগাতে হচ্ছে অনেক বলি।” এস্থলে বলা দরকার, ‘আশ্রম’ বলতে তিনি বুঝতেন বিদ্যাচর্চার স্থান নয়, জীবনচর্চার স্থান।

কালের বিবর্তনে, ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের সেই আসল রূপটি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর চিন্তা-চেতনা-আইডিয়া কিন্তু আমাদের সামনে বিদ্যমান। এই জ্ঞানদরিদ্র সমাজে সেটা একটি উল্লেখযোগ্য মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।ভিনদেশী বিচ্ছিন্ন কোন মডেল থেকে, দুশ বছরের এক মহত্তম বাঙালির বেঁধে দেয়া পথের দিকে তাকানো অনেক বেশি আত্মশ্রদ্ধার এবং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নিজেদের চারিত্রিক ও মানসিক ; জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি করতে হলে তাই সত্যিকারের শিক্ষা আমাদের লাভ করতে হবে। পাঠ করতে হবে সাহিত্য। সৃষ্টি করতে হবে জ্ঞান। দৃষ্টি করতে হবে প্রসারিত। ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের বিশালতায় উন্মুক্ত করতে হবে নিজেদের- বলাকার মত।

তৃণদল,
মাটির আকাশ-’পরে ঝাপটিছে ডানা;
মাটির আঁধার নীচে,কে জানে ঠিকানা,
মেলিতেছে অঙ্কুরের পাখা
লক্ষ লক্ষ বীজের বলাকা।

১ thought on “শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ এবং আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার মডেল

  1. ভালো লিখেছেন। শিক্ষাদার্শনিক
    ভালো লিখেছেন। শিক্ষাদার্শনিক রবীন্দ্রনাথ আজকের ‘কৃষিব্যাংকে’র উদ্ভাবক।
    ধন্যবাদ আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *