চেকপয়েন্ট (প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকান্ড, জেঃ এরশাদের উত্থান এবং অন্যান্য) – পর্ব-১১

২০শে মে, ১৯৮১
ঢাকা, বাংলাদেশ


২০শে মে, ১৯৮১
ঢাকা, বাংলাদেশ

নিয়মিত ফর্মেশন কমান্ডারস কনফারেন্স চলছে আজ সেনা সদরে। এই কনফারেন্সের প্রচলন শুরু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন সেনাপ্রধান ছিলেন তখনই জাতীয় নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সামরিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মতামত জানবার জন্য। এই কনফারেন্সগুলোর আলোচনা সাধারনত গোপন রাখা হতো। তবে আজকের কনফারেন্সে বেশ কয়েকজন মেজর জেনারেল সরাসরি প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করলেন উনি দেশের রাজনীতিতে অতিরিক্ত গনতন্ত্রায়ন ঘটাচ্ছেন দেখে, যার পরিনতি তাদের চোখে খারাপই হবে। প্রেসিডেন্টকে অবাক করে দিয়ে তাদের একটা বড় অংশ আবার সামরিক আইন জারীর সুপারিশ করলেন। এর অধীনে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করা, গনমাধ্যম এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপের পক্ষেও মত দিলেন তারা।

তারা সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কার নীতিমালার ব্যাপারে। এই নীতিমালার কারনে গ্রামাঞ্চলের মানুষ লাভবান হলেও সামরিক-বেসামরিক আমলারা সহ শহরের মধ্যবিত্তরা বিপাকে পরছিলেন। তারা এ নিয়ে তর্কে লিপ্ত হুলেন যে মূল্যস্ফীতি এবং আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উনি তার ব্যক্তিগত ইমেজ বাড়াতে এতটাই ব্যস্ত যে বিএনপির অভ্যন্তরেই যে ব্যাপকহারে দুর্নীতি ছড়িয়ে পরছে তা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তারা তাকে নিজ দলের ব্যাপারে আরো কঠোর হতে বললেন। তারা প্রেসিডেন্টকে এই বলে সরাসরি সমালোচনা করলেন যে,

– “আপনি রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি খেলছেন এবং সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সমঝে চলতে গিয়ে অতিরিক্ত চালাকীর আশ্রয় নিচ্ছেন।“

এদের মধ্যে সবচেয়ে সোচ্চার হচ্ছেন মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর। প্রেসিডেন্ট এবং তার মধ্যে সরাসরি দৃস্টিকটুভাবে তর্ক শুরু হলো। মেজর জেঃ মঞ্জুর টেবিল চাপড়ে বললেন,

– “আপনি সেনাবাহিনীর সাথে প্রতারনা করছেন। যে সেনাবাহিনীর কারনে আজ আপনি ক্ষমতায় সেই সেনাবাহিনীর প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতাবোধ দেখতে পাচ্ছি না। আপনার অতিরিক্ত বেসামরিক রাজনৈতিক নীতি জাতীয়তাবাদের জন্য হুমকী হয়ে দাড়িয়েছে।“

তবে এ সময় অনান্য অফিসারেরা মেজর জেঃ মঞ্জুরের সমর্থনে সরাসরি কথা না বললেও তাদের নীরবতা এবং অঙ্গভঙ্গী বলে দিচ্ছিলো যে তারাও প্রেসিডেন্ট জিয়া যেভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন। জেঃ মঞ্জুর এ সময় বিএনপির নেতাকর্মী এবং কিছু সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ছড়িয়ে পরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেয়া সহ নানা ব্যর্থতার জন্য প্রেসিডেনকে দায়ী করলেন। প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে জোর গলায় নিজের যুক্তি তুলে ধরতে চাইলেও অন্য জেনারেলদের থেকে কোন সহযগিতা পাননি। আর এটাই সম্ভবত জেঃ মঞ্জুরকে তাদের প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরোধী হয়ে যাবার ভুল ধারনা দিলো।

মেজর জেঃ মঞ্জুর সেদিনই ঢাকায় উড়ে গেলেন, এবং খুব সম্ভবত সেদিন থেকেই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা শুরু করেন। অন্যান্য জেনারেলদের মৌনতার কারনে উনি হয়তো ধারনা করছিলেন প্রেসিডেন্টের ব্যাপারে অনান্য জেনারেলরাও সন্তুষ্ট নন এবং তার যেকোন পদক্ষেপে তাদেরও সাথে পাবেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়া এ সময় মেজর জেঃ মঞ্জুর এবং তার অধীন কিছু তরুন অফিসারদের ভিন্নমতের কথা জানতেন কিন্তু এ ব্যাপারে অজানা কোন কারনে পদক্ষেপ নেননি। যদিও উপরের স্তরের অনেক সামরিক উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সুপারিশ ছিলো তাদের নিয়ন্রনে নিয়ে আসবার অথবা বাধ্যতামুলক অবসরে পাঠাবার। খোদ ঢাকাতেই গুজব ছড়িয়ে পরেছিলো যে জেঃ মঞ্জুর এবং তার অনুগত সেনারা জুলাই কিংবা আগস্ট মাসে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছেন।

চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ২ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৩ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৪ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৫ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৬ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৭ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৮ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৯ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১০

২৯ শে মে, ১৯৮১
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বিএনপির আভ্যন্তরীন কোন্দল মিমাংসার জন্য চট্টগ্রাম এসেছেন আজ। সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম পৌছেই তিনি চট্টগ্রাম বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সাথে আলোচনায় বসলেন এবং তাদের মতামত জানলেন। জেলা বিএনপির নেতাদের সাথে আলাদা আলাদাভাবে কথাও বললেন তিনি। এ সময় ব্যক্তিগত ১৫ জন দেহরক্ষী ছাড়া খুবই সাধারন পুলিশী নিরাপত্তার ব্যবস্থ্যা নেয়া হয়। সন্ধ্যার পর চট্টোগ্রাম সার্কিট হাউসে চলে গেলে সেখানে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত দেহরক্ষী কিংবা পুলিশের সদস্যদের কাছে সাধারন পিস্তল এবং রাইফেল ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র ছিলনা যা জেঃ মঞ্জুরের পক্ষ থেকে আগেই অনুমান করে নেয়া হুমকীর মোকাবেলায় অপ্রতুল ছিলো।

এই সফরের যৌক্তিকতা কতটুকু ছিলো তাও ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ। কারন চট্টগ্রাম বিএনপির অন্তকলহের মূলে ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ এবং ডেপুটি স্পীকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী, যারা দুইজনেই ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এ কারনে তাদের অনেকেই প্রেসিডেন্টকে চট্টগ্রামে যেতে মানা করেছিলেন এবং জেঃ মঞ্জুরকে আটক করে ঢাকায় এনে সামরিক আদালতে বিচারের ব্যবস্থ্যা নিতে বলেন।

তার এই সফরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো এনএসআই যা ডিজিএফআই এর কর্মকর্তাদেরও হতাশার কারন ছিলো। ডিজিএফআই কে এসময় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। কারন, প্রেসিডেন্ট নিজেই তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নন-মিলিটারী সংস্থ্যা এনএসআই এর কাছেই তুলে দিচ্ছিলেন যা স্বরাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। প্রেসিডেন্টের সফরের দায়িত্ব সম্পুর্নরুপে এনএসআই এর হাতে চলে যায় যখন প্রেসিডেন্ট নিজেই ডিজিএফআই এর মহাপরিচালক মেজর জেঃ মাহতাবউদ্দীন চৌধুরীকে সন্ধ্যায় ঢাকা পাঠিয়ে দিলেন এইদিন। তবে প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম গেলেন সকল সতর্কতা উপেক্ষা করেই। খুব সম্ভবত তিনি নিজের দলের সাধারন নেতাকর্মীদের কাছ থেকে সকল সমস্যার কথা নিজ কানে শুনে সমস্যার আসল কারন উপলব্ধি করতে চাইছিলেন।

এ সময় প্রেসিডেন্টের কিছু সিদ্ধান্তে জেঃ মঞ্জুর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। প্রেসিডেন্ট তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে কারো আসবার প্রয়োজন নেই। তার সম্ভবত এর পরেরদিন জেঃ মঞ্জুরের সাথে দেখা করবার পরিকল্পনা ছিলো। উনি তার কাছের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও বলেননি যে তিনি জেঃ মঞ্জুরকে ঢাকায় বদলী করবার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে জেঃ মঞ্জুর সে সম্পর্কে জেনে গিয়েছিলেন আগেই। জেঃ মঞ্জুর চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করে তুলছিলেন এবং যেকারনে ঢাকায় কম ক্ষমতাধর ষ্টাফ কলেজের কমান্ডেন্টের দাপ্তরিক পদে বদলী করে আর ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তাকে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।

কিন্তু তখনও উনি জানতেন না, উনার পরিকল্পনার আগেই জেঃ মঞ্জুর খুব দ্রুতই অন্য পরিকল্পনা করে ফেলেছেন।

৩০শে মে, ১৯৮১
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
প্রেসিডেন্ট জিয়ার নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বেশ অনেকদিন ধরেই তাকে সতর্কতার সাথে চলবার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। উনি নিজেও ছিলেন একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তবে উনি যতটাই রাজনীতিতে জড়িয়ে পরছিলেন ততই নিরাপত্তার ব্যাপারে শিথিলতা দেখাচ্ছিলেন। বিদেশী সাংবাদিক, কূতনৈতিক এবং সরকারী কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের সাথে বাসভবন, বিমানবন্দর কিংবা অফিসে দেখা করতে গেলে বেশিরভাগকেই সেভাবে তল্লাশী করে ঢুকানো হতোনা। তার এই পরিবর্তনটাকে অনেকে প্রকৃতপক্ষে বেসামরিক রাজনীতিবিদে বদলে যাবার প্রচেস্টার অংশ হিসেবে দেখেন।

নিজের সক্ষমতার উপর ছিলো তার পুর্ন বিশ্বাস। ইতিমধ্যে অনেকবার তিনি হত্যা এবং ক্যু এর প্রচেস্টা প্রতিহত করেই এ পর্যায়ে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্নে পাকিস্তানীদের তাকে মেরে ফেলবার এক প্রচেস্টা থেকেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন উনি। নতুন বাংলাদেশ গড়বার স্বপ্নে কিছু মাথা গরম অফিসার বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে উনি তা হিসেবেই নেননি, কিন্তু নেয়া খুবই দরকার ছিলো।

জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে কোন রকম ঝুকি কখনোই নেয়া উচিত না। বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়েছেন অনেকটা এ কারনেই, এবার প্রেসিডেন্ট জেঃ জিয়াউর রহমানের পালা ছিলো।

মধ্যরাতের পরপরই হত্যাকারীদের তিনটি দল সমন্বিতভাবে আক্রমন করে বসলো সার্কিট হাউস। এই পরিকল্পনা করেন মেজর জেঃ আবুল মঞ্জুর এবং সে মোতাবেক প্রায় ২০ জন অফিসার এই আক্রমনে অংশ নিচ্ছেন যাদের মধ্যে রয়েছেন একজন ব্রিগেডিয়ার, কয়েকজন কর্নেল ও লেঃ কর্নেল, কিছু মেজর ও ক্যাপ্টেন এবং খুব সম্ভবত একজন লেফটেন্যান্ট ও একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। তাদের সহযোগিতায় আশ্চর্য্যজনকভাবেই কোন সাধারন সৈনিক ছিলো না। তবে জেঃ মঞ্জুর এদের মধ্যে ছিলেন না, তবে তার ভাগ্নে লেঃ কর্নেল মাহবুব ছিলেন (সিও, ২১ ইস্ট বেঙ্গল)। বেশ অনেকদিন ধরেই তিনি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছিলেন, তবে খুব সম্ভবত প্রেসিডেন্টের আগমনের সংবাদ পেয়ে অল্প কয়দিনের মধ্যেই আঘাত হানবার সময় এগিয়ে নিয়ে আসেন তার অনুগত অফিসারদের মাধ্যমে।

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিলো মধ্যরাতের পর থেকেই, এর মধ্যেই দুটি জীপে করে ঘাতকেরা উপস্থিত হলেন। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন পুলিশ তখন বৃষ্টির কারনে ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঘাতক অফিসারদের দলগুলো রকেট লঞ্চার এবং মেশিনগানের গুলি করা শুরু করে আসবার পরপরই। পুলিশদের মধ্যে কয়েকজন সাথে সাথে পাল্টা জবাব দেয় এবং অল্প সময়ের জন্য থামিয়ে রাখে। তবে একটি আর্মি জীপকে এগিয়ে আসতে দেখে তারা দ্বিধান্বিত হয়ে পরলেন যে তা আক্রমনকারীদের জীপ, নাকি ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাহায্য নিয়ে এসেছে।

আক্রমনকারীদের পনেরজন দূর থেকে রকেট লঞ্চার দিয়ে সার্কিট হাউসের ভেতরে আক্রমন চালায়। এদের মধ্যে দুটি রকেট প্রেসিডেন্ট জিয়ার কক্ষের ঠিক নীচতলায় আঘাত হানে এবং সে সার্কিট হাউসের সে অংশ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। আর বাকী পাচজন হাল্কা মেশিনগান হাতে গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসের ভেতর আগাতে থাকে কমান্ডো স্টাইলে প্রেসিডেন্টের খোঁজে। প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীদের মধ্যে মাত্র দুইজন সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং তাতে আক্রমনকারী দুইজন অফিসার আহত হলেন। প্রাথমিক আক্রমনে সার্কিট হাউজের ভেতরে থাকা প্রেসিডেন্টের তিন দেহরক্ষী, ২ জন সহকারী, একজন পুলিশ সদস্য এবং একজন টেলিফোন অপারেটর নিহত হলেন। আরও ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন।

প্রাথমিক প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিয়ে আক্রমণকারীরা সার্কিট হাউজের ভেতরে প্রবেশ করে কক্ষ তল্লাশী চালাতে থাকলো প্রেসিডেন্টের খোঁজে এবং চীৎকার করে বলতে থাকে,

– “প্রেসিডেন্ট কোথায়?”

এ সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পাজামা পরিহিত অবস্থায় তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসলেন ঘাতকদের মুখোমুখি হতে। তবে ঘাতকরা কোন সময় নিলোনা। লেঃ কর্নেল মতিউর রহমান (বীর বিক্রম) এর হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশফায়ারে নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট লেঃ জেঃ জিয়াউর রহমান। তবে প্রকৃত ঘটনা সম্ভবত একটু অন্যরকম ছিলো, যা পরে জানতে পারবো।

প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে নিজে তাদের মোকাবেলা করতে যান। যদি তিনি তার কক্ষে থেকে যেতেন কিংবা বাথরুমের দরজা আটকেও লুকিয়ে থাকতেন, তবে তার দেহরক্ষী এবং পুলিশ সদস্যরা আরো কিছু সময় পেতে পারতেন হামলা প্রতিহত করবার। অনেকে মনে করেন উনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এ কারনে যে, উনি ভেবেছিলেন আক্রমনকারীরা তখনো সার্কিট হাউজের ভেতরে প্রবেশ করেনি এবং দেহরক্ষী এবং পুলিশদের নিয়ে হামলা ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন। তবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার কাছের লোকেরা বলে থাকেন যে, এটা ছিলো তার লড়াইয়ের ময়দানে পালিয়ে না গিয়ে বুকচিতিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বভাবসুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সত্যিই কি তাই ছিলো? এ ব্যাপারেও অন্য কিছু ভাবনা চলে আসবে যখন ঘটনাটা অন্য কারো বর্ননায় শোনা যাবে।

এরপরে ময়নাতদন্তে দেখা যায় যে তার শরীরে ২১ থেকে ২৭ টি বুলেট আঘাত হেনেছিলো। প্রধানত মুখে এবং বুকে। চট্টোগ্রামে বিএনপির অন্য কোন নেতার বাসায় আক্রমন হয়নি কিংবা কাউকে গ্রেফতারের চেস্টাও করা হয়নি। পুরো হামলাটির স্থায়িত্ব ছিলো মাত্র ১৫-২০ মিনিট এবং প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হবার সাথে সাথেই ঘাতক অফিসারেরা সার্কিট হাউজ ত্যাগ করে।

আর এভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট জেঃ জিয়াউর রহমানের অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। রক্তপাতের মাধ্যমেই যার শুরু হয়েছিলো, শেষটাও হলো রক্তপাতের মাধ্যমে।

৩০শে মে, ১৯৮১
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভোর হতে না হতেই ঢাকায় পৌছে গেছে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার খবর। এ খবর পাবার সাথে সাথেই সেনাপ্রধান জেঃ এরশাদ সহ দেশের অন্যান্য সকল অঞ্চলের উচ্চপদস্থ্য সামরিক অফিসাররা দেশের সাংবিধানিক সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্যের কথা জানালেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার সে সময় ঢাকা সিএমএইচ এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাকে সকাল ৬ টার সময় হাসপাতালের বিছানা থেকে তুলে নিয়ে আসা হলো। সেখান থেকে তাকে সরাসরি বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে গিয়ে তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন। সেনাপ্রধান এরশাদ এবং বেশকিছু মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান তখন ছিলেন কুস্টিয়ায়, তিনিও প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যার খবর পেয়ে আধাঘন্টার মধ্যে হেলিকপ্টারে ঢাকায় চলে আসলেন। মন্ত্রীসভা সকাল সাড়ে নয়টায় জরুরী সভায় বসলো, আর শুরু হলো প্রেসিডেন্ট জিয়া পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের, তাকে হত্যা করবার মাত্র পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই।

সেনাপ্রধান এরশাদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং তার অধীন সেনাদের অভ্যুত্থান দমনের নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হতে বললেন। ঢাকা, কুমিল্লা এবং অন্যান্য ক্যান্টোনমেন্ট সমুহ থেকে সরকারের অনুগত সেনা ইউনিটগুলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো অভ্যুত্থানকারীদের নিঃচিহ্ন করবার লক্ষ্যে। এই সময়ে জেঃ মঞ্জুরও সরকারকে চাপে ফেলতে চট্টগ্রামের সাথে রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশের সড়ক, নৌ ও বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দেন। তবে তিনি তখনও বুঝতে পারেননি, চট্টগ্রাম ছাড়াও সারাদেশ খুব সহজেই টিকে থাকতে পারবে।

দুপুরের পর ঢাকা রেডিও জেঃ মঞ্জুরকে প্রেসিডেন্টের হত্যার সাথে জড়িত থাকবার খবর প্রচার শুরু করে। জেঃ মঞ্জুর এ সময় সারা দেশের সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ করে সমর্থন লাভের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার পরে যেমনটা ঘটেছিলো পুরো সেনাবাহিনির ক্ষেত্রে। মাত্র দুইটা ইউনিট আর অল্প কয়েকজন অফিসারের কাছেই যেন সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অসহায় আত্মসমর্পন করেন। তবে তিনি মনে হয় এটা হিসেবে নেননি যে উনার অভ্যুত্থান প্রচেস্টা চালানো হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে যেখান থেকে কোনকিছু প্রভাবিত করবার ক্ষমতা তার নেই এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করবার সময়ও তার জনপ্রিয়তা ছিলো ব্যাপক।

এর আগে জেঃ মঞ্জুরের সেনারা প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং তার সঙ্গে নিহতদের মরদেহ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে একটি ভ্যানে করে সরিয়ে নেয়। তাদের মৃতদেহ সার্কিট হাউজ থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কাছের একটি পাহাড়ে তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে সরকারী সেনারা এই কবর সনাক্ত করবে এবং কোনক্রমে গর্ত করে পুতে রাখা মৃতদেহটি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য চিহ্নিত রাজাকার সদস্য সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে তুলে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাবে। সেখান থেকে তার মৃতদেহ হেলিকপারে করে রাস্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের জন ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

টাইম ম্যাগাজিন প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর খবর নিয়ে তার মৃত্যুর পরের সপ্তাহে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে লেখা ছিলো,

“Once, reflecting on his service for Pakistan in the 1965 war with India over Kashmir, (Ziaur Rahman) he observed: “There is no scientific explanation for a man to die or live. In front of me many people died, but I got a bonus of life”. He used that bonus well, but last week it ran out.”

১লা জুন, ১৯৮১
ঢাকা, বাংলাদেশ
হত্যার দুইদিন পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ ঢাকায় উড়িয়ে আনা হয়েছে। সাধারন একটা কাঠের কফিনে করে তার মৃতদেহ শেরেবাংলা নগরের সদ্য নির্মিত সংসদ ভবনের কাছে চন্দ্রিমা উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হবে। কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থ্যা নেয়া হলো চারদিকে। সারাদেশে সরকারী ছুটি ঘোষনা করা হলো এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হলো। ৩০ মে, ১৯৮১ থেকেই সকল সরকারী অফিসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ছিলো। সকাল থেকেই উৎসুক এবং শোকার্ত জনতা লাইন ধরে দাঁড়ায় মৃত প্রেসিডেন্টের প্রতি শেষ শ্রদ্ধ্যা জানাতে। তারা শোক বইতে সাক্ষর করবার জন্যও লাইন দেন। দুপুরের মধ্যেই লাখো জনতার মধ্যে দিয়ে প্রেসিডেন্টের মৃতদেহ রাস্ট্রীয় জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। এই জানাজায় দশ থেকে বিশ লাখ মানুষ সমবেত হয় যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকায় সবচেয়ে বৃহত্তম সমাবেশ। তারা সবাই তাদের প্রিয় প্রেসিডেন্টকে শেষ বিদায় কিংবা সম্মান জানাতে এসেছিলেন, কেউ তাদের জোর করেনি। প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এই জানাজার নামাজের ইমামতি করেন। সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, বন্ধু রাস্ট্রসমুহের প্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ সহ নানা রাজনৈতিক দলের সদস্যরাও এতে যোগ দেন।

এরপরে ৪০ দিনের রাস্ট্রীয় শোক পালন করা হয় ইসলামী রীতি অনুসারে। ৮ই জুলাই ১৯৮১ সালে বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে এই শোকের কর্মসুচী শেষ হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাদের সমর্থন জানান প্রকাশ্যে এবং সক্রিয়ভাবে। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘে পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন যেখানে উনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারেশান সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হওয়া গনহত্যাকে মিথ্যাচার বলে দাবী করেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের পর উনি পাকিস্তানে পালিয়ে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। তিনিও মধ্যপ্রাচ্যের নানা মুসলিম দেশ সহ অন্যান্য দেশ কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতিপ্রদানের বিরুদ্ধে প্রচারনার কার্যক্রমে অংশ নেন। প্রায় বছরখানেক পর উনি দেশে ফেরত আসলে বঙ্গবন্ধুর সরকার তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরন করে। ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর উনি রাজনীতে ফেরত আসেন এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ার দল থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন এবং তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় লাখো জনতার সমাবেশ তার প্রতি জনগনের অকুন্ঠ ভালোবাসার যেমন প্রমান দেয় যা অস্বীকার করবার উপায় নেই, তেমনই তার জানাজাও পড়ালো চিহ্নিত দেশদ্রোহীদের একজন, সাধারন বাংলায় আমরা এখন যাদের রাজাকার বলি। আর এই দুই দৃষ্টিতে দেখবার সুযোগ করে দেবার কারনও ছিলেন উনি নিজেই।

৩০শে মে, ১৯৮১
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যার অল্প কয় ঘন্টার মধ্যেই জেঃ মঞ্জুর বুঝতে পারলেন যে তাদের অভ্যুত্থান প্রচেস্টা ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। জেঃ মঞ্জুরের তার অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা যাই ঠিক থাকেন না কেন, সেটা আর বাস্তবায়ন সম্ভব ছিলনা। সম্ভবত জেঃ মঞ্জুরের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিলো প্রেসিডেন্টকে বন্দী করে ইবিআরসিতে নিয়ে আসা এবং সেখান থেকে তাদের দাবী মানতে বাধ্য করা। পরিকল্পনা দ্রুতই করা হয় এটা ভেবে নেবার একটা যুক্তি হচ্ছে হত্যা অভিযানে কোন সাধারন সৈনিকের অনুপস্থিতি। নিজের অনুগত অল্প সংখ্যক অফিসারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তারা সম্ভবত তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেন এবং এ ব্যাপারে কাউকে বিশ্বাস করেননি। ঘাতক দলে তার ভাগ্নের উপস্থিতি তার এই পরিকল্পনার সাথে জড়িত থাকবার ধারনাকে নিশ্চিত করে।

জেঃ মঞ্জুর চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দীন চৌধুরী, ডিভিশনাল কমিশনার মো সাইফুদ্দীনকে ডেকে পাঠালেন এবং তাদের কাছে বর্ননা করলেন কেন একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। তবে আলোচনার কোন পর্যায়েই জেঃ মঞ্জুর নিজেকে এই অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে দাবী করলেন না। তিনি বারবার নিজেকে প্রেসিডেন্টকে উৎখাতকারীদের মুখপাত্র হিসেবে দাবী করেন, আবার এটাও খুলে বললেন না যে তারা আসলে কারা। তবে একটূ বেশী দেরী করেই উনি পরিস্থিতি সামলাতে সকল দ্বায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। যখন জিয়াউদ্দীন চৌধুরী এবং মোঃ সাইফুদ্দীন চলে যেতে উদ্যত হলেন, তখন জেঃ মঞ্জুর তাদের সমর্থনের ব্যাপারে কক্ষে থাকা কোরান শরীফ ছুঁয়ে শপথ নিতে বললেন।

এরপরের দিন চট্টগ্রামের সরকারী কর্মকর্তা, সাংবাদিক, পুলিশ অফিসার সহ সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের একটা অংশের সাথে বৈঠকে বসলেন ডেপুটি কমিশনারের কার্য্যালয়ে। উনি বুঝতে পারছিলেন যে ইতিমধ্যে তার পরাজয় ঘটে গেছে। উনি পরিস্কার করে কোন লক্ষ্য কিংবা কর্মপদ্ধতির ব্যাপারে বলছিলেন না। স্নায়বিক উত্তেজনায় তার কথাবার্তা ছিলো কিছুটা অসংলগ্ন। উনি একবার বলছিলেন যে উনি মরতে প্রস্তুত আছেন। আবার পরের মুহুর্তে সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়বার ঘোষনা দিচ্ছিলেন। কখনো ইসলামকে টেনে আনছিলেন আবার পরের মুহুর্তেই বলছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। উনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেন। সেখানে উপস্থিত ব্যাঙ্ক ম্যানেজারদের দুর্নীতির আখড়া হিসেবে অবিহিত করলেন। আবার তাদেরই এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে বললেন। উনি বললেন যে উনি মদ্যপান করা, জুয়া খেলা প্রভৃতি ছেড়ে দিয়েছেন, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন। আবার পরমুহুর্তেই ঈশ্বরের প্রতি পুর্ন বিশ্বাসের কথা বলছিলেন।

সকল বক্তব্যের শেষে যখন উনি কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, তার আগে থেকেই তিনি মানসিকভাবে ছিলেন একজন মৃত সৈনিক।

৩১শে মে, ১৯৮১
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করবার প্রায় দুইদিন পর আজ রাতে জেঃ মঞ্জুর চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশন থেকে তার একমাত্র বেতার ভাষন প্রদান করলেন। এর আগে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সব বক্তব্যই জেঃ মঞ্জুরের নামে চালানো হয়েছিলো যাতে ৭ সদস্য বিশিষ্ট বিপ্লবী পরিষদের প্রধান বলে উল্লেখ করা হয়। আর এ ব্যাপারে প্রথম প্রচারনা চালানো হয় প্রেসিডেন্টকে হত্যার প্রায় ৫ ঘন্টা পর। তবে তার বক্তব্যে জেঃ মঞ্জুর নিজেকে নতুন সরকারের প্রধান বলে ঘোষনা করলেন। এর বাইরে তিনি নিজেকে জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) চট্টগ্রাম অঞ্চল বা ২৪নং পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার হিসেবেও উল্লেখ করেন এবং বলেন যে বিপ্লবী পরিষদ তাকে তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রচার করবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

রেডিওতে প্রচারিত বক্তব্যে বিপ্লবীরা জানায় যে জেঃ মঞ্জুর নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে দ্বায়িত্ব নিয়েছেন এবং ভারতের সাথে ১৯৭২ সালে সাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে মেজর জিয়া এই চট্টগ্রাম থেকেই এমন এক বেতার ভাষন প্রচার করেন। জেঃ মঞ্জুরও তেমনই এক বিপ্লবের ডাক দিচ্ছিলেন, তবে সেটা সেই দশ বছরের আগের সেই নায়ককে হত্যা করে। উনি তার বক্তব্যে কোথাও প্রেসিডেন্টের হত্যাকান্ডের নিন্দা করেননি কিংবা যুক্তি দিয়ে সঠিক বলেও প্রমানের চেষ্টা করেননি। তার নামে প্রচারিত কিছু বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে, ঢাকা থেকে প্রচারিত বেতারে বলা হলো ক্ষমতা ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারের হাতেই রয়েছে এবং সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি বহাল রয়েছে।

১লা জুন, ১৯৮১
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
আগেরদিন জেঃ মঞ্জুর নোয়াখালীর কাছে মহাসড়কে সরকার অনুগত সেনাদের থমকে দিতে তার একটি বিশ্বস্ত ইউনিটকে (৬ ইস্ট বেঙ্গল) পাঠিয়েছিলেন। সেখানে পৌছে ইউনিটের এক বিশ্বস্ত প্লাটুনের দ্বায়িত্বে থাকা অফিসার ক্যাপ্টেন হায়দার ওয়্যারলেসে চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রে জানিয়ে দিলেন যে তারা সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য পাল্টে ফেলেছে এবং তাদের কাছে আত্মসমর্পন করছে স্বেচ্ছায়।

জেঃ মঞ্জুর বুঝতে পারলেন যে তার এই অভ্যুত্থান সফল হতে পারবেনা এবং পরাজয় নিশ্চিত। উনি ভেঙ্গে পরলেন খুব। তিনি এদিন মধ্যরাতের পরপরই স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং অন্য অফিসারদের পরিবার সহ ১৫০ জনের নিজের অনুগত সেনা নিয়ে ছয়টি দলে বিভক্ত হয়ে ছয়দিকে পালিয়ে গেলেন ভারত এবং বার্মার উদ্দেশ্যে। তবে তাদের পালাবার পথ রুদ্ধ করে দিতে ঢাকাসহ সারাদেশের সকল বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হলো। ভারতের সাথে টেলিফোন আর টেলেক্সের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো। বাংলাদেশ রাইফেলসের সকল বর্ডার আউটপোস্টে সরকারের তরফ থেকে সতর্ক থাকবার নির্দেশ দেয়া হলো যাদের আনুগত্য ছিলো ঢাকার সরকারের প্রতি।

দুপুরের মধ্যেই সরকারী সেনারা চট্টগ্রামে প্রবেশ করে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিলো। কোথাও কোন ধরনের বাঁধার সম্মুক্ষীন হলোনা তারা। পুরো ২৪তম পদাতিক ডিভিশন সরকারের অনুগত সেনাদের কাছে আত্মসমর্পন করে আনুগত্য প্রকাশ করলো। সকাল নয়টার দিকে চট্টগ্রাম শহরের ৩০ মাইল উত্তরে ফটিকছড়ির পাহাড় থেকে মেঃ মঞ্জুরের দলটিকে সনাক্ত করে পরবর্তীতে দুপুরের মধ্যেই গ্রেফতার করা হয়। জেঃ মঞ্জুর এ সময় তার ছোট ছেলেকে খাওয়াচ্ছিলেন একটি চা বাগানের ভেতরে।

বন্দীদের আটক ফটিকছড়ি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। জেঃ মঞ্জুর এ সময় তাকে ক্যান্টনমেন্টে না নিয়ে গিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করেন। উনি নিজের এবং সহচরদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। এ সময় সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার তার দীর্ঘ্য বক্তব্য রেকর্ড করেন। তবে সেটা কোনোদিন প্রকাশ করা হয়নি কিংবা নস্ট করে ফেলা হয়েছিলো। জেঃ মঞ্জুরকে আরো দুইজন অফিসার সহ দুপুরের দিকে ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেনাপ্রধান জেঃ এরশাদের মতে তাদের ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারের নির্দেশনায়।

এরপরেই এই দেশের ইতিহাসে কম গুরুত্বপূর্ন কিন্তু আরেকটি রহস্যজনক হত্যার ঘটনা ঘটবে। বেতারে প্রচারিত সরকারী ভাষ্য অনুসারে বিক্ষুব্ধ জনতা ক্যান্টনমেন্টে নেয়ার পথে পুলিশের গাড়ি আক্রমন করে তাকে হত্যা করে। জেঃ মঞ্জুর হত্যা মামলার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ২০১৩ সালে জেঃ এরশাদ আবারো দাবী করবেন, উত্তেজিত জনতা তাকে আক্রমন করে এবং হাসপাতালে নেবার পথে উনি মারা যান। উনি দাবী করবেন ৪ জুন ১৯৮১ সালে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত উত্তেজিত সশস্ত্র জনতা কর্তৃক জেঃ আবুল মঞ্জুর এবং তার দুই সহযোগীকে গুলি করে হত্যার সংবাদটি সত্য ছিলো। উনি এ ব্যাপারে সাক্ষ্যতে বলেন,

– “মঞ্জুরকে আটক করবার পর চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নেয়া হচ্ছিলো। কিছুসংখ্যক উত্তেজিত জনতা যাত্রাপথে তাকে ছিনিয়ে নিতে চায় এবং তাদের ও পুলিশের প্রহরীদের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। এ সময় মঞ্জুর গুলিবিদ্ধ হন এবং হাসপাতালে নেবার পথে মারা যান।“

তবে পুলিশ তাদের ভাষ্যে উল্লেখ করেছিলো যে, জেঃ মঞ্জুরকে ক্যান্টনমেন্টে পৌছে দিয়েছিলো যেখানে তাকে সহ আরো দুইজন অফিসারকে প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে সেনারা হত্যা করে। চট্টগ্রামের ততকালীন ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দীন আহমেদও এই মতই প্রকাশ করেন। উনি বলেন যে, তিনি মনে করেন তখন ঢাকায় জেঃ মঞ্জুরকে সরিয়ে দিতে পরিকল্পনা নেয়া হয় এবং একজন ব্রিগেডিয়ারকে এ ব্যাপারে দ্বায়িত্ব দিয়ে ঢাকা থেকে প্রেরন করা হয় যিনি জেঃ মঞ্জুরকে মাথায় গুলি করে হত্যা করেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট্রের অভ্যন্তরে। পরবর্তীতে ময়না তদন্ত রিপোর্টেও উল্লেখ ছিলো যে জেঃ মঞ্জুর মাথার পেছনের দিক থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

উনি এ ব্যাপারে বলেছেন,

– “একজন ক্যাপ্টেন হাটহাজারীর পুলিশ স্টেশনে এসে জেঃ মঞ্জুরকে তার কাছে হস্তান্তর করতে বলেন। এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে ধাকার অনুমতি চাওয়া হয়। চট্টোগ্রামের পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অস্পস্ট উত্তর দিচ্ছিলেন এবং বারবার বলছিলেন উনি এ ব্যাপারে জেঃ এরশাদের সাথে আলোচনা সিদ্ধান্ত জানাবেন। এরপর প্রেসিডেন্ট সাত্তার এবং জেঃ এরশাদের নির্দেশে জেঃ মঞ্জুরকে সেই ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দেয়া হয়।

এরপরে থানা চত্তর থেকে তাকে বের করেই সেই ক্যাপ্টেন কারাতের ভঙ্গিতে লাথি মেরে জেঃ মঞ্জুরকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তার হাত পা বেঁধে একটি পিকআপের পেছনে ফেলে রাখা হলো। এ সময় জেঃ মঞ্জুরের স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে পিকআপের সামনের সীটে বসানো হয়।

এরপর চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বন্দী থাকা অবস্থায় একজন ব্রিগেডিয়ার তাকে দেখতে আসেন। এরপর সেই ব্রিগেডিয়ার একটা পিস্তল বের করেন এবং তার মাথায় গুলি করে নির্লিপ্তভঙ্গীতে হেটে বেরিয়ে আসেন। এরপর জানানো হয় যে জেঃ মঞ্জুরকে ক্ষুব্ধ সেনারা হত্যা করেছে।“

বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে ঠিক কিভাবে তাকে হত্যা করা হয়, যদিও তার এই মৃত্যুকে সাধারনভাবে রহস্যময় বলেই আখ্যায়িত করা হবে। তবে এটা নিশ্চিত যে তাকে ২রা জুন ১৯৮১ সালে হত্যাই করা হয়। তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান এরপরে যুক্তরাস্ট্রে অভিবাসন গ্রহন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডারকে এ দেশের ইতিহাস কলংকজনক আরেক অধ্যায়ের কারনেই মনে রাখবে। এই মুহুর্তে যদি একশ জনকে জিজ্ঞেস করা হয় জেঃ মঞ্জুর কে ছিলেন। তাদের সবাই সম্ভবত এক কথায় উত্তর দেবে, “প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকারী।“

কেউ বলবেনা, উনি ছিলেন একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।

জেঃ মঞ্জুরের হত্যাকান্ডটাও গত ৫-৬ বছর ধরে চলে আসা হত্যাকান্ডগুলোর মতই রহস্যময়। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলো, এরপরে ২৮ জুলাই ১৯৮১ সালে বেশকিছু সংখ্যক অফিসারকে প্রেসিডেন্টের হত্যার দায়ে গোপন সামরিক আদালতে হাজির করা হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এই আদালতের চেয়ারম্যান ছিলেন একজন প্রত্যাগত অফিসার মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান। এই বিচারের কার্যক্রম সম্পর্কে কেউ কোনদিন কিছু জানতে পারেনি। তবে ১৩ জন অফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবার নির্দেশ দেয়া হলো যাদের ১১জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। আরো ১৯ জনকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। তাদেরও প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার।

প্রথমে ১২ জন অফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মহসীন উদ্দীন আহমেদ এবং সবচেয়ে জুনিয়র লেফটেন্যান্ট মোঃ রফিক হোসেন খান, যার বয়স ছিলো মাত্র ২৩ বছর। ১৩তম অফিসার লেঃ কর্নেল শাহ মোঃ ফজলে হোসেনকে ১৯৮৩ সালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কারন মধ্যবর্তী সময়ে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩০শে মে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যার অভিযানের সময় উনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। ব্রিগেডিয়ার মহসীন উদ্দিনের ছোটভাই মেজর মোসলেহ উদ্দীনকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেয়া হলেও পরে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়, কারন তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র পুরুষ মানুষ। ৩১ শে অক্টোবর ১৯৮১ সালে ১৯ জন অফিসারকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দিয়ে চাকুরীচ্যুত করা হয়।

এর আগে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষনা দেয়া হয় বিদ্রোহীরা যদি আত্মসমর্পন করে তবে তাদের ক্ষমা করা হবে। এই ঘোষনার পর অনেকেই সরকারের অনুগত সেনাদের কাছে আত্মসমর্পন করেন। তবে বিচার চলাকালীন সময় এ কথা অস্বীকার করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। আসামী পক্ষের কৌসুলী লেঃ কর্নেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) মোহাম্মদ ইব্রাহীম এ ব্যাপারে আদালতের সামনে বেতার ও টিভিতে প্রচারিত প্রমান উপস্থাপন করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়। এ সময় আদালতে হাজির করা আসামীরা অভিযোগ করেন যে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাদের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। জামাকাপড় খুলে বিচারকের সামনে দেখালে সেগুলোও আদালত আমলে নেয়নি। এই আদালতের প্রধান মেজর জেঃ আব্দুর রহমান রাস্ট্রদুত হসেবে দ্বায়িত্বপালনকালে ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরন করেন। পরিবার থেকে দাবী করা হয় যে সরকারই তাকে হত্যা করেছে।

এবার আবার একটু ফিরে দেখি। যখন এই অংশটা লিখছিলাম তখন আমার মনে প্রশ্ন আসলো কেন হত্যায় দায়ে কেবল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরই প্রধানত ফাঁসিতে ঝুলানো হলো? সেই সময়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের সংখ্যা প্রত্যাগতদের থেকে কম ছিলো। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে কি কেবল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারেরাই ছিলেন? আমার মনে পরলো বেশ অনেকদিন আগে সহব্লগার মনিরা সুলতানা আপার একটা কথা। কথা প্রসঙ্গে উনি বলেছিলেন, তুমি কি ত্রিশোনকু মল্লিকের জিয়া হত্যার সময়ের লেখাগুলা পড়ছো? আমি বলেছিলাম পড়া হয়নি। একটা ট্যাব খুলে ত্রিশোনকু মল্লিক নামে সার্চ দিয়ে ব্লগ খুঁজে সেই সময়ের ঘটনা নিয়ে তার স্মৃতিচারনমুলক লেখাগুলো বের করি। আর অনেককিছুর হিসেবটা এখানেই মিলে যায়। আমাদের সবার জীবন থেকে উঠে আসা ঘটনাগুলো জানা দরকার। আমি এই ব্যাপারে উনার সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করি এবং পরে টেলিফোনেও কথা বলি। তখন উনি আমাকে বলেন তার লেখার একটা শব্দও এদিক সেদিক করা যাবেনা, তাতে অর্থ বদলে যেতে পারে। আমি সেটাই করবার চেষ্টা করেছি অল্প কিছু বানানগত ভুল ঠিক করা আর বক্তব্যগুলোকে আলাদা করে দেখানো ছাড়া। আবার একটু পেছন থেকে সাজাই তৎকালীন লেফটেন্যান্ট ত্রিশোনকুর স্মৃতি থেকে নিয়ে যিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেনঃ

(লেঃ ত্রিশোনকু মল্লিকের স্মৃতিচারন থেকে হুবহু তুলে ধরা)
২৫শে মার্চ, ১৯৮১
ঢাকা, বাংলাদেশ
সে বছরেরই (১৯৮১) ফেব্রুয়ারীতে আমি আমার সেনাদল নিয়ে ঢাকায় চলে যাই স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজের জন্যে। দিনে দুটো মহড়ার পর আর কিছু করবার থাকতোনা। পুরোনো বিমানবন্দরের এক কোণে আমাদের ক্যাম্প। ক্যাম্প থেকে হাঁটা পথে ১০ মিনিট দূরে আমাদের বাসা। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!

তখন সশস্ত্র বাহিনী দিবস ছিল না। তিন বাহিনী তিনটি আলাদা দিন পালন করতো। সেনাবাহিনী দিবস ছিল ২৫ শে মার্চ। সে দিবসটি ঊপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এবং সশস্ত্র বাহিনী প্রধান আমাদের নিমন্ত্রণ করেছেন (কন্টিঞ্জেন্ট কমান্ডার হিসেবে), স্থান অফিসার্স ক্লাব, ঢাকা সেনানিবাস (এখন কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব)। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর পৌছুলাম। অতিথি অত্যন্ত বেশী জায়গার তুলনায়। নড়াচড়া করার ঊপায় নেই (তখন সেনাকুঞ্জ ছিল না)। ধাক্কায় দুবার মেঝে থেকে মাঠে চলে এলাম। খুব সম্ভবতঃ আমিই সেখানে সর্ব কনিষ্ঠ আমন্ত্রিত কর্মকর্তা।

রাত আটটার দিকে হঠাৎ ক্লাবের মাঝখান থেকে শোরগোল উঠল, ঠেলায় ঠেলায় আমি তখন শোরগলের কাছেই। তাকিয়ে দেখি রষ্ট্রপতি লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বেশ কিছু অফিসার ঘিরে ধরেছেন এবং উচ্চ স্বরে তর্ক করছেন। কেউ একজন চিৎকার করে উঠলেন,

– “Sir, how could you make RAZAKAR Shah Aziz the Prime Minister of our country (স্যার, আপনি রাজাকার শাহ আজিজকে কি করে দেশের প্রধান মন্ত্রী বানালেন)?”

জেনারেল জিয়ার তাৎক্ষণিক উত্তর,

– “Politics make strange bed fellows!”

ভীড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বললেন,

– “Sir you have to pay for it (স্যার এ জন্যে আপনাকে মূল্য দিতে হবে)।“

..and he paid with his life. তাকে মূল্য দিতে হয়েছিলো নিজের জীবন দিয়ে, মাত্র দু মাস পাঁচ দিনের মাথায়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেখছি মুক্তিযোদ্ধারা যেন কে কার আগে মরবেন তার প্রতিযোগিতায় মেতেছেন, আজ অব্দি দেখছি!

৩১ শে মে, ১৯৮১
ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট
কুমিল্লা, বাংলাদেশ
(মাঝের কিছু অংশ বাদ দেয়া। যেখানে প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর সংবাদ জেনে নিজের ইউনিটে ফেরত আসবার জন্য উনি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন আনুষাঙ্গিক আরও কিছু ঘটনা ছাড়াও।)

ট্রেনের রাত্রির যাত্রা আমার এক্কেবারে পিচ্চি থাকতেই ভীষন পছন্দ। ট্রেনের দুলনিতে খুব গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই আমি। এখনো যেখানে ঢাকায় থাকতে রোজ ঘুমুতে ঘুমের ওষুধের প্রয়োজন হয়, কিন্তু তূর্ণা নিশিথা চলা শুরু করবার পাঁচ মিনিটে মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি, সেখানে সে রাতে ঠায় বসে রাত পার করে দিলাম। স্টেশনে নেমে কোন বাহন না পেয়ে হেঁটে শাসনগাছা পর্যন্ত এসে একটা রিক্সা ঠিক করতে পারলাম। পাহাড়ের ঢালে, আমার মেসের কাছে যখন রিক্সা থেকে নামলাম, তখন ঘড়িতে সকাল চারটা বিশ। দ্রুত ইউনিফর্মে তৈরি হয়ে ইঊনিটে গেলাম। পুরো ইঊনিট খা খা করছে। শুধু সহ অধিনায়কের অফিসে বাতি জ্বলছে। সহ অধিনায়কের কাছে যেতেই উনি বল্লেন,

– “তোমার আসার খবর বিকেলের দিকে ব্রিগেড সদর থেকে পেয়েছি, সাথে তোমার সংযুক্তির আদেশ। তোমাকে ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের অস্থায়ী জিএসও-৩ {অপারেশন সংক্রান্ত নিয়োগ যা তখন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া সবখানের পদাতিক ব্রিগেডে suspended animation (পোস্ট ছিল নিয়োগ ছিল না) ছিল} নিয়োগ দেয়া হয়েছে আজ পূর্বাহ্ন থেকে। ব্রিগেড ট্যাক্টিক্যাল হেড কোয়ার্টার এখন ফেনী শহরে, বি ডি আর সদর দপ্তরে। সকাল সাতটার মধ্যে তুমি ব্রিগেড মেজরের সামনে উপস্থিত থাকবে।“

একটা পিকআপে আমার সমস্ত সম্পত্তি ( ২ জোড়া ইঊনিফর্ম, ২ টি ট্রাউজার, ২টি শার্ট, ২ টি সর্টস, ২ টি টি-শার্ট, ১ জোড়া চপ্পল আর আমার প্রাণ প্রিয় ছোট্ট একটি ক্যাসেট প্লেয়ার সাথে অনেক ক্যাসেট) নিয়ে আমি আমার গাড়ি চালক আর ওয়্যারলেস অপারেটরকে নিয়ে রওনা দিলাম।

বি ডি আর সদর দপ্তরে ব্রিগেড মেজর (বি এম)আমকে অপারেশনাল ব্রিফিং দিলেন। যার সার কথা ছিল সেনা সদর থেকে ৩৩ পদাতিক ডিভিশনকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে চিটাগাং এর ২৪ পদাতিক ডিভিশনকে আত্ম সমর্পন করানো। ৩৩ পদাতিক ডিভিশন সে দ্বায়িত্ব দিয়েছে ৪৪পদাতিক ব্রিগেডকে। ভোর পাঁচটায় ৬ ইস্ট বেংগল (অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্ণেল শাহ মোহাম্মদ ফজলে হোসেন, ৩০ শে সেপ্টেম্বর ‘৮৩ তে শারিরিকভাবে সম্পূর্ণভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়) এর এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন হায়দার ৭০ জন সৈনিক ও ২ জন জে সি ও (নায়েব সুবেদার/সুবেদার/সুবেদার মেজর) নিয়ে শুভপুর সেতু পার হয়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। শুভপুর সেতুর এপারে আমার সেনাদল আর ওপাড়ে ৬ ইস্ট বেঙ্গল, একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে আগের দিন থেকে। আমার কাজ হবে আত্মসমর্পনের পুর্নাংঙ্গ ব্যাবস্থা, তদারক ও নিশ্চিত করা। আমি উত্তরে বললাম যে,

– “২৪ পদাতিক ডিভিশন কুমিল্লা, যশোর ও রংপুরের সম্মিলিত ডিভিশনের সমান। ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের মতো অসম্পূর্ণ একটা ব্রিগেড কিভাবে সে ডিভিশনকে সারেন্ডার করাবে?”

উনি পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন

– “এত বিশ্লেষনী ক্ষমতা থাকতে আমি কেন বুদ্ধিজীবী না হয়ে সেনাবাহিনীতে আমার পশ্চাদদেশ ঘষতে এলাম (to rub your ass)?”

আমার অস্থায়ী অফিসে স্থিতু হয়ে বসতে না বসতেই ক্যাপ্টেন হায়দার (আমার ছয় মাসের জেষ্ঠ) ঢুকলেন। উনি বললেন,

– “একটা মাইক্রো রিকিউজিশন করো (৪৪ পদাতিক ব্রিগেডকে ততক্ষণে সে ক্ষমতা পেয়ে গেছে) আমি ওপার থেকে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদারকে {৬ ই বেংগলের সহ অধিনায়ক, repatriated (পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত )} ঊঠিয়ে নিয়ে আসি, সাথে ব্যাটালিয়ানের গুরুত্বপূর্ণদের। তাহ’লে আপনা আপনিই ডিফেন্স খালি করে সবাই চলে আসবে এপাড়ে।“

একটা ২২ সিটার মাইক্রো আনা হ’ল তাতে ট্যাংক ভর্তি করে পেট্রল ভরে ক্যাপ্টেন হায়দার চলে গেলেন। আমার রানার (বেসামরিক পিওনের সমার্থক বলা যেতে পারে) তিন ব্যান্ডের একটা ট্রাঞ্জিস্টার (রেডিও) নিয়ে আমার অফিসে ঢুকল। বি বি সি থেকে বলছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় সেনারা অনুপ্রবেশ করছে। তাদের সংখ্যা বিশাল (with great strength)। আমি বি এম কে জানালাম। উনি তখনকার জনপ্রিয় ফিলিপস ২০ ব্যান্ডের একটা রেডিও কোত্থেকে যেন জোগাড় করলেন। আমর আবার শুনলাম।

ভয়াবহ পরিস্থিতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন সেনা দলের সাথে আমাদের কারো যোগাযোগ নেই যে আমরা খবরটি যাচাই করবো। গুজব বলেও ঊড়িয়ে দিতে পারছিনা, বি বি সি বলে কথা! অনুমান করছি যে রাষ্ট্রপতির ঘোষনা শুনে পার্বত্য চট্টগ্রামের যুদ্ধরত সবাই কুমিল্লার পথে। এদিকে ডিভিশন সদর ও সেনাসদর থেকে ক্রমাগত চাপ আসছে সঠিক তথ্য জানানোর জন্যে।

ব্রিগেড অপারেশন রুমের (অপস রুম) চার দেয়াল জুড়ে মেঝে থেকে ছাঁদ পর্যন্ত নানা মাপের ম্যাপ-চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের। ইন্টেলিজেন্স হাবিলদার তার সহকারী নিয়ে চিটাগাং ডিভের deployment (সেনা মোতায়েন) আঁকতে ব্যাস্ত। যদিও সে deployment ততক্ষণে কাগুজে, আসলে কে কোথায় কেউই জানেনা। ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান (পরে মেজর জেনারেল, তুরস্কে রাষ্ট্রদুত থাকা অবস্থায় প্রয়াত), বি এম, বি ডি আর ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মেজর দাউদ (তখন বি ডি আর ব্যাটালিয়ান গুলো কমান্ড করতো মেজররা) আর আমি। সবাই মিলে উপায় বের করার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমি ছাড়া আর যারাই তখন অপস রুমে, তাদের সবাই প্রত্যাগত অফিসার, এমনকি ব্রিগেড কমান্ডারের রানার পর্যন্ত!

হঠাৎ বি এম বলে উঠলো,

– “স্যার! বিডিআরের ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক তো খুবই শক্তিশালী। আমরা ওদের সেট দিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিনা কেন? তাছাড়া হিলে তো ওদেরও deployment আছে।“

শুরু হয়ে গেল কাজ। বি ডি আরের ছিল তখন ফিক্সড ব্যান্ড সেট- CD- 100. চারটি ব্যান্ডে কথা বলা যেত। ঝকঝকে নতুন ছোট্ট ব্রিফকেসের মত দেখতে এ সেটগুলোর রেঞ্জ ছিল বিশাল। এক ঘন্টার মধ্যেই বের করা গেল যে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঘটেনি। আমরা সেটা ডিভিশন ও সেনা সদরকে জানিয়ে দিলাম।

আমার অফিসে আসতে না আসতেই ক্যাপ্টেন হায়দার হাজির, সাথে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদার, ৬ ই বেংগলের কোম্পনি অধিনায়ক মেজর ইসমত (প্রত্যাগত) ও ক্যাপ্টেন ইলিয়াস {জাতিয় রক্ষী বাহিনী (JRB)}। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শুধু মাত্র মেজর দোস্ত কে। তিনি এপারে আসতে চাচ্ছিলেন না। ক্যাপ্টেন হায়দার তাকে জোর করে বন্দুকের মুখে নিয়ে এসেছেন। মেজর দোস্ত মোহাম্মদকে ছোট্ট একটা ঘরে বন্ধ করে পাহারার ব্যাবস্থা করলাম। ততক্ষণে ৬ ইস্ট বেংগলের সবাই ফেনী নদীর প্রতিরক্ষা ছেড়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আধঘন্টার মধ্যে আরেকটি পদাতিক ব্যাটেলিয়ান এসে হাজির। তাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে ফিরতে না ফিরতেই বিএমের অফিসে ডাক পড়লো। বিএম ও কমান্ডার দাঁড়িয়ে। বি এম আমাকে অতি নিরিহ গলায় বললেন,

– “যে দুটো ব্যাটালিয়ান এসেছে আদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে নাও (disarm them)।“

আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারন, প্রথমতঃ তারা সবাই স্বেচ্ছায় এসেছে, দ্বিতীয়তঃ একজন সৈনিকের কাছে অস্ত্র সমর্পন আর একজন মেয়ের সম্ভ্রমহানী সমার্থক, তৃতীয়তঃ এই অসম্ভব প্রায় কাজটি জেষ্ঠ কারো করার কথা!

ব্রিগেড কমান্ডার বলে উঠলেন,

– ” দেখ, আমাদের কিছু করার নেই, আদেশ সেনাসদর থেকে ডিভ হয়ে আমার কাছে এসেছে (Look young man, the order has come from the AHQ through Div, I’m undone).”

কিছু বলে কোন লাভ হবেনা বুঝে আমি হাঁটা দিলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম কিভাবে এ অসাধ্য সাধন করা যায়। ওদের ছাঊনি পর্যন্ত পৌঁছুতে পৌছুতে একটা বুদ্ধি বের হ’ল। আমি দুই ব্যাটালিয়ানের দুই সুবেদার মেজরকে (সৈনিকদের সবচেয়ে ঊঁচু পদবীর) ডাকলাম। বললাম যে চিটাগাং থেকে যারা আসছে তাদেরকে জিয়া হত্যাকারী হিসেবেই সাধারন মানুষেরা মনে করছে (কথাটা অসত্য ছিল না)। জেনারেল জিয়ার যে পরিমান জনপ্রিয়তা, যে কোন সময়, সাধারন মানুষ তাদের ওপর চড়াও হতে পারে। হাতে অস্ত্র থাকলে অযথা রক্তপাত হবে। তাই তারা দুজন যেন ব্যাপারটা বুঝিয়ে সবাইকে বলে এবং একজায়গায় অস্ত্র জমা করে।

আমি যেভাবে আমার বি এমের দিকে তাকিয়ে ছিলাম ঠিক সেই দৃষ্টিতে ওরা দু’জন তাকালো আমার দিকে। আমার তখন যা বয়স, তাদের দুজনেরই সেনাবাহিনীর চাকুরী তার চেয়ে বেশী। আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম,

– “আধ ঘন্টা পর আমি আমার লোকজন নিয়ে আসবো।“

২৫ মিনিটের মাথায় তারা দুজন ফিরে এসে জানালো অস্ত্র ও গোলা বারুদ আমি নিয়ে যেতে পারি।

ক্যাপ্টেন হায়দারের একক সিদ্ধান্তের ফলে ৬ ই বেংগল শুভপুরের প্রতিরক্ষা ত্যাগ করায় চিটাগাং এর সৈন্যদের কুমিল্লার দিকে আসতে আর কোন বাঁধা থাকলো না। শুরু হ’ল বানের পানির মত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ও চট্টগ্রাম এরিয়ার সৈনিক ও অফিসারদের আসা।

তাদের স্থান সংকুলানের জায়গা খোঁজার জন্যে আমি বের হ’লাম, সাথে ক্যাপ্টেন হায়দার। কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন হায়দার বললেন,

– “এই আমার স্টেনটা দেখেছ?”

জীপ থামিয়ে আমরা দুজনই AK 47 এর চায়নিজ ভার্সানটি (SMG) খুঁজতে লাগলাম। কোথাও নেই!

আমাদের তখনকার জিওসি (General Officer Commanding; Division Commander) মেজরে জেনারেল আব্দুস সামাদ (প্রত্যাগত) হঠাৎ উদয় হলেন। হারানো অস্ত্র খোঁজায় ব্যাস্ত থাকায় আমরা আকে আগে দেখিনি।

সটান দঁড়িয়ে স্যালুট দিলাম।

উনি জিজ্ঞেস করলেন,

– “কি খুঁজছ তোমরা?”

সেনাবাহিনীতে অস্ত্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ হারানোই কবিরা গুনাহ, আস্ত একটা অস্ত্র হারানোর কথা কেঊ কল্পনাও করতে পারেনা। কিছুক্ষন ইতস্তত করে ক্যাপ্টেন হায়দার বলে উঠলেন,

– ” স্যার, আমি আমার স্টেন হারিয়েছি!”

জেনারেল সামাদ উত্তর দিলেন,

– “স্টেন হারিয়েছে তো কি হয়েছে বাবা?”

অত সহজে পার পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম দু’জন। আসলে ক্যাপ্টেন হায়দার সেনাবাহিনীর জন্যে কি বিরাট একটা কাজ করে ফেলেছিলেন তা তিনি তখনো বুঝে উঠতে পারেন নি। আর পরেও (আজ পর্যন্ত) তাঁর সেই অবদানের মৌখিক স্বীকৃতিও কেউই দেয়নি। আর শ্বেতপত্রের সে মিথ্যাচারের কথা আর নাই বললাম। সারা জীবনে যত মিথ্যে শুনেছি সব এক করলেও শ্বেতপত্রের একটি পাতার মিথ্যে গুলোর সমান হবেনা।

১ লা জুন, ১৯৮১
(এ সময়ের মধ্যে লেঃ ত্রিশোনকু মল্লিকের কোর্সমেট এবং বন্ধু লেঃ রফিকও পক্ষত্যাগ করে আত্মসমর্পন করেন। সাথে সেকেন্ড লেঃ মোসলেহও ছিলেন অন্যান্যদের অফিসারদের মধ্যে যারা উনার খুব কাছের মানুষ ছিলেন এবং সম্পর্ক ছিলো বেশ অন্তরঙ্গ। উনি ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের সাথে ৩০শে মে রাতের কোন প্রসঙ্গ টেনে আনছিলেন না এর আগে। তবে কথা প্রসঙ্গে তা চলেই আসলো।)

আমি আর রফিক যে বিষয়টি সচেতনে এড়িয়ে গেছি এক’ ঘন্টা, মোসলেহ সে বিষয়টিরই অবতারনা করলো। আমি হতভম্ভের মত শুনে গেলাম। মোসলেহ শেষ করার অনেকক্ষণ পর আমি বোঝার চেষ্টা করলাম কি হয়েছিল সে রাতে।

“জেনারেল জিয়াকে সার্কিট হাউজ থেকে EBRC (East Bengal Regimental Centre) তে নিয়ে আসার জন্যে অফিসাররা সার্কিট হাউজ ঘেরাও করে। কিছু গুলি বিনিময়ের পরে যাদের দায়িত্ব ছিল ভেতরে ঢোকার তাদের সবাইকে একটা করে কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল clear করার জন্যে। মোসলেহকে যেটা বরাদ্দ করা হয় সেটাতে জেনারেল জিয়ার থাকার কথা ছিল না। মোসলেহ দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়, সাদা ধপধপে পাজামা পাঞ্জাবী পরা জেনারেল জিয়া বেরিয়ে আসেন। তাঁকে দেখে মোসলেহ ঘাবড়ে যায়। “কি ব্যাপার?” তিনি জিজ্ঞেস করলে মোসলেহ বলা শুরু করে, ” স্যার আপনাকে আমরা……”। আর এটুকু বলতেই প্রচন্ড জোরে ওর কাঁধে পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় মোসলেহ মাটিতে পড়ে যায়। মাটি থেকে উঠতে উঠতে সে দেখতে পায় যে তাকে যে ধাক্কা দিয়েছিল সে জিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে স্টেনের {SMG, 7.62 mm, type 56, Origin China (carbon copy of AK 47)} তিরিশটি গুলি ট্রিগারের এক চাপে, ওপর থেকে নীচে স্প্রে করে। গুলির ধাক্কায় জেনারেল জিয়ার দেহ পেছনের দিকে চলে যায়, তারপর মাটিতে আছড়ে পড়ে। হত্যাকারী ঘুরতেই মোসলেহ চিনতে পারে তাকে, উনি লেঃ কর্নেল মতি {G-I, CI (General Staff Officer, Grade One, Counter Insurgency)}। পুরো হত্যাকান্ডটি ঘটতে ১ মিনিটের ও কম সময় লাগে। কর্নেল মতি দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করে।“

বেশ কিছুক্ষণ হয় মোসলেহ চলে গেছে। আমি ঝিম মেরে পড়ে আছি। লেঃ রফিক জিজ্ঞেস করে,

– “দোস্ত আমাদেরকে ওরা ঝুলিয়ে দেবে।“

আমি বললাম,

– “ওরা তোকে ঝুলিয়ে দেবে কেন? তুই প্রায় বারো ঘন্টার মত আগে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিস। আমি ‘in writing’ তোর কাছ থেকে আত্মসমর্পণ এর ব্যাপারটি নিয়েছি। It’s sealed and signed! তোর কোন ভয় নেই। তোর কোন রকম বিচারই হবেনা।

আবার নিস্তব্ধতা। কিছুক্ষন পর লেঃ রফিক বললো,

– “দোস্ত, তুই একদিন আমার রুমে আমার হাত দেখে বলেছিলি যে আমি ২৫ বছরের বেশী বাঁচবো না।“

আমি আবার কাঠ হয়ে গেলাম।”

ক্লাস টুতে পড়তে নানার সার সার বইয়ের আলমারিতে একটা বই আবিষ্কার করি “Chiro’s Book of Numbers”. Numerology (সংখ্যা তত্ব)র ওপর ঝোঁক হয় , নানা মারা যান, আমি তারঁ বইয়ের ভেতর থেকে কিরোর বইগুলো নেই। Palmistry তে হাতে খড়ি হ’ল। তখন বিভিন্ন হাতের ছবি দেখাটাই ছিল মূখ্য। বড় হ’তে হ’তে প্রধান তিন লাইন (Life, Head , Heart ) শেষ করে অপ্রধান লাইন (sun, health, fate)বিভিন্ন চিহ্ন (star, flag, island etc.) শিখতে শিখতে কেমন যেন নেশায় পেয়ে বসে আমাকে। মানুষের হাত যদিও খুবই কম দেখেছি। সব মিলিয়ে হয়তো বা সাকুল্যে দশ বারোটি।

দূর্ভাগ্যক্রমে আমার দেখা হাতের মধ্যে একটা ছিল রফিকের। কোন এক শনিবার রাতে ফান করতে করতে তার হাত দেখি । লাইফ লাইন সাধারন অন্য লাইফ লাইনের চার ভাগের একভাগে এসে বেশ কতগুলো আইল্যান্ড, তারপরই শেষ। এরকম হাত আমি কি্রোর কোন বইতে দেখিনি। নিজে নিজে এটার একটা অর্থ বের করতে চেষ্টা করছিলাম। অনেকক্ষণ আমাকে চুপ থাকতে দেখে রফিক বলেছিলো,

– “দোস্ত কি দেখছিস?”

শুধু মাত্র মজা করার জন্যে (আমি ওর হাতটা বুঝিনি) বলেছিলাম,

– “তুই তো ২৫ বছরেই পটল তুলবি। তোর একটা মাত্র গার্ল ফ্রেন্ড তাও কত দূরে। যশোরে তাড়াতাড়ি কতগুলো বানা। সময় নেই।”

রফিক বলেছিলো,

– “নারে দোস্ত, একটাই সামলানো আমার জন্যে বিরাট ব্যাপার।”

আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম অনেক্ষণ, ও চুপ মেরে গেল।

গান শুনছি, রফিক গুন গুন করা শুরু করছে গানের সাথে। রাত চারটার সময় রুমের ফিল্ড টেলিফোন ক্রিং ক্রিং, বিএম অপরপ্রান্তে। উনি বললেন,

– “শোন তুমি তোমার সেনাদলে ফেরত যাও। ২৪ ডিভের বেশীর ভাগই সারেন্ডার করেছে। তোমার অধিনায়কের সাথে এক্ষুনি যোগাযোগ কর।”

রানারকে পাঠালাম গাড়ী আনতে। ওয়্যারলেসে অধিনায়কের সাথে যোগাযোগ করতেই আমাকে তিনি আদেশ দিলেন আমার উপদল নিয়ে আমি যেন এক্ষুণি চিটাগাং রওয়ানা হই। চিটাগাং রেডিও স্টেশনের সৈনিকেরা এখনো Surrender করেনি। আমি যেন পরদিন সকাল ১১টার মধ্যে রেডিও স্টেশনের দখল নেই।

রফিকের সাথে বিদায়ের পালা। দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেকক্ষণ পর আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে কিছু না বলে ঊল্টো ঘুরে দরোজা দিয়ে বের হলাম

সকাল চারটার পর থেকে
১ লা জুন, ১৯৮১
দরজার বাইরে কারো সাড়া পাওয়া গেলো। দরজা দিয়ে বের হয়ে আসতেই দু’পাশ থেকে খটাস খটাস, স্টেনের উপর হাতের তালুর বাড়ির শব্দ। চমকে উঠলাম। দু’জন এম পি (Military Police) আমাকে অভিবাদন জানালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– “তোমরা? এখানে? আমার রুমের সামনে? তোমাদের ডিউটি কোথায়?”
উত্তর পেলাম,

– “স্যার, এখানেই।“

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

– “এখানে? মানে?”

কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে ওদের কজন তোতলাতে তোতলাতে বললো,

– “বিএম স্যার তিন নয় (3×9, 3 guard commanders 9 guards in 24 hours, each group for 8 hours)সান্ত্রী লাগিয়েছেন আপনার রুমে আর চিটাগাং থেকে আসা স্যারদের ঐ রুমে।“

এই প্রথম আমি চিন্তিত হ’লাম রফিককে নিয়ে। গাড়িতে উঠে বিএম এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম, পেলাম না। কমান্ডারের সাথে প্রথমে VHFএ না পেয়ে পরে HF সেটে কথা বললাম। আমাকে উনি বললেন, চিটাগাং থেকে আসা অফিসারদের নিরাপত্তার জন্যেই গার্ডের ব্যাবস্থা উনি নিজেই করেছেন।

মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম আমি চেইন অফ কমান্ডে বিশ্বাস হারালাম। বাঘের খাঁচায় যে রফিকরা সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ঢুকেছে আর আমিও তাদের রেখে এসেছি সেখানে, তখুনি তা বুঝতে শুরু করলাম।

আমার কমান্ডারকে আমি যদি বিশ্বাস করতে পারতাম! সত্যি কথাটা বলতে তাঁর কি অসুবিধে ছিল?

আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাওম
বাজে সকাল সাড়ে চারটা
সামনে আমি আমার জীপে, আমার পেছনে সাতটা গাড়ি, সবার পেছনেরটায় আমাদের রসদ আর cook house। মাঝখানের গাড়িগুলোয় যুদ্ধের সরঞ্জাম। মনটাকে অন্য কোনখানে নিয়ে যাবার জন্যে মনে মনে আমি হিসেব করা শুরু করলাম কত গুলো গোলা, কত সংখ্যক গুলি আর কয়টা জীবন লাগতে পারে চিটাগাং রেডিও স্টেশন দখল করতে।

অনেকক্ষন ধরে বসে আছি জ্যামে। চিটাগাং থেকে বহরের পর বহর সৈন্যদল আসছে। তারাই এই সাত সকালে চিটাগাং এর রাস্তায় জ্যাম লাগিয়েছে। অধিনায়কের সাথে যোগাযোগ করলাম সকাল সাতটায়। জানিয়ে দিলাম যে আমাকে যদি MP Escort না দেয়া হয় রাস্তা ক্লিয়ার করতে আর আধ ঘন্টার মধ্যে, তাহলে আমি ১১টার মধ্যে রেডিও স্টেশনে পৌছুতে পারবো না। উনি বল্লেন যে খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যাবস্থা করছেন তিনি।

হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো, মার্চ ১৯৭১। চিটাগাং রেডিও স্টেশন। পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস, আমার প্রিয় ফুপাতো বোনটা গাইছেঃ

“তোমার এই খেলাঘরে, শিশুকাল কাটিলো রে, তোমার এই ধুলামাটি, অংঙ্গে মাখি, ধন্য জীবন মানি………আমার তখন বারো, ওর এগারো।”

আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি! তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম আমার নিজের স্বাধীন দেশের সেনা বাহিনীতে আমরা বিভাজিত হয়ে মরণ খেলায় মাতবো? যেখান থেকে আমার বোনটি না জেনে তার স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে দাড়াঁনো দেশটির জাতীয় সংগীত গাইলো, সেটাকেই উড়িয়ে দিতে যাচ্ছি আমি, শত্রু মুক্ত করতে নয় সহযোদ্ধা মুক্ত করতে।

যে MP Escort আমাদের রাস্তা ক্লিয়ার করে নিয়ে যাবে তাদেরকে আমাদের ফ্রিকয়েন্সী দেয়াছিল। তারা যোগাযোগ করলো ও যে তারাও আমাদের মাইল টাক পেছনে জ্যামে আটকে গেছে।

শর্শের মধ্যে ভুত! সাড়ে দশটার সময় আমি আমার প্রাক্তন বিএমএ কমাডান্ট ব্রিগেডিয়ার লতিফকে চিটাগাং থেকে আসতে দেখে জীপ থেকে নামলাম। কুশলাদী জিজ্ঞেস করলাম (নিয়ম অনুযায়ী তাঁরই আমাকে জিজ্ঞেস করার কথা। কিন্ত আমি বিজয়ী পক্ষের উনি বিজেতা)। Nuremberg Trial এর সেই বিখ্যাত ঊক্তিটি মনে পড়ে গেল,

– “Yes! Our greatest crime is that we lost the war!”

কে যেন কাকে বলছিল বিচারের সময়!

২৪ পদাতিক ডিভিশনের একমাত্র কমান্ডার যিনি বেঁচে গিয়েছিলেন সে সময় তিনি হলেন এই লতিফ। বাকী তিন ব্রিগেড কমান্ডার (এক বীর বিক্রম ও এক বীর প্রতীক সহ) কে ফাঁসীতে ঝুলতে হয়। চার কমান্ডারের মধ্যে শুধু লতিফই যে ছিলেন প্রত্যাগত।

আনুমানিক দশটার দিকে অধিনায়ক যোগাযোগ করলেন আবার। চিটাগাং রেডিও স্টেশন আত্ম সমর্পন করেছে। আমার আর চিটাগাং যাবার দরকার নেই। পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা তখন যেখানে, সেখানেই যেন অবস্থান করি। আমরা তখন জোড়ালগঞ্জে

আমার জীপটা সেখানে থেমেছে, তার বাঁ পাশেই একটা সমতল খালি জায়গা। আতি পুরনো কিছু গাছ, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত। তার পর শ’খানেক বছরের পুরোনো একটা মসজিদ। গাড়ি থেকেই জায়গাটা পছন্দ হয়ে গেল। নেমে হাবিলদার মেজরকে নিয়ে রেকী (reconnaissance) করলাম দ্রুত। মিনিট বিশেকের মধ্যে সব তাঁবু দাঁড়িয়ে গেল। হঠাৎ চারিদিকে আলো বেশ কিছুটা কমে যাওয়ায় আমি চারিপাশ লক্ষ করলাম।আমাদের ক্যাম্প ঘিরে শয়ে শয়ে লোক এবং প্রতি মূহুর্তে বাড়ছে।

সে সময় পর্যন্ত আমার কোন ধারনাই ছিল না জিয়া কতটা জনপ্রিয়। তিন বছরের কিছু কম সময়ে দেখেছি যে জিয়া নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযুদ্ধ বি্রোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তখন অফিসার ছিল চার কিসিমেরঃ

১। মুক্তিযোদ্ধা।
২। প্রত্যাগত-সংখ্যায় সবচেয়ে বেশী।
৩।7th Fleet (JRB officerদের সাতটি কোর্সের “লিডার”দের অফিসারের মর্যাদা দিয়ে সেনা বাহিনীতে আত্মীকরন করা হয়)।
৪। আমরা-বাংলাদেশী কমিশনড আফিসার।

১, ৩ ও ৪ ক্রমিকের অফিসারেরা ছিল মোটামূটি একদল। প্রত্যাগতরা আরেক। জিয়ার ওপর আমাদের ছিল চাপা অসন্তোষ।

আমরা মনে করতাম যে ২ ক্রমিকের অফিসারেরা জিয়ার প্রতি খুবই সন্তষ্ট।

আমার সেনা উপদলের চারপাশে এত মানুষ জড়ো হ’ল যে আমি চিন্তিত হয়ে পরলাম। পুরো জোড়ালগঞ্জ ভেংগে পড়েছে। করের হাট ও অন্যান্য জায়গা থেকে লোকজন আসছেই। আমি একটা গাছের ডালে চড়ে ওদের তীক্ষভাবে লক্ষ করতে থাকলাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিন চার জন নেতাগোছের লোককে চিহ্নিত করে RP (Regimental Police) হাবিলদারকে তাদের ডেকে আনতে পাঠালাম। একজন এলাকার চেয়ারম্যান, আরেকজন স্কুলের হেডমাস্টার, একজন প্রাক্তন চেয়ারম্যান, দুজন মেম্বার। কেঊই বিএনপি বা এর অংগ সংগঠনের নয়। তারা লম্বা সালাম দিল, “স্লঅঅঅঅমালাইমুম সার”। সালাম দিয়ে প্রথমেই আমাদের অনেক প্রশংসা করলো। তারা ধরে নিয়েছে যে চিটাগাং থেকে যারা ঢাকার দিকে যাচ্ছে তারা জিয়াকে মেরেছে আর যারা ঢাকার দিক থেকে চিটাগাং যাচ্ছে তারা জিয়ার সমর্থক। একটু পড়েই তারা আমদের অনুরোধ করা শুরু করলো যে তারা আমাদের তাঁবু গাড়তে দেখেই একটা গরু ও দুটো খাসী জবাই করেছে আমাদের জন্যে। দুপুরের আতিথ্য যেন আমরা গ্রহন করি। যতই আমি বোঝাতে চাই যে সে আতিথ্য নেয়া নিয়ম বহির্ভুত, ততই তারা পীড়াপীড়ি আর অনুনয় বিনয় করতে থাকে। ঘন্টা খানেক চেষ্টা করে তাদের সাথে পেরে না ঊঠে আমি বলে ঊঠলাম যে আমরা যে কোন সময় সে স্থান ত্যাগ করতে পারি। তাদের উত্তর -আমরা যেখানে যাব সেখানেই তারা খাবার পৌছে দেবে।

ঊপায়ান্তর না দেখে আমি আমার অধিনায়কে সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করলাম। তারপর সহ অধিনায়ককে। তাদের সাথে আমার কমিঊনিকেশন নেটওয়ার্ক VHF এ। রেঞ্জ, ক্ষেত্র ভেদে ৫ থকে ৮ মাইল মাত্র, যোগাযোগ হলোনা। মহাসড়ক ধরে তখন একটা সিগন্যাল দলকে ঢাকার দিকে যেতে দেখে থামালাম। একজন হাবিলদারকে আদেশ করলাম তক্ষুণি তাদের HF সেট দিয়ে ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের সাথে আমাকে যোগাযোগ করিয়ে দিতে। সে হাবিলদারের কোন কারনই ছিলনা আমার আদেশ মানার। সে আমার under command নয়। কিন্তু বিজেতার সে মনোবল ছিলনা। মাত্র ১০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার অধিনায়কের অনুমতি নেয়ার কোন চেষ্টাও সে করলো না। পাঁচ মিনিটে সংযোগ স্থাপন হ’ল। কমানডারকে পেলাম না। তিনি তখন একসাথে ডিভ সদর ও সেনা সদরের সাথে কথা বলছেন। অগত্যা বিএমের সাথে যোগাযোগ করলাম। বিএম বললেন,

– “You goof, why don’t you understand that this is their expression of love for General Zia! Accept their invitation humbly. This is a different time and you are in a different world!” (হাঁদারাম, বুঝছনা কেন এটা জেনারেল জিয়ার প্রতি ওদের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। বিনীতভাবে ওদের আতিথ্য গ্রহন কর । এটা ভিন্ন সময় ও তুমি এখন ভিন্ন জগতে)।“

চেয়ারম্যান সাহেবকে বিনীত ভাবে বললাম যে আমরা তাঁর আতিথ্য গ্রহন করছি। জনতার মধ্যে হুল্লোড় পরে গেল। দুপুরের খাবার না বানাতে আদেশ দিয়ে মসজিদটার কাছে এলাম একা। নির্জন। দিঘিতে টলটলে জল। মনে আসলো যে ২৯ তারিখ সকালে পিটির পর আর গোসল করিনি। ৩০ তারিখের চড়ানো পোশাক গায়ে থেকে নামাই নি। দৌড়ে এসে টেন্টে কাপড় ছেড়ে সর্টস পড়ে দিঘিতে ঝাপিয়ে পড়লাম। অনেকক্ষন ডুব সাঁতার দিয়ে যখন আমি পানি ছেড়ে উঠলাম, ততক্ষনে আংগুলের চামড়া কুঁচকে গেছে আর ক্ষিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে।

কাছেই একটি স্কুলের মাঠে এলাহী কান্ড। গরুর ও খাসীর মাংসের সাথে পোলাও, বিভিন্ন সাইজের মুরগীর রোষ্ট, কলিজা, গুরদা এসব দিয়ে একটা পদ, মুরগীর লটপটি আরও হরেক রকমের খাবার। ১৫/২০টা টেবিল এক সাথে করে সব সাজানো হয়েছে। তিল ধারনের স্থান নেই। চেয়ারম্যান একটু কুন্ঠিত হয়ে বললেন অনেক গ্রামবাসী তাদের বাড়ি থেকে ভালবেসে আমাদের জন্যে খাবার নিয়ে এসেছে, তাই এত হযবরল।

খাচ্ছি আর মনে করছি -যে মানুষটিকে এতদিন প্রতিপক্ষ জেনে এসেছি সে মানুষটির প্রাপ্য ভালবাসা উজাড় করে আমাকে দেয়া হচ্ছে!

কী বিচিত্রই না এ জীবন। কি অদ্ভুতই না এর ঘটনা প্রবাহ।

অপরাহ্ন
১ লা জুন, ১৯৮১
রেডিওর একটি ঘোষনা আমাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। মেজর দোস্ত মোহাম্মদ সিকদার নাকি অধিনস্ত সৈন্যসহ আত্মসমর্পন করেছে! কিভাবে! কিভাবে?

দোস্ত মোহাম্মদ সিকদার তখন ৬ ই বেংগলের সহ অধিনায়ক। তারই ব্যাটালিয়ানের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন হায়দার তাকে জোর করে বন্দুকের মাথায় ধরে নিয়ে এসেছে। ফেনীর অস্থায়ী ব্রিগেড সদরে সে-ই একমাত্র বন্দী। রফিক, সেরনিয়াবাত বা ইলিয়াস নয়, সে কি করে আত্মসমর্পন করে?

সেই প্রথম আমার রক্ত হীম হয়ে আসা শুরু করলো। What am I missing? কি যেন একটা কিছু আমার সামনেই যা আমি দেখতে পাচ্ছিনা। কি যেন ঘটে চলেছে যা আমি ধরতে পারছিনা। অত্যন্ত অস্বস্তিকর অনুভূতি। আমি আবার আমার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সজানোর চেষ্টা করলাম। দশ বারো বার করেও কিছুই মেলাতে পারলাম না। ধুৎতেরি বলে আমার সিটে আমার পাশে শোয়ানো ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালিয়া মনে মনে ঠিক করলাম করের হাটে পৌঁছেই ব্যাটারি কিনতে হবে গান শোনার জন্যে।

গান শুনতে শুনতেই হঠাৎ জিগসাও পাজলের (jigsaw puzzle) প্রত্যেকটি অংশ ঠিক ঠিক জায়গায় বসে যেতে শুরু করলোঃ

জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা।
ব্রিগেড কমান্ড পোস্টে সব প্রত্যাগত দেখা।
রফিকও অন্যান্য আত্মসমর্পনকারীকে দেয়া প্রয়োজনাতিরিক্ত পাহারা।
এখন রেডিওতে শোনা দোস্ত মোহাম্মদ কাহিনী।

ধীরে ধীরে বোধদয় হওয়া শুরু করলো যে যা দেখছি যা শুনছি যা বুঝছি তারো বাইরে কিছু ঘটে চলছে, আর তা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা বনাম প্রত্যাগতদের লড়াই। আর আমরা ব্যাবহৃত হচ্ছি দু’দল দিয়েই। আর যে দলকে ঠিক পছন্দ করি না সে দলেরই আমি দাবার ঘুঁটি! ‘a pawn- a peon- a powerless person’, কে শিখিয়েছিল? আমার চতুর্থ শ্রেণীর গৃহ শিক্ষিকা Mrs. Rasmusen? না ফৌজদারহাটের মিস্টার রাফি ইমাম?

জোরাল গঞ্জ থেকে কিছুক্ষণ আগে রওয়ানা দিয়েছি করের হাটের উদ্দেশ্যে। নির্দেশ মত সমস্ত ভারী অস্ত্র, গোলা বারুদ ও কুক হাউজের ৩ টন গাড়ী রেখে এসেছি। হাতের নাগালে যত পেয়েছি ততগুলো স্টেন নিয়েছি। কমান্ডার আমাকে আমার ঊপদলকে নিয়ে করের হাটের একটা নির্দিষ্ট স্থানে ডেকেছেন। চেষ্টা করছি বুঝতে, কেন? খাবারের সংস্থান নেই (যদিও বলা হয়েছে যে যথা স্থানে যথা সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে), ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেলে আসা, বেশী করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নেয়া, হালকা পোশাক।

আমাকে কেন? ব্রিগেডে কি Subaltern (Lieutenant & Second Lieutenant) এর অভাব পরেছে? হিসাব করে দেখলাম পুরো ব্রিগেডের ১৫ জন সাবলটার্নের মধ্যে ১০ জনই উপস্থিত!

প্রথমে ব্রিগেড সদরে G-III, অপস রুমে চিন্তার ঝড়ে আংশ নেয়া, আত্মসমর্পন করানো, নিরস্ত্রীকরন করানো, চিটাগাং এ রেডিও স্টেশনের দখল নিতে পাঠান, এখন আবার কি যেন কি অপারেশনে পাঠাবে। আবার অংক কষতে বসলাম। সহজেই অংক মিলে গেল। এরকম পরিস্থিতিতে, যখন ন্যায় অন্যায়ের সীমা রেখা ম্লান হয়ে যায় (when the thin line between right and wrong gets blurred) , তখন ঠিক ন্যায় নয় এমন কাজ করাতে বিস্বস্থ লোকের প্রয়োজন হয়। আমার বিস্বস্থতা আমার পড়ালেখার সাথে জড়িয়ে আছে। কমান্ডার, ব্রিগেড মেজর (বিএম) আর আমি একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের।

ফেঁসে যাচ্ছি কি?

করেরহাট পৌঁছে রানারকে ব্যাটারী কিনতে বাজারে নামিয়ে দিয়ে, যতক্ষণে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছুলাম, ততক্ষণে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা, বিপথে যাওয়া একদল সৈন্যকে বাগে আনা, দেশের তরে জীবন দেয়ার সুযোগ পেয়ে আত্মহারা হওয়া এগুলো সব উবে গেছে। বুঝে গেছি এ হচ্ছে এক দলের অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করার সুযোগের সদ্যবহার করা। প্রত্যাগত দল যদি হেরে যায় তবে আমার ভাগ্যে কি ঘটবে তা আমার কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেল। তবে আশার কথা যে সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। দেখি আমাদের একই ব্রিগেডের অন্য সেনাদলের মেজর তালেবুল মাওলা (মেজর সাঈদ ঈস্কান্দার, খালেদা জিয়ার আপন ছোট ভাইয়ের কোর্স মেট, প্রয়াত), তাঁর উপদল নিয়ে আগেই এসে পড়েছেন, তাকেও ডেকেছেন কমান্ডার। মেজর মাওলার মোটর সাইকেলের ধবংস সাধন করার তিন মাস পূর্তিও হয়নি আমার, তাই তাঁকে এড়িয়ে যাবার ব্যার্থ চেষ্টা করলাম। সদা হাস্যজ্জ্বল মেজর মাওলার মুখ পান্ডুর বর্ণ ধারন করেছে। তাকে আমার চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল।

আমি পৌঁছানোর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছুলেন কালা ভাই (কমান্ডারকে এ নামেই ডাকা হ’ত আড়ালে), ইঊনিফর্মের সাথে স্নিকার পায়ে, গলায় মাফলার পেঁচানো। তার হাতের তাক ছিল অব্যর্থ। আমি আমার চাকুরী জীবনে তার চেয়ে ভাল চাঁদিয়াল (marksman) দেখিনি। শিকার করা ছিল তার নেশা। হাতে মোড়ান একটি quarter inch map (বিশেষ স্কেলের ম্যাপ) নিয়ে উনি তিন মিনিটের একটি ব্রিফিং দিয়ে আমাদের দুজনকে ছেড়ে দিলেন। করের হাট থেকে রাম গড়ের রাস্তাকে দুটি আংশে ভাগ করে রামগড় থেকে হেঁয়াকো দিলেন আমাকে। আর হেঁয়াকো থেকে করের হাট মেজর তালেবুল মাওলাকে। তিনি জানালেন যে যে জেনারেল মঞ্জুর সহ বিদ্রোহী অফিসারেরা পালাচ্ছে এবং তারা যেদিক দিয়ে এগুচ্ছে তাতে রামগড় থেকে করেরহাটের মাঝামাঝি যে কোন জায়গা দিয়েই পালানোর চেষ্টা করবে। আমাদের কাজ হবে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আমাদের এলাকা দিয়ে কোন মানুষ রাস্তা পেরিয়ে ভারতের দিকে না চলে যেতে পারে। যে-ই যাবার চেষ্টা করবে তাকেই ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে এং সামান্যতম সন্দেহ হ’লে আটক করতে হবে। আর সে যদি আমাদের পরিচিত হয় তা’লে তো কথাই নেই।

জীবনের প্রথম সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্যে একটি জিনিসই অন্তরের অন্তস্থল থেকে চাইলামঃ “হে ইচ্ছা পুরনকারী, আমার মনের একটি ইচ্ছে পুরণ করুন। কেঊ যেন আমার হাতে ধরা না পড়ে”।

আমাদেরকে আদেশ দিয়ে তিনি আগে থেকে জড়ো হ’য়ে একদল বেসামরিক স্থানীয় লোকদেরকে সংঘবদ্ধ করতে লাগলেন- ৩/৪ জনের একেকটি দলে, যারা পায়ে চলাপথ যেগুলো বাংলাদেশের ভেতর থেকে ভারতে চলে গেছে সেগুলোতে পাহারা দেবে। কমান্ডারের এলাকাটা চষা ছিল, কারন শিকার করতে তিনি প্রায়ই এলাকাটিতে কাটাতেন।

হেঁয়াকোতে ছিল একটি বি ডি আরএর বি ও পি (Border Out Post)। এমন অনেক জায়গা ছিল হেঁয়াকো থেকে রামগড় পর্যন্ত যেখানে রাস্তা পেরুলেই ৪/৫ ফুটের মধ্যে ১০/১২ ফুট চওড়া একটি অতি সরু খাল, খালটি পেরুলেই ভারত।

টহল শুরু হ’ল। প্রথমেই আমার জীপ, তার পর ৭ টি Volvo ২ টন ট্রাক, তখনকার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দামী state of the art military vehicle. হঠাৎ মনে পড়লো , জেনারেল মঞ্জুরই সিজিএস (Chief of the General Staff) থাকতে অনেক জোর জবরদস্তি করে জেনারেল জিয়াকে রাজী করিয়ে এই বাহনগুলো কিনেছিলেন। আজ তাকেই ধরতে এগুলো ব্যাবহার করা হচ্ছে।

সন্ধ্যার কিছু আগে দিকে খবর এল জেনারেল মঞ্জুর আত্মসমর্পন করেছে ফটিকছড়িতে। আমার ও মেজর মাওলার ওয়্যারলেস ফ্রিকোয়েন্সী এক থাকায় এবং আমারা দু’জন বেশিরভাগ ওয়্যারলেস নিজেরাই অপারেট করার জন্যে সব খবরাখবর আদান প্রদান হচ্ছিল। আমার কুখ্যাত Weird Sense of Humour তখনো অল্প বিস্তর কাজ করছিল। দুজনেই কিছুক্ষন অদৃষ্টবাদী কথাবার্তা বলতে বলতে মনটাকে একটু চাংগা করলাম। হঠাৎ অপরপ্রান্ত থেকে কথা বন্ধ হ’য়ে গেল। আমি তখন অপারেটরকে ওয়্যারলেস সেটটা দিয়ে দিলাম।

মিনিট পাঁচেক পর আমার অপারেটর জানালো যে মেজর রওশন ইয়াজদানী ভুঁইয়া বীর প্রতীক, মেজর মাওলার হেফাজতে । ভাগ্যের কি পরিহাস। মেজর মাওলা ক্যাপ্টেন থাকা আবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এই মেজর ইয়াজদানীর সরাসরি অধীনে GSO-III ছিলেন।

যেহেতু মেজর তালেবুল মাওলা নিজে সে ঘটনা সম্পর্কে আমাকে কোনদিন কিছু বলেন নি, আমিও কিছু জিজ্ঞেস করিনি কখনো এবং যেহেতু মেজর ইয়াজদানীর হেফাজতে আসা নিয়ে একাধিক পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায় তাই আমি সে সম্পর্কে কিছু বলছি না।

সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা আবার শুরু করলাম একই আর্জি নিয়ে। রাত বারটার কিছু আগে আমার চোখ ব্যাথা করতে লাগলো। প্রচন্ড শীতে আমি কাঁপতে লাগলাম। গাড়ীর বহর থামালাম মিনিট খানেকের জন্যে। মেডিক্যাল এসিট্যান্টকে ডেকে আনল রানার, জ্বর একশ চার। অনেকদিনের অভ্যাস জ্বর এলেই গোসল করা অনেকক্ষণ। কোথায় পাবো পানি? একবার ভাবলাম খালে নামি। কিন্তু অত সময় কোথায়? চারটা নোভালজিন মেরে দিয়ে পেটের ব্যাথায় মোচড়াতে মোচড়াতে টহল আবার শুরু করলাম।

রাতের খাবার তখনো পৌছেনি. ঘড়িতে বাজে রাত বারোটা।

পূর্বাহ্ন, ২রা জুন, ১৯৮১
রিয়ার ভিউ মিররে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করছি। সামনে মানুষের ছবি ফুটে না উঠে, ক্যাবিন লাইটে দেখা যাচ্ছে একটা অতিকায় ব্যাংএর ছবি, চোখ দুটো এতই ফুলেছে। রং টকটকে লাল। আমার ১৯৭১ সালের কথা মনে পড়ে গেল। তখনো এ রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।গায়ে প্রচন্ড জ্বর। জ্বরটা খারাপ লাগছেনা, বরং ভাল লাগছে, খুব হাল্কা হয়ে ঊড়ে যাচ্ছি উড়ে যাচ্ছি ভাব। কিন্তু চোখের যন্ত্রনায় কাতর। তার চেয়েও বড় যন্ত্রনা নতুন একটা হিসেব কষা।

বাজে ভোর চারটা। একটু আগেই কথা হয়েছে মেজর মাওলার সাথে। মেজর দোস্ত মোহাম্মদ সিকদারের কথা বলতেই উনি জোর গলায় বলে উঠলেন ” মেজর দোস্ত আবার গাদ্দারী করল নাকি?” বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে থাকলাম। মেজর মাওলা জানালেন যে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ কচুক্ষেত কমিশন, (2nd SS এর অফিসার), মুক্তি যোদ্ধা, প্রত্যাগত নয়।

অনেকক্ষন চিন্তা করে কোন কুল কিনারা না পেয়ে আমি রাস্তার দিকে মনোনিবেশ করলাম। এক পাশে ঘন জংগল আরেক পাশে ঝোপ ঝাড়ের পরেই সরু নালা। তার পরেই ভারত। ভাবতে লাগলাম ” আচ্ছা, মেজর ইয়াজদানী যখন আমাদের হেফাজতে আসেন তখন মুক্তি তারঁ কাছ থেকে কতদুর ছিল? পঞ্চাশ ফুট? ২৫? ১৫?

সকাল এগারোটা পয়তাল্লিশ। উচুঁ নীচু পাহাড় ঝোপ ঝাড় আর জঙ্গলে ভরা এলাকায় আমাদের VHF সেটগুলো ভাল যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছেনা। আমার মূল সেনাদলের সাথে তো দূরে থাক, মেজর মাওলার সাথেই প্রায়ই যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ছে। আমাদের রাতের খাবার, সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার কিছুই আসেনি। ৩০ তারিখ থেকে একবারো চোখের পাতা মিনিট খানেকের জন্যেও বন্ধ করতে পারিনি। অধিনস্ত সৈন্যেদের অবস্থা আরো খারাপ। আমি ব্রিগেড সদর থেকে তাদের সাথে যখন যোগ দিয়েছি তখন তারা সবে ফেনী নদী তীরের প্রতিরক্ষা অবস্থান ত্যাগ করেছে।
কারো সাথে কোন যোগাযোগ করতে না পেরে একক সিদ্ধান্তে ২ ঘন্টার বিরতি দিলাম সবাইকে। কিন্তু পেটে প্রচন্ড খিদে নিয়ে সবাই ইতস্ততঃ হাঁটাচলা করতে লাগলো।

কি করা যায়?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল গাড়িতে টহল দেবার সময় রাস্তায় পাহাড়ের মত উচুঁ করে স্তুপ করা অনেক কাঠাঁল দেখেছি। আমি আমার রানার ও অপারেটরকে সংগে করে জীপ নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। তিন চারটি পরিত্যাক্ত কাঠাঁল ডিবি পার হয়ার পর একটি ডিবির পাশে বিরস বদনে একজনকে বসে থাকতে দেখলাম। সে বল্ল যে ৩০ তারিখ থেকে রামগড়ের কাঠাঁল বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না। পরিবহনের কোন গাড়ি নেই। আমি অগোচরে আমার ওয়ালেট বের করে টাকা গুনলাম-সাকুল্যে সত্তুর টাকা। বললাম তার ডিবিটা আমাকে কত হ’লে দেবে। সে একশো টাকা চাইলো। দামাদামী করে সত্তুর টাকায় এক পাহাড় কাঠাঁল কিনে ফেললাম। Volvo আনিয়ে সেগুলো আমার উপদলের বিশ্রামের স্থানে নিয়ে গেলাম।

চার ভাগের একভাগ পাহাড় দিয়ে ১০০+ লোক রাতের খাবার, সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার খেলাম, এক বসায়, পেট পুরে।

খিদে মিটতেই চোখের ব্যাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। মেডিক্যাল এসিস্টেন্ট জ্বর মেপে তাপমান দেখতে গিয়ে বিষম খেল। ঝেড়ে আবার মাপলো। তারপর ঘোষনা করলো আমাকে বিশ্রামে যেতেই হবে আর যে কোনভাবে মাথায় পানি ঢালতে হবে, কারন আমার জ্বর ১০৫.৮। যেহেতু আমার বেঁধে দেয়া বিশ্রামের আরো আধ ঘন্টা বাকী , তাই আমি পাশের স্কুলের ক্লাস রুমে একটি বেঞ্চির ওপর শুলাম এবং জ্ঞান হারালাম।

একটি ঝরনার পাশে আমি আর রফিক বসা। রফিক বলছে “দোস্ত, ওরা আমাকে ঝুলিয়ে দেবে। আবার একটু দ্যাখনা হাতটা। কুল কুল শব্দে ঝরনা বয়ে চলছে। আমরা হাটহাজারীর বন জংগলে ভরা একটি পাহাড়ের নীচে বসে আছি। রফিক গাওয়া শুরু করলোঃ

Chiquitita, tell me what’s wrong
You’re enchained by your own sorrow
In your eyes there is no hope for tomorrow…

সবকিছু মিলিয়ে গেল এক সময়, শুধু ঝরনার শব্দ ছাড়া। ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখি আমার উপদল সুবেদার আমার মাথায় পানি ঢালছে, পাশে মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট, অদুরে রানার ও অপারেটর। লাফ দিয়ে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বিরতির সময় শেষ হবার আর মিনিট পাঁচেক বাকি। ঊপদল সুবেদারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। এক জায়গায় একটি জটলা। আমার উপদলের প্রায় সবাই সেখানে। আমি কাছে যেতে না যেতেই সবাই ছত্র ভংগ হয়ে পড়লো।

পাঁচ মিনিটেই আবার টহল শুরু করলাম। স্বাভাবিক সময়ে যেটা করা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ, আমি সেটাই কলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম জটলার কারন। ইতস্তত করে সে জবাব দিল,

– “স্যার জেনারেল মঞ্জুরকে সেনা প্রধানের আদেশে মেরে ফেলা হয়েছে।”

আমি চুপ মেরে গেলাম। সে যে কথাটা বলে ফেলেছে তাই তার প্রাণ যাবার জন্যে যথেষ্ঠ। এবার আর কোন সন্দেহ রইলো না আমার বন্ধু রফিকের ভাগ্যে কি আছে!

১লা জুনের মধ্যে সব অফিসারেরা আত্মসমর্পন করে। এর মধ্যে মেজর রেজা, যিনি জেনারেল মনজুরের শেষ সময়গুলোতে তার নিরাপত্তা অফিসারের দ্বায়িত্ব পালন করেন (তিনি বিদ্রোহ সম্পর্কে জানতেনই না, ২৯ শে মের রাত ঘুমিয়ে কাটিয়েছিলেন) তিনি ছাড়া আর সবাই, সাধারন ক্ষমায় বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পন করে। মেজর খালেদ (প্রয়াত) ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যায়। এ দু’জন ছিলেন বিদ্রোহে সবচেয়ে সক্রিয় পাঁচ জনের দু’জন। ৩ রা জুনের মধ্যে অন্যান্য অফিসারদের ধরা হয়। এর মধ্যে বিদ্রোহের সময় ব্রিগেডিয়ার মহসীন ছিলেন চোখের অসুখে অসুস্থ্য অবস্থায় SIQ (Sick in Quarter)। তদন্ত আদালত শুরু হয় ৪ ই জুন। ৫ তারিখ থেকেই নানা ভয়াবহ সব গুজব ছড়িয়ে পরে। বন্দী অফিসারদের ওপর অমানুষিক অত্যাচারের সব বিবরন আসতে থাকে। প্রচন্ড মার, দু’হাতের সবক’টা নখ উপড়ে ফেলা (জেষ্ঠ্য অফিসারদের বিশেষ করে), বৈদ্যুতিক শক, জননেন্দ্রিয় দিয়ে কাঁচের রড প্রবেশ করানো, হেন কোন নির্যাতন নেই যা করা হয়নি, যত দিন পর্যন্ত না তারা মনগড়া সাক্ষ্যে সাক্ষর করেছেন।

নির্যাতিতেরা ছিল মুক্তি্যোদ্ধা আর নির্যাতকদের দল নেতাও ছিল আরেক মুক্তি যোদ্ধা-কর্ণেল/ব্রিগেডিয়ার আশরাফ, DG, NSI (পরে মেজর জেনারেল)। আমি এখনো ভেবে পাইনা আমাদের মহান মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী এক মুক্তিযোদ্ধা কিসের লোভে তার সহযোদ্ধাদের অবর্ননীয় অত্যাচার করে, তাদেরকে নিজ নিজ মৃত্যু পরোয়ানায় সাক্ষর করিয়ে নেয়? তদন্ত আদালত শেষে Summary of Evidence (সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্য) তৈরি করা হয় এবং চার্জ সিট দেয়া হয়, যার ওপর ভিত্তি করে চিটাগাং জেলে গোপন কোর্ট মার্শালে (যেখানে বেসামরিক আইনজীবীদের উপস্থিতি নিষিদ্ধ) তাদের বিচার শুরু হয়। পৈশাচিক অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে নেয়া মনগড়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার শুরু হয়। তদন্ত আদালত চলাকালে ও কোর্ট মার্শালের সময় সেখানে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সার্বক্ষণিক ভাবে উপস্থিত থাকতো।

তদন্ত আদালতের সুপারিশ মালার ওপর ভিত্তি করে সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্য ও চার্জ সিট বানানো হয়। সেই চার্জ সিটের ওপর ভিত্তি করে হয় কোর্ট মার্শাল। এ নিয়মের বাইরে যাবার কোন উপায় সেনা আইনে নেই।

জেনারেল জিয়ার পি এস লে. কর্নেল ওয়াই এম মাহফুজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্যে দু’ দু’বার বীর বিক্রম খেতাবে ভুষিত হ’ন। জুনের প্রথম দিকে শুনি যে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, পরে ছেড়ে দিয়ে আবার জুলাইয়ের প্রথম দিকে তাকে ধরা হয়। তদন্ত আদালতের একজন সদস্য ছিলেন মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর ঊত্তম (অবসরপ্রাপ্ত)। তিনি এবং অন্যান্য সদস্যেরা যখন তদন্ত আদালতের কাজ শেষ করেন (সাক্ষ্য-উৎঘাটিত তথ্য-মতামত-সুপারিশ), তখন কর্নেল মাহফুজকে সেই তদন্ত আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। সুপারিশে তাঁর বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নেয়ার কথাই বলা হয়নি।কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে চার্জ সিট হয়েছে, তাঁর কোর্ট মার্শাল চলছে। কিভাবে এটা সম্ভব? নাকি আসলেই এগুলো শুধুই গুজব?

কোর্ট মার্শালের খবর আসতেই থাকলো। সেখানকার সব অনিয়ম, স্বেচ্ছাচার, একপেশে নীতি, যথেচ্ছাচার–সব কিছুরই। ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল এর প্রেসিডেন্ট বানানো হয়েছে প্রকাশ্য মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী মেজর জেনারেল আব্দুর রহমানকে। সে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ব্যাঙ্গ করতো। প্রকাশ্যে বংগবন্ধুকে বিদ্রুপ করতো। শুনলাম যে বন্দীদের ৩ জন করে এক একটি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের সেলে রাখা হয়েছে, যে সেলে লম্বা হয়ে শোয়া পর্যন্ত যায়না। প্রাকৃতিক কাজ ৩ জনকেই সেখানে সারতে হ’ত একটি পাত্রে। কোন কোন সেলে নাকি ঐ বর্জ্য পাত্র খাবারের পাত্র হিসেবেও ব্যাবহার করতে হয়েছে। আমরা ঐ সব গুজব তখন ঠিক বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আজ জানি, সে গুজবগুলো সবই সত্য ছিল।

তারিখটি মনে নেই। তবে পরিষ্কার মনে আছে সেদিনটি ছিল ২৭শে রামজান। পিটির পর (তখন রামজানে পিটি হ’ত) বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পিরিওড। সকাল আটটাও বাজেনি। অধিনায়ক তলব করলেন। বিকেলে কুমিল্লা স্টেডিয়াম কর্ডন করতে হবে। একটি হেলিকপ্টার আসবে, সেখানে কিছু কয়েদী থাকবে, তাদেরকে নিয়ে কুমিল্লা জেলে সোপর্দ করতে হবে। আমি অধিনায়কের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। তিনি জানতেন যে চট্টগ্রাম বিদ্রোহীদের মধ্যে আমার এক কোর্স মেট আছে যে আমার আতি অন্তরংগ বন্ধু এবং আরেকজনের সাথে আছে গাঢ় হৃদ্যতা।

দুপুরের আগেই ডিউটি বদলে যায়। যিনি আমাকে ২৯শে মে তে টি্পরা বাজার এম পি চেক পোস্টে নামিয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই ডিউটিটি করেন। শেষ বিকেলের দিকে হেলিকপ্টার নামে। বের করা হ্য় কয়েদীদের। চোখ বাঁধা, হাতে পায়ে কাফ, লোহার শেকল, ডান্ডা বেড়ি, এগুলো এমন ভাবে বাঁধা যে কেঊই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছিল না। তারা যে কখনো সেনা বাহিনীতে অফিসার ছিল বা সেনাবাহিনীতে ছিল তা অতি কষ্টেও কল্পনাতে আনা যাচ্ছিল না। তাদেরকে চ্যাংদোলা করে ওঠানো হ’ল গাড়িতে। ওঠানোর সময় কর্তব্যরত অফিসারটি একজনকে সনাক্ত করেন- মেজর আব্দুল কাইঊম খান- বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে উনি আমাদের G-2 (General Staff Officer Grade-2) ছিলেন। দু’জনের মধ্যে অল্প কিছুক্ষণ কথোপকথন হয়।

মেজর আব্দুল কাইউম খানকে যখন চিটাগাং জেলে পাঠানো হয়, তার বাবা, সে সময়কার দিনের বিরাট ব্যাবসায়ী, তখন দক্ষিণ আমেরিকায় (সম্ভবতঃ পেরুতে)। তাকে খুঁজে পেতেই লেগে যায় দিন তিনেক। তিনি দেশে আসেন। সেনা প্রধানের সাথে দেখা করেন। এর ফলশ্রুতিতে একদিন গভীর রাতে/ভোর রাতে কুমিল্লা জেলের একটি ফটক খুলে যায়। বাইরে অপেক্ষমান গাড়িতে উঠে মেজর আব্দুল কাইঊম খান সোজা ঢাকা বিমান বন্দরে। সেখান থেকে আমেরিকায়।জর্জিয়া স্টেট ইঊনিভারসিটি্ থেকে ফিনান্সে ১৯৮৯ সালে পিএইচডি করে অনেকদিন সে দেশে কাটিয়ে এখন স্বদেশে। জনশ্রুতি আছে যে সেনাপ্রধানের সাথে মেজর আবদুল কাইয়ুম খানের বাবার সাক্ষাতের সময় কোটি টাকার বিনিময় হয়েছিল।

ইস, আমার বন্ধুটার বাবা আনসার এডজুট্যান্ট না হয়ে যদি অতি সফল ব্যাবসায়ী হতেন!

আর এখানেই শেষ করা যাক লেঃ ত্রিশোনকুর স্মৃতিচারন।

পরিশিষ্টঃ
এভাবেই শেষ হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেসিডেন্ট লেঃ জেঃ জিয়াউর রহমানের অধ্যায়ের। এই হত্যার পেছনে প্রথমে জেঃ মঞ্জুরকেই দোষী করা হলেও এবং সেটাকেই সঠিক মনে করা হলেও সেটা সব প্রশ্নের উত্তর দেয়না। এই হত্যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে গেলেন জেঃ এরশাদ। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় জেঃ মঞ্জুর ছিলেন দাবার একটা ঘুটি। জেঃ এরশাদের নেতৃত্বে প্রত্যাগত সামরিক অফিসার এবং রাজনীতিবিদেরা যে জেঃ মঞ্জুরকে উস্কে দিচ্ছিলেন তা বোঝা যায়। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রধান দুই মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সরিয়ে দেবার পথ প্রশস্ত হয়। ক্ষমতা সম্পূর্নরুপে প্রত্যাগত অফিসারদের হস্তগত করবার উপায় হিসেবে জে মঞ্জুরকে উস্কে দেয়া হয় এবং কাজ সমাধা হয়ে গেলে নিঃচিহ্ন করে ফেলা হয়। প্রেসিডেন্টের চারপাশের নিরাপত্তা এতোটাই অপ্রতুল থাকবার পেছনের যুক্তি ধোপে টেকেনা। ঝুকিপূর্ন অবস্থানে অবস্থিত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্টের থাকবার ব্যবস্থা করা। জেঃ মঞ্জুরকে বিচারের আগেই সরিয়ে দেয়া এবং জেঃ মঞ্জুরের এবং রেকর্ডকৃত বক্তব্য উধাও করে ফেলা অদৃশ্য কোন শক্তির ইশারায় সবকিছু হওয়াকে নির্দেশ করে। আর সে সক্ষমতা একমাত্র সেনাপ্রধানের ছিলো সে সময়। ধারনা করা হয় যে জেঃ এরশাদ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট সাত্তারকে সমর্থন দেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যাপক জনসমর্থনের কারনে। প্রায় পুরো দেশের মানুষ এই হত্যাকান্ডের বিপক্ষে ছিলো। তবে জেঃ এরশাদ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। উনি বলেন,

– “প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা দেয়া আমার দ্বায়িত্ব ছিলনা। উনি ছিলেন একজন বেসামরিক প্রেসিডেন্ট, আর তাই তার নিরাপত্তা দেবার দ্বায়িত্ব বেসামরিক প্রশাসনের। তারাই তাকে রক্ষা করেনি। তারাই তাকে নিরাপত্তা দেয়নি।“

তবে সেই সময়ে এবং এই সময়েও দেশের সরকার প্রধান রাজধানীর বাইরে গেলে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা ঠিকমত করা হয়েছে কি না তা তদারক করাও সেনাপ্রধানের দ্বায়িত্বের মধ্যেই পরে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের এলাকার ভেতরেই পরে এবং ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে নিরাপত্তাবিধানের প্রাথমিক দ্বায়িত্ব সেনাবাহিনীর, বেসামরিক প্রশাসনের নয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোন প্রহরা কি সেখানে আদৌ ছিলো? এর জন্য যদি জিওসি জেঃ মঞ্জুর দায়ি থাকেন তবে সেনাপ্রধানও দায়ী থাকবার কথা। সেনাবাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্যরা জিওসির অধীনে থাকেন না, থাকেন সরাসরি সেনাপ্রধানের অধীনে। স্বাভাবিক সময়েই যেখানে একটূ এদিক সেদিক হলেই রিপোর্ট করা হয়, সেখানে এতো বড় অনিয়ম সেনাপ্রধানকে কি জানানো হয়নি?

১৬ অক্টোবর, ২০১০ সালে জেঃ এরশাদের জাতীয় পার্টির সাংসদ নাসিম ওসমান নারায়নগঞ্জের মদনগঞ্জ মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এক সভায় বলেন,

– “জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিলো এবং এই কারনেই এরশাদের হাতে তার হত্যাকান্ড যুক্তিযুক্ত। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ৩০শে মে ১৯৮১ সালেই জিয়া হত্যার সাথে সাথে হয়ে গেছে কারন উনিই ছিলেন জাতির পিতার হত্যাকারীদের পেছনের প্রধান ব্যক্তি।“

উনি আরও বলেন,

– “আপনারা কি জানেন আমি কেন এরশাদের জাতীয় পার্টিতে আছি? কারন যা আমি করতে চেয়েছিলাম তা উনি করে দিয়েছেন।“
জেঃ এরশাদ এবং তার মুখপাত্রদের কাউকে এরপর বেশ কয়দিন যোগাযোগ করে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কেউ এ ব্যাপারে প্রতিবাদও করেননি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটা প্রধান হত্যাকান্ডও হয়তো রহস্যময় ব্যাপারই হয়ে থাকবে। আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যার জন্য দায়ী করা হয়নি। আর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়েও কিছু হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকান্ডের পর যে বিচার হয়েছিলো তা ছিলো বিদ্রোহের অভিযোগে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকান্ডের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার হলেন বিএনপির প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে গনভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে ২৪শে মার্চ ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রেসিডেন্ট সাত্তারের সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতার দখল নেবেন জেঃ এরশাদ। উনি এরপর মার্শাল ল’ জারী করেন এবং নিজের দল জাতীয় পার্টি গঠন করেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার দেখানো পথেই। তাকে সরানর মত প্রতিপক্ষ সে সময় সেনাবাহিনীতে আর কেউ ছিলনা। তার আসেপাশের সকল অফিসারই যে প্রত্যাগত ছিলেন, তার নিজের বাছাই করা।

শুরু হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের, বাংলাদেশের প্রধান দুইটি দল যাকে নির্দ্বিধায় স্বৈরাচারী শাসনামল বলে মেনে নেবে। কিন্তু প্রতিটা দলই যখন সরকার বিরোধী আন্দোলনে যাবে জেঃ এরশাদ পরবর্তী সময়, তাদের মিত্র হিসেবে বেছে নেবেন এই স্বৈরাচারকেই। প্রেসিডেন্ট জিয়া ঠিকই বলেছিলেন,

“Politics make strange bed fellows!”

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *