পড়ে দেখুন (অবুঝদের জন্য নয়)

শাহবাগে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় সব ব্লগে একটা বিষয় কমন হয়ে গেছে, যারাই ব্লগিং করছে, তারা প্রায় সকলেই ধর্ম আর ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ গুলোর বিপক্ষে লেখা শুরু করেছে। আবার অন্যদিকে ধর্মপ্রাণ (!) মানুষগুলো ব্লগার বলতেই এক দল নাস্তিককে কল্পনা করছে, এতে আবার দেখা যাচ্ছে যারা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে নেতিবাচক কিছু লিখত না- তারা আবার এখন নেতিবাচক লেখা শুরু করেছে, কারন, ধর্মের প্রতি সহানুভূতি দেখালে যে আবার প্রতিষ্ঠিত ব্লগারেরা তাদের সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু করবেন!
এতক্ষণ যে ধর্মের কথা বলা হয়েছে, তা শুধু একটা ধর্মকেই বুঝাচ্ছে, যা হল ইসলাম। প্রথম কথা হল বর্তমানে ব্লগ সাইট গুলো কিংবা ফেসবুক এর জনপ্রিয় মানুষগুলো কারা? আমার দেখা মতে যারা “যৌবন আমার কচুপাতার পানি” কিংবা “হাসাইতে হাসাইতে মাইরা ফালামু” টাইপ লেখা যারা লেখে তারা। আর বুদ্ধিজীবী হিসেবে এ সকল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত কারা? তাও প্রায় এক-ই রকম, অর্থাৎ, টুপিওয়ালা মানুষ দেখলেই যারা রাজাকার বলে নয়তো ইসলামের নামে বেশ কিছু অগ্নিঝরা এবং শ্রবণযোগ্য ভাষার গালি দিতে পেরেছেন তারা। অর্থাৎ, আমরা এখানে যাদেরকে মাথায় তুলি, তারা হয় ভাঁড়, নয়তো শরীর কেন্দ্রিক সাহিত্যিক অথবা কিছু দুই পা ওয়ালা হায়েনা; যারা মানুষের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।

প্রথমে একটু বোঝার চেষ্টা করলে হয়না আমরা এমন কেন করছি? বা আমরা কারা? একটা জিনিস বলে রাখি, ব্লগ সাইট গুলোতে একটা করে আই.ডি ওপেন করে চটকদার কিছু লিখে ফেললেই কেউ বুদ্ধিজীবী হয়ে যায় না। আর ধর্ম নিয়ে আশালীন কিছু লিখলে বা শালীন ভাষায় কতক্ষণ গালাগালি করলেই প্রগতিশীল হওয়া যায় না।
ধর্ম কী তা বুঝে ক’জন? ধর্ম যা বলে তা সত্য না মিথ্যা তা আমি বলতে চাইনা, তবে এতটুকু মাথায় রাখা উচিত, ধর্ম একটা আবেগ, একটা সংস্কৃতি। মানুষ আবেগ কে ধারণ করেই এতদূর এসেছে। দেশপ্রেম ও একটা আবেগ। আর দেশ বা জাতি সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ধর্মকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে; যা প্রমাণিত। দেশপ্রেমের আবেগ এত কড়া হতে পারে আর ধর্মেরটা হলেই দোষ? দেশপ্রেমের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করতে পারলে; দেশের বিরোধী শক্তিকে জানের দুশমন মনে করতে পারলে এটাও বোঝা উচিৎ, যেই ধর্মকে আশ্রয় করে সেই দেশ গঠিত হয়, সেই ধর্মকে নিয়ে ফাজলামো করলেও কিছু মানুষ আপনাকে জানের দুশমন মনে করবে, আর সেটা বৈধ।

পরের কথা হল, যদি আপনি অলৌকিকতা বিশ্বাস না করেন, তবে আপনি মুক্ত চিন্তার অধিকারী হতে পারবেন, ঠিক আছে, মানলাম, কিন্তু একজন মুক্ত চিন্তার অধিকারী হিসেবে আপনার এটা তো বোঝা উচিৎ, গোঁড়া ধর্মে বিশ্বাসী মানুষগুলো তো বুঝেনা, তাদের বিরুদ্ধে অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করাটা কি ঠিক? আপনি সচেতন হয়ে যদি এই কাজ করেন তবে ঐ মানুষগুলো কী করবে? আপনি মুক্ত মনের মানুষ, তাই আপনি মুক্ত মনের-ই থাকুননা, কে মানা করেছে? আপনি যেটা বিশ্বাস করেননা সেটা অন্য কেউ ও বিশ্বাস করতে পারবেনা? আর আপনি যদি বলতে চান যে, আপনি জনতার সেবক হিসেবে মানুষের মন থেকে এই কুসংস্কারের বোঝা সরিয়ে দিবেন, তাহলে সেটা সুন্দর প্রমাণসহ জনসাধারনকে জানানোর চেষ্টা করুন। আপনি আপনার তত্ত্ব প্রমাণ না করে তাদের ধর্মের দোষ-গুন নিয়া টানাটানি করেন কেন? এতে তো মানুষ বিক্ষুদ্ধ হয়!
তারও পরের কথা হল, অনেকেই স্বঘোষিত নাস্তিক হিসেবে নিজেকে দাবী করছেন, আসলেই কী আপনি নাস্তিক? যদি নাস্তিক-ই হন, তাহলে আপনার বর্ণনায় শুধু ইসলামের কু-কীর্তি (!) কেন উঠে আসে? অন্য ধর্মেরটা কোথায়? উল্টো আরও অন্য ধর্মের কীর্তন শোনা যায়! এর দুটো কারন থাকতে পারে- প্রথমত, অন্য ধর্ম সম্বন্ধে ধারনা নেই বলে বেড়ার ওপারের ঘাসগুলোকে সবুজ মনে করছেন। দ্বিতীয়ত, এই কারন দেখানোর চেষ্টা যে, আমি আগে নিজের ধর্মের সমালোচনা করছি, কারন, আমি নিরপেক্ষ!!!
আসলেই কী তাই? উপরের কারন গুলো কী যথার্থ? নাকি এর মাঝে অন্য কাউকে অনুসরণ করার চেষ্টা? নাকি নিজেকে পশ্চিমা সমাজ উপযোগী হিসেবে প্রমাণ করার নিরন্তর চেষ্টার একটা মাত্র? আধুনিক হতে গেলে কি ধর্মকেই আগে জবাই করা দরকার? ভেবে দেখুন, ধর্ম; সেটা যে ধর্মই হোক, সেটা মানুষকে অনেক বেশি সু-শৃঙ্খল রাখে, যা সমাজের উন্নয়নে অনেক বেশি দরকার। ধর্মের যত দোষ-ই থাকুক, এই গুনটা তার অসাধারন। নিজেকে বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করার জন্য ও ধর্ম বিদ্বেষী হিসেবে প্রস্তুত করারও কোন দরকার নেই। অন্য অনেক বিষয় আছে। এটা মানুষের আবেগের স্থান, যেমনি একজন লোকের বোন, মা, কিংবা স্ত্রী তার আবেগের জায়গা। আপনি নিশ্চয়-ই মানুষের পরিবারের মহিলাদেরকে ধর্ষণ করার জন্য অন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবেননা, তাদের শরীরের ঘ্রান কেমন, তাদের জৈবিক ক্ষুধা কেমন তা নিয়ে কটাক্ষ করার চেষ্টা করবেননা, সেভাবেই ধর্মটাকেও নেয়ার চেষ্টা করুন। দেখবেন, আপনি ও যেমন আপনার চিন্তা নিয়ে ভালো থাকবেন; তৃপ্তি পাবেন, তারাও আপনাকে মারতে আসবে না। সর্বোচ্চ হলে আপনি যেমন তাদের দেখে মনে মনে গোঁড়া বলবেন, তারাও তেমনি আপনাকে দেখে মনে মনে অস্বীকারকারী বলবে, তাতে সমাজের স্থীরতায় কোন ব্যাঘাত ঘটবে বলে আমি মনে করিনা।

সকল ব্লগারদের কাছে একটা জিজ্ঞাসা, আপনারা আবেগপ্রান মুসলিম মানুষ গুলোকে এভাবে হেয় করছেন কেন? তারা বলছে আপনারা নাস্তিক, আর আপনিও তাদেরকে এটা কেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে আপনি নাস্তিক? এ দেশে তো নাস্তিক বলতে শুধু ইসলাম বিদ্বেষীদেরকেই বুঝানো হয়। আপনি যদি সত্যিকারের নাস্তিক হয়েও থাকেন, তবে আপনি বলুন যে, আমি কোন ধর্ম মানিনা, কোন ধর্মের বিপক্ষেও যাই না। কারন, এ দেশে কোন নাস্তিক নাই, আছে হয় ইসলাম সহিষ্ণু নয়তো ইসলাম বিদ্বেষী; অন্য ধর্মের ব্যাপারে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই! তাই এদের ক্ষেত্রে নাস্তিক শব্দটা খাটেনা। আর অনুরোধ সকল ব্লগারদের কাছে, সাধারণ মানুষদেরকে বুঝতে দিন, ব্লগাররাও সাধারণ মানুষ, তাদের মাঝেও ধার্মিক আছে, আর ব্লগাররা কেউ-ই ধর্ম-বিদ্বেষী না; কিছু লোক ব্যক্তিগতভাবে এমন হতে পারে, তবে তার সাথে সবার সম্পর্ক নেই।

আমরা একটা সুন্দর দেশ চাই, প্রতিষ্ঠিত জাতি হিসেবে নিজেদেরকে আরো অনেক অনে-এ-এ-ক উপরে দেখতে চাই, অন্য কারো নকল করে যা হয়না, অন্যের অনুকরণে শুধু হালের বলদ হওয়া সম্ভব। নিজের মান উন্নত করুন নিজের চেষ্টায়, নিজেকে বদলে নিন নিজের চাহিদা মাফিক। সফলতা না এসে যাবে কই?

১২ thoughts on “পড়ে দেখুন (অবুঝদের জন্য নয়)

  1. লেখার শুরুর দিকের কিছু কথা
    লেখার শুরুর দিকের কিছু কথা মানতে পারলাম না।প্রকৃত গবেষক,বোদ্ধাদের মধ্যেও অনেকে জনপ্রিয় আছেন।বাকি সবগুলো পয়েন্টে সহমত।

    1. রাসেল ভাই, সহমত প্রকাশের জন্য
      রাসেল ভাই, সহমত প্রকাশের জন্য শুভেচ্ছা, আর প্রকৃত বুদ্ধিজীবীরাও যে জনপ্রিয় নয়, তা বলছিনা, ওখানে আমার লেখা উচিৎ ছিল “অধিকাংশ”…… ভালো থাকবেন

  2. যেই ধর্মকে আশ্রয় করে সেই দেশ

    যেই ধর্মকে আশ্রয় করে সেই দেশ গঠিত হয়, সেই ধর্মকে নিয়ে ফাজলামো করলেও কিছু মানুষ আপনাকে জানের দুশমন মনে করবে, আর সেটা বৈধ।

    আপনার এই কথাটা আপত্তিকর। ধর্মকে আশ্রয় করে পাকিস্থান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম সেই ধর্ম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ধর্ম রক্ষার জন্য হয়নি। বরং ধর্ম রক্ষার নাম করে এক দল হায়েনা এদেশের কোটি কোটি নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঠিক ৪২ বছর পরও তারা সেই একই নোংরা খেলায় নেমেছে, আর আপনাদের মতন নিজেদের মডারেট মুসলিম দাবী করা মানুষগুলো তাদের সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছেন। যে কোন উগ্রতার বিরোধী আমি। তাই বলে আজকে ধর্ম নিয়ে যেই প্রশ্ন উঠেছে তার সাথে তাল মেলাতে পারব না। কারন মূল উদ্দেশ্য যে ধর্ম রক্ষা নয় সেটা খুব ভালো করেই জানি।

    1. আপনাকে আমি পুরো লেখাটা আর
      আপনাকে আমি পুরো লেখাটা আর একবার পড়ার জন্য অনুরোধ করবো। আর আমি কাকে সাপোর্ট করেছি তা আপনার বোঝা উচিৎ, আমি কিন্তু একবারের জন্য ও মুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বী কিংবা ব্লগার অথবা নাস্তিক কারোর-ই বিরোধিতা বা সাপোর্ট করিনাই। পুরো লেখাটা সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছি আর ম্যাক্স ভেবার’র funcionalism থিওরী তে অর্থাৎ সমাজের সকল কিছুর সহাবস্থান ও সহযোগিতা মূলক আচরণের কথা বলেছি। সমাজে ভালো খারাপ কিছু রায় দেয়ার আপনিও যেমন কেউ না, তেমনি আমিও কেউ না। আমরা শুধু সময়ের প্রয়োজন অপ্রয়োজন নিয়ে কথা বলতে পারি, যেখানে ব্যক্তিগত অভিমত গ্রাহ্য নয়। আর এই কথাগুলো যদি আপনি না বুঝেন, তাহলে শুধু শুধু তর্ক করবনা। লেখাটা পড়ে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।

  3. যে সংস্কৃতি বা বিশ্বাস আপনাকে
    যে সংস্কৃতি বা বিশ্বাস আপনাকে পেছনে ঠেলে দেয় তার বিরুদ্ধে সমালোচনা উঠবেই । আর ব্লগে নাস্তিকগণ শুধু এক ধর্মের বিষয় নিয়ে কথা বলে, আপনার এই অভিযোগ সত্য নয় । বাঞলাদেশের ক্ষেত্রে ইসলাম কে নিয়ে একটু বেশি কথা বলা হবে এটা স্বাভাবিক । কারন এই দেশে ইসলাম ধর্মের অনুসারী বেশি । আর বর্তমান সময়ে এই ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের অধিক পরিমানে সহিংস হতে দেখা যাচ্ছে ।

    1. নাস্তিক আস্তিক ইস্যুটা যত
      নাস্তিক আস্তিক ইস্যুটা যত গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তার চাইতে বেশিই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমি জানি কে। তুমি জান তুমি কে। ব্যাস। পরিষ্কার। কিন্তু এ নিয়ে চাপাচাপিরও কিছু নেই। কচলাকচলিরও কিছু নেই। বিষয়টা পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। আর গোঁড়ামি অনেক বেশি ক্ষতিকর। সেটা যে মতের পক্ষেই হোক না কেন। আমি বাঙ্গালী হিসেবেই পরিচিত হতে চাই।
      কিন্তু,

      দেশপ্রেমের আবেগ এত কড়া হতে পারে আর ধর্মেরটা হলেই দোষ?

      এর মানে কি? দেশপ্রেম আমাকে শেখায়, দেশের মানুষকে ভালবাসতে।আর ধর্মান্ধতা শেখায়, ধর্মের হুজুগে প্রতিবেশির ঘরে আগুন দিতে। এটাই সত্যি কথা।

    2. ভাই কবিয়াল, লেখার সমালোচনা
      ভাই কবিয়াল, লেখার সমালোচনা অবশ্যই করবেন, প্রকৃত লেখক তাতে খুশি হয়। কিন্তু আমি আপনাকেও লেখাটা আর একবার পড়ে দেখার অনুরোধ করবো, তাতে হয়ত কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হবে। ভালো থাকবেন।

  4. সাম্প্রসিত সময়ে দেশ
    সাম্প্রসিত সময়ে দেশ প্রেমিকদের আচরণ আর তথাকথিত ধার্মিকদের আচরণ তূলনা করলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *