জর্জ কার্লিন: ধর্ম মানেই বুলশিট!

বুলশিট-এর বাংলা কি হবে? আবোলতাবোল কথা নাকি ছাইপাঁশ, আজগুবি বা ফালতু কথা? কারণ এই লেখাটার শিরোনাম হল “ধর্ম মানে বুলশিট!” জর্জ কার্লিনের বক্তৃতাকেন্দ্রিক এই লেখাটির শিরোনাম লিখতে গিয়ে অনেক ঘাম ঝরেছে।
কৌতুক অভিনেতা বা লেখক যেভাবেই তাকে পরিচয় করাই, তিনি আসলে আধুনিক পৃথিবীর একজন প্রথিতযশা দার্শনিক যিনি তার জীবদ্দশায় যুক্তিসঙ্গত কথা বলতে রাখঢাক করেননি।


বুলশিট-এর বাংলা কি হবে? আবোলতাবোল কথা নাকি ছাইপাঁশ, আজগুবি বা ফালতু কথা? কারণ এই লেখাটার শিরোনাম হল “ধর্ম মানে বুলশিট!” জর্জ কার্লিনের বক্তৃতাকেন্দ্রিক এই লেখাটির শিরোনাম লিখতে গিয়ে অনেক ঘাম ঝরেছে।
কৌতুক অভিনেতা বা লেখক যেভাবেই তাকে পরিচয় করাই, তিনি আসলে আধুনিক পৃথিবীর একজন প্রথিতযশা দার্শনিক যিনি তার জীবদ্দশায় যুক্তিসঙ্গত কথা বলতে রাখঢাক করেননি।

অনুবাদের সুবিধার্থে কার্লিনের কথাগুলো হুবহু বলা যাচ্ছেনা, তবে এখানে কিছুই বাদ যাবেনা। পড়ুন ও ভাবুন…
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফালতু বিষয় হল ধর্ম। এর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। শুধুই ধর্ম। পৃথিবীর সবচেয়ে ফালতু গল্পগুলো আপনি ধর্ম বইয়ে পাবেন। ভেবে দেখুন।

ধর্মগুলো মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, আকাশের উপরে একজন অদৃশ্য “পুরুষ” আছে যে কিনা সবকিছু দেখছে; আপনি প্রতি দিন প্রতি মিনিটে যা কিছু করছেন সব।
এই ব্যক্তির কাছে আবার দশটি কাজের একটি বিশেষ তালিকা আছে যা আপনি করতে পারবেন না। আর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে যদি আপনি সেসব কাজ করেন তাহলে সে আপনাকে একটি বিশেষ জায়গায় পাঠিয়ে দেবে যেখানে আছে শুধু আগুন, ধোঁয়া, নির্যাতন আর যন্ত্রণা; আপনাকে সেখানেই থাকতে হবে। যুগ যুগ ধরে আপনি কষ্ট পাবেন, চিৎকার করবেন, যন্ত্রণা ভোগ করবেন!

কিন্তু মজার ব্যাপার হল সেই ব্যক্তি আবার আপনাকে ভালোবাসে। আর তার দরকার টাকা, অনেক টাকা। সে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী, এবং সব কাজ সুচারুভাবে করতে পারে, শুধু টাকা-পয়সা সামলাতে পারেনা। ধর্মের কথা বলে সে অনুসারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু কোন ট্যাক্স দিচ্ছেনা! তার চাহিদার শেষ নেই। আরো টাকা চাই। যতসব!

তবে আমি আপনাদের জানাতে চাই যে, আমি অনেক চেষ্টা করেছি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস রাখতে। সত্যি অনেক চেষ্টা করেছি। আমি বিশ্বাস করতে চেয়েছি যে সৃষ্টিকর্তা আছে; সে আমাদের প্রত্যেককে তার নিজের মতো করে, তার পছন্দমতো করেই তৈরি করেছে। সে আমাদের সত্যি অনেক ভালোবাসে এবং আমাদের খেয়াল রাখে… আমি সত্যি অনেক চেষ্টা করেছি বিশ্বাস করতে।

কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনি যত দিন বাঁচবেন, চোখ-কান খোলা রাখবেন, ততই বুঝবেন কোথায় যেন একটা গোলমাল আছে।

অবশ্যই গোলমাল আছে! পৃথিবীতে যুদ্ধ, অসুখ-বিসুখ, মৃত্যু, ধ্বংসযজ্ঞ, নির্যাতন, দারিদ্র, ক্ষুধা, অপরাধ, দুর্নীতি লেগেই আছে। নিশ্চয়ই এখানে কোন গোলমাল আছে। এগুলো সুখের বিষয় নয়। আর এসব যদি সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে ভালো উপহার হয়, তবে আমি তার অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখতে পারছিনা। পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রাণীদের এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ার কথা নয়। এ ধরণের আচরণ আপনি হয়তো পেতে পারেন আপনার অফিসের বদমেজাজি সহকর্মীর কাছ থেকে।

কোন ভদ্র মহাবিশ্ব হলে অনেক আগেই সৃষ্টিকর্তাকে লেজ গুটিয়ে পালাতে হতো!
ওহ, আরেকটা কথা! বার বার “ব্যক্তি” বলছি কারণ এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, যদি সৃষ্টিকর্তা থেকেই থাকে তবে সে অবশ্যই একজন পুরুষ। কোন নারীর পক্ষে এভাবে সবকিছু উল্টাপাল্টা করে দেয়া সম্ভব না।

আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তা যদি থেকেই থাকে, তবে যেকোনো বিচক্ষণ মানুষ মাত্রই স্বীকার করবেন যে সে একদমই অযোগ্য, এবং সে আমাদের থোড়াই কেয়ার করে। এ ধরণের বেখেয়ালি আচরণ কোন মানুষের মধ্যে দেখলে হয়তো আমি তাকে মেনে নিতাম; বুঝতাম যে এসব তার দ্বারা সম্ভব। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা কেন তার সৃষ্টিকে এভাবে শাস্তি দিবে?
তাই আমি অন্যদের মতো মস্তিষ্ক-বিহীন রোবট হতে চাইনি। অন্ধের মতো উদ্দেশ্য-বিহীনভাবে বিশ্বাস করিনা যে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে কোণ এক ভুতুড়ে অযোগ্য পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যে কিনা আমাদের কিসে ভালো হবে তা নিয়ে একদম ভাবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে নিজেকে আমি এমন কারো কাছে সমর্পণ করবো যাকে সম্মান করতে পারি।

ভাবতে গিয়ে প্রথমেই আমার মাথায় আসলো সূর্যের কথা, হঠাতই। রাতারাতি আমি সূর্যের উপাসক হয়ে গেলাম। ওহ, নাহ, রাতের বেলায় নয়। রাতে তো আর সূর্যকে দেখা যায় না! তাই পরদিন সকাল থেকেই আমি সূর্যের উপাসনা শুরু করে দিলাম; কয়েকটি কারণে।
প্রথম কথা হল আমি সূর্যকে দেখতে পাই, ঠিক না? সূর্য অন্য আর কয়েকটা সৃষ্টিকর্তার মতো নয়। তাকে দেখা যায়। আমি জানি না, হয়তো দেখি বলেই সূর্যকে আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। সূর্যকে আমি প্রতিদিনই দেখতে পাই, অনুভব করি। কারণ সূর্য আমাকে সবকিছু দেয় যেমন, তাপ, আলো, খাবার, ফুল-ফল, পানিতে প্রতিফলন; এমনকি ক্ষেত্র-বিশেষে ত্বকের ক্যানসারের কারণও হয়! কিন্তু মতের সাথে অমিল থাকার কারণে আমি অন্তত কাউকে খুন করিনা বা পুড়িয়ে মারি না।

সূর্যের উপাসনা খুবই সহজ একটা ব্যাপার। এর মধ্যে রহস্য নেই, অলৌকিকতা নেই, সাড়ম্বর অনুষ্ঠান নেই, বিশেষ কোন গান শেখার বাধ্যবাধকতা নেই, এমনকি সপ্তাহে একদিন একটা বিশেষ ভবনে গিয়ে সবাই একত্র হয়ে নিজেদের জামা-কাপড় তুলনা করার মতো বিষয়ও নেই। সূর্যের সবচেয়ে বড় গুন হল সে আমাকে কখনো বলে না যে আমি কোন কাজের না; বলে না যে আমি একজন খারাপ মানুষ যাকে তার রক্ষা করতে হবে; কখনোই আমাকে কোন রূঢ় কিছু বলে কষ্ট দেয় না। বরং আমার সাথে সখ্যতা রাখে। তাই আমি সূর্যের উপাসনা করি। কিন্তু আমি তার কাছে কোন প্রার্থনা করি না। কেননা তার সাথে আমার বন্ধুত্ব নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

আমি অনেক সময় ভেবে দেখেছি মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে অনেক বিরক্ত করে। তাই না? তারা প্রতিদিন কোটিবার প্রার্থনা করে তার কাছে এটা ওটা চায়। তারা বলে আমার জন্য এটা করে দাও, ঐ জিনিসটা আমার চাই, আমি একটা গাড়ি চাই, একটা ভালো চাকরি চাই… আর বেশিরভাগ প্রার্থনাই করা হয় যেদিন তার ছুটির দিন! এটা কি ঠিক? বন্ধুর সাথে এ ধরণের ব্যবহার করা ঠিক না।

কিন্তু তবুও মানুষ প্রার্থনা করে; অদ্ভুত সব বিষয়ে সমাধান চায়! প্রার্থনা করে তাকে ডেকে এনে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দোকানে বসিয়ে দিতে চায় যেন চাইলেই সব হাতের কাছে পাওয়া যায়। অন্ধত্বের জন্য বা পোলিওতে আক্রান্ত হলেও কি আপনি প্রার্থনা করবেন?
আমি মনে করি আপনি যা খুশি তাই প্রার্থনা করেন সমস্যা নেই। কিন্তু ভাগ্যের লিখনের কি হবে? মনে আছে সৃষ্টিকর্তার সেই পরিকল্পনার কথা যা সে তৈরি করে রেখেছে অনেক অনেক আগেই? সে অনেক ভেবেচিন্তে সেই পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং কাজে লাগাচ্ছে। কোটি কোটি বছর ধরে সেই পরিকল্পনা-মাফিক সবকিছু ঠিকমতোই চলছিলো। এরপর আপনি আসলেন। এসে তার কাছে কিছু চাইলেন। ভেবে দেখুন তো সেই জিনিস যদি তার পরিকল্পনায় না থাকে তাহলে কি হবে? সেক্ষেত্রে আপনি কি করতে পারেন? তাকে তার পরিকল্পনা বদলাতে বলবেন? শুধু আপনার জন্য? এটা একটু কেমন কেমন শোনালো না? এটা ঐশ্বরিক পরিকল্পনা (কপালের লিখন)। আপনার মতো একজন মানুষের জন্য যদি তাকে তার পরিকল্পনা পাল্টাতে হয় তাহলে আর সৃষ্টিকর্তা হয়ে কি লাভ?
আরেকটা বিষয়। ধরুন, আপনার প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তা শুনলো না, কি করবেন আপনি? কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? সব তার ইচ্ছা? ঠিক আছে! সবকিছু যদি তার ইচ্ছাতেই হয়, তাহলে আপনার প্রার্থনা করার দরকারটা কি? এটাকে আমার মনে হয় সময়ের অপচয়। আপনি কি প্রার্থনা না করে তার ইচ্ছার অপেক্ষায় থাকতে পারলেন না? এইসব বিষয় খুবই বিভ্রান্তিকর।
এইসব ঝামেলা এড়াতেই আমি তাই সূর্যের উপাসনা করি। কিন্তু আমি তার কাছে কিছু চাই না।

আপনারা জানেন আমি কার কাছে প্রার্থনা করি? জো পেসি। দুইটি কারণে আমি তার কাছে প্রার্থনা করি। প্রথমত: তিনি একজন ভালো অভিনেতা। এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর দ্বিতীয়ত: তিনি এমন একজন মানুষ যিনি অনেক কিছু করতে জানেন। জো পেসি আলতু-ফালতু কেউ না। জীবনে তিনি এমন কিছু করেছেন যা করতে সৃষ্টিকর্তা নিজেও বিপদে পড়ে যায়।

পাশের বাসার ঘেউ ঘেউ করা কুকুরটির বিষয়ে বিহিত করতে আমি বহু বছর সৃষ্টিকর্তাকে বলেছিলাম। জো পেসি একবার এসেই সমস্যার সমাধান দিয়ে গেলেন; একটি সামান্য বেসবল ব্যাট দিয়েই। হাহাহা…!!!

তাই আমি গত একবছর ধরে জো পেসির কাছেই প্রার্থনা করি। তারপর থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করছি: সৃষ্টিকর্তার কাছে এতদিন যা চেয়েছিলাম এবং এখন জো পেসির কাছে যা চাইছি তার মোটামুটি ৫০ভাগ পূরণ হয়েছে। তার মানে আমি যা চাইছি তার অর্ধেক পাচ্ছি, অর্ধেক পাচ্ছি না। ভাগ্যের খেলাগুলো এমনই। ৫০-৫০! সুতরাং নিজের অন্ধবিশ্বাস নিয়েই খুশি থাকুন, একটা ইচ্ছা করুন এবং দেখুন কি হয়।

আর যারা শিক্ষণীয় বিষয় বা উন্নত সাহিত্যমানের জন্য বাইবেল পড়েন তাদেরকে আমি বলবো অন্য কিছু পড়ুন। যেমন শিশুতোষ ছড়া ও গল্প। এসব বই থেকে জীবনে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি শিখেছি যে, সৃষ্টিকর্তা বলে কিছু নেই, কখনো ছিলোনা।
আমি আসলে বিষয়টাকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই: যদি সৃষ্টিকর্তা থেকেই থাকে তবে সে এখানে উপস্থিত সব দর্শক-শ্রোতাদের মেরে ফেলুক। দেখলেন তো, কিছুই হয়নি! সবাই ঠিক আছেন তো? এই দেখুন। এবার আমি আরো বড় কিছু করবো। সৃষ্টিকর্তা যদি থেকেই থাকে তবে সে আমাকে এক্ষুনি মেরে ফেলবে। দেখুন, আমার কিছুই হয়নি। নাহ! আরে! আমি তো পায়ে ব্যথা পেয়েছি, আমার অণ্ডকোষে ব্যথা হচ্ছে! আমি অন্ধ হয়ে গেছি… নাহ, এখন সব ঠিক হয়ে গেছে! নিশ্চয় এটা জো পেসির কারণে! সৃষ্টিকর্তা জো পেসির উপর সহায় হোক। সবাইকে ধন্যবাদ। জো পেসি আপনাকে ভালো রাখুন!

৭ thoughts on “জর্জ কার্লিন: ধর্ম মানেই বুলশিট!

  1. দারুণ একটা কাজ করেছেন। এই
    দারুণ একটা কাজ করেছেন। এই ধরনের প্রচুর অনুবাদ প্রয়োজন আমাদের। কাজটির জন্য আপনাকে স্যালুট। সম্ভব হলে পোস্টের নীচে ইউটিউব ভিডিওটির এম্বেড যোগ করে দিয়েন।

  2. ধর্মগুলো সব রুপকথা।পুরুষোচিত
    ধর্মগুলো সব রুপকথা।পুরুষোচিত জীবন ব্যবস্থা,যত সুযোগ সুবিধা সব পুরুষের জন্য বরাদ্দ।

  3. রূপকথা পড়ে যেমন বিনোদন পাওয়া
    রূপকথা পড়ে যেমন বিনোদন পাওয়া যায়, ধর্মগ্রন্থগুলো পড়েও বিনোদিত হওয়া যায়। ধর্ম মানেই বুলশিট!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *