জিন্স বিড়ম্বনা

ইউনিভার্সিটির প্রথম দিকের ঘটনা । যতদূর মনে পড়ে ডিপার্টমেন্টে একটা অনুষ্ঠান ছিল। আমি তখন মোহাম্মাদপুরে থাকি। ইউনিভার্সিটির বাসে যাতায়াত করতাম। ইউনিভার্সিটির বাস না পেলে আনলাকি থার্টিনই (১৩ নং) ভরসা।

ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান উপলক্ষে জিন্স আর শার্ট পড়েছিলাম। বেল্ট না পড়ে শার্টের সামনের অংশ প্যান্টের মধ্যে গুজে দেওয়া দেখেছিলাম কোন এক তরুণ বলিউডের হিরোকে। আমি তাকে অনুসরণ কি অনুকরন করেছিলাম সেটা বুঝিনি কিন্তু যা বুঝেছিলাম তা এই যে ওই হিরো ব্যাটার উপরে যদি ডিরেক্টর না থাকত এবং ওর জিন্সটা যদি ঢাকার নিউমার্কেট থেকে কেনা হত তাহলে তা ফ্যাশান হত না, হত বিড়ম্বনা।


ইউনিভার্সিটির প্রথম দিকের ঘটনা । যতদূর মনে পড়ে ডিপার্টমেন্টে একটা অনুষ্ঠান ছিল। আমি তখন মোহাম্মাদপুরে থাকি। ইউনিভার্সিটির বাসে যাতায়াত করতাম। ইউনিভার্সিটির বাস না পেলে আনলাকি থার্টিনই (১৩ নং) ভরসা।

ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান উপলক্ষে জিন্স আর শার্ট পড়েছিলাম। বেল্ট না পড়ে শার্টের সামনের অংশ প্যান্টের মধ্যে গুজে দেওয়া দেখেছিলাম কোন এক তরুণ বলিউডের হিরোকে। আমি তাকে অনুসরণ কি অনুকরন করেছিলাম সেটা বুঝিনি কিন্তু যা বুঝেছিলাম তা এই যে ওই হিরো ব্যাটার উপরে যদি ডিরেক্টর না থাকত এবং ওর জিন্সটা যদি ঢাকার নিউমার্কেট থেকে কেনা হত তাহলে তা ফ্যাশান হত না, হত বিড়ম্বনা।

জিন্স কেনার কাহিনীটা ছিল এরকম- অনেক দোকান ঘাটাঘাটি করে সাত’শ টাকা দিয়ে সেদিনের সে জিন্সটি কিনেছিলাম। দোকানদার দাম চাইল ২৩’শ টাকা। ভেবেছিলাম কিনে হয়ত জিতেছি। কিন্তু জেতাজেতির রশি যে অনেকটাই দোকানদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা জেনেছিলাম জিন্স কেনার সপ্তাহখানেক পরে। দোকানদার আমার কোমর মাপল ৩২ ইঞ্চি, আমি জানতাম ৩১। ভাবলাম বেড়ে গেছি হয়ত।জিন্সের কোমরও মাপল ৩২ কিন্তু সেটা ছিল ৩৩। জিন্সের গায়ে লেখাও ছিল ৩৩। কিন্তু দোকানদার বলল, বস এটা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির মাপ। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির মালে এরকমই লেখা থাকে। পড়ার পর এটা আরও এঁটে যাবে। সরল বিশ্বাসে কিনলাম।

অনুষ্ঠানের দিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল। নাস্তা করলাম না। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম বলিউড ফ্যাশানে । জিন্স পড়লাম, সাথে শার্ট। শার্টের পেছনের অংশটা ছেড়ে দিয়ে সামনের অংশটা গুজে দিলাম। তারপর বেরিয়ে পড়লাম। বাসা থেকে বের হয়ে ১৩ নং বাস স্ট্যান্ডের দিকে কিছুটা হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম জিনসটা একটু একটু করে আলগা হয়ে যাচ্ছে। মনে পড়ল লিটনের কথা। লিটন আমার বন্ধু। ও জিন্স খুব নিচে পড়ত। নিচে বলতে এমন একটা সেনসিটিভ জায়গায় পড়ত, সেখান থেকে দুর্ঘটনাবশত একটু নিচে নামলে, জিন্স কর্তার সম্মানটাই এক্ লাফে নেমে ধুলায় লুটোপুটি খেত। একদিন ওকে বলেছিলাম, দোস্ত জিনসটা একটু উপরে ওঠা না! কোনদিন জিন্স কেলেঙ্কারিতে পড়বি। লিটন বলেছিল, অনেকদিন ধরে শুনতাছি পৃথিবী নাকি ধ্বংস হবে, আজো কিন্তু হয়নি।

লিটনের কথা মতই চলতে লাগলাম, ভাবলাম, পৃথিবীটা যেহেতু আজো ধংস হয়নি আমার জিনসটাও খুলে পড়বে না। কিন্তু লিটনের থিওরি খাটল না। ক্রমে এটি সেনসিটিভ থেকে সেনসিটিভ জায়গায় নামতে লাগল। হাত দিয়ে টেনে তুলতে লাগলাম। কিন্তু হাত দিয়ে কি আর পৃথিবীর ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যায়! ইউনিভার্সিটির বাস পেলাম না। ভরসা আনলাকি থার্টিন। ১৩ নং বাসে উঠলাম। সিট পেলাম না। আশাও করিনি, কিন্তু আজ দরকার ছিল। একহাত দিয়ে গাড়ির ছাদ-সমান্তরাল হাতলটি ধরলাম। বাসের মৃদু ঝাকুনিটাও আমার জিনসটি সহ্য করতে পারল না। বাধ্য হয়ে একহাত দিয়ে হাতল আর একহাত দিয়ে নিজের মান সম্মান চেপে ধরলাম, এই জনারন্যে যদি মান সম্মান হারায় তবে এখান থেকে তাকে আর উদ্ধার করতে পারব না।

আমার পেছনের সিটে কয়েকজন মেয়ে বসেছিল। কথা- বার্তা শুনে বুঝেছিলাম তারা এই শহরের একটি বিখ্যাত মহিলা কলেজের সম্মান বর্ষের ছাত্রী। তারা আমাকে নিয়ে ফিসফিস কথা বলছিল আর জোরে জোরে হাসছিল। ওদের দিকে তাকানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। যে ক্ষমতা আমার ছিল তা হল শক্ত করে ধরে রাখা- জিন্স এবং বাসের হাতল দুইটাই।

পাশে বসা দুই মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক আমার দিকে কটমট করে তাকাল এবং ব্যঙ্গ বলল, স্মার্টনেস।
মৃদু মৃদু ঝাঁকুনিতে বাস চলতে লাগল ধানমণ্ডির ভিতর দিয়ে। ঝিগাতলার কাছে এলে একজন নেমে গেল। তড়িৎ গতিতে আমি জায়গাটা দখল নিলাম। এবার কমেডি অফ এরর (ভ্রান্তি বিলাস) ঘটল। সিটে বসার সময় শার্টটা পেছন থেকে একটু উঁচু হয়ে গেছিল। সেটি আমি খেয়াল করিনি। করার কথাও না। আমি ব্যস্ত ছিলাম জিন্স নিয়ে, কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও আমার আন্ডারওয়ারের কিয়দাংশ ঢাকা শহরকে দেখার একটু অবকাশ পাইল। যেটি দেখার অবকাশ আমি না পেলেও পেছনে বসা মেয়েগুলোর দৃষ্টি এড়াতে পারল না, বরং আঁটকে গেল। উচ্চস্বরে হেসে উঠে ওদের মধ্য থেকে কেউ বলে উঠল, বাঙালি আজকাল আন্ডারওয়ারেরও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এবার আমার ভ্রম ভাঙল । অন্যমনস্কভাবে বিজ্ঞাপনটা ঢেকে দিলাম। কিন্তু পণ্যটি বাজারে এতটাই জনপ্রিয় যে, বাস থকে স্বয়ং কোম্পানিটি না নামা পর্যন্ত এর প্রভাব রইল।

নীলক্ষেত এসে জিন্স ধরে ধরে নামলাম। রিকশা নিয়ে অপু মান্নানদের ফোন করে বললাম, তোদের হলে আসতাছি একটা বেল্ট লাগবে। ওরা বলল, আমারা ক্যাম্পাসে চলে আসছি, তুই ক্যাম্পাসে আয়, এখান থেকে আমাদের তা খুলে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে পড়িস।

সেই ভরসায় ক্যাম্পাসেই গেলাম। রিকশা থেকেই দেখতে পেলাম বন্ধুরা আনন্দ উল্লাস করতে করতে সবার চেয়ে ওজনে ভারি (অবশ্য কখনও ওজন মাপে না) মটু পুত্রকে উপরে তুলে নাচ্ছে। আমি রিকশা থেকে নেমে একদৌড়ে সেখানে পৌঁছে মটুপুত্রকে উপরে তোলার কাজে হাত লাগালাম। ততক্ষণে জিন্সের কথা ভুলে গেছি। মটুপুত্রকে উপরে তুলতেই টের পেলাম জিন্স সেনসিটিভ জায়গা অতিক্রম করে দ্রুত বেগে নিচের দিকে ধাবমান। এদিকে দু হাত উচু করে মটুকে ধরে আছি। যদি জিন্স ধরতে যায় তাহলে মটুপুত্র পড়ে যাবে। আর যদি মটুপুত্র বাঁচে তাহলে আমার জিন্স পড়ে যাবে। একদিকে বন্ধুর জীবন অন্যদিকে নিজের মান সম্মান। কোনটিকে আমি বেছে নেব? বেশ সিদ্ধান্তহীনতায় পড়লাম।

চরম মুহূর্তে যে মানুষ স্বার্থপর হয়ে যায় তার প্রমাণ আমি। মটুপুত্রকে ছেড়ে দিয়ে সেদিন আমি নিজের মান সম্মানকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। অবশ্য কিভাবে যেন সেদিন নিউটনের অভিকর্ষ সূত্র কাজ করেনি। আমি ছেড়ে দিলেও প্রাণের বন্ধু মটুপুত্র নিচে পড়ে যায়নি।

২ thoughts on “জিন্স বিড়ম্বনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *